, ,

দেশে ভিক্ষাবৃত্তির যত অপ-কৌশল

নিউজটি শেয়ার করুন

ভিক্ষাবৃত্তি, পতিতা বৃত্তি, চৌর্যবৃত্তি কোন বৃত্তিই সমাজ কর্তৃক স্বীকৃত নয়। জীবন নির্বাহের জন্য মানুষ কোন না কোন পেশা বা বৃত্তির উপর নির্ভর করে। তবে সব পেশাই বৃত্তি কিন্তু সব বৃত্তি পেশা নয়। পেশার সাথে সম্পৃক্ত কিছু বিষয় আছে। যেমন- সুনির্দিষ্ট শিক্ষা, দক্ষতা, যোগ্যতা, সামাজিক মর্যাদা, নৈতিকতা ও স্বাধীনতা। কিন্তু বৃত্তির সাথে এ বিষয়গুলো সম্পৃক্ত নয়। বৃত্তির জন্য কোন দক্ষতা, যোগ্যতা নৈতিকতা অথবা কোন আইনসিদ্ধ নীতিমালার প্রয়োজন হয় না। বৃত্তিতে যে কেউ নিয়োজিত হতে পারে কিন্তু পেশায় সবাই সম্পৃক্ত হতে পারে না। ব্যক্তি বিশেষের ক্ষেত্রে বৃত্তি খুবই সহজ। এমনই একটি বৃত্তি আমাদের সমাজে প্রচলিত তা হল ভিক্ষাবৃত্তি। যদিও ভিক্ষাবৃত্তি আমাদের সমাজ কর্তৃক স্বীকৃত নয়। তথাপিও আমাদের সমাজে ভিক্ষাবৃত্তি প্রচলিত বৃত্তিগুলোর মধ্যে একটি। বাংলাদেশের সর্বত্র গ্রাম-উপশহর, উপজেলা, জেলা শহর, বিভাগীয় শহর ও রাজধানীতে ভিক্ষুকদের সরব উপস্থিতি বিদ্যমান। ভিক্ষুকদের বিভিন্ন অযুহাত, ছল-চাতুরী, মিথ্যা অভিনয়, প্রতারণা, ছদ্মবেশ, ভিন্নরূপ ধারণ, অসুস্থতার ভান করা, ক্ষুধার্ত ও অনাহারি হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন ইত্যাদি মানুষের কাছে এখন সহনীয় ও নিত্য-নৈমিত্যিক বিষয়। বিগত কয়েক দশক ধরে দেশে ভিক্ষাবৃত্তি অর্থ উপার্জনের একটি বিশেষ অপ-কৌশলে পরিণত হয়েছে। ভিক্ষুকরা ভিক্ষা চাওয়ার পূর্বেই মানুষকে টার্গেট করে। তারপর শুরু হয় তাদের ভিক্ষা বৃত্তির অপ-কৌশল। ভিক্ষুকদের ভিক্ষাবৃত্তির বিভিন্ন অপ-কৌশলগুলো হচ্ছেঃ
একঃ গান গেয়ে ভিক্ষাঃ
গণপরিবহন, বাস ষ্টেশন, রেল ষ্টেশন ও লঞ্চ ষ্টেশনে ভিক্ষুকরা ভিক্ষা চাওয়ার পূর্বে বিভিন্ন সুরে গান গায়। যেমনঃ
১। বিসমিল্লাহ্ বলিয়া আল্লাহ যে করিবেন দান, হায় আল্লাহ তুই সুবাহান হায়াতের মালিক।
২। দিয়ে যান ভাই দিয়ে যান, আল্লাহ রসতে দান করে যান, যাহা দিবেন হাতে, তাহা যাবে সাথে।
৩। এই দুনিয়া দেখার আমার চক্ষু দুটি নাই, আমারে টাকা-পয়সা দিয়া দয়া করেন ভাই।
৪। আমি একজন জনম দুঃখি, আমার বাপ-মা নাই, আমারে ভিক্ষা দেন ভাই।
৫। মা গো আল্লাহ রসতে ভিক্ষা দেন, ভিক্ষুকরা ধর্মের দোহাই দিয়ে পরলোকের কথা বলে গান গেয়ে মানুষকে আকৃষ্ট করে। মানুষ ভিক্ষা দিতে বাধ্য হয়।

