মোঃ রফিকুল ইসলাম সম্রাট: বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতি আজ এক গভীর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর এসেও গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ, সুশাসন এবং জাতীয় ঐক্যের প্রশ্নগুলো এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
১. মূল সংকট কোথায়?
আমাদের রাজনীতির সবচেয়ে বড় সংকট হলো আস্থাহীনতা। এক দল অন্য দলকে বিশ্বাস করে না, রাষ্ট্রযন্ত্রকে নিরপেক্ষ মনে করে না। নির্বাচন এলেই সংকট, নির্বাচনের পরেও সংকট। এই আস্থাহীনতার কারণে রাজনীতি আর নীতির জায়গায় নেই, আছে প্রতিহিংসার জায়গায়।
ক্ষমতাই এখানে সবকিছু। বিরোধী দলে থাকা মানেই যেন অস্তিত্বের সংকট। ফলে ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে রাজনীতি ঘুরপাক খায়, জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
২. তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ:
ক) প্রতিষ্ঠান ধ্বংস: সংসদ, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, দুদক, পুলিশ — এই প্রতিষ্ঠানগুলো যখন দলীয়করণের শিকার হয়, তখন রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে পড়ে। ব্যক্তির চেয়ে প্রতিষ্ঠান বড় হওয়ার কথা, কিন্তু আমাদের এখানে উল্টোটা হচ্ছে।
খ) তরুণদের বিমুখতা: দেশের ৬০% মানুষ তরুণ। কিন্তু তারা রাজনীতিকে ঘৃণা করে। তাদের চোখে রাজনীতি মানে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি। মেধাবীরা রাজনীতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, ফলে মাঠ দখল করছে অযোগ্যরা।
গ) অর্থনীতি বনাম রাজনীতি: রাজনৈতিক অস্থিরতার সরাসরি প্রভাব পড়ছে অর্থনীতিতে। বিনিয়োগ কমছে, দ্রব্যমূল্য বাড়ছে, বেকারত্ব বাড়ছে। রাজনীতিবিদরা যখন নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে ব্যস্ত, তখন জনগণের রুটি-রুজির প্রশ্ন উপেক্ষিত থাকছে।
৩. উত্তরণের পথ কী?
উত্তরণের জন্য কোনো জাদুর কাঠি নেই। তিনটি কাজ জরুরি:
প্রথম, জাতীয় ঐক্যমত: মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্র, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স — এই তিনটি বিষয়ে সব দলকে একমত হতে হবে। নির্বাচন কীভাবে হবে, তা নিয়ে একটি স্থায়ী সমাধানে আসতে হবে, যাতে প্রতি ৫ বছর পর পর দেশ সংকটে না পড়ে।
দ্বিতীয়, রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন: পেশিশক্তি ও কালো টাকার রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। দলের ভেতরে গণতন্ত্র আনতে হবে। বংশতান্ত্রিক ও পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতি থেকে বেরিয়ে মেধা ও ত্যাগের মূল্যায়ন করতে হবে।
তৃতীয়, জনগণকে ফেরানো: রাজনীতিকে আবার জনগণের কাছে ফিরিয়ে নিতে হবে। ফেসবুকের রাজনীতি নয়, মাঠের রাজনীতি, মানুষের দুঃখ-কষ্টের রাজনীতি করতে হবে। সাংবাদিক, শিক্ষক, কৃষক, শ্রমিক — সবার কথা শুনতে হবে।
শেষ কথা:
বাংলাদেশের মানুষ অসীম সহনশীল। তারা অনেক ঝড়, অনেক ষড়যন্ত্র সহ্য করেছে। কিন্তু তারা স্বপ্ন দেখতে ভুলে যায়নি। তারা এখনো চায় — একটি নিরাপদ, মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ।
রাজনীতিবিদদের বুঝতে হবে — ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, কিন্তু কর্ম চিরস্থায়ী। আজ যারা ক্ষমতায় আছেন, কাল বিরোধী দলে যাবেন, এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।
তাই সময় এসেছে প্রতিহিংসা নয়, প্রতিযোগিতার রাজনীতি করার। ষড়যন্ত্র নয়, জনগণের জন্য কাজ করার।
লেখক: মোঃ রফিকুল ইসলাম সম্রাট, সিনিয়র সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ সাংবাদিক সংস্থা (বাসাস)






