এক কিংবদন্তির স্মৃতিচারণ
মুক্তিযুদ্ধ, রাজনীতি, নগর উন্নয়ন ও জনমানুষের ভালোবাসায় স্মরণীয় এক সাহসী নেতার সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকী
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু মানুষের নাম সময়ের সীমানা অতিক্রম করে মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নেয়। তাঁদের জীবনের গল্প শুধু রাজনৈতিক সাফল্য কিংবা ক্ষমতার ইতিহাস নয়; বরং দেশপ্রেম, সাহস, ত্যাগ, সংগ্রাম, নেতৃত্ব ও মানুষের প্রতি ভালোবাসার এক অনন্য দলিল। বীর মুক্তিযোদ্ধা, কিংবদন্তি রাজনীতিক, খ্যাতিমান ক্রীড়া সংগঠক, সাবেক মন্ত্রী এবং অবিভক্ত ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র মরহুম সাদেক হোসেন খোকা ছিলেন তেমনই একজন ব্যক্তিত্ব।
আজ ৪ নভেম্বর তাঁর সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১৯ সালের এই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী রাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং ঢাকার নগর নেতৃত্বে এক পরিচিত ও প্রভাবশালী অধ্যায়ের অবসান ঘটে।
তিনি ছিলেন একাধারে রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা, ছাত্র আন্দোলনের সাহসী সংগঠক, রাজনীতিবিদ, সংসদ সদস্য, মন্ত্রী, নগরপিতা এবং ক্রীড়াঙ্গনের নিবেদিতপ্রাণ সংগঠক। দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে তাঁর মুক্তিযুদ্ধের অবদান, রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং মানুষের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক তাঁকে বাংলাদেশের ইতিহাসে স্মরণীয় করে রেখেছে।
মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে এক সাহসী যোদ্ধা
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অনার্সের তৃতীয় বর্ষের তরুণ শিক্ষার্থী সাদেক হোসেন খোকা দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পরিবারের কাউকে না জানিয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়েন। স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরতা এবং বাঙালির মুক্তির স্বপ্ন তাঁকে রণাঙ্গনে টেনে নিয়েছিল।
ভারতের আগরতলায় মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের ২ নম্বর সেক্টরের অধীনে প্রশিক্ষণ শেষে মেজর হায়দারের নেতৃত্বে কুমিল্লার সালদা নদী ও মন্দভাগ এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন। পরবর্তী সময়ে তাঁকে কমান্ডারের দায়িত্ব দিয়ে ঢাকায় পাঠানো হয়। সেখানে তিনি গেরিলা যুদ্ধের বিভিন্ন অভিযানে নেতৃত্ব দেন।
একাত্তরের উত্তাল দিনগুলোতে ঢাকায় পাকিস্তানি সামরিক ও প্রশাসনিক স্থাপনায় দুঃসাহসিক অভিযান পরিচালনায় তাঁর ভূমিকার কথা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে আলোচিত। পাকিস্তানি তথ্য অধিদপ্তরের কার্যালয়, নির্বাচন কমিশন কার্যালয়, বিমানবাহিনীর নিয়োগকেন্দ্র এবং পিলখানা এলাকায় পরিচালিত বিভিন্ন অভিযানের সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে আছে।
একজন তরুণ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর জীবন থেকে রণাঙ্গনের একজন সাহসী মুক্তিযোদ্ধা হয়ে ওঠার এই অধ্যায় তাঁর ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে গৌরবময় পরিচয়। পরবর্তী জীবনে তিনি যে সাহসিকতা ও দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছেন, তার শিকড় খুঁজে পাওয়া যায় একাত্তরের সেই রণাঙ্গনেই।
ছাত্র আন্দোলন থেকে রাজনীতির শীর্ষ পর্যায়ে
সাদেক হোসেন খোকার রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয়েছিল ছাত্র আন্দোলন ও স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। ১৯৬৮-৬৯ সালের আইয়ুববিরোধী গণআন্দোলন এবং ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল সময়ে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
