, ,

ষাটের পর: আয়হীন জীবনের অদৃশ্য যুদ্ধ -শহীদ রায়হান।

নিউজটি শেয়ার করুন

মানুষের জীবনে এমন একটি সময় আসে, যখন আয় কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর পরিচিত মানচিত্রটিও যেন বদলে যেতে থাকে। যে মানুষটি একদিন পরিবারের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করেছেন, সন্তানের শিক্ষার জন্য নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়েছেন, বিপদের দিনে অন্যের পাশে দাঁড়িয়েছেন, জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে তিনিই কখনো কখনো নিজের সামান্য প্রয়োজনটির হিসাব করতে গিয়ে থমকে দাঁড়ান। তাঁর পকেটে টাকা কমে আসে, কিন্তু প্রয়োজন কমে না; দায়িত্বের তালিকা ছোট হয় না, অথচ দায়িত্ব বহন করার শক্তি ও সামর্থ্য ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে পড়ে। বাইরে থেকে এই পরিবর্তনকে অবসর, বার্ধক্য কিংবা জীবনের স্বাভাবিক পরিণতি বলে মনে হতে পারে। কিন্তু মানুষের ভেতরে তখন যে ভূমিকম্প ঘটে, তার শব্দ কেউ শোনে না।

বাংলাদেশের ষাটোর্ধ্ব মানুষের এই নীরব মানসিক যুদ্ধকে বুঝতে হলে বার্ধক্যকে কেবল শরীরের বয়স দিয়ে বিচার করলে চলবে না। বুঝতে হবে, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা মানুষের আত্মপরিচয়ের সঙ্গে কত গভীরভাবে জড়িয়ে আছে, আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামো কীভাবে উপার্জনক্ষম মানুষকে মূল্যায়ন করে, আর জীবনের দীর্ঘ শ্রমের পর একজন মানুষ নিজের অস্তিত্বের মর্যাদা কতটা অক্ষুণ্ণ রাখতে পারেন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের জনশুমারি নিয়ে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার প্রকাশিত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দেশে ষাট বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় দেড় কোটি, যা মোট জনসংখ্যার ৯.২৯ শতাংশ। ২০১১ সালে এই হার ছিল ৭.৪৭ শতাংশ। একই বিশ্লেষণে ২০৫০ সালের মধ্যে ষাটোর্ধ্ব মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ বার্ধক্য বাংলাদেশের সমাজে আর কোনো প্রান্তিক বা বিচ্ছিন্ন বাস্তবতা নয়; এটি আগামী দিনের অর্থনীতি, পরিবার, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও সামাজিক নিরাপত্তার কেন্দ্রীয় প্রশ্নগুলোর একটি।

কিন্তু সংখ্যার ভেতরে মানুষের জীবন দেখা যায় না। দেড় কোটি মানুষের প্রত্যেকের গল্প আলাদা। কেউ সারা জীবনের সঞ্চয় দিয়ে শেষ বয়সের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন, কেউ অবসরভাতা পান, কেউ সন্তানদের ভালোবাসা ও আর্থিক সহায়তায় নিশ্চিন্তে আছেন। আবার কেউ জীবনের অধিকাংশ সময় কাজ করেও এমন কোনো সঞ্চয় গড়ে তুলতে পারেননি, যা তাঁকে কর্মক্ষমতা হারানোর পর নিরাপদ রাখবে। কারও জীবিকা ছিল দৈনিক শ্রম, কারও ক্ষুদ্র ব্যবসা, কারও ছিল অনিয়মিত পেশা, কারও জীবনের পুরো অর্থনীতি দাঁড়িয়ে ছিল নিজের শ্রম, পরিচিতি ও কর্মদক্ষতার ওপর। তাঁদের কাছে অবসর কোনো পরিকল্পিত বিশ্রাম নয়; অনেক সময় তা আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার অন্য নাম।

