কৃষিবিদ
এম. মোজাহিদুল ইসলাম সেলিম, পিএইচডি
চাহিদার সঠিক হিসাব, দেশীয় উৎপাদন, মাননিয়ন্ত্রণ ও কৌশলগত মজুত—চার স্তম্ভে গড়ে উঠতে পারে বীজ নিরাপত্তা
বাংলাদেশে সবজি উৎপাদন ও বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। শহর থেকে গ্রাম—সবখানেই সবজির চাহিদা বাড়ছে। কৃষকেরাও বাণিজ্যিকভাবে সবজি চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। কিন্তু সবজি উৎপাদনের এই অগ্রযাত্রার পেছনে যে গুরুত্বপূর্ণ উপকরণটি রয়েছে, সেই বীজের বাজার এখনো অনেকাংশে আমদানিনির্ভর।
এটি শুধু বাণিজ্যিক বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষকের উৎপাদন ঝুঁকি, খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় এবং ভবিষ্যতের কৃষি-নিরাপত্তা।
দেশে বছরে সবজি বীজের চাহিদা আনুমানিক ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ৫০০ টন। এর প্রায় ৬০ শতাংশ আমদানিনির্ভর বলে বিভিন্ন খাতভিত্তিক হিসাবে উঠে এসেছে। অন্যদিকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের একটি নিম্নতর পরিকল্পনা হিসাবেও প্রায় ৩ হাজার ৬০ টন চাহিদার কথা রয়েছে। অর্থাৎ জাতীয় পর্যায়ে সবজি বীজের প্রকৃত চাহিদা কত—এ বিষয়ে একটি অভিন্ন ও নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডারের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট। এই বাস্তবতায় ২০২৬–২০৩০ মেয়াদে একটি জাতীয় সবজি বীজ গবেষণা, উৎপাদন ও কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণের প্রস্তাব সময়োপযোগী। তবে পরিকল্পনাটি শুধু বীজ কেনাকেন্দ্রিক হলে চলবে না। প্রয়োজন হবে চাহিদা নিরূপণ, দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি, মাননিয়ন্ত্রণ, রোগবালাই নজরদারি, কৌশলগত মজুত এবং ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটিকে একই কাঠামোর মধ্যে আনা।
প্রথম কাজ চাহিদার সঠিক হিসাব
কোন ফসলের কত বীজ প্রয়োজন—এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর ছাড়া কার্যকর বীজনীতি করা সম্ভব নয়।
প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় ২০২৬/২৭ অর্থবছরের জন্য ৪ হাজার ৫০০ টনকে পরিকল্পনাগত ভিত্তি ধরে নেওয়া হয়েছে। বছরে ৪ শতাংশ চাহিদা বাড়লে ২০৩০ সালের দিকে তা প্রায় ৫ হাজার ২৬৪ টনে দাঁড়াতে পারে। তবে এই সংখ্যা সরকারি চূড়ান্ত হিসাব নয়; প্রতি বছর সরকারি ফসলভিত্তিক চাহিদা ও সরবরাহের তথ্য দিয়ে তা সংশোধন করতে হবে।
এখানেই একটি বড় সংস্কারের সুযোগ রয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়, বিএডিসি, বেসরকারি বীজ কোম্পানি, আমদানিকারক, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং মাঠপর্যায়ের উৎপাদনের তথ্য সমন্বয় করে একটি জাতীয় সবজি বীজ ডেটাবেস তৈরি করা দরকার।
শুধু মোট চাহিদা নয়—কোন অঞ্চলে কোন ফসল, কোন জাত, কোন মৌসুমে এবং কত পরিমাণ বীজ প্রয়োজন, তারও তথ্য থাকতে হবে। তাহলেই আমদানি, দেশীয় উৎপাদন ও সরকারি ক্রয় পরিকল্পনা বাস্তবভিত্তিক হবে।
আমদানি বন্ধ নয়, নির্ভরতা কমানোই লক্ষ্য
সবজি বীজের ক্ষেত্রে রাতারাতি আমদানি বন্ধ করা বাস্তবসম্মত নয়। বিশেষ করে হাইব্রিড সবজি বীজের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক জেনেটিক উপাদান, উন্নত প্যারেন্ট লাইন এবং নতুন জাতের প্রয়োজন রয়েছে।
তাই নীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত—‘শূন্য আমদানি’ নয়, ‘ন্যূনতম প্রয়োজনীয় আমদানি এবং সর্বোচ্চ প্রতিযোগিতামূলক দেশীয় উৎপাদন’।
প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৭১ শতাংশ সবজি বীজ দেশীয় উৎস থেকে সরবরাহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সে হিসাবে প্রায় ৩ হাজার ৭২৩ টন দেশীয় উৎপাদন এবং ১ হাজার ৫৪১ টন কৌশলগত আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় ৫২৬ টন বীজ কৌশলগত মজুত হিসেবে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এগুলো পরিকল্পনাগত লক্ষ্য, সরকারি চূড়ান্ত প্রতিশ্রুতি নয়।