দুইঃ কলেমা পড়ে ভিক্ষাঃ
গ্রামাঞ্চলে ভিক্ষুকরা সাধারণ সপ্তাহে দু’দিন এলাকা ভিত্তিক ভিক্ষা করে। বাড়ীর গেটে বা উঠানে এসে বলে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ, মাগো ভিক্ষা দেন। তবে নগদ অর্থের চেয়ে গ্রামাঞ্চলের মানুষ ভিক্ষার উপকরণ হিসেবে চাউলই বেশি দিয়ে থাকে।

তিনঃ ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন দেখিয়ে ভিক্ষাঃ
ভিক্ষুকরা হাতে বেশ কিছু পুরাতন প্রেসক্রিপশন, এক্স-রে এর রিপোর্ট ও রোগীর অস্পষ্ট ছবি দেখিয়ে গণপরিবহনে, হাসপাতালের সামনে, বাস ও রেল স্টেশনে, জনাকীর্ণ এলাকাতে মানুষের কাছে ভিক্ষা চেয়ে থাকে। মানুষ দেখলেই ভিক্ষুকরা বলে ভাইÑআমার ছেলে/বাবা/মা/ভাই/বোন অসুস্থ চিকিৎসার জন্য টাকা দেন।

চারঃ বিকৃতি অঙ্গ, মুখে বা পেটে টিউমার ও গলগ- দেখিয়ে ভিক্ষাঃ
এই শ্রেণির ভিক্ষুকরা মানুষের সামনে এসে বিকৃত অঙ্গ দেখিয়ে, শরীরে বিভিন্ন স্থানে টিউমার দেখিয়ে, গলায় গলগন্ড দেখিয়ে মানুষের সহানুভূতির দৃষ্টি আকর্ষণ করে। মানুষ এদেরকে রোগে আক্রান্ত মনে করে দ্বিগুণ হারে ভিক্ষা দেয়। কিন্তু এসব ভিক্ষুকরা একমাসে যে টাকা উপার্জন করে ঐ টাকা দিয়ে সরকারি হাসপাতালে সাশ্রয় মূল্যে চিকিৎসা করালে সে সুস্থ হতে পারে। কিন্তু এসব ভিক্ষুকরা চিকিৎসা না করে ভিক্ষাবৃত্তিতে লিপ্ত থাকে এরা মূলত বাণিজ্যিক ভিক্ষুক। বাণিজ্যিক ভিক্ষুকরা বিকৃত অঙ্গ, টিউমার, গলগন্ড ইত্যাদি ভিক্ষার অন্যতম পূজি হিসেবে ব্যবহার করে থাকে।

পাঁচঃ গণপরিবহণে লিফলেটের মাধ্যমে ভিক্ষাঃ
গণপরিবহনে লিফলেটের মাধ্যমে সাধারণত নারীরা ভিক্ষা করে থাকে। লিফলেটে লেখা থাকে-আমার বাবা নাই। মা অসুস্থ। নদীতে আমাদের বাড়ি ঘর সব চলে গেছে। আমার ছোট দুটি বোন। আমার কোন ভাই নাই। দয়া করে আমাকে সাহায্য করুন। লিফলেটটি দয়া করে ফেলবেন না। গণপরিবহনে লিফলেটের মাধ্যমে ভিক্ষাবৃত্তি এখন ব্যবসায় পরিণত হয়েছে।

