, ,

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন : অন্তর্ভুক্তিহীনতার ছায়ায় গ্রহণযোগ্যতার সংকট

নিউজটি শেয়ার করুন

 

আজ ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। সারা দেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ সকাল সাড়ে সাতটায় আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। তবে ভোটের প্রারম্ভ থেকেই দেশের গণতান্ত্রিক বিশ্বাসের ওপর প্রশ্নের ছায়া।

গতরাতের ঘটনায় দেখা গেছে ১১ দলের নেতৃত্বে থাকা জামায়াতের অপতৎপরতা চট্টগ্রাম, ফরিদপুর, নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকার কয়েকটি কেন্দ্রে ভোটকেন্দ্র দখল, ব্যালট পেপার ও সিলের অপব্যবহার, জাল ভোট এবং ভোটারদের ওপর চাপ ও হুমকি। বিভিন্ন জায়গায় নগদ অর্থে ভোট ক্রয়, বিপুল পরিমান টাকা সহ জামায়াত নেতাদের অনেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহীনির হাতে আটক হয়েছে। ভোট কেন্দ্রের আশপাশে দেশী অশ্ত্র,লাঠি ইত্যাদি মজুদ করতে গিয়েও ধরা পড়েছে জামায়াত-শিবির ও তাদের সহযোগীরা। এ পরিস্থিতিতে ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি রাতেই সংবাদ সম্মেলন করে জামায়াতের এসব বেআইনী কর্মকাণ্ডকে তারা সমর্থন করেনা বলে জানিয়েছে। আবার এনসিপির এক প্রার্থী প্রাণনাশের হুমকি প্রদান করে দেওয়া বক্তব্যে তার নির্বাচনী এলাকায় বসবাসরত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটারদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। যদিও ওই প্রার্থী তার বক্তব্য অস্বীকার করে,এটি অপপ্রচার দাবী করেছেন। এছাড়া সামাজিক মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর প্রচার নির্বাচনকে বিতর্কিত করেছে।

অনেকের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশন দীর্ঘদিন নীরব থেকেই জামায়াতের এ ধরনের কর্মকাণ্ডের পরোক্ষ প্রশ্রয় দিয়ে আসছে। তবুও বিএনপির চাপ ও জনসচেতনতার কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে। কেন্দ্র থেকে জড়িতদের বহিষ্কার, আটক এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান।

আজকের ভোট কেবল প্রতিনিধি নির্বাচন নয়,এটি দেশের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরীক্ষা এবং প্রশাসন ও কমিশনের দায়ভার নির্ধারণের মঞ্চ। সরকার ও নির্বাচন কমিশন নাগরিক বিশ্বাস পুনর্গঠন করবে নাকি বিতর্ক আরও জোরালো করবে, সেই প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে দেশি-বিদেশি পরিমণ্ডলে যে প্রশ্ন, সংশয় ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা কেবল একটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নয়, বরং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চরিত্র, রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি, সংখ্যালঘু নিরাপত্তা, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার বৃহত্তর ইস্যুকে সামনে নিয়ে এসেছে। নির্বাচনের মাত্র কয়েকদিন আগে ওয়াশিংটন ডিসির ক্যাপিটল হিলে অনুষ্ঠিত এক কংগ্রেসনাল ব্রিফিং থেকে শুরু করে ঢাকায় গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত জরিপ-সবকিছু মিলিয়ে স্পষ্ট হচ্ছে, এই নির্বাচনকে ঘিরে আস্থার সংকট গভীর।

আজকের ভোট নিয়ে ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রশ্ন উঠেছে।গত ৯ ফেব্রুয়ারি ক্যাপিটল হিলে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা’ শীর্ষক ব্রিফিংয়ে অংশ নেওয়া কয়েকজন মার্কিন নীতিনির্ধারক ও বিশ্লেষক বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেন। সেখানে বলা হয়, দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখে যে নির্বাচন আয়োজন করা হচ্ছে, তা স্বভাবতই প্রশ্নবিদ্ধ হিসেবে মূল্যায়িত হবে।

কিছু বক্তা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞার কথাও তোলেন। একই সঙ্গে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষায় ব্যর্থতার অভিযোগ, সংখ্যালঘু নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং দায়মুক্তির সংস্কৃতি নিয়ে প্রশ্ন উঠে আসে।

রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট দুই দলের প্রতিনিধিদের বক্তব্যে একটি সাধারণ সুর ছিল। দক্ষিণ এশিয়ায় স্থিতিশীলতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার। ভার্চুয়ালি অংশ নেওয়া ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ক সাবেক মার্কিন অ্যাম্বাসেডর অ্যাট-লার্জও সংখ্যালঘু নিরাপত্তা ইস্যুকে গুরুত্ব দেন।
অর্থাৎ, নির্বাচনটি কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক নজরদারির আওতায় চলে এসেছে।

একই সময়ে দেশীয় বাস্তবতায় উঠে এসেছেে আস্থাহীনতার পরিসংখ্যান। ঢাকায় সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) প্রকাশিত গবেষণায় উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য। যদিও ৮৮.৭ শতাংশ মানুষ ভোটাধিকার সম্পর্কে সচেতন, প্রায় ৫০.৭ শতাংশ নির্বাচন নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং ২৫.৮ শতাংশ নিজেদের চরম অনিরাপদ মনে করেন।

গবেষণায় আরও বলা হয়, সংবিধানে সমতা ও বৈষম্যহীনতার অঙ্গীকার থাকলেও বাস্তবে ধর্মীয় সংখ্যালঘু, আদিবাসী জনগোষ্ঠী, নারী ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের নির্বাচনী অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্ব সীমিত। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের প্রায়শই ‘ভোটব্যাংক’ হিসেবে বিবেচনা করে, কিন্তু নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাদের উপস্থিতি নগণ্য।

