, ,

সওজ সিলেট সার্কেলে ২৩ কোটির ‘কাগুজে’ হরিলুট: ঠিকাদার-প্রকৌশলী সিন্ডিকেটের অন্দরে ওলটপালট

নিউজটি শেয়ার করুন

​সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) সিলেট সড়ক সার্কেল ও সুনামগঞ্জ সড়ক বিভাগে যেন চলছে এক রূপকথার উন্নয়ন। ২০২৪-২০২৬ মেয়াদের দুই বছর মেয়াদী একটি মহাসড়ক সংস্কার প্রকল্পের কাজ শেষ না হতেই এবং ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়েই তুলে নেওয়া হয়েছে শতভাগ ‘চূড়ান্ত বিল’।

২৩ কোটি টাকার এই প্রকল্পের নেপথ্যে রয়েছে নিজস্ব হট মিক্সড প্ল্যান্ট জালিয়াতি, নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার এবং সরকারি ফাইলের ভেতর প্রকাশ্য ‘সিন্ডিকেট’ সদস্যদের তালিকা। এই দুর্নীতির জাল এতটাই গভীরে যে, ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টার পর মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে তাৎক্ষণিক ‘স্ট্যান্ড রিলিজ’ (Stand Release) করা হয়েছে সিলেট সার্কেলের শীর্ষ প্রকৌশলীকে। হাতে আসা সওজের একাধিক অভ্যন্তরীণ গোপন নথি ও চিত্র বিশ্লেষণ করে এই চাঞ্চল্যকর ডিজিটাল ডাকাতির চিত্র উঠে এসেছে।
​প্রকল্পের আড়ালে আর্থিক ফাঁদ
​নথি অনুযায়ী, সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়ক (R-280) এর ২৩তম কিলোমিটার (গোবিন্দগঞ্জ) থেকে ৪৬তম কিলোমিটার (ডাবর পয়েন্ট) পর্যন্ত আংশিক শক্তিশালীকরণ ও পিচ ঢালাই (DBS Base & Wearing Course) কাজের জন্য একটি বড় প্রকল্প বরাদ্দ দেওয়া হয়।

​অনুমোদিত বাজেট: ২৩ কোটি ২৭ লাখ ৩৪ হাজার ৭৫৫ টাকা।

​অনুসন্ধানে প্রাপ্ত দুর্নীতির চার স্তম্ভ
​১. কাজ শেষ না হতেই ‘চূড়ান্ত বিল’ (IPC-02) গায়েব!
​অনুসন্ধানের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসে প্রকল্পের বিল ভাউচার বিশ্লেষণ করে। নিয়ম অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে প্রকল্পের আংশিক কাজের জন্য ১ম অন্তর্বর্তীকালীন বিল প্রক্রিয়াকরণ হওয়ার কথা। কিন্তু মেসার্স সালেহ আহমেদ অ্যান্ড ব্রাদার্স এবং সওজের অসাধু প্রকৌশলীরা মিলে অবিশ্বাস্য গতিতে চূড়ান্ত বিলের নথিপত্র সই করিয়ে নিয়েছেন। মাঠপর্যায়ে অর্ধেকের বেশি কাজ বাকি রেখেই কাগজে-কলমে শতভাগ কাজ দেখিয়ে সম্পূর্ণ টাকা তুলে নেওয়ার এই অভিনব ‘ডিজিটাল জালিয়াতি’র চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে মে ২০২৬-এর ফাইলে।
​২. সরকারি নথিতে ‘সিন্ডিকেট মেম্বার’-এর তালিকা
​সাধারণত যেকোনো সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে সিন্ডিকেটের কথা আড়ালে-আবডালে শোনা গেলেও, সুনামগঞ্জ সড়ক বিভাগের এই ফাইলের ২ নম্বর পৃষ্ঠায় প্রকাশ্যেই যুক্ত রয়েছে সিন্ডিকেট চক্রের নথিপত্র। “Syndicate Members” শিরোনামে পল্লব কুমার ঘোষ (Pallab Kumar Ghosh) নামের এক ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্রের ভেরিফিকেশন ডাটাবেজের অনুলিপি সরকারি নথিতে নথিবদ্ধ রয়েছে। সরকারি কর্মকর্তারা কার স্বার্থে এবং কার ইশারায় একজন বহিরাগত ব্যক্তির প্রোফাইল ফাইলের অংশ করলেন, তা সওজের চরম প্রশাসনিক দেউলিয়াত্ব এবং যোগসাজশের অকাট্য প্রমাণ দেয়।
​‘হট মিক্সড প্ল্যান্ট’ জালিয়াতি ও হাতের লেখা গোপন নোট
​চুক্তি অনুযায়ী, সড়কের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রকল্প এলাকার কাছাকাছি নিজস্ব আধুনিক ‘হট মিক্সড প্ল্যান্ট’ বসিয়ে পিচ গলাতে হতো। কিন্তু ঠিকাদার সেই শর্ত ভঙ্গ করে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার শুরু করলে সওজের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা আপত্তি তোলেন। নথির ৮ নম্বর পৃষ্ঠায় দেখা যায়, ওপর মহলের গোপন সমঝোতার পর একটি চিঠির গায়ে হাতে লিখে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে— “উক্ত Batching Plant বা Hot mixed Plant যেখানেই করা হোক না কেন তা Unqualified করার কোনো সুযোগ নাই…”। অর্থাৎ, ত্রুটিপূর্ণ ও অযোগ্য প্ল্যান্টকেও জোরপূর্বক ‘যোগ্য’ সার্টিফিকেট দিয়ে বিল পাসের পথ সুগম করা হয়েছিল।

​শীর্ষ প্রকৌশলীর ‘স্ট্যান্ড রিলিজ’ ও নাটকীয়তা
​২৩ কোটির এই হরিলুটের ফাইল যখন মে ২০২৬-এ চূড়ান্ত অনুমোদনের টেবিলে, ঠিক তখনই নড়েচড়ে বসে মন্ত্রণালয়। অনিয়মের গন্ধ পেয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ থেকে সিলেট সড়ক সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো: হাফিজুর রহমান (পরিচিতি নং: ০০৫০৭২)-কে তাৎক্ষণিক বদলির প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।