দীর্ঘ দুই বছরের বিরতি কাটিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস নদীর বুকে আবারো ফিরল গ্রাম-বাংলার হাজার বছরের লোকজ ঐতিহ্য ‘নৌকা বাইচ’।
ভাদ্রের তপ্ত রোদ ও ভ্যাপসা গরম উপেক্ষা করে প্রাণের টানে নদীর দুই তীরে আছড়ে পড়েছিল অর্ধ লক্ষাধিক সৌখিন মানুষের ঢল। মাঝিদের বৈঠার ক্ষিপ্র ছন্দ, কাংস্য-করতালের ঝংকার, ভাটিয়ালি গানের সুর আর দর্শকদের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসে পুরো তিতাসপাড় রূপ নিয়েছিল এক মহা উৎসবে।গত শনিবার বিকেলে জেলা প্রশাসনের সুশৃঙ্খল উদ্যোগে তিতাস নদীর ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর এলাকার শিমরাইলকান্দি গাঁওগেরাম পয়েন্ট থেকে এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিযোগিতা শুরু হয়। প্রায় দেড় কিলোমিটার নৌপথের রোমাঞ্চকর গতিযুদ্ধ পাড়ি দিয়ে পৌর এলাকার মেড্ডা সরকারি শিশু পরিবার পয়েন্টে এসে প্রতিযোগিতাটি সফলভাবে শেষ হয়। এবারের আসরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর ও নবীনগর উপজেলাসহ জেলার বিভিন্ন অঞ্চলের মোট ১০টি সুসজ্জিত বাছারী নৌকা অংশ নেয়। কয়েক ধাপের তীব্র লড়াই শেষে চূড়ান্ত পর্বে ৪টি নৌকা বিজয়ের লক্ষ্যে অবতীর্ণ হয়।এর আগে বিকেল সাড়ে ৩টায় আকাশে বর্ণিল বেলুন উড়িয়ে প্রতিযোগিতার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি, কেন্দ্রীয় বিএনপির অর্থনৈতিক বিষয়ক সম্পাদক ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামল।উদ্বোধনের সাথে সাথেই রঙ-বেরঙের পোশাকে সজ্জিত মাঝিমাল্লারা তাঁদের সুদীর্ঘ নৌকা নিয়ে তিতাসের শান্ত জলে ঝড় তোলেন। বাদ্যের তালে তালে হেলেদুলে মাঝিদের সারি গান এবং বৈঠার ছলাত ছলাত শব্দে মুখরিত হয়ে ওঠে তিতাসের চারপাশ। নদীর দুই পাড়ে অপেক্ষমাণ লাখো দর্শকও মাঝিদের উৎসাহ দিতে একসাথে কণ্ঠ মেলান—‘মারো টান, হেইয়ারে হেইয়াহো’। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই বাইচ ঘিরে নদীর ঘাট, সেতু, বহুতল ভবনের ছাদ এবং অসংখ্য ট্রলার ও নৌযানে চড়ে দর্শনার্থীরা এই রোমাঞ্চকর মুহূর্ত উপভোগ করেন।চূড়ান্