ছয়ঃ প্রতিবন্ধী ও প্রতিবন্ধীর রূপধারণ করে ভিক্ষাঃ
বিকলাঙ্গ হাত-পা, অর্ধাঙ্গ, খোড়া, আগুনে পুড়া প্রতিবন্ধী ও প্রতিবন্ধীর রূপধারণ করে যে সব ভিক্ষুক ভিক্ষা করে এরা খুব সহজেই মানুষের সহানুভূতি ও দয়ার দৃষ্টিতে আবদ্ধ হয়। শরীরের বিকল অর্ধাঙ্গ ও প্রতিবন্ধীত্বকে পূঁজি করে এসব ভিক্ষুকরা ভিক্ষাবৃত্তিকে নেশা ও পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে।

সাতঃ লাশ দাফনের কথা বলে ভিক্ষাঃ
ভয়ঙ্কর ভিক্ষুক এরা। চোখের মধ্যে মলম লাগিয়ে চোখ লাল করে গণপরিবহনে উঠার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে চোখে গ্লিসারিন দিয়ে চোখ দিয়ে পানি বের করে। এদের হাতের মুঠোয় বেশ কিছু টাকা থাকে। গাড়িতে উঠেই কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলে ভাই আমার মা/বাবার লাশ দু’দিন ধরে পড়ে আছে হাসপাতালে। তারপর দূরবর্তী কোন জেলার নাম বলে লাশ নিয়ে যাওয়ার জন্য কাঁদতে কাঁদতে চোখের পানি ছেড়ে বলে-আমাকে সাহায্য করুন, লাশ দফান করার জন্য। যা সম্পূর্ণ মিথ্যা।

আটঃ ভিক্ষুক বেশে চুরিঃ
এরা খুব কৌশলী ভিক্ষুক। সময় সুযোগ বুঝে এর চুরি করে। বিশেষ করে বেলা দুইটাÑচারটার মধ্যে মহিলারা যখন একটু বিশ্রাম নেয় তখন এরা চুরির নেশায় মরিয়া হয়ে ওঠে। উপরে উঠার সিঁড়িতে মূল্যবান কিছু পড়ে থাকলে বা বারান্দায় ও গেটের সাথে ভেজা কাপড়, লুঙ্গি, শাড়ী টাঙ্গানো থাকলে সুযোগ বুঝে এরা এসব জিনিস চুরি করে দ্রুত প্রস্থান করে। তারপর ঐ এলাকাতে বেশ কিছু দিন যাতায়াত বন্ধ রাখে এসব ভিক্ষুকরা।

নয়ঃ খাওয়ার সময়কে টার্গেট করে ভিক্ষাঃ
সম্প্রতি সমগ্র বাংলাদেশে স্ট্রীট ফুড এর দোকানের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। যখনই মানুষ স্ট্রীট ফুড সপের সামনে দাঁড়িয়ে খেতে শুরু করে ভিক্ষুকরা তাদের সামনে এসে ভিক্ষার জন্য এক প্রকার বল প্রয়োগ করতে থাকে। মানুষ বিরক্ত হয়ে ভিক্ষা দিতে বাধ্য হয় এসব ভিক্ষুকদের।
দশঃ পরিবহন থেকে নামার সময় ভিক্ষার জন্য ব্যারিকেডঃ
বাস ও রেল ষ্টেশন, সিনেমা হল ও হাসপাতালের গেটে মানুষ যখন পরিবহন থেকে নেমে মানিব্যাগ, ভ্যানিটিব্যাগ ও পকেট থেকে টাকা বের করে ভাড়া পরিশোধের জন্য ঠিক তখনই ভিক্ষুকরা তাদের টার্গেট করে ব্যারিকেড দিয়ে কয়েকজন মিলে ভিক্ষা চাইতে শুরু করে। মানুষ অপারগ হয়ে তখন কয়েকজন ভিক্ষুককে ভিক্ষা দিতে বাধ্য হয়।
এগারোঃ বোরকা পরে দলবদ্ধ নারী ভিক্ষুকদের ভিক্ষাঃ
এই শ্রেণির ভিক্ষুকরা বিশেষ করে সন্ধ্যায় ভিক্ষার জন্য নেমে পড়ে। মানুষ দেখলেই বলেÑভাই আমাদের সব কিছু হারিয়ে গেছে/চুরি হয়ে গেছে। তারপর দূরবর্তী কোন জেলার নাম উল্লেখ করে বলে আমাদের বাড়ি যাওয়ার ভাড়া নাই। সারাদিন খাই নাই। আমাদের সাহায্য করেন। এসব বোরকা পরা ভিক্ষুকবেশী নারীদের সাথে দুই-তিনজন ছেলেমেয়ে থাকে। একজন পুরুষ দূর থেকে এদেরকে ভিক্ষাবৃত্তির জন্য নির্দেশনা দিয়ে থাকে।