স্বাধীনতার পর তিনি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন। পরবর্তী সময়ে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর রাজনৈতিক ধারার সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং পরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে যোগদানের মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়।
১৯৭৭ সালে ঢাকা পৌরসভার কমিশনার নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে স্থানীয় সরকার ও জনপ্রতিনিধিত্বের রাজনীতিতে তাঁর আনুষ্ঠানিক উত্থান ঘটে। পরবর্তী সময়ে ঢাকা মহানগর বিএনপির নেতৃত্বে থেকে তিনি দলকে সংগঠিত করার কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এবং বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি তাঁকে ঢাকার রাজনীতিতে শক্তিশালী নেতৃত্বে পরিণত করে। ঢাকা মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও সভাপতি হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেন।
শেখ হাসিনাকে পরাজিত করে জাতীয় রাজনীতিতে আলোচনায়
১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৭ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন সাদেক হোসেন খোকা। সেই নির্বাচনে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। তাঁকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার ঘটনাটি জাতীয় রাজনীতিতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
এর মধ্য দিয়ে তিনি সারাদেশে পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা ও সাংগঠনিক দক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়।
১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর বিরোধী দলের রাজনীতিতে সক্রিয় থেকে রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার গঠনের পর তিনি মৎস্য ও পশুসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পান। মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ঢাকা মহানগর বিএনপির রাজনীতিতেও তাঁর প্রভাব ও নেতৃত্ব অব্যাহত ছিল।
চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া তাঁর নির্বাচনী জনপ্রিয়তা ও রাজনৈতিক অবস্থানের একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।
অবিভক্ত ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র: নগর উন্নয়নে এক স্মরণীয় অধ্যায়
২০০২ সালে অবিভক্ত ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন সাদেক হোসেন খোকা। ২৫ এপ্রিল মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে তাঁর নগর পরিচালনার নতুন অধ্যায় শুরু হয়। প্রায় নয় বছর তিনি ঢাকার নগরপিতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
ঢাকা তখন দ্রুত বর্ধনশীল জনসংখ্যা, যানজট, জলাবদ্ধতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও নাগরিক সেবার নানা সমস্যায় জর্জরিত একটি মহানগর। এমন একটি কঠিন বাস্তবতায় নগর প্রশাসনের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাঁকে বহু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে।
তাঁর মেয়াদকালে নগরীর বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়ন, সড়ক, পরিচ্ছন্নতা, সৌন্দর্যবর্ধন ও নাগরিক সেবার বিভিন্ন উদ্যোগ আলোচনায় আসে। গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভার প্রকল্পের প্রাথমিক উদ্যোগ ও কার্যক্রমের সঙ্গে তাঁর মেয়াদকালের নগর পরিকল্পনার সম্পর্ক ছিল। মানিক মিয়া এভিনিউয়ের নান্দনিক ফোয়ারা স্থাপন এবং মুক্তিযোদ্ধা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নামে বিভিন্ন সড়ক ও স্থাপনার নামকরণও তাঁর সময়ের উল্লেখযোগ্য উদ্যোগের মধ্যে স্মরণ করা হয়।
