, ,

চার দশকের নীরবতা ভেঙে জিয়া হত্যা তদন্ত রিপোর্ট: নিরাপত্তা গলদ নাকি ক্ষমতার রাজনীতি?

নিউজটি শেয়ার করুন

মোঃ অহিদ, স্টাফ রিপোর্টার: ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসের সেই ঝোড়ো রাতে বাংলাদেশের রাজনীতি চিরতরে বদলে গিয়েছিল,রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নজিরবিহীন হত্যাকাণ্ডের পর তৈরি হয়েছিল একাধিক রহস্য, তৎকালীন সরকার দ্রুততম সময়ে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিশন গঠন করে একই বছরের সেপ্টেম্বরে রিপোর্ট জমা নিলেও, সেই প্রতিবেদন সরকারি লালফিতার দৌরাত্ম্যে আলোর মুখ দেখতে সময় নিল সাড়ে চার দশক, সম্প্রতি ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এর মাধ্যমে প্রকাশ্যে আসা কমিশনের এই বিশেষ হার্ড কপি শুধু একটি হারিয়ে যাওয়া নথিকে সামনে আনেনি, বরং উসকে দিয়েছে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে স্পর্শকাতর রাজনৈতিক অধ্যায়ের বহু অনুত্তরিত প্রশ্ন,

​নিরাপত্তার দেউলিয়াত্ব: গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কি তবে ঘুমিয়েছিল?
​প্রকাশিত প্রতিবেদনে রাষ্ট্রপতির চট্টগ্রাম সফরের সময়কার নিরাপত্তা প্রোটোকলের যে বিবরণ উঠে এসেছে, তা যেকোনো পেশাদার রাষ্ট্রীয় কাঠামোর জন্য চরম অস্বস্তিকর,প্রতিবেদনের মূল পর্যবেক্ষণগুলো ইঙ্গিত করে, এটি কেবল আকস্মিক কোনো হামলা ছিল না, বরং ছিল চরম দায়িত্বহীনতার এক ধারাবাহিক চিত্র:
​হুমকি অনুধাবনে চরম ব্যর্থতা: রাষ্ট্রপতির মতো স্পর্শকাতর পদে থাকা ব্যক্তির সফরের ক্ষেত্রে পূর্বাহ্ণে তথ্য সংগ্রহ ও ঝুঁকি বিশ্লেষণ করা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রধান কাজ, কিন্তু প্রতিবেদনে স্পষ্ট, সম্ভাব্য ঝুঁকি মূল্যায়নে তারা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছিল,

​সহজ লক্ষ্যবস্তু সার্কিট হাউস: দেশের রাষ্ট্রপ্রধান যেখানে অবস্থান করছেন, সেই সার্কিট হাউসকে ঘিরে যে ধরনের নিরেট সুরক্ষাবেষ্টনী (Security Perimeter) থাকা বাধ্যতামূলক ছিল, বাস্তবে সেখানে ছিল শিথিল নজরদারি,

​সমন্বয়হীনতা ও ইভাকুয়েশন প্ল্যানের অভাব: হামলা শুরুর পরপরই ভেতরের নিরাপত্তা বাহিনীর দ্রুত সাড়া দেওয়ার বা রাষ্ট্রপতিকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার কোনো কার্যকর কৌশল বা জরুরি পরিকল্পনা কার্যকর দেখা যায়নি,

​৪৫ বছরের রহস্যময় গোপনীয়তা: কার স্বার্থে এই আড়াল?
​প্রতিবেদনের সবচেয়ে সংবেদনশীল দিক হলো—কমিশন মাত্র চার মাসের মধ্যে তদন্ত শেষ করে রিপোর্ট জমা দিলেও, চার দশকের বেশি সময় ধরে কোনো সরকারই এটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি,

​একটি নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধান হত্যাকাণ্ডের তদন্ত প্রতিবেদন চেপে রাখার পেছনে তৎকালীন সামরিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা কাঠামোর কী হিসাব-নিকাশ ছিল? প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা ঢাকার চেষ্টা নাকি ঘটনার পেছনের প্রভাবশালীদের আড়াল করতেই এই নথি গোপন রাখা হয়েছিল—সে প্রশ্ন এখন নতুন করে রাজনৈতিক অঙ্গনে ঘুরপাক খাচ্ছে,কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী আদৌ কোনো প্রশাসনিক বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না, তারও কোনো স্বচ্ছ হিসাব রাষ্ট্রের নথিপত্রে মেলেনি,

​ইতিহাসের দায়ভার ও নতুন সত্যানুসন্ধান
​দীর্ঘ ৪৫ বছর পর একটি স্পর্শকাতর সরকারি নথি প্রকাশ্যে আসা প্রমাণ করে যে, ইতিহাসকে চিরতরে চেপে রাখা যায় না, যখন রাষ্ট্রীয় কোনো প্রধান ট্র্যাজেডির মূল প্রতিবেদন চার দশক গোপন থাকে, তখন সত্যের জায়গায় উঁকি দেয় শত কোটি গুজব ও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব,

​জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার রাজনৈতিক ও আইনি পরিণতি যাই হোক না কেন, এই তদন্ত কমিশনের পর্যবেক্ষণগুলো উন্মোচিত হওয়া দেশের ইতিহাস চর্চায় একটি বড় মোড়, এখন দেখার বিষয়, এই রিপোর্টের সূত্র ধরে ইতিহাসের সেই অন্ধকার অধ্যায়ের নেপথ্য সত্য উদঘাটনে নতুন কোনো প্রশাসনিক বা ঐতিহাসিক উদ্যোগ নেওয়া হয় কি না!