বঙ্গোপসাগরের বুকে জেগে থাকা বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন।
নীল জলরাশি, নারিকেল গাছের সারি, কেয়া বন আর জীববৈচিত্র্যের এক অপূর্ব লীলাভূমি এই দ্বীপটি দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছে অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। কিন্তু বর্তমানে মানুষের অনিয়ন্ত্রিত কর্মকাণ্ড, অপরিকল্পিত পর্যটন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভাবে হারিয়ে যেতে বসেছে এই দ্বীপের অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পরিবেশগত ভারসাম্য। আজ সেন্টমার্টিন দ্বীপ এক চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি। তাই সেন্টমার্টিন দ্বীপ ও এর বিরল জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং বর্তমান সময়ের অন্যতম এক তীব্র দাবি।
ভৌগোলিক ও পরিবেশগত গুরুত্ব
বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের সর্বদক্ষিণে টেকনাফ থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার দক্ষিণে এই দ্বীপের অবস্থান। মাত্র ৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দ্বীপটি কেবল একটি পর্যটন কেন্দ্র নয়, এটি একটি সংকটাপন্ন প্রতিবেশগত এলাকা (ECA)। প্রবাল দ্বীপ হিসেবে এর পরিবেশগত গুরুত্ব অপরিসীম। এখানে রয়েছে শত বছরের পুরোনো প্রবাল প্রাচীর, যা সামুদ্রিক ইকোসিস্টেমের ভারসাম্য বজায় রাখে। এই দ্বীপটি বিরল প্রজাতির সামুদ্রিক কচ্ছপ (যেমন: অলিভ রিডলে), ডলফিন, বিরল প্রজাতির পাখি ও নানা ধরনের সামুদ্রিক শৈবালের নিরাপদ প্রজনন ক্ষেত্র ও আবাসস্থল। সমুদ্রের বুক থেকে উপকূলভাগকে রক্ষা করতেও এই প্রবাল প্রাচীর প্রাচীর হিসেবে কাজ করে।
সংকটের মূলে অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন ও আধুনিকতা
সেন্টমার্টিনের বর্তমান বিপর্যয়ের প্রধান কারণ হলো ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন। প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটক এই দ্বীপে ভ্রমণ করছেন। পর্যটকদের আবাসন ও বিনোদনের জন্য দ্বীপে গড়ে উঠেছে শত শত অবৈধ হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট।
* প্লাস্টিক ও বর্জ্য দূষণ: পর্যটকদের ফেলে যাওয়া ওয়ান-টাইম প্লাস্টিক বোতল, চিপসের প্যাকেট এবং পলিথিন দ্বীপের মাটি ও সৈকতে মিশে যাচ্ছে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব প্লাস্টিক বর্জ্য সমুদ্রে গিয়ে মিশছে, যা সামুদ্রিক প্রবাল ও মাছ খেয়ে ফেলছে এবং মৃত্যুর মুখে পড়ছে।
*
* ভূগর্ভস্থ পানির সংকট: শত শত হোটেলের পানির চাহিদা মেটাতে দ্বীপের অগভীর নলকূপ থেকে অতিরিক্ত মাত্রায় ভূগর্ভস্থ মিষ্টি পানি তোলা হচ্ছে। ফলে দ্বীপে মিষ্টি পানির স্তর দ্রুত নেমে যাচ্ছে এবং সেখানে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করছে।
*
* উচ্চ শব্দ ও আলোর দূষণ: রাতে রিসোর্টগুলোতে উচ্চশব্দে গান-বাজনা ও অতিরিক্ত আলোকসজ্জা করা হয়। এর ফলে রাতে ডিম পাড়তে আসা মা কচ্ছপগুলো ভয় পেয়ে ফিরে যাচ্ছে। এতে কচ্ছপের বংশবৃদ্ধি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
*
* পাথর ও প্রবাল উত্তোলন: পর্যটকদের কাছে বিক্রি করার জন্য বা রিসোর্ট নির্মাণের জন্য অবাধে দ্বীপের পাথর ও প্রবাল তুলে নেওয়া হচ্ছে, যা দ্বীপের প্রাকৃতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
*
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব
বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি শিকার সেন্টমার্টিন। সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে ‘কোরাল ব্লিচিং’ বা প্রবালের মড়ক দেখা দিচ্ছে। জ্যান্ত প্রবাল মরে সাদা হয়ে যাচ্ছে, যার ফলে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র ধ্বংসের মুখে। এছাড়া সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে দ্বীপের নিচু এলাকাগুলো প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ঘন ঘন সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড় এবং তীব্র জলোচ্ছ্বাস দ্বীপের কেয়া বন ও অন্যান্য উদ্ভিদ উপড়ে ফেলছে, যা দ্বীপের ক্ষয়রোধে ভূমিকা রাখত।
কেন সেন্টমার্টিন রক্ষা করা জরুরি?
সেন্টমার্টিন হারিয়ে গেলে কেবল একটি পর্যটন কেন্দ্রই হারাবে না, বাংলাদেশ হারাবে তার একমাত্র সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের স্বর্গরাজ্য। কিন্তু ব্যবসায়ীরা ব্যবসা যে কোন জায়গায় করতে পারবে কিন্তু বাংলাদেশ থেকে মুছে যাবে প্রবাল দ্বীপ।
১. বাস্তুতান্ত্রিক বিপর্যয়: প্রবাল প্রাচীর ধ্বংস হলে সাগরের মাছ ও অন্যান্য প্রাণীর খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়বে। এতে বঙ্গোপসাগরের মৎস্য সম্পদ বিপুল পরিমাপে হ্রাস পাবে।
২. দ্বীপের বিলুপ্তি: পাথর ও প্রবাল তুলে ফেলার কারণে দ্বীপের চারপাশের প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। এর ফলে সাগরের ঢেউয়ের আঘাতে দ্বীপের মাটি ক্ষয়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে আগামী কয়েক দশকের মধ্যে দ্বীপটি সমুদ্রের বুকে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
৩. স্থানীয় মানুষের জীবিকা বিপন্ন: সেন্টমার্টিনের স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবন মূলত মাছ ধরা এবং পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল। দ্বীপটি বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়লে হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হবে এবং তাদের জীবিকা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাবে।
করণীয় ও স্থায়ী সমাধান
সেন্টমার্টিনকে বাঁচাতে হলে এখনই সরকারকে কঠোর ও দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। কেবল কাগজের আইন নয়, মাঠপর্যায়ে তার বাস্তবায়ন জরুরি।
* পর্যটক সংখ্যা সীমিতকরণ: দ্বীপে প্রতিদিন কতজন পর্যটক প্রবেশ করতে পারবেন, তার একটি নির্দিষ্ট সীমা (Carrying Capacity) নির্ধারণ করতে হবে। অনিয়ন্ত্রিতভাবে হাজার হাজার মানুষকে একদিনে দ্বীপে প্রবেশ করতে দেওয়া বন্ধ করতে হবে। প্রয়োজনে অনলাইন রেজিস্ট্রেশন ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে।
*
* রাত্রিকালীন অবস্থান নিষিদ্ধ বা সীমিত করা: দ্বীপের পরিবেশকে পুনরুজ্জীবিত করতে দ্বীপে পর্যটকদের রাত্রিকালীন অবস্থান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা বা নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় কঠোর নিয়মের মধ্যে নিয়ে আসা প্রয়োজন। এতে দ্বীপের প্রকৃতি রাতের বেলা নিজের ক্ষত নিজে নিরাময় করার সুযোগ পাবে।
*
* প্লাস্টিক মুক্ত অঞ্চল ঘোষণা: সেন্টমার্টিনকে সম্পূর্ণ ‘প্লাস্টিক মুক্ত দ্বীপ’ হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। টেকনাফ ঘাট থেকেই পর্যটকদের পলিথিন বা ওয়ান-টাইম প্লাস্টিক সামগ্রী দ্বীপে নিয়ে যাওয়া নিষিদ্ধ করতে হবে।আমি নিজে যখন গেলাম দেখলাম মানুষের ব্যবহারিক জিনিস ডাস্টবিনে না পেলে সাগরে পানির মধ্যে পেলে দিলো বুজতে পারিনি যে এটা পরিবেশ নষ্ট করলো সে কোন অনুভব তার মধ্যে নেই। আমি নিজে গিয়ে জিজ্ঞেস করলে সে কোন কথা না বলে হেসে দিলো বললো তারা তুলে নিবে বললাম কারা নিবে ভাই সে কোন কিছু মনেই করলো না।