বিশেষ করে নগরীর ঐতিহ্য, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অবদানকে নাগরিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে তাঁর আগ্রহ ছিল লক্ষণীয়।
২০১১ সালে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন বিভক্ত হওয়ার প্রেক্ষাপটে তাঁর মেয়র জীবনের অবসান ঘটে। তবে অবিভক্ত ঢাকার শেষ মেয়র হিসেবে তাঁর নাম নগর প্রশাসনের ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
ক্রীড়াঙ্গনের সংগঠক ও ব্রাদার্স ইউনিয়নের গর্ব
রাজনীতির পাশাপাশি বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনেও সাদেক হোসেন খোকার অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। তিনি ছিলেন একজন ক্রীড়ানুরাগী ও সংগঠক। ঐতিহ্যবাহী ব্রাদার্স ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা উদ্যোক্তাদের অন্যতম হিসেবে তাঁর নাম বিশেষভাবে স্মরণীয়।
ব্রাদার্স ইউনিয়ন বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। দেশের ফুটবলের বিকাশ, প্রতিভাবান খেলোয়াড় তৈরি এবং ক্লাবভিত্তিক ক্রীড়া সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠায় এই ক্লাবের অবদান রয়েছে।
সাদেক হোসেন খোকা ক্রীড়াকে শুধু বিনোদন হিসেবে দেখেননি; তিনি এটিকে তরুণ প্রজন্মের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ এবং জাতীয় পরিচিতি তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করতেন।
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন এবং ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে তাঁর দীর্ঘ সম্পৃক্ততা তাঁর এই পরিচয়কে আরও সমৃদ্ধ করেছে। দেশের ক্রীড়াঙ্গনে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারও লাভ করেন।
মানবিক, কর্মীবান্ধব ও জনসম্পৃক্ত এক নেতা
সাদেক হোসেন খোকার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল নেতা-কর্মীদের সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগ। তিনি শুধু রাজনৈতিক কর্মসূচি বা সভা-সমাবেশের নেতা ছিলেন না; কর্মীদের ব্যক্তিগত সমস্যা, পারিবারিক সংকট ও বিপদের সময় পাশে দাঁড়ানোর জন্যও পরিচিত ছিলেন।
পুরান ঢাকার মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত নিবিড়। ব্যবসায়ী, শ্রমজীবী, রাজনৈতিক কর্মী, ক্রীড়াপ্রেমীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল।
নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ঢাকা নগরবাসীর পক্ষ থেকে সংবর্ধনা দেওয়ার উদ্যোগও তাঁর নাগরিক নেতৃত্বের একটি স্মরণীয় দৃষ্টান্ত।
রাজনৈতিক জীবনে প্রতিকূলতা, মামলা, আন্দোলন ও নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও তিনি নিজের রাজনৈতিক অবস্থানে অবিচল ছিলেন। তাঁর সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন সাহসী, কর্মীবান্ধব ও আপসহীন নেতৃত্বের প্রতীক।
আমার রাজনৈতিক জীবনে সাদেক হোসেন খোকা: কিছু অমলিন স্মৃতি
একজন রাজনৈতিক সহকর্মী ও সংগঠক হিসেবে মরহুম সাদেক হোসেন খোকার সঙ্গে আমার সম্পর্কের স্মৃতিগুলো আজও হৃদয়ে গভীরভাবে গেঁথে আছে। তাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্ক শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; ছিল স্নেহ, আন্তরিকতা, সাংগঠনিক যোগাযোগ এবং কিছু অসাধারণ অভিজ্ঞতার সমন্বয়।
তাঁর স্বাক্ষরে আমি বৃহত্তর তেজগাঁও থানা বিএনপির দপ্তর সম্পাদক হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। আমার রাজনৈতিক জীবনের এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এ ছাড়া অবিভক্ত ঢাকা মহানগর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী তাঁতী দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছি।