বারোঃ সঙ্গবদ্ধ ভিক্ষুকদের ভিক্ষাঃ
সাধারণত এ সঙ্গবদ্ধ ভিক্ষুকদের শহর এলাকাতে দেখা যায়। এরা অধিকাংশই বিকলাঙ্গ। এরা রাস্তায় গড়িয়ে গড়িয়ে তালে তালে আল্লাহ-রাসুলের নাম নিয়ে ভিক্ষা করে। এদের মধ্যে একজন কিছুটা সক্ষম থাকে। এই সক্ষম ব্যক্তিটি ভিক্ষার টাকা সংগ্রহ করে থাকে।

তেরোঃ নওমুসলিম সেজে ভিক্ষাঃ
ভিক্ষুক শ্রেণিদের মধ্যে এরা অন্যতম প্রতারক। মুখে দাড়ি, মাথায় টুপি ও ছেঁড়া পাঞ্জাবী পরে মানুষের কাছে এসে বলে-ভাই আমি/হিন্দু/বৌদ্ধ/খ্রিষ্টান/উপজাতি থেকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছি। আমার পরিবার আমাকে ত্যাজ্য করেছে। আমাকে বাঁচার জন্য ভিক্ষা বা সাহায্য দিন।
চৌদ্দঃ উত্তরবঙ্গের ভিক্ষুকদের ভিক্ষাঃ
এই শ্রেণির ভিক্ষুকরা গায়ে স্যান্ডো গেঞ্জি পরা থাকে। এদের পায়ে কোন জুতা বা চটি থাকে না। মুখ মন্ডলে ও শরীরে কিছু ময়লার দাগ থাকে। দেখলে মনে হয় এরা হাল চাষ করে আসছে। মানুষ দেখলেই এরা হাত বাড়িয়ে বলে- ভাই হামার বাড়ি অংপুর। মুই তিনদিন ধরত না খাওয়া। মোক খাওয়ার জৈনন্যে টাকা দেন। কোন মানুষ এদেরকে মানবিক কারণে খাওয়ার জন্যে টাকা দিলে পরবর্তী অন্য মানুষের কাছেও এরা তিন দিন ধরে না খাওয়ার কথা বলে ভিক্ষা করে।

ষোলঃ অন্ধদের ভিক্ষাঃ অন্ধ ভিক্ষুকরা মায়াবী সুরে বিভিন্ন ইসলামিক গান ও গজল গেয়ে কোন নির্দিষ্ট এলাকাতে, বাসে বা ট্রেনে এরা মানুষের কাছে ভিক্ষা চায়। দৃষ্টিহীনতার প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে মানুষ অন্ধদের দ্বিগুণ ভিক্ষা দিয়ে থাকে।