*
* অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ: পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া দ্বীপে গড়ে ওঠা সমস্ত অবৈধ হোটেল-রিসোর্ট অবিলম্বে উচ্ছেদ করতে হবে। নতুন কোনো পাকা স্থাপনা নির্মাণের ওপর স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা জারি করা প্রয়োজন। নতুন কোন ভবন নির্মাণ করা থেকে ভিতর থাকতে হবে।ওই দ্বীপের স্থানীয় বাসিন্দাদের সরয়ে আনতে হবে সরকারকেই দায়িত্ব নিতে হবে।
*
* পরিবেশবান্ধব পর্যটন (Eco-tourism): সেন্টমার্টিনকে সাধারণ বিনোদন কেন্দ্রের বদলে একটি শিক্ষণীয় এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। পর্যটকদেরকে দ্বীপের পরিবেশের প্রতি সংবেদনশীল হতে সচেতন করতে হবে। মানবিক পর্যাটক হতে হবে আমার চলা চলে যে সেন্টমার্টিনের কোন সমস্যা না হয় সে ব্যাপারে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে সবাইকে। ২০১৫ সালের দিকে
* আমি গিয়ে ইকবাল হোসেন মজুমদার আমার এলাকার জনপ্রিয় চেয়ারম্যান মালিকানা হোটেলে উঠে পড়ি সে রকম খাবার সহ
* ব্যাপক আয়োজন করেন তিনি কারন আমরা সবাই-ই কিন্তু সাপ্তাহিক চৌদ্দগ্রাম উপজেলার সাংবাদিক ছিলাম।
*
* বিকল্প জ্বালানি ও পানির ব্যবস্থা: দ্বীপে জেনারেটরের ব্যবহার কমিয়ে সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবেসবাই কে সৌর বিদ্যুতের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে । ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার (Rainwater Harvesting) ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
*
শেষ কথা হলো
সেন্টমার্টিন প্রকৃতি আমাদের যে অনন্য উপহার দিয়েছে, তা রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের সকলের। অর্থনৈতিক মুনাফা বা সাময়িক বিনোদনের চেয়ে একটি দেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আজ যদি আমরা সেন্টমার্টিনের সুরক্ষায় কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ না নিই, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কেবল বইয়ের পাতায় এই দ্বীপের গল্প পড়বে। প্রকৃতিকে ধ্বংস করে উন্নয়ন বা পর্যটন কখনোই টেকসই হতে পারে না। তাই সেন্টমার্টিনকে বাঁচাতে রাষ্ট্র, প্রশাসন, পরিবেশবাদী সংগঠন এবং সাধারণ পর্যটকদের একযোগে কাজ করতে হবে। সেন্টমার্টিন রক্ষা করা আজ আর কোনো বিকল্প নয়, এটি আমাদের অস্তিত্ব ও সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। পরিবেশ নষ্ট না করে দ্রুত সময়ের মধ্যে আসুন সবাই মিলে
আর সবার আগে বাংলাদেশ দেখতে হলে সেন্টমার্টিন মানিই বাংলাদেশ।







