ক্ষুদ্র কৃষকের বসতবাড়ির গাছকে আয়ের নতুন উৎসে পরিণত করা এবং গ্রামীণ মানুষের গাছকে জলবায়ু অর্থনীতির সম্ভাবনাময় সম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার অভিনব ধারণা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছে গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (গাকৃবি) শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী দল ‘কার্বোডিট’।
এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ১৩টি দেশের অংশগ্রহণে শ্রীলঙ্কার কলম্বোতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক গ্রামীণ উন্নয়ন উদ্ভাবন প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্বে ভারত, শ্রীলঙ্কা ও মালয়েশিয়ার মতো দেশকে পেছনে ফেলে রানার-আপ হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে দলটি।
গত ৭ থেকে ৯ অক্টোবর শ্রীলঙ্কার কলম্বোতে অনুষ্ঠিত ‘Asia-Pacific Conference on Innovations in Rural Development and CIRDAP Knowledge Circuit Dialogue on Sri Lanka’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে নিজেদের উদ্ভাবনী মডেল উপস্থাপন করে কার্বোডিট।
প্রতিযোগিতায় ১৩টি দেশ থেকে মোট ১৮৭টি উদ্ভাবনী প্রস্তাব জমা পড়ে। আন্তর্জাতিক বিচারক কমিটির মূল্যায়নে ইরান চ্যাম্পিয়ন এবং বাংলাদেশের গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্বোডিট রানার-আপ নির্বাচিত হয়।
সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী ড. হরিণী অমরসূর্য। এতে সভাপতিত্ব করেন সিরডাপের মহাপরিচালক ড. পি. চন্দ্র শেখর। বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের প্রতিনিধিত্ব করেন বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমির (বার্ড) মহাপরিচালক মোঃ সাইফ উদ্দিন আহমেদ।
ক্ষুদ্র কৃষকের গাছ থেকেই আয়ের নতুন সম্ভাবনা
কার্বোডিটের উদ্ভাবনী উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো ক্ষুদ্র কৃষকদের বসতবাড়ি ও কৃষি বনায়ন ব্যবস্থায় থাকা গাছকে কার্বন ক্রেডিট অর্জনের সম্ভাবনাময় সম্পদে রূপান্তর করা। গাছের কার্বন ধারণক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে কৃষকদের আন্তর্জাতিক কার্বন বাজারের সঙ্গে যুক্ত করার মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার পাশাপাশি গ্রামীণ মানুষের জন্য নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করতে চায় দলটি।
এ লক্ষ্যে গ্রামভিত্তিক ‘ভিলেজ কার্বন গ্রুপ’ গঠন, গাছের তথ্য সংগ্রহ এবং প্রশিক্ষিত তরুণদের মাধ্যমে গাছ পরিমাপের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কার্বন মজুত নিরূপণ এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানদণ্ড অনুযায়ী যাচাইয়ের মাধ্যমে উপযুক্ত কার্বন ক্রেডিট প্রকল্প গড়ে তোলাই এ উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।
পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে ক্ষুদ্র কৃষকদের সম্ভাব্য আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি গ্রামীণ তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
চার তরুণের নেতৃত্বে এগিয়ে যাচ্ছে কার্বোডিট
কার্বোডিটের টিম লিডার, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও সহ-প্রতিষ্ঠাতা সাইফুল্লাহ মানওয়ার। দলটির অন্য সদস্যরা হলেন প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) ও সহ-প্রতিষ্ঠাতা ফাবিয়ান তাসকিন, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) অদিতি ঘোষ এবং প্রযুক্তি উন্নয়নে যুক্ত আরফা সাইয়ারা রিজা।
গত এক বছর ধরে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসা দলটি ইতোমধ্যে গাজীপুর, খুলনা, বাগেরহাট ও নাটোরে মাঠপর্যায়ে কাজ সম্প্রসারণ করেছে। বর্তমানে এ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন ২১ জন শিক্ষার্থী।
কার্বোডিটের প্রত্যাশা, বৈজ্ঞানিক যাচাই, স্বীকৃত কার্বন মানদণ্ড এবং স্বচ্ছ আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে ক্ষুদ্র কৃষকদের গাছ শুধু পরিবেশ সংরক্ষণেই নয়, বরং তাঁদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিরও নতুন দুয়ার খুলে দিতে সক্ষম হবে।
জলবায়ু অর্থায়নের সুফল সরাসরি গ্রামীণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং তরুণদের উদ্ভাবনী শক্তিকে টেকসই উন্নয়নের কাজে লাগানোই দলটির অন্যতম লক্ষ্য।
গাকৃবি উপাচার্যের অভিনন্দন
আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় শিক্ষার্থীদের এ অর্জনে অভিনন্দন জানিয়েছেন গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. জিকেএম মোস্তাফিজুর রহমান।
তিনি বলেন, “আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কার্বোডিটের এ সাফল্য বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য গৌরবের এবং শিক্ষার্থীদের জন্য অনুপ্রেরণারও বটে। তাঁদের উদ্ভাবনী উদ্যোগ ক্ষুদ্র কৃষকের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা উন্মোচন, জলবায়ু সুরক্ষা ও টেকসই গ্রামীণ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আমি আশাবাদী।”
উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রানার-আপ হওয়ার আগে ‘CIRDAP-REEDS International Rural Development Innovation Challenge 2026’-এ বাংলাদেশের আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে গাকৃবির কার্বোডিট।
এবারের আন্তর্জাতিক সাফল্যের মধ্য দিয়ে ক্ষুদ্র কৃষকের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, জলবায়ু সুরক্ষা ও গ্রামীণ উদ্ভাবনে বাংলাদেশের তরুণ শিক্ষার্থীদের সম্ভাবনা আরও একবার বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরল দলটি।