তিনি যখন অবিভক্ত ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র, তখন তাঁর রাজনৈতিক পিএস ছিলেন আমার বন্ধু বাগেরহাটের কৃতী সন্তান মনির এবং এপিএস মান্না ভাইয়ের সঙ্গেও আমার যোগাযোগ ছিল।
একটি ঘটনা আজও বিশেষভাবে মনে পড়ে। একদিন তাঁর পতাকাবাহী গাড়ি হঠাৎ আমার সামনে এসে থেমে যায়। গাড়িতে থাকা অবস্থায় তিনি আমাকে দেখতে পেয়ে ডেকে নেন। এরপর সেই গাড়িতে আমাকে উঠিয়ে একটি অনুষ্ঠানে নিয়ে যান। সেখানে অনুষ্ঠান উপস্থাপনার দায়িত্ব পালনের সৌভাগ্য আমার হয়েছিল।
একজন মেয়রের ব্যস্ত কর্মসূচির মধ্যে এভাবে একজন রাজনৈতিক কর্মীকে স্মরণ করা, গাড়ি থামিয়ে ডেকে নেওয়া এবং অনুষ্ঠানে দায়িত্ব পালনের সুযোগ করে দেওয়া ছিল আমার কাছে অত্যন্ত আনন্দের ও আবেগের ঘটনা।
শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়, তাঁর উপস্থিতিতে মহাখালী টাঙ্গাইল বাসস্ট্যান্ড এবং মানিক মিয়া এভিনিউয়ের ফোয়ারা উদ্বোধনের অনুষ্ঠানও আমি উপস্থাপনা করার সৌভাগ্য অর্জন করেছি। এসব ঘটনা আমার রাজনৈতিক জীবনের অত্যন্ত মূল্যবান স্মৃতি।
তাঁর সঙ্গে আমার আরেকটি স্মরণীয় অভিজ্ঞতা রয়েছে। জীবদ্দশায় আমি ‘মায়ের ডাক’-এর প্রতিষ্ঠাতা সানজিদা ইসলাম তুলিদের বাড়িতে তাঁর সঙ্গে গিয়েছিলাম। সেখানে তিনি অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে বিভিন্ন স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিয়েছিলেন। একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ হয়েও তাঁর সহজ-সরল ও আন্তরিক আচরণ আমাকে মুগ্ধ করেছিল।
সাদেক হোসেন খোকার সঙ্গে কাটানো সেই সময়গুলো আজও মনে পড়লে মনে হয়, রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রকৃত সৌন্দর্য শুধু পদ-পদবিতে নয়, মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার মধ্যেই নিহিত।
মৃত্যুর পরও সম্মান জানাতে আমার উদ্যোগ
সাদেক হোসেন খোকার মৃত্যুর পরও তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা অটুট ছিল। রাজনৈতিক প্রতিকূলতার কঠিন সময়েও আমি তাঁর অবদানকে যথাযথ সম্মান জানানোর প্রয়োজন অনুভব করেছি।
সেই দায়বদ্ধতা থেকেই বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার সমিতির পক্ষ থেকে আমি তাঁকে মরণোত্তর স্মারক সম্মাননা প্রদান করি। আমার কাছে এটি ছিল একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও জাতীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদনের একটি প্রয়াস।
তাঁর পক্ষে এই স্মারক সম্মাননা গ্রহণ করেন তাঁর সন্তান, বর্তমান সংসদ সদস্য প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা নজরুল ইসলাম খান ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন মাহমুদুর রহমান মান্নাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও মানবাধিকার অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ।
আমি বিশ্বাস করি, রাজনৈতিক মতপার্থক্য কখনোই একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার জাতীয় অবদানকে অস্বীকার করার কারণ হতে পারে না। দেশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় যাঁরা ভূমিকা রেখেছেন, তাঁদের যথাযথ সম্মান জানানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
সাদেক হোসেন খোকাকে মরণোত্তর সম্মাননা প্রদান ছিল আমার সেই বিশ্বাসেরই বাস্তব প্রতিফলন।
প্রবাসে শেষ নিঃশ্বাস, মাতৃভূমির মাটিতে চিরনিদ্রা
জীবনের শেষ পর্যায়ে দুরারোগ্য ক্যানসারে আক্রান্ত হন সাদেক হোসেন খোকা। উন্নত চিকিৎসার জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছিলেন। দীর্ঘ চিকিৎসা ও অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করে ২০১৯ সালের ৪ নভেম্বর নিউইয়র্কে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
জীবনের শেষ সময়ে তাঁর দেশে ফেরার আকাঙ্ক্ষা ছিল গভীর। মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়। ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারসহ বিভিন্ন স্থানে সর্বস্তরের মানুষ তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানান। তাঁর জানাজায় বিপুলসংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণ প্রমাণ করেছিল, রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরেও মানুষের হৃদয়ে তাঁর একটি বিশেষ স্থান ছিল।
৭ নভেম্বর ২০১৯ সালে তাঁকে রাজধানীর জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়। যে দেশের স্বাধীনতার জন্য একদিন অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছিলেন, সেই দেশের মাটিতেই তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন।
ইতিহাসের পাতায় সাদেক হোসেন খোকা
সাদেক হোসেন খোকার জীবনকে কয়েকটি পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করা সম্ভব নয়। তিনি ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, ছাত্র আন্দোলনের সংগঠক, জাতীয়তাবাদী রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ নেতা, চারবারের সংসদ সদস্য, সাবেক মন্ত্রী, অবিভক্ত ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র এবং দেশের ক্রীড়াঙ্গনের একজন নিবেদিতপ্রাণ সংগঠক।
তাঁর রাজনৈতিক জীবনে যেমন সাফল্য ছিল, তেমনি ছিল চ্যালেঞ্জ, বিতর্ক ও প্রতিকূলতা। ইতিহাসের নির্মোহ মূল্যায়নে সবকিছুরই আলোচনা হতে পারে। কিন্তু তাঁর মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকা, রাজনৈতিক সংগ্রাম, ক্রীড়া সংগঠনে অবদান এবং নগর প্রশাসনে দায়িত্ব পালনের ইতিহাস বাংলাদেশের সামগ্রিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আজকের প্রজন্মের কাছে তাঁর জীবন থেকে দেশপ্রেম, সাহসিকতা, সাংগঠনিক দক্ষতা, মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও দায়িত্ব পালনের শিক্ষা গ্রহণ করার অনেক কিছু রয়েছে।
মানুষ চলে যান, কর্ম ও স্মৃতি বেঁচে থাকে
সময়ের স্রোতে অনেক পরিচিত মুখ হারিয়ে যায়। কিন্তু কিছু মানুষ তাঁদের কর্ম, সাহস, ত্যাগ ও মানুষের ভালোবাসার মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে।
সাদেক হোসেন খোকা আমার কাছে শুধু একজন সাবেক মেয়র, মন্ত্রী কিংবা রাজনৈতিক নেতা নন; তিনি আমার রাজনৈতিক জীবনের একজন স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। তাঁর স্বাক্ষরে রাজনৈতিক দায়িত্ব পাওয়া, তাঁর পতাকাবাহী গাড়িতে ওঠার স্মৃতি, তাঁর উপস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান উপস্থাপনা এবং মৃত্যুর পর তাঁকে মরণোত্তর সম্মাননা প্রদানের সুযোগ—সবকিছুই আমার জীবনের অমূল্য সম্পদ।
আজ তাঁর সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতায় তাঁকে স্মরণ করছি।
আমি মনে করি, বাংলাদেশের ইতিহাসে বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকার নাম শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ে নয়, একজন সাহসী মুক্তিযোদ্ধা, সংগঠক, জনসম্পৃক্ত নেতা ও ক্রীড়ানুরাগী হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মরহুম সাদেক হোসেন খোকাকে ক্ষমা করে দিন, তাঁর কবরকে নূরে পরিপূর্ণ করুন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। তাঁর সন্তান, পরিবার-পরিজন, সহযোদ্ধা, রাজনৈতিক সহকর্মী ও অসংখ্য শুভাকাঙ্ক্ষীকে এই শোক বহন করার শক্তি দান করুন।
বিনম্র শ্রদ্ধা ও গভীর ভালোবাসায় স্মরণ করছি।
মো. মঞ্জুর হোসেন ঈসা
চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার সমিতি