সতেরোঃ নদী ভাঙ্গা মানুষের তকমা দিয়ে ভিক্ষাঃ
এই শ্রেণির ভিক্ষুকরা নিজেদের অতীত ইতিহাস গৌরবের সাথে উল্লেখ করে নদী ভাঙ্গার কথা বলে মানুষের কাছে নিজেকে নিঃস্ব বলে দাবী করে। করুণ আকুতি-মিনতি করে এসব ভিক্ষুকরা মানুষের কাছে ভিক্ষা চায়।
এখানে উল্লেখ্য যে, নদী ভাঙনের ফলে তাৎক্ষণিকভাবে ঘরবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হওয়া মানুষের মাঝে সরকার চাল, শুকনো খাবার, তাবু বা সাময়িক আশ্রয় এবং ক্ষেত্রবিশেষে নগদ অর্থ প্রদান করা হয়। নদী ভাঙনের শিকার হলে নিজ এলাকার ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (টঘঙ) কার্যালয় কিংবা জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে সাহায্যের জন্য আবেদন করলে সরকারি সাহায্য পাওয়া যায়।

আঠারোঃ মসজিদে ফরজ নামাজের সালাম ফেরানের পর ভিক্ষাঃ
এক শ্রেণির ভিক্ষুক নামাযি বেশে মসজিদে প্রবেশ করে। ফরজ নামাযের সালাম ফেরানোর সাথে সাথেই এরা দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলে-ভাই আমি অসুস্থ, চিকিৎসার জন্য/মেয়ে বিয়ের জন্য আমাকে আল্লাহ্ রসতে সাহায্য করেন। এ কথা বলেই এরা মসজিদের গেটের সামনে দাঁড়ায় সাহায্যের জন্য। এসব নামাযি লেবাসধারী ভিক্ষুকরা কখনও সুন্নত নামায পড়ে না। কৌশলে ভিক্ষা চাওয়াই এদের মূখ্য উদ্দেশ্য।

উনিশঃ শুক্রবারে জুমার দিনকে টার্গেট করে ভিক্ষাঃ
অধিক পূণ্যের আশায় মসলিম জাতি শুক্রবার জুমার দিনে দান-সদগা ও ভিক্ষার পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। শুক্রবার সকাল সাতটা থেকে শুরু হয় ভিক্ষুকদের ভিক্ষা চাওয়া। ভিক্ষুকদের জন্য শুক্রবার একটি উৎসব মূখর পরিবেশে পরিণত হয়। ভিক্ষার পরিমাণও হয় দুই থেকে তিনগুণ।

বিশঃ পবিত্র রমজানকে টার্গেট করে ভিক্ষাঃ
মুসলিম জাতি অধিক নেকী ও পূন্যের আশায় রমজান মাসে প্রচুর পরিমাণ ভিক্ষা ও দান-সদগা করে রমজান এলেই সারা দেশে ভিক্ষা বৃত্তির উৎসব চলে। পেশাদার ভিক্ষুকদের জন্য রমজান মাস ভিক্ষার জন্য মহাউৎসবে পরিণত হয়। এক শ্রেণির লেবাসধারী টুপি-দাড়িওয়ালা হাজার হাজার লোক মসজিদ মাদ্রাসার উন্নয়নের কথা বলে ভিক্ষা করে। এই লেবাসধারীরা কোন নামাজ পড়ে না। মসজিদ-মাদ্রাসার উন্নয়নের কথা বলে এরা ভিক্ষা করে যে টাকা উপার্জন করে তা দিয়ে নিজ পরিবারের উন্নতি সাধন করে থাকে। এসব লেবাসধারী টুপিওয়ালারা মূলত বাণিজ্যিক ভিক্ষুক।

একুশঃ ভ্যান ভাড়া করে ভিক্ষাঃ
একটি ভ্যান একদিনের জন্য সর্বনিম্ন ভাড়া এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা। ভ্যান চালকের চাহিদা এক হাজার। গড়ে দাঁড়ায় আড়াই হাজার টাকা। ভ্যান ভাড়া করে ভ্যানের মধ্যে বিছানা পেতে প্রতিবন্ধী সেজে বা প্রতিবন্ধীরা মাইক দিয়ে ইসলামিক গজল বাজিয়ে ভিক্ষা করে। এসব ভিক্ষুকদের দৈনিক ইনকাম পাঁচ হাজার টাকার উপরে। এসব ভিক্ষুকরা মূলত স্মার্ট বাণিজ্যিক ভিক্ষুক।

