, ,

মাছ সংরক্ষণ ও কর্মসংস্থানের ভারসাম্য খুঁজছে ‘চায়না দুয়ারী জাল’ শিল্প: সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগের প্রত্যাশা

নিউজটি শেয়ার করুন

চায়না দুয়ারী জাল বাংলাদেশের মৎস্য খাতে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত একটি বিষয়। একদিকে প্রচলিত আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট ধরনের জালের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা হয়, অন্যদিকে এই জাল উৎপাদনকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান, যেখানে বহু শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে। ফলে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার পাশাপাশি কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন ও রাজস্ব আয়ের বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পাচ্ছে।
সরেজমিনে বিভিন্ন ব্যবসায়ী, শ্রমিক, জেলে ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০১৬ সালের দিকে বিদেশ থেকে এই ধরনের জাল আমদানি শুরু হয়। পরবর্তীতে দেশীয় উদ্যোক্তারা দক্ষ কারিগর তৈরি করে স্থানীয়ভাবে জাল উৎপাদনের উদ্যোগ নেন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন এলাকায় এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বহু মানুষ যুক্ত রয়েছেন এবং উৎপাদিত পণ্যের একটি অংশ বিদেশেও রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেন।
কারখানাগুলোতে কর্মরত শ্রমিকদের ভাষ্য, এই শিল্পের মাধ্যমে নারী-পুরুষ উভয়েরই কর্মসংস্থান হয়েছে। অনেক পরিবারের অতিরিক্ত আয়ের উৎস তৈরি হওয়ায় সন্তানদের শিক্ষা, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়েছে। উদ্যোক্তাদের দাবি, জাল উৎপাদনের সঙ্গে সুতা, রড ও অন্যান্য কাঁচামালের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় সংশ্লিষ্ট শিল্পখাতেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বেড়েছে এবং সরকার রাজস্বও পাচ্ছে।
তবে মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ক্ষতিকর জালের ব্যবহার জলাশয়ের জীববৈচিত্র্য ও মাছের প্রজননের জন্য হুমকি হতে পারে। তাই প্রচলিত আইন অনুযায়ী তাদের অভিযান ও তদারকি কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। তাদের মতে, মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন রক্ষা করা দীর্ঘমেয়াদে দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এ বিষয়ে ঢাকা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা রোকনুজ্জামান বলেন, প্রচলিত মৎস্য আইন অনুযায়ী অধিদপ্তরের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে নীতিগত কোনো পরিবর্তন বা সমন্বিত সিদ্ধান্তের বিষয়টি সরকারের উচ্চ পর্যায় এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বিবেচনার বিষয়। তিনি আরও জানান, জনবল সংকটের কারণে অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় তদারকি পরিচালনা করা সম্ভব হয় না।
অন্যদিকে উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা মনে করেন, পরিবেশ ও মৎস্যসম্পদ রক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই শিল্পখাতকে পরিচালনার জন্য একটি বাস্তবসম্মত নীতিমালা প্রণয়ন করা যেতে পারে। তাদের প্রস্তাব, কোন ধরনের জাল উৎপাদন ও ব্যবহার করা যাবে, কোনটি নিষিদ্ধ থাকবে এবং কীভাবে আইন মেনে উৎপাদন অব্যাহত রাখা সম্ভব—এসব বিষয়ে সরকার, মৎস্য অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান হওয়া উচিত।
জেলেদের একাংশ বলেন, নদী ও জলাশয়ের মাছ ধরার ওপর নির্ভর করেই বহু পরিবারের জীবিকা চলে। তাই তারা চান, মাছের প্রজনন সংরক্ষণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি জীবিকা রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হোক।
সচেতন মহলের মতে, কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ ও মৎস্যসম্পদ রক্ষার মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতিমালা প্রণয়ন করা সময়ের দাবি। তারা মনে করেন, মাছের নিরাপদ প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ, আইন মেনে উৎপাদন ব্যবস্থা এবং কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা গেলে একদিকে যেমন জীববৈচিত্র্য রক্ষা হবে, অন্যদিকে শিল্প ও কর্মসংস্থানও টেকসইভাবে এগিয়ে যাবে।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, সরকার, মৎস্য অধিদপ্তর, উদ্যোক্তা, জেলে ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে আলোচনার মাধ্যমে এমন একটি কার্যকর সমাধান আসবে, যা দেশের মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন—সব দিকেই ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।