এই লক্ষ্য অর্জনে সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি বীজ কোম্পানির মধ্যে কার্যকর অংশীদারত্ব প্রয়োজন।
যেসব ফসলে এখনই নজর দেওয়া দরকার
সবজি বীজের ক্ষেত্রে একই ধরনের নীতি সব ফসলে প্রয়োগ করা ঠিক হবে না।
টমেটো, বেগুন, মরিচ, শসা, লাউ, করলা, কুমড়া, ঢেঁড়স ও বিভিন্ন শাকজাতীয় ফসলকে জাতীয় বীজ নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ ফসল হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। এসব ফসলে দেশীয় উৎপাদনের সুযোগ তুলনামূলকভাবে বেশি।
অন্যদিকে মূলা, বাঁধাকপি, ফুলকপি ও গাজরকে আমদানি-প্রতিস্থাপনকারী ফসল হিসেবে অগ্রাধিকার দেওয়া দরকার। পরিকল্পনায় ২০৩০ সালের মধ্যে এসব ফসলে ৬০–৭০ শতাংশ পর্যন্ত দেশীয় সরবরাহের লক্ষ্য প্রস্তাব করা হয়েছে।
মূলার ক্ষেত্রে দেশীয় হাইব্রিড ব্রিডিং, স্বল্পমেয়াদি ও তাপসহিষ্ণু জাত এবং প্যারেন্ট লাইন সংরক্ষণে বিনিয়োগ প্রয়োজন। টমেটোর ক্ষেত্রে তাপসহিষ্ণুতা, রোগ প্রতিরোধ এবং উচ্চ তাপমাত্রায় ফল ধরার সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। বেগুনে ব্যাকটেরিয়াজনিত ঢলে পড়া রোগ ও শুট অ্যান্ড ফ্রুট বোরার প্রতিরোধী জাতের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
অর্থাৎ ভবিষ্যতের বীজনীতি শুধু পরিমাণনির্ভর হলে হবে না; জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খায় এমন বীজ উৎপাদনও এর অন্যতম লক্ষ্য হতে হবে।
বীজ কেনার আগে মান যাচাই বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—সরকার যে বীজ কিনবে, সেটি কতটা মানসম্পন্ন?
কেবল সরবরাহকারীর কাগজপত্রের ওপর নির্ভর করে সরকারি বীজ গ্রহণ করা উচিত নয়। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বীজ লটকে নির্ধারিত মাননিয়ন্ত্রণ পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
শারীরিক বিশুদ্ধতা, অঙ্কুরোদগম, আর্দ্রতা, বীজের স্বাস্থ্য, প্রয়োজন অনুযায়ী জীবনীশক্তি বা টেট্রাজোলিয়াম পরীক্ষা, জাতগত বিশুদ্ধতা এবং হাইব্রিড বিশুদ্ধতা—ফসল ও ঝুঁকি অনুযায়ী এসব পরীক্ষা করা দরকার। হাইব্রিড সবজির ক্ষেত্রে জেনেটিক ও হাইব্রিড বিশুদ্ধতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে হাইব্রিড বীজের ক্ষেত্রে শুধু ভালো অঙ্কুরোদগম হলেই চলবে না। বীজটি সত্যিই ঘোষিত হাইব্রিড কি না, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
এ জন্য সরবরাহকারীর নিজস্ব মাননিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি স্বাধীন ও স্বীকৃত পরীক্ষাগারে পরীক্ষা এবং বিতরণের পর নমুনাভিত্তিক নজরদারি চালু করা যেতে পারে।
বীজের মাননিয়ন্ত্রণে স্বাধীন পরীক্ষাগারের ভূমিকা
একটি শক্তিশালী জাতীয় বীজ ব্যবস্থায় স্বাধীন বীজ পরীক্ষাগার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বীজ সরবরাহকারী এবং সরকারি ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের মাঝখানে একটি নিরপেক্ষ বৈজ্ঞানিক যাচাইব্যবস্থা থাকা দরকার।
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি ও প্রযোজ্য জাতীয় মান অনুসরণ করে নমুনা গ্রহণ, বিশুদ্ধতা, অঙ্কুরোদগম, আর্দ্রতা, বীজ স্বাস্থ্য, জীবনীশক্তি, জেনেটিক বা হাইব্রিড বিশুদ্ধতা এবং প্রয়োজনে রেফারি পরীক্ষা করা যেতে পারে।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—‘বীজ সরবরাহ করা হয়েছে’ আর ‘মান যাচাই করে বীজ গ্রহণ করা হয়েছে’—দুটি এক বিষয় নয়।
জাতীয় বীজ নিরাপত্তার হিসাবেও দ্বিতীয়টিকেই গুরুত্ব দিতে হবে।
বীজ স্বাস্থ্য এখন খাদ্যনিরাপত্তার অংশ
সবজি বীজের সঙ্গে শুধু অঙ্কুরোদগম বা বিশুদ্ধতার প্রশ্ন জড়িত নয়; বীজবাহিত রোগও বড় ঝুঁকি।
একটি দূষিত বীজের মাধ্যমে রোগ একটি অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই জাতীয় পর্যায়ে সবজি বীজ স্বাস্থ্য নজরদারি ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন।
