মোঃ আলমগীর হোসেন
উপজেলা প্রতিনিধি, কাজিপুর
যমুনা বিধৌত সিরাজগঞ্জের কাজিপুরের চরাঞ্চলের পলিমাটি থেকে উঠে আসা এক সৃজনমুখর নাম রাশেদ রেহমান। তিনি একাধারে কবি, কথাসাহিত্যিক, সম্পাদক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা। শেকড়সচেতন এই স্রষ্টা তাঁর বহুমুখী প্রতিভা ও নিরলস সাধনায় সমকালীন বাংলা সাহিত্য ও শিল্পাঙ্গনে গড়ে তুলেছেন নিজস্ব অবস্থান।
তাঁর সাহিত্যজীবনের অন্যতম মাইলফলক উপন্যাস আজিরণ বেওয়া। গ্রামীণ জীবনের বাস্তবতা, মানবিক টানাপোড়েন ও জীবন্ত চরিত্রায়নের জন্য উপন্যাসটি পাঠকমহলে ব্যাপক সমাদৃত হয়। অমর একুশে বইমেলায় গ্রন্থটির পঞ্চম সংস্করণ প্রকাশ এ জনপ্রিয়তারই প্রমাণ। এ কৃতিত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বাংলাদেশ-ভারত যৌথ আয়োজনে ‘বঙ্গভূমি সাহিত্য সম্মাননা–২০১৮’ লাভ করেন।
উপন্যাসটির গল্পচিত্র পরে রূপ নেয় চলচ্চিত্রে। প্রখ্যাত নির্মাতা মির্জা সাখাওয়াত হোসাইন–এর প্রাথমিক ভাবনার সূত্র ধরে ২০২৩–২৪ অর্থবছরে গীতালি হাসান–এর পরিচালনা ও প্রযোজনায় এটি সরকারি অনুদান পায়। দীর্ঘ চিত্রায়ন শেষে চলচ্চিত্রটি বর্তমানে সম্পাদনার পর্যায়ে রয়েছে। সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্রে এই অভিযাত্রা তাঁর সৃষ্টিশীলতার বিস্তারকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
চলচ্চিত্র জগতে তিনি কেবল গল্পকার নন, দক্ষ সংগঠক ও নির্মাণ-সহযোগী হিসেবেও পরিচিত। ‘স্বপ্নযাত্রা’, ‘একজন মহান পিতা’, ‘হরিজন’ ও ‘চুন’সহ দশটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে তিনি প্রধান সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন। অভিজ্ঞ নির্মাতাদের সঙ্গে কাজের মধ্য দিয়ে অর্জিত এই দক্ষতা তাঁকে পূর্ণাঙ্গ পরিচালনায় আত্মপ্রকাশের আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে। ‘একজন মহান পিতা’ চলচ্চিত্রে মুক্তিযোদ্ধার চরিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি ফতে লুহানী পুরস্কার অর্জন করেন।
সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় তাঁর অবাধ বিচরণ। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহ—
গল্পগ্রন্থ: ‘নির্জন চরাচরে’, ‘আঁধভাঙা চাঁদ’
উপন্যাস: ‘নদীর নাম যমুনা’, ‘ওপার-এপার’
কাব্য ও ছড়া: ‘দুঃখ সুখের যমুনা’, ‘টাইমলাইনের কবিতা’, ‘আবির রাঙা ছড়া’
নাটক: ‘কোমক’, ‘এপার ওপার’, ‘চর’, ‘শালিক’, ‘রক্তাক্ত পতাকা’, ‘বন্দি আমার মা’
এছাড়া তিনি শতাধিক গানের রচয়িতা। সরকারি অনুদানের চলচ্চিত্র ‘আজিরণ’-এ তাঁর লেখা দুটি গান সংযোজিত হয়েছে।
প্রায় দেড় দশক ধরে তিনি সম্পাদনা করে আসছেন সাহিত্যপত্র ‘ক্যাপ্টেন’। নবীন ও প্রান্তিক লেখকদের জন্য এটি একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিবেচিত। তিনি ‘ক্যাপ্টেন শহীদ এম মনসুর আলী সাহিত্য পরিষদ’-এর প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক এবং ‘বঙ্গভূমি সাহিত্য পর্ষদ (বসাপ)’–এর কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি ‘বঙ্গমাতা সাংস্কৃতিক জোট’-এর কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন।
তাঁর সাহিত্যকর্ম বিভিন্ন পুরস্কারে স্বীকৃত হয়েছে। কথাসাহিত্যে শাহ জালাল স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার; উপন্যাসে উত্তরণ সাহিত্য পুরস্কার, লালন একাডেমিক পুরস্কার (ছেউড়িয়া) এবং ভারত থেকে ‘দ্য বেস্ট নভেলিস্ট অ্যাওয়ার্ড–২০১৮’ (ICHFR); ছোটগল্পে অণুরীমা সাহিত্য পুরস্কার ও দেশ বাংলার দুই বাংলা বর্ষসেরা পুরস্কার; এছাড়া জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম জন্মজয়ন্তী পুরস্কার, শীতলপাটি সাহিত্য পুরস্কার ও আইডিয়া প্রকাশন শিশু সাহিত্য পুরস্কারসহ একাধিক সম্মাননা তিনি অর্জন করেছেন।
মাটি ও মানুষের ঘ্রাণ থেকে নাগরিক বোধ—দুই ধারার সংমিশ্রণে রাশেদ রেহমান নির্মাণ করেছেন নিজস্ব শিল্পভুবন। গ্রাম থিয়েটার ও রেডিওতে পত্রলিখন দিয়ে শুরু হওয়া তাঁর যাত্রা আজ বাংলা সাহিত্য ও চলচ্চিত্র অঙ্গনে এক প্রতিষ্ঠিত নাম। তাঁর এই ধারাবাহিক সৃজনযাত্রা আগামী দিনেও সমানভাবে সমৃদ্ধ করবে আমাদের সংস্কৃতি—এমন প্রত্যাশাই সবার।