এখানেই শেষ বয়সের সংকটের প্রথম নির্মম সত্যটি লুকিয়ে আছে। জীবনের প্রয়োজনগুলো বয়সের সঙ্গে অবসর নেয় না। বাড়িভাড়া দিতে হয়, বাজার করতে হয়, ওষুধ কিনতে হয়, চিকিৎসকের কাছে যেতে হয়। সন্তান প্রতিষ্ঠিত হলেও তার নিজের সংসার থাকে, ঋণ থাকে, ভবিষ্যৎ নির্মাণের চাপ থাকে। ফলে পরিবারের প্রবীণ মানুষটি অনেক সময় বুঝতে পারেন, তাঁর প্রয়োজন আছে, কিন্তু সেই প্রয়োজন পূরণের নিশ্চয়তা আর তাঁর নিজের হাতে নেই। যিনি একদিন পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রতীক ছিলেন, তাঁকেই একসময় নিজের নিরাপত্তার জন্য অন্যের সামর্থ্যের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়।

অর্থের এই পরিবর্তন শুধু জীবনযাত্রার মান কমায় না; মানুষের আত্মপরিচয়ের ভিতেও আঘাত করে। বিশেষত যে সমাজে পুরুষের সাফল্যকে দীর্ঘকাল উপার্জন, সম্পদ ও পরিবারের ভরণপোষণের সঙ্গে মাপা হয়েছে, সেখানে আয় হারানো মানে অনেকের কাছে নিজের সামাজিক ভূমিকা হারানো। তিনি হয়তো আর্থিকভাবে সাময়িক সংকটে পড়েছেন, কিন্তু তাঁর মনে হয়, জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং এত দিনের অবদানও বুঝি মূল্যহীন হয়ে গেল। পরিবারের কোনো সিদ্ধান্তে তাঁর মতামত উপেক্ষিত হলে, ব্যক্তিগত প্রয়োজনে টাকা চাইতে হলে কিংবা নিজের চিকিৎসার ব্যয় নিয়ে আলোচনা করতে হলে সেই অনুভূতি আরও তীব্র হতে পারে।

এখানে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। আর্থিকভাবে অন্যের ওপর নির্ভরশীল হওয়া এবং নিজেকে অন্যের বোঝা মনে করা এক বিষয় নয়। প্রথমটি বাস্তব পরিস্থিতি; দ্বিতীয়টি অনেক সময় সেই পরিস্থিতি থেকে জন্ম নেওয়া গভীর মানসিক ক্ষত। ভালোবাসার মানুষও হয়তো আন্তরিকভাবে সাহায্য করছেন, অথচ সাহায্য গ্রহণকারী মানুষটির ভেতরে কাজ করছে অপরাধবোধ। তিনি প্রয়োজনের কথা বলতে গিয়ে বাক্য বদলান, নিজের ওষুধ কেনার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দেন, পছন্দের কোনো জিনিস কেনার আগে বহুবার ভাবেন। কখনো পরিবারের সদস্যদের বিরক্ত করার ভয় থেকে, কখনো নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশের লজ্জায় তিনি নীরব থাকেন। এভাবে প্রয়োজনের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর কণ্ঠস্বরও সংকুচিত হতে থাকে।

এই সংকোচের সঙ্গে যুক্ত হয় সময়ের নির্মম মনস্তত্ত্ব। কর্মজীবনে মানুষ প্রতিদিন কোনো না কোনো কাজে নিজের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। সকালে ঘুম থেকে ওঠার কারণ থাকে, দিনের একটি উদ্দেশ্য থাকে, কারও ফোনের অপেক্ষা থাকে, কোনো সিদ্ধান্তের দায়িত্ব থাকে। কিন্তু কাজ থেমে গেলে, নিয়মিত যোগাযোগ কমে গেলে এবং অন্যের কাছে নিজের অভিজ্ঞতার আর প্রয়োজন নেই বলে মনে হলে দিনের দীর্ঘ সময়টি অর্থহীন হয়ে উঠতে পারে। তখন মানুষ শুধু আয় হারান না; হারান নিজের সময়কে অর্থপূর্ণ করে তোলার পুরোনো কাঠামোও। গতকালের ব্যস্ততা আজ স্মৃতি, আর আগামীকাল যেন অস্পষ্ট এক অপেক্ষা।

২০২৫ সালের ১৮ নভেম্বর বিএমসি সাইকিয়াট্রি সাময়িকীতে প্রকাশিত বাংলাদেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠী নিয়ে একটি গবেষণা এই বাস্তবতার মানসিক দিকটি বুঝতে সাহায্য করে। ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত বিভিন্ন অঞ্চলের প্রবীণদের ওপর পরিচালিত সমীক্ষায় প্রাথমিকভাবে ১,৬০৭ জন অংশ নেন; চূড়ান্ত বিশ্লেষণে অন্তর্ভুক্ত হন ১,৫৪৪ জন। গবেষকেরা প্রশ্নমালার মাধ্যমে বিষণ্নতা, উদ্বেগ, অনিদ্রা ও নিঃসঙ্গতার লক্ষণ মূল্যায়ন করেন। তাঁদের ব্যবহৃত পরিমাপপদ্ধতি অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বিষণ্নতার লক্ষণ পাওয়া যায় ৫৮ শতাংশের, উদ্বেগের লক্ষণ ৮২ শতাংশের এবং অনিদ্রার লক্ষণ ৭৭ শতাংশের ক্ষেত্রে। নিঃসঙ্গতার লক্ষণ পাওয়া যায় ৯ শতাংশের মধ্যে।

এই সংখ্যাগুলো পড়ার সময় একটি বৈজ্ঞানিক সতর্কতা জরুরি। এগুলো গবেষণায় ব্যবহৃত নির্দিষ্ট প্রশ্নমালা ও নির্ধারিত সীমারেখার ভিত্তিতে পাওয়া লক্ষণের হার; এগুলোকে বাংলাদেশের সব প্রবীণের নিশ্চিত রোগনির্ণয় বা জাতীয়ভাবে প্রতিনিধিত্বশীল চূড়ান্ত হার হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। তবু ফলাফলটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ গবেষণায় অবসরপ্রাপ্ত বা কর্মহীন অবস্থা, নিম্ন থেকে মধ্যম অর্থনৈতিক অবস্থান, দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা এবং পরিবারের বাইরে বসবাসের সঙ্গে বিভিন্ন মানসিক সমস্যার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। অর্থাৎ মানুষের মানসিক সুস্থতা কেবল তাঁর ব্যক্তিগত মনোবলের ওপর নির্ভর করে না; তিনি কোন পরিবেশে বেঁচে আছেন, কতটা নিরাপত্তা পাচ্ছেন এবং তাঁর জীবনে অর্থপূর্ণ সম্পর্ক ও কাজের সুযোগ কতটা রয়েছে, সেগুলোও গুরুত্বপূর্ণ।

আর্থিক অনিশ্চয়তা মানুষের মনে এমন এক ধরনের উদ্বেগ সৃষ্টি করে, যার কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি নেই। মাসের শুরুতে হাতে টাকা থাকলেও তিনি মাসের শেষের কথা ভাবেন। আজ চিকিৎসার খরচ মেটাতে পারলেও আগামী মাসে কী হবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তা করেন। সন্তানের কাছে টাকা চাইলে সে কী ভাববে, পুরোনো পরিচিত কেউ তাঁর সংকট বুঝতে পারবে কি না, অসুস্থতা বাড়লে কে পাশে দাঁড়াবে—এই প্রশ্নগুলো অনেক সময় দিনের কাজের ফাঁকে, রাতের নিস্তব্ধতায়, এমনকি পরিবারের সবার সঙ্গে বসে থাকার সময়ও মনে ফিরে আসে। বাইরে থেকে তাঁকে স্বাভাবিক দেখায়, কিন্তু ভেতরে তিনি ভবিষ্যতের সম্ভাব্য বিপর্যয়গুলো বারবার কল্পনা করে চলেন।

এই উদ্বেগের সঙ্গে যুক্ত হয় সামাজিক তুলনা। একই বয়সের কোনো পরিচিত ব্যক্তি অবসরজীবনে স্বচ্ছন্দে ভ্রমণ করছেন, কেউ নাতি-নাতনিদের নিয়ে আনন্দে সময় কাটাচ্ছেন, কেউ নিজের বাড়ি বা সঞ্চয়ের নিরাপত্তায় নিশ্চিন্ত। আর নিজের জীবনে সামান্য ব্যয়ের জন্যও হিসাব করতে হচ্ছে। তখন অন্যের সুখ শুধু আনন্দের দৃশ্য থাকে না; কখনো তা নিজের অপূর্ণতার আয়না হয়ে ওঠে। মানুষটি ভাবতে পারেন, সারা জীবন এত পরিশ্রম করেও তিনি কী অর্জন করলেন? এই প্রশ্নের উত্তর সব সময় অর্থনৈতিক সাফল্যের হিসাব দিয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু যখন সমাজ বারবার সাফল্যের দৃশ্যমান মাপকাঠি হিসেবে সম্পদ ও উপার্জনকে সামনে আনে, তখন জীবনের অন্য অর্জনগুলোও তাঁর চোখে ম্লান হয়ে যেতে পারে।

এ সংকট নারীর ক্ষেত্রে ভিন্নভাবে প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশের বহু নারী সারা জীবন সংসার, সন্তান লালন-পালন, অসুস্থ স্বজনের পরিচর্যা এবং পারিবারিক সম্পর্ক রক্ষার কাজে শ্রম দিয়েছেন। অথচ এই শ্রমের বিনিময়ে তাঁদের নামে নিয়মিত আয়, অবসরভাতা কিংবা ব্যক্তিগত সঞ্চয় তৈরি হয়নি। জীবনের শেষ ভাগে স্বামী মারা গেলে, সন্তান দূরে চলে গেলে অথবা পারিবারিক সম্পর্ক দুর্বল হলে তাঁরা অর্থনৈতিক নিরাপত্তার পাশাপাশি সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতাও হারাতে পারেন। সমাজ যে কাজকে ভালোবাসা বা দায়িত্ব বলে স্বাভাবিক করে নিয়েছে, সেই কাজের অর্থনৈতিক মূল্য স্বীকৃত না হওয়ায় বহু নারীর বার্ধক্য শুরু হয় আর্থিক অধিকারহীনতার মধ্য দিয়ে। তাই প্রবীণদের আয়হীনতা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে নারীর অবৈতনিক শ্রম এবং সম্পদে তাঁর অধিকারকে আলাদা করে দেখা যায় না।

বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থায় বয়স্ক ভাতা, অবসরকালীন সুবিধা এবং সর্বজনীন পেনশনব্যবস্থার মতো উদ্যোগ রয়েছে। ২০২৩ সালে চালু হওয়া সর্বজনীন পেনশনব্যবস্থায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী, অনানুষ্ঠানিক খাতের মানুষ, নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠী এবং প্রবাসীদের জন্য পৃথক ব্যবস্থার কথা রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা বলেছে, বার্ধক্যে পর্যাপ্ত আয়নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পেনশনের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা ও মৌলিক সামাজিক সুরক্ষাও জরুরি; একই সঙ্গে বাংলাদেশে বহু প্রবীণ এখনো বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতার বাইরে রয়েছেন।

তবে কেবল একটি কর্মসূচি চালু করলেই মানুষের শেষ বয়স নিরাপদ হয়ে যায় না। সুবিধা পাওয়ার যোগ্যতা, নিবন্ধনের প্রক্রিয়া, নিয়মিত অর্থপ্রাপ্তি, ভাতার ক্রয়ক্ষমতা এবং চিকিৎসার ব্যয়ের সঙ্গে তার সামঞ্জস্য—সবই গুরুত্বপূর্ণ। অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে কাজ করা মানুষের বড় অংশের কর্মজীবন এমন, যেখানে নিয়মিত অবদানভিত্তিক পেনশনের সুযোগ তৈরি হয়নি। তাঁদের জন্য এমন সামাজিক নিরাপত্তা প্রয়োজন, যা তাঁদের অতীতের চাকরির ধরন দিয়ে নয়, বর্তমান প্রয়োজন ও নাগরিক অধিকার দিয়ে বিচার করবে।

কিন্তু অর্থনৈতিক সহায়তা পেলেই কি শেষ বয়সের সমস্ত সংকট মিটে যাবে? না। অর্থ মানুষের মৌলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, কিন্তু জীবনের অর্থ নিশ্চিত করে না। একজন মানুষ আর্থিকভাবে স্বচ্ছল হয়েও নিঃসঙ্গ হতে পারেন; আবার সীমিত আয় নিয়েও অর্থপূর্ণ সম্পর্ক, সৃজনশীল কাজ ও সামাজিক সংযোগের মধ্য দিয়ে আত্মমর্যাদা ধরে রাখতে পারেন। অর্থাৎ শেষ বয়সের সুস্থতার জন্য প্রয়োজন দুটি সমান্তরাল নিশ্চয়তা—জীবনধারণের বাস্তব সামর্থ্য এবং জীবনের প্রয়োজনীয় মানুষ হয়ে থাকার অনুভূতি।

পরিবারের ভূমিকাটি তাই শুধু মাসিক খরচ বহন করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রবীণ মানুষকে সিদ্ধান্তে অংশ নিতে দেওয়া, তাঁর অভিজ্ঞতার কথা মন দিয়ে শোনা, তাঁকে নিজের প্রয়োজন প্রকাশের স্বাধীনতা দেওয়া এবং অর্থনৈতিক সহায়তাকে অনুগ্রহের বদলে পারিবারিক দায়িত্ব হিসেবে দেখা জরুরি। বয়সের কারণে কারও কাজের গতি কমতে পারে, স্মৃতি দুর্বল হতে পারে, শারীরিক সীমাবদ্ধতা বাড়তে পারে; কিন্তু এসবের কোনোটিই তাঁর অনুভূতি, ব্যক্তিগত পছন্দ কিংবা মর্যাদার অধিকারকে বাতিল করে না।

একইভাবে প্রবীণ মানুষের কর্মক্ষমতাকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করা দরকার। ষাট বছর পার হলেই একজন মানুষের অভিজ্ঞতা অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায় না। কেউ পরামর্শ দিতে পারেন, কেউ নতুন প্রজন্মকে প্রশিক্ষণ দিতে পারেন, কেউ লেখালেখি, শিল্পচর্চা, ক্ষুদ্র উদ্যোগ কিংবা উপযুক্ত ডিজিটাল কাজে যুক্ত থাকতে পারেন। তবে কাজের সুযোগকে এমনভাবে তৈরি করতে হবে, যাতে তা মর্যাদা ও স্বাধীনতার পথ হয়, অসুস্থ শরীর নিয়ে জীবিকা অর্জনের বাধ্যবাধকতা নয়। যে মানুষ বিশ্রাম নিতে চান, তাঁর বিশ্রামের অধিকারও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সবচেয়ে বড় কথা, মানসিক সংকটকে বার্ধক্যের স্বাভাবিক নিয়তি বলে উপেক্ষা করা চলবে না। দীর্ঘস্থায়ী হতাশা, ঘুমের সমস্যা, আগ্রহ হারিয়ে ফেলা, অতিরিক্ত উদ্বেগ কিংবা নিজেকে মূল্যহীন মনে করার অনুভূতি দেখা দিলে পরিবারের উচিত তা গুরুত্ব দিয়ে দেখা এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়া। প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবায় মানসিক সুস্থতাকে শারীরিক সুস্থতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার সুযোগ নেই।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু এই নয় যে, ষাটের পর একজন মানুষের আয় কত থাকে। প্রশ্নটি আরও গভীর: জীবনের দীর্ঘ পরিশ্রমের পর তিনি নিজের জীবনের ওপর কতটা অধিকার ধরে রাখতে পারেন? নিজের চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন কি না, সামান্য ব্যক্তিগত প্রয়োজনের কথা সংকোচহীনভাবে বলতে পারেন কি না, পরিবারে তাঁর মতামত শোনা হয় কি না, আগামীকাল নিয়ে ভাবার মতো সামান্য নিরাপত্তা তাঁর আছে কি না।

মানুষের জীবনের শেষ অধ্যায়কে আমরা প্রায়ই স্মৃতিচারণের সময় বলে ভাবি। অথচ ষাটের পরও মানুষ ভবিষ্যৎ চান। তিনি হয়তো নতুন কোনো কাজ শুরু করতে চান, পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে চান, অসমাপ্ত লেখাটি শেষ করতে চান, নাতির হাত ধরে হাঁটতে চান, অথবা শুধু নিজের মতো করে একটি দিন কাটাতে চান। তাঁর আকাঙ্ক্ষা ছোট হয়ে আসতে পারে, কিন্তু আকাঙ্ক্ষা রাখার অধিকার ছোট হয় না।

একটি সমাজের মানবিকতার প্রকৃত পরীক্ষা তখনই, যখন একজন মানুষ আর আগের মতো উপার্জন করতে পারেন না। তাঁর উৎপাদনশীলতা কমে গেলে সমাজ তাঁকে কীভাবে দেখে? তাঁর আয় বন্ধ হলে পরিবার তাঁর কথা কতটা শোনে? তাঁর শরীর দুর্বল হলে রাষ্ট্র কতটা নিরাপত্তা দেয়? এসব প্রশ্নের উত্তরেই নির্ধারিত হয় আমরা উন্নয়নকে কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হিসেবে দেখছি, নাকি মানুষের পূর্ণ জীবন হিসেবে বুঝতে শিখছি।

ষাটের পরের মানুষটি আমাদের অতীতের প্রতিনিধি মাত্র নন; তিনি আমাদের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ। আজ যে সন্তান পিতামাতার নির্ভরশীলতাকে বিরক্তি হিসেবে দেখছে, কাল সেও হয়তো নিজের উপার্জনক্ষমতার শেষ প্রান্তে দাঁড়াবে। আজ যে সমাজ অভিজ্ঞ মানুষকে অবসরের পর অপ্রয়োজনীয় মনে করছে, আগামী দিনে সেই সমাজকেই তার বার্ধক্যের জন্য উত্তর খুঁজতে হবে।

জীবনের শেষ বয়সে অর্থ হারানোর বেদনা গভীর, কিন্তু তার চেয়েও গভীর হলো অর্থের সঙ্গে নিজের মূল্যও হারিয়ে গেছে বলে মনে হওয়া। একজন মানুষকে নিরাপত্তা দেওয়া মানে শুধু তাঁর হাতে কিছু টাকা তুলে দেওয়া নয়; তাঁকে এই বিশ্বাস ফিরিয়ে দেওয়া যে তাঁর জীবন এখনো তাঁরই, তাঁর সিদ্ধান্তের মূল্য আছে, তাঁর অভিজ্ঞতার প্রয়োজন আছে এবং তাঁর অস্তিত্ব কাউকে বোঝা হয়ে থাকার অপরাধে দণ্ডিত নয়।

মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় পরাজয় আয় হারানো নয়; আয় হারানোর পর নিজের মূল্যেও বিশ্বাস হারিয়ে ফেলা। আর একটি সমাজের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো—যে মানুষটি সারাজীবন তার জন্য শ্রম দিয়েছেন, শেষ বয়সে সেই মানুষটির মর্যাদাকে তাঁর উপার্জনের অবশিষ্টাংশ দিয়ে মাপা।

তাই ষাটের পরের জীবনকে করুণা দিয়ে নয়, অধিকার দিয়ে দেখতে শিখতে হবে। কারণ বার্ধক্য কোনো অপরাধ নয়, কর্মক্ষমতার অবসান কোনো নৈতিক ব্যর্থতা নয়, আর অন্যের সাহায্য গ্রহণ করা মানুষের মর্যাদার পরাজয় নয়। জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়েও একজন মানুষ পূর্ণ মানুষ—তাঁর প্রয়োজন আছে, স্বপ্ন আছে, ভয় আছে, ভালোবাসা আছে। যে সমাজ এই সত্যটি বুঝতে পারে, সেই সমাজই শেষ বয়সকে অপেক্ষার অন্ধকার থেকে মর্যাদাপূর্ণ জীবনের আলোয় নিয়ে যেতে পারে।