বাইশঃ তিন চাকার ছোট গাড়ীতে বৃদ্ধদের দিয়ে ভিক্ষাঃ
অনেক বাকপ্রতিবন্ধী চলতে পারে না এবং অনেক বৃদ্ধ নারী-পুরুষ চলতে-ফিরতে অক্ষম ও দরিদ্র এদেরকে ভাড়া করে বিভিন্ন মসজিদ ও মাজারের সামনে এনে ভিক্ষা করানো হয়।

তেইশঃ পাগলের বেশে ভিক্ষাঃ
গায়ে লাল শালু কাপড়ে মোড়ানো, হাতে বেশকিছু চুড়ি, বাবড়ি চুল, মোটা গোঁফ ও পিঠে ছালার বস্তা এবং সমগ্র শরীরে ছালা দিয়ে মোড়ানো পাগল বেশী কিছু লোক ভিক্ষা করে। এদেরকে মানুষ দেখে কেউ ভয়ে ভিক্ষা দেয় আবার কেউ আধ্যাত্মিক মানুষ মনে করেও ভিক্ষা দেয়। মূলতঃ এরা ভিক্ষুকের বেশে গাঁজা বিক্রি করে।

চব্বিশঃ ছোট শিশু কোলে নিয়ে ভিক্ষাঃ
আট-দশ মাস থেকে এক দেড় বছরের শিশুদের খালি গায়ে কোলে নিয়ে মানুষের সামনে হাজির হয় নারী ভিক্ষুকরা। শিশুদের কোলে দোলাতে দোলাতে ভিক্ষা চাইতে থাকে মানুষের কাছে। শিশুদের প্রতি দয়াশীল মানুষের মন এসব ভিক্ষুককে ভিক্ষা দিতে বাধ্য হয়।

পঁচিশঃ শিশুদের দিয়ে কৌশলে ভিক্ষাঃ
রাস্তার এক পাশে বাবা অথবা মা ময়লা কাপড়ের ব্যাগ ও ছোট বস্তা ইত্যাদি নিয়ে চুপচাপ বসে থাকে। এদের আট-দশ- বছরের ছেলে-মেয়েরা মানুষের কাছে খাওয়ার জন্য কাপড় কেনার জন্য ভিক্ষা চায়। মানুষ ভিক্ষা দিলে এই শিশুরা দৌঁড়ে ওদের বাবা-মার কাছে ভিক্ষার টাকাটা পৌঁছে দেয়।

ছাব্বিশঃ পথচারীদের পা ঝাঁপটে ধরে শিশুদের ভিক্ষাঃ
ঢাকা শহরের ফুটওভার ব্রীজের সিঁড়িতে পাঁচ থেকে সাত বছরের শিশুরা পথচারীদের পা ঝাঁপটে ধরে ভিক্ষা চায়। অনেক পথচারী পা না ছাড়ার কারণে বিরক্ত হয়ে এসব অবুঝ শিশুদের গায়ে হাত তোলে। আবার অনেক পথচারী মানবিক কারণে এসব অবুঝ শিশুদের ভিক্ষা দিয়ে থাকে। কোমলমতি শিশুরা যখন পথচারীদের পা ঝাঁপটে ধরে ভিক্ষা চায় এদৃশ্যটি কতটুকু অমানবিক মূল্যবোধের পরিচয় বহন করে তা স্ব-চক্ষে না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না।