এমন প্রেক্ষাপটে একটি বড় রাজনৈতিক দলকে নির্বাহী আদেশে কার্যত বাইরে রেখে নির্বাচন আয়োজন অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের ধারণার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ ? সেই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।

রাজনৈতিক দলগুলোর অন্তর্ভুক্তির ঘাটতিও আজকের নির্বাচনকে করেছে ঝুঁকিপূর্ণ। ঐকমত্য কমিশনের দীর্ঘ আলোচনায় ৫০টির বেশি নিবন্ধিত দলের মধ্যে মাত্র ৩০-৩২টি দল অংশ নিতে পেরেছে। বাকি দলগুলোর সঙ্গে পর্যাপ্ত সংলাপ হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। একইসঙ্গে নারীদের ও সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্বের ঘাটতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সরকারি পর্যায়ে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি ও ইসলামী আন্দোলন,এই চার দলকে “বড় দল” হিসেবে বিবেচনা করে ধারাবাহিক বৈঠক করা হয়েছে। কিন্তু কোন মানদণ্ডে এই শ্রেণিবিন্যাস নির্ধারিত হলো, সেটি স্পষ্ট নয়। গণতান্ত্রিক কাঠামোয় রাজনৈতিক সমতার নীতি অনুসরণ না করলে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ণ হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।

প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও নির্বাচনী ব্যবস্থাপনার দূর্বলতা ভোটের দিনেও বাতাসে ভেসে বেড়িয়েছে। নির্বাচনকে ঘিরে মাঠ প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়েও নানা অভিযোগ ঘুরে বেড়াচ্ছে আজও। ৬৪ জেলার ডিসিদের রাজনৈতিক আনুগত্য নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তা ভুল প্রমাণিত করা যায়নি আজও। এ
ধরনের অভিযোগই নির্বাচনী আস্থাকে ক্ষয় করে, স্বচ্ছতাকে সন্দেহের জালে আটকে দেয়। ভোট গণনার স্থান ও পদ্ধতি নিয়ে ইসির ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্যে ও সিদ্ধান্তে অস্পষ্টতা থাকাও উদ্বেগের কারণ।

নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ৫৪০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক নির্বাচন পর্যবেক্ষণে আসছেন, যার মধ্যে বিবিসি, রয়টার্স, এপি ও আল জাজিরার প্রতিনিধিরা রয়েছেন। রয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের ঘনিষ্ঠ পাকিস্তানের বিশাল বহরের পর্যবেক্ষক সাংবাদিক প্রতিনিধি দল। তারা হয়তো আন্তর্জাতিক মহলের কাছে স্বচ্ছতার বার্তা দিতে পারে, কিন্তু কাঠামোগত দুর্বলতা থাকলে পর্যবেক্ষণ একা আস্থার সংকট দূর করতে পারে না।

গণভোট ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। গতকাল জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে গণভোটের বিদ্যমান অধ্যাদেশ ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে ফলাফলের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে বলে নীতিগত বিশ্লেষকরা মত দিয়েছেন।
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের ভাষায়, জাতীয় নির্বাচন যে অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক হওয়া প্রয়োজন, বাস্তবে তা বলা যাচ্ছে না। ফলে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিবর্তে নির্বাচন যদি বৈধতা প্রমাণের লড়াইয়ে পরিণত হয়, তাহলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে।

বহির্বিশ্বের প্রত্যাশা ছিল “ইনক্লুসিভ” নির্বাচন।
কমনওয়েলথ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারতসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অংশীদার “ইনক্লুসিভ” নির্বাচনের ওপর জোর দিয়েছিলেন। তাদের দৃষ্টিতে অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন মানে এমন একটি প্রতিযোগিতা, যেখানে প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলো অংশ নেয় এবং ভোটাররা প্রকৃত বিকল্পের মধ্যে বেছে নিতে পারে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় আওয়ামী লীগ একটি বড় অংশের প্রতিনিধিত্ব করে,এই বাস্তবতা অস্বীকার করা যায় না। ফলে দলটির অনুপস্থিতিতে নির্বাচন হওয়ায় সেটির অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা কতটা হবে, তা সময়ই বলে দেবে।

গ্রহণযোগ্যতার পরীক্ষায় এই ১২ ফেব্রুয়ারির ভোট। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। একদিকে প্রশাসনিক আয়োজন, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক, সবই রয়েছে। অন্যদিকে রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির ঘাটতি, নেই গ্রহণযোগ্য পরিমান ভোটার উপস্থিতি, রয়েছে জেন্ডার সমতার ঘাটতি, আস্থাহীনতা, সংখ্যালঘু নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে সমালোচনা,এসব বাস্তবতাও উপেক্ষণীয় নয়।

গণতন্ত্রের শক্তি কেবল ভোটের দিনে নয়, বরং প্রক্রিয়ার প্রতি সর্বস্তরের আস্থায় নিহিত। যে নির্বাচন দেশের বড় একটি রাজনৈতিক শক্তিকে বাইরে রেখে অনুষ্ঠিত হয় এবং যেখানে অর্ধেকের বেশি ভোটার উদ্বেগে থাকে, নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে বয়কট করে, সেই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

অতএব আজকের দিনে চলমান এই ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের ভোট গ্রহন হয়তো একটি নতুন সরকার গঠন করবে।তবে এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ, রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি এবং আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতার এক কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছে। আগামীর সময়ই বলে দেবে, এই পরীক্ষায় বাংলাদেশ কতটা সফলভাবে উত্তীর্ণ হতে পারবে ?