ঝুঁকি অনুযায়ী ব্লটার ও আগার পদ্ধতি, মাইক্রোস্কপি, বীজ ওয়াশিং এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ELISA, PCR/qPCR ও সিকোয়েন্সিংয়ের মতো আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে।
আমদানিকৃত বীজের ক্ষেত্রে আমদানি অনুমতি, উদ্ভিদ সংগনিরোধ, নমুনা গ্রহণ, পরীক্ষাগার পরীক্ষা ও ছাড়পত্রের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে।
১০ শতাংশ কৌশলগত বীজ মজুতের প্রস্তাব
বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অতিবৃষ্টি বা অন্য কোনো দুর্যোগে কৃষকের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হয় সময়মতো বীজ।
এই বাস্তবতায় বছরে প্রয়োজনীয় সবজি বীজের প্রায় ১০ শতাংশ কৌশলগত মজুত রাখার প্রস্তাব গুরুত্বপূর্ণ। ২০৩০ সালের সম্ভাব্য চাহিদা ৫ হাজার ২৬৪ টন ধরলে মজুতের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ৫২৬ টন।
তবে সব বীজ একটি গুদামে রাখা উচিত নয়। জাতীয়, আঞ্চলিক এবং চুক্তিভিত্তিক বেসরকারি মজুত—এই তিন স্তরে ব্যবস্থা করা যেতে পারে। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে অঙ্কুরোদগম ও অন্যান্য মান পুনঃপরীক্ষা করে বীজ ঘুরিয়ে ব্যবহার করতে হবে।
সরকারি ক্রয়ে শুধু কম দাম নয়, মানই প্রধান হওয়া উচিত
সরকারি বীজ ক্রয়ে সবচেয়ে কম দামকে প্রধান বিবেচনা করা হলে দীর্ঘমেয়াদে কৃষক ও সরকার উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
প্রস্তাবিত মূল্যায়ন কাঠামোয় অঙ্কুরোদগম ও জীবনীশক্তি, জেনেটিক বা হাইব্রিড বিশুদ্ধতা এবং বীজ স্বাস্থ্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দামকে মোট মূল্যায়নের মাত্র পাঁচ নম্বর দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
নীতিগতভাবে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। সরকারি ক্রয় হওয়া উচিত ‘সর্বনিম্ন মূল্য’ নয়, ‘নিশ্চিত মানসহ সর্বনিম্ন মূল্যায়িত ব্যয়’-এর ভিত্তিতে।
ডিজিটাল বীজ পরিচিতি চালু করা দরকার
প্রতিটি সরকারি ক্রয় করা বীজ লটের জন্য একটি ডিজিটাল আইডি এবং কিউআর কোড চালু করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে জাত, উৎপাদক, উৎপাদন এলাকা, পরীক্ষাগার, পরীক্ষার ফল, উৎপাদনের দেশ, পরীক্ষার তারিখ এবং পুনঃপরীক্ষার তথ্য জানা যাবে।
এতে কোনো বীজ লটে সমস্যা দেখা দিলে তার উৎস দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে কৃষক, ডিলার, সরকারি সংস্থা ও পরীক্ষাগারের মধ্যে জবাবদিহি বাড়বে।
শেষ কথা: বীজ নিরাপত্তা মানেই কৃষকের নিরাপত্তা
বাংলাদেশের সবজি খাতকে আরও শক্তিশালী করতে হলে শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না; উৎপাদনের ভিত্তি—বীজ ব্যবস্থাকেও শক্তিশালী করতে হবে।
এর জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত জাতীয় পরিকল্পনা, যেখানে থাকবে নির্ভরযোগ্য চাহিদার তথ্য, দেশীয় হাইব্রিড বীজ উৎপাদন, কৌশলগত আমদানি, স্বাধীন পরীক্ষাগারভিত্তিক মাননিয়ন্ত্রণ, বীজ স্বাস্থ্য নজরদারি, কৌশলগত মজুত, জেনেটিক সম্পদ সংরক্ষণ এবং ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি।
২০২৬–২০৩০ সালের মধ্যে যদি বাংলাদেশ সবজি বীজের অন্তত ৭০ শতাংশ দেশীয় উৎস থেকে সরবরাহের সক্ষমতা অর্জন করতে পারে এবং আমদানিকে প্রয়োজনীয় জেনেটিক ও কৌশলগত ব্যবহারে সীমিত রাখতে পারে, তাহলে এটি শুধু বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করবে না—কৃষকের উৎপাদন ঝুঁকিও কমাবে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য সরকারকে এখনই জাতীয় সবজি বীজ চাহিদা ও সরবরাহ কমিটি, ফসলভিত্তিক উৎপাদন লক্ষ্য, ১০ শতাংশ কৌশলগত বীজ মজুত এবং স্বাধীন পরীক্ষাগারভিত্তিক মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিতে হবে।
সবশেষে লক্ষ্যটি হওয়া উচিত খুব সহজ:
সঠিক ফসল, সঠিক জাত, সঠিক উৎস, সঠিক মান, সঠিক পরিমাণ, সঠিক সময়ে—সঠিক কৃষকের হাতে।






