নিজস্ব প্রতিবেদক: সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসানকে ঘিরে ডালপালা মেলছে এক বিশাল দুর্নীতির নেটওয়ার্ক। ওবায়দুল কাদেরের আর্শীবাদপুষ্ট এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বদলি-পদায়ন বাণিজ্য, টেন্ডার জালিয়াতি, শত কোটি টাকার ঘুষ গ্রহণ এবং বিদেশে অর্থ পাচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে। এমনকি ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পরও অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ পদে আওয়ামীপন্থী কর্মকর্তাদের পুনর্বাসনের মাধ্যমে তিনি নিজের আধিপত্য বজায় রাখছেন বলে জানা গেছে।
রাজনৈতিক পটভূমি ও প্রভাব বিস্তার:
১৯৯৬ সালে ১৮তম বিসিএস ক্যাডারে যোগ দেওয়া মঈনুল হাসান ছাত্রজীবনে বুয়েট ছাত্রলীগের সক্রিয় নেতা ছিলেন। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তার পরিবারের সদস্যরাও সরাসরি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী। তার চাচাতো ভাই শামসুল আলম নড়াইল জেলা পরিষদ নির্বাচনে কয়েক কোটি টাকা ব্যয় করেছেন এবং ভাগ্নে সৈয়দ মুনতাসির ডিপ্লোমা সমিতির নেতৃত্বে থেকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছেন। লোহাগড়ায় তার পরিবারের বিরুদ্ধে সুদের ব্যবসা এবং ভোট কেনাবেচার মতো গুরুতর অভিযোগ লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে।
বদলি বাণিজ্য ও আওয়ামীপন্থী পুনর্বাসন:
মঈনুল হাসানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো অধিদপ্তরকে রাজনৈতিক আখড়ায় পরিণত করা। অভিযোগ রয়েছে যে, একক হস্তক্ষেপে তিনি নিরপেক্ষ কর্মকর্তাদের শাস্তিমূলক বদলি করে বিতর্কিত কর্মকর্তাদের পুরস্কৃত করছেন। সম্প্রতি বিভিন্ন প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ম্যাক আজাদকে সড়ক গবেষণাগারে, আহাদ উল্যাহকে সুনামগঞ্জে এবং রিতেশ বড়ুয়াকে কিশোরগঞ্জ থেকে ঢাকায় পদায়ন করা হয়েছে। রিতেশ বড়ুয়ার বিরুদ্ধে ইতিপূর্বে সেতু নির্মাণে বাঁশ ব্যবহারের মতো গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাকে সুবিধাজনক স্থানে পোস্টিং দেওয়া হয়। অন্যদিকে প্রায় দশজন নিরপেক্ষ কর্মকর্তাকে ওএসডি বা শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছে, যা অধিদপ্তরের ভেতরে চরম অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে।
টেন্ডার সিন্ডিকেট ও টিআইবি রিপোর্টের প্রতিফলন:
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ বা টিআইবি-এর সাম্প্রতিক রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সড়কে গত ১৫ বছরে ৫০ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে। এর একটি বড় অংশ হয়েছে টেন্ডার ও নির্মাণ প্রক্রিয়ায়। অভিযোগ রয়েছে, মঈনুল হাসান শুদ্ধি অভিযানের ভয় দেখিয়ে ঠিকাদারদের কাছ থেকে শত কোটি টাকা ঘুষ আদায় করেছেন। এমনকি কোনো টেন্ডার ছাড়াই নিজের বাসভবনে আড়াই কোটি টাকার সংস্কার কাজ করিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। দুদক বর্তমানে সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মনির পাঠানের সাথে মঈনুল হাসানের সংশ্লিষ্টতা তদন্ত করছে। এছাড়া ৩০ জন বিশ্বস্ত কর্মকর্তার মাধ্যমে কাদের ও শেখ পরিবারের অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগও রয়েছে।
৫ আগস্টের ধ্বংসযজ্ঞ ও রহস্যজনক ভূমিকা:
গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে সেতু ভবনে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় মঈনুল হাসানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গুঞ্জন রয়েছে, মহাখালীতে তার বাসভবন অক্ষত থাকলেও জনরোষ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে পরিকল্পিত নাশকতায় তার ইন্ধন থাকতে পারে। এছাড়া জুলাই আন্দোলনে ছাত্রলীগকে অর্থায়ন এবং ডিপ্লোমা সমিতির ব্যানারে বিতর্কিত রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের অভিযোগও তার বিরুদ্ধে জোরালো।
প্রধান অভিযোগসমূহের সারসংক্ষেপ:
১. বদলি ও পদায়ন জালিয়াতি: আওয়ামী ঘরানার কর্মকর্তাদের সুবিধাজনক স্থানে পুনর্বাসন এবং যোগ্য ও নিরপেক্ষ কর্মকর্তাদের শাস্তিমূলক বদলি করা।
২. ঘুষ ও টেন্ডার দুর্নীতি:
শুদ্ধি অভিযানের নামে ঠিকাদারদের থেকে বড় অংকের ঘুষ সংগ্রহ এবং টিআইবি রিপোর্টে উল্লেখিত বিশাল অংকের দুর্নীতির সাথে সংশ্লিষ্টতা।
৩. অবৈধ সম্পদ ও অর্থপাচার:
৩০ জন কর্মকর্তার একটি সিন্ডিকেট ব্যবহার করে বিদেশে অর্থ পাচার এবং নড়াইল ও গুলশানে অবৈধ আয়ের মাধ্যমে সম্পদ অর্জন।
৪. রাজনৈতিক নাশকতায় ইন্ধন:
জুলাই আন্দোলনে ছাত্রলীগকে আর্থিক সহায়তা প্রদান এবং ৫ আগস্টের সেতু ভবন ভাঙচুরের ঘটনায় নেপথ্য ভূমিকা পালন।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের সাধারণ কর্মকর্তাদের দাবি, ক্ষমতার পটপরিবর্তন হলেও মঈনুল হাসানের এই চক্র এখনো সক্রিয়। অর্ধশতাধিক সংবাদমাধ্যমে তার দুর্নীতির খবর প্রকাশিত হলেও অদৃশ্য শক্তির প্রভাবে তিনি এখনো স্বপদে বহাল আছেন। বর্তমান সরকারের উচিত দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে তাকে অপসারণ করে একজন পেশাদার ও নিরপেক্ষ প্রকৌশলীকে দায়িত্ব দেওয়া, যাতে দেশের সড়ক অবকাঠামো খাত নিরাপদ ও দুর্নীতিমুক্ত হয়।
এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসানের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।







