“জুলাই সনদ ও গণভোট সাংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক”-এই শিরোনাম আজ আর কেবল রাজনৈতিক স্লোগান নয়, এটি একটি বিচারাধীন প্রশ্ন। কারণ, জুলাই জাতীয় সনদ, গণভোট অধ্যাদেশের বৈধতা নিয়ে রুল জারি করেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট এর হাইকোর্ট বিভাগ। বিচারপতি রাজিক-আল-জলিল ও বিচারপতি মো. আনোয়ারুল ইসলামের বেঞ্চ আইন সচিব, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, জাতীয় সংসদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, নির্বাচন কমিশন ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে চার সপ্তাহের মধ্যে ব্যাখ্যা চেয়েছেন- কেন এসব পদক্ষেপ অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না।
এই রুল কেবল একটি প্রক্রিয়াগত ধাপ নয়। এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক আত্মপরিচয় নিয়ে মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।
সংবিধান: প্রক্রিয়ার শাসন, ফলাফলের নয়
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে অনুষ্ঠিত গণভোটে সরকারি ফল বলছে- প্রায় ৬২ শতাংশ ‘হ্যাঁ’, ২৯ শতাংশ ‘না’। অংশগ্রহণ প্রায় ৬১ শতাংশ। সংখ্যার বিচারে এটি একটি সুস্পষ্ট ফল। কিন্তু সাংবিধানিক গণতন্ত্রে বৈধতা কেবল ফলাফলের অঙ্কে নির্ধারিত হয় না। তা নির্ধারিত হয় প্রক্রিয়ার ন্যায্যতা, প্রতিনিধিত্বের কাঠামো এবং সংবিধানসম্মত ক্ষমতার সীমারেখা দিয়ে।
বাংলাদেশের সংবিধান জনগণকে ক্ষমতার উৎস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু সেই ক্ষমতার প্রয়োগ নির্দিষ্ট সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে, প্রধানত সংসদের মাধ্যমে। সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা সংসদের হাতে ন্যস্ত। ১৪২ অনুচ্ছেদে সংবিধান সংশোধনের পদ্ধতি নির্ধারিত। প্রশ্ন হলো, এই নির্ধারিত প্রক্রিয়া অতিক্রম করে গণভোটের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কারের বাধ্যবাধকতা তৈরি করা যায় কি?
রুলে ঠিক এই প্রশ্নটিই উত্থাপিত হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকার ও ক্ষমতার বৈধতা
রিটকারীদের অন্যতম যুক্তি- সংবিধান বা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ -এ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কোনো বিধান নেই। অতএব এমন সরকারের প্রণীত ‘জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫’ ও তার অধীনে গণভোট আয়োজন ক্ষমতাবহির্ভূত। আরও বলা হয়েছে, ২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল ঘোষণার প্রেক্ষিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের প্রশ্ন বিচারাধীন। এই পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকারের সাংবিধানিক অবস্থান নিজেই অনির্দিষ্ট।
এখানে একটি মৌলিক নীতি সামনে আসে-“continuing parliamentary sovereignty”। অর্থাৎ, একটি সংসদ তার কার্যকালে স্বাধীনভাবে আইন প্রণয়ন ও বাতিল করতে পারে, কোনো বহিরাগত কাঠামো তাকে পূর্বনির্ধারিত ফল মেনে নিতে বাধ্য করতে পারে না। অথচ ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, আগামী সংসদ প্রথম ২৭০ দিন সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে কাজ করবে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রস্তাবগুলো অন্তর্ভুক্ত না করলে সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে যুক্ত হয়ে যাবে।
সাংবিধানিক গণতন্ত্রে “স্বয়ংক্রিয় সংশোধন” ধারণা নজিরবিহীন। সংসদীয় বিতর্ক ও ভোটাভুটির বিকল্প হিসেবে গণভোটকে প্রতিষ্ঠা করা হলে তা সংসদের সার্বভৌমত্বকে খর্ব করে।
‘Bundled Referendum’: এক প্রশ্নে বহু সিদ্ধান্ত
জুলাই সনদের অধীনে ৪৮টি সাংবিধানিক প্রস্তাবকে একক ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ প্রশ্নে গুচ্ছবদ্ধ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সংবিধানের মূলনীতি পরিবর্তন, ৭(ক) ও ৭(খ) অনুচ্ছেদ বিলুপ্তি, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা, তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা প্রভৃতি মৌলিক ও পারস্পরিকভাবে ভিন্নধর্মী বিষয়।
তুলনামূলক সাংবিধানিক চর্চায় একে “bundled referendum” বলা হয়- যা সমালোচিত। কারণ এটি ভোটারকে পৃথক মত দেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে। একজন ভোটার হয়তো রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধির পক্ষে, কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার বিপক্ষে। তবুও তাকে একটি সামগ্রিক উত্তর দিতে বাধ্য করা হয়েছে। এতে সম্মতি আংশিক না সামগ্রিক- তা স্পষ্ট হয় না।
হাইকোর্টের রুল এই প্রশ্ন কাঠামোর বৈধতা নিয়েও পরোক্ষভাবে প্রশ্ন তুলেছে।
ব্যালট নিরপেক্ষতা ও প্রশাসনিক প্রচারণা
গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পাশে টিক এবং ‘না’-এর পাশে ক্রস চিহ্ন ব্যবহারের বিষয়টি কেবল নকশাগত নয়; এটি “ballot neutrality” নীতির সঙ্গে যুক্ত। টিককে সাধারণত সঠিক বা গ্রহণযোগ্য এবং ক্রসকে ভুলের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো প্রতীকী পক্ষপাত এড়ানো।
অন্যদিকে, অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রশাসনিক প্রচারণা চালানোর ঘোষণা নির্বাচন প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। যদি রাষ্ট্রযন্ত্র কোনো এক বিকল্পের পক্ষে সক্রিয় হয়, তবে গণভোটের স্বাধীনতা কতটা অবশিষ্ট থাকে?