সাতাশঃ শিশুদের বিকলাঙ্গ করে ভিক্ষাঃ
ভিক্ষুকদের একটি দুর্ধষ সিন্ডিকেট আছে। এরা চুরি, ডাকাতি ও অপহরণ ও মানব পাচারের সাথে জড়িত। এরা সুযোগ পেলেই শিশুদের অপহরণ করে আটক করে রাখে। তারপর তাদেরকে হাত বা পা কেটে জীবনের জন্য পঙ্গু করে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় নিয়ে ভিক্ষা বাণিজ্য করতে বাধ্য করে।
দেশের প্রচলিত আইন ও উচ্চ আদালতের রায় অনুযায়ী শিশুদের ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত করা একটি গুরুতর এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
শিশুদের বিকলাঙ্গ বা অঙ্গহানি করে বাংলাদেশের প্রচলিত আইন এবং উচ্চ আদালতের রায় অত্যন্ত কঠোর। শিশুদের ভিক্ষাবৃত্তির বিরুদ্ধে হাইকোর্টের প্রধান প্রধান পর্যবেক্ষণ, রায় ও আইনী ব্যবস্থাগুলো নি রূপঃ
১। শিশুদের ভিক্ষাবৃত্তির বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতের রায়ঃ
(ক) শিশুদের ব্যক্তিগত জিম্মা ও ভিক্ষাবৃত্তি নিষিদ্ধকরণ (২০১৫)
২০১৫ সালে নভেম্বর মাসে “শিশু রবিউল ও তার ভাইবোনদের ভিক্ষাবৃত্তি” সংক্রান্ত একটি মামলায় হাইকোর্ট সুনির্দিষ্ট আদেশ দেন। আদালত স্পষ্ট নির্দেশ দেন যে, ঐ শিশুদের দিয়ে কোনভাবেই ভিক্ষাবৃত্তি করানো যাবে না।
শিশুদের যদি পুনরায় ভিক্ষাবৃত্তিতে ব্যবহার করা হয়, তবে তাদের মায়ের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারী দেওয়া হয়।
(খ) রাজধানীতে ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধের নির্দেশঃ হাইকোর্ট রাজধানী ঢাকাসহ দেশজুড়ে শিশুদের দিয়ে জোরপূর্বক ভিক্ষাবৃত্তি করানো এবং শিশুদের অপহরণ ও অঙ্গহানি করা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পুলিশ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দিয়েছেন।
২। শিশুদের ভিক্ষাবৃত্তির বিরুদ্ধে বাংলাদেশে প্রচলিত আইনে শাস্তির বিধানঃ
(ক) নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (ধারা ১২)ঃ এই আইনের ১২ ধারা অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি ভিক্ষাবৃত্তি বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে কোনো শিশুর হাত, পা, চোখ বা অন্য কোনো অঙ্গ বিকল বা নষ্ট করেন কিংবা অন্য কোনোভাবে শিশুকে বিকলাঙ্গ বা অঙ্গহানি করেন, তবে সেটি একটি গুরুতর অপরাধ। এই অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড- বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদ- এবং এর পাশাপাশি অর্থদ-।
(খ) শিশু আইন, ২০১৩ (ধারা ৭১): কোনো শিশুকে ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োগ করলে, বাধ্য বা এ কাজে প্রশ্রয় দিলে অপরাধীর অনধিক ৫ বছরের কারাদন্ড, অনধিক ১ লাখ টাকা অর্থদন্ড- বা উভয় দ-ের বিধান রয়েছে।

এখানে লক্ষণীয় যে, সারাদেশে প্রায় কয়েক লক্ষ লোক ভিক্ষাবৃত্তির সাথে জড়িত। রাজধানী ঢাকাতে প্রায় পঞ্চাশ হাজারের অধিক লোক ভিক্ষা বাণিজ্যের সাথে জড়িত। ঢাকা শহরের অলিতে গলিতে ভিক্ষুক। প্রতি মিনিটে ভিক্ষুকদের ভিক্ষা চাওয়ার দৃশ্য চোখে পড়ে। ভিক্ষুকদের অত্যাচারে মানুষ অতিষ্ট। প্রতিদিন প্রায় দশ কোটি টাকার ভিক্ষা বাণিজ্য শুধু ঢাকা শহরেই হয়ে থাকে। এটি এখন পুরো বাংলাদেশেই বিশাল সিন্ডিকেটে পরিণত হয়েছে। প্রতিবন্ধী ও প্রতিবন্ধী সেজে যারা ভিক্ষা করে এদের দৈনিক ইনকাম প্রায় চার হাজার টাকা। বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত ভিক্ষুকদের দৈনিক ইনকাম প্রায় তিন হাজার টাকা। যারা অসহায়ত্বের কথা বলে, নদী ভাঙ্গার কথা বলে, বাবা-মা নেই, এতিম এদের দৈনিক ইনকাম প্রায় আড়াই হাজার, পেশাদার ভিক্ষুক যারা বাড়িতে বাড়িতে ভিক্ষা করে তাদের দৈনিক ইনকাম এক হাজার থেকে বারশ টাকা। সর্বনিম্ন আয়ের ভিক্ষুক হল যারা রাস্তার এক পাশে ভিক্ষার থালা নিয়ে চুপচাপ বসে থাকে এদের ইনকাম তিন থেকে পাঁচশ টাকা।

ভিক্ষুক বেশে সারাদেশে ছদ্মবেশী প্রতারক চক্রের ভিক্ষুকের সংখ্যাই বেশি। এসব ভিক্ষুকরা ভিক্ষাবৃত্তিকে জীবিকা নির্বাহের খুব সাধারণ মাধ্যম নয় বরং বাণিজ্যিকিকরণে পরিণত করেছে। শুধু তাই নয় ভিক্ষাবৃত্তির সাথে জড়িত ভিক্ষুক সিন্ডিকেট ভয়াবহ অপরাধ জগতের সাথে জড়িয়ে পড়ছে। কে পেশায় ভিক্ষুক আর কে বাণিজ্যিক ভিক্ষুক তা চেনার উপায় নেই।

উপরোক্ত ভিক্ষাবৃত্তির বিষয়গুলোর আলোকে প্রকৃত পক্ষে কে প্রকৃত ভিক্ষুক তা চেনা দুস্কর। আত্ম-সম্মান বিসর্জন দিয়ে কে বা কারা ভিক্ষা বৃত্তিতে জড়িয়েছেন জীবন বাঁচানোর তাগিদে তা খুঁজে বের করা দরকার। অনেক নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবার অনন্যোপায় হয়ে আত্ম-সম্মান বিসর্জন দিয়ে সবকিছু হারিয়ে জীবন বাঁচানোর তাগিদে ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু ভিক্ষা বাণিজ্যে ও ভিক্ষুক সিন্ডিকেটদের জন্য ভিক্ষাবৃত্তি এখন আর ভিক্ষাবৃত্তি নয় বরং পূঁজিহীন লাভজনক বাণিজ্য।

কর্ম বড় ধর্ম। পরিশ্রমের মাধ্যম যদি একটি অর্থ উপার্জিত হয় সেই অর্থের মূল্য, তাৎপর্য ও মহত্ত্ব কত ব্যাপক ও অপরিমেয় তা কোন মানদন্ড দিয়ে পরিমাপ করা যাবে না। সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয় ভূমিহীন, নিঃস্ব, অবলা-অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধ করে তাদের কর্মসংস্থানের পথ সৃষ্টির জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিতে পারে। মানবতার মহান মুক্তির দূত আমাদের প্রিয় নবী রাসুল (সাঃ) বলেছেন তোমরা ভিক্ষা কর না, মেহনত কর। পরিশ্রম করে হালাল অর্থ উপার্জন করে জীবন নির্বাহ কর।” তাই শারীরিকভাবে সক্ষম ও পরিশ্রম করার মত যাদের শক্তি ও সামর্থ আছে তারা ভিক্ষাবৃত্তি পরিহার করুন। যে কোনো বৈধ কর্ম করুন। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে নিজের অবদান রাখুন। আত্ম-সম্মান নিয়ে পৃথিবীতে বাস করুন। প্রচলিত আইনের বাহিরেও আরো কঠোর আইন করে দেশ থেকে ভিক্ষাবৃত্তি চিরতরে বন্ধের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করছি।