ইতিহাসের শিক্ষা
বাংলাদেশে অতীতে তিনটি গণভোট হয়েছে। ১৯৭৭, ১৯৮৫ ও ১৯৯১ সালে। প্রথম দুটি ছিল মূলত ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপ্রধানের বৈধতা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা। সরকারি হিসাবে ৯০ শতাংশের বেশি সমর্থন দেখানো হলেও গবেষণা বলছে, বাস্তব অংশগ্রহণ ছিল অনেক কম। তৃতীয় গণভোট তুলনামূলকভাবে রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে হলেও ফলাফল প্রশ্নমুক্ত ছিল না।
এই ইতিহাস আমাদের সতর্ক করে- গণভোট কখনো কখনো জনমতের চেয়ে ক্ষমতার অভিপ্রায় প্রতিফলিত করতে পারে।
নোট অব ডিসেন্ট ও ঐকমত্যের প্রশ্ন
জুলাই সনদ তৈরিতে দীর্ঘ আলোচনার পর বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নোট অব ডিসেন্ট সংযুক্ত করেছিল। কিন্তু বাস্তবায়নের সুপারিশে সেই আপত্তিগুলো বাদ দেওয়া হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে- ঐকমত্য কমিশন কি নিজেদের সংসদের সমতুল্য মনে করেছে? কমিশন একটি সুপারিশকারী সংস্থা, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের এখতিয়ার সংসদের।
সংসদ হলো জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রতিষ্ঠান। সংবিধান পরিবর্তনের একমাত্র বৈধ ফোরামও সেটিই। সংসদের আগে গণভোটের মাধ্যমে বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করা হলে তা প্রতিনিধিত্বমূলক কাঠামোর সঙ্গে সংঘর্ষ তৈরি করে।
গণভোট কি সংসদকে বাধ্য করে?
সাংবিধানিক তত্ত্বে গণভোটকে কখনো “constituent power in action” বলা হয়- জনগণের প্রতিষ্ঠাতা ক্ষমতার প্রত্যক্ষ প্রয়োগ। কিন্তু এই প্রয়োগ তখনই বৈধ, যখন তা সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে নির্ধারিত এবং প্রতিনিধিত্বমূলক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
যদি গণভোট সংসদীয় বিতর্ককে সংকুচিত করে বা প্রতিনিধিদের স্বাধীন বিবেচনাকে অকার্যকর করে, তবে তা গণতন্ত্রের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ বলছে, আইন ব্যতীত কোনো কার্যক্রম গ্রহণযোগ্য নয়। সুতরাং গণভোট আয়োজনের আইনি ভিত্তি স্পষ্ট না হলে তার বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়াই স্বাভাবিক।
আদালতের ভূমিকা: সাংবিধানিক প্রহরী
হাইকোর্টের রুল এই মুহূর্তে রাষ্ট্রের সামনে একটি সাংবিধানিক বিরতি তৈরি করেছে। আদালত চূড়ান্ত রায় দেননি। কিন্তু ব্যাখ্যা চেয়ে জানিয়ে দিয়েছেন,প্রক্রিয়াগত ও কাঠামোগত প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে এগোনো যাবে না।
বিচার বিভাগের এই ভূমিকা সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিপরীতে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো রক্ষার দায়িত্বের অংশ। “Counter-majoritarian” নীতি এখানেই প্রাসঙ্গিক। সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তও যদি সাংবিধানিক সীমা লঙ্ঘন করে, তবে আদালতের হস্তক্ষেপ বৈধ।
সামনে পথ কোনটি?
রাষ্ট্রের সংস্কার প্রয়োজন,এ নিয়ে দ্বিমত নেই। ক্ষমতার ভারসাম্য, জবাবদিহি, নির্বাচন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা-এসব প্রশ্নে পরিবর্তন জরুরি। কিন্তু সংস্কারের বৈধতা তার প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল। যদি সেই প্রক্রিয়াই প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তবে ফলাফল যতই চমকপ্রদ হোক, আস্থার সংকট থেকেই যায়।
এই মুহূর্তে প্রয়োজন-
১. আদালতের রুলের পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ জবাব।
২. সংসদীয় বিতর্ক ও সর্বদলীয় আলোচনার মাধ্যমে প্রস্তাবসমূহ পর্যালোচনা।
৩. গণভোটের আইনি ভিত্তি স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত কোনো বাধ্যতামূলক বাস্তবায়ন থেকে বিরত থাকা।
গণতন্ত্র কেবল সংখ্যার খেলা নয়, এটি প্রক্রিয়ার শাসন। জুলাই সনদ ও গণভোটের বিতর্ক আমাদের সেই মৌলিক সত্য আবারও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। আদালতের রুল এখন রাষ্ট্রকে সুযোগ দিয়েছে, আবেগ নয়, সংবিধানের আলোকে পথ নির্ধারণের। এই সুযোগকে সম্মান করাই হবে গণতন্ত্রের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা।
#
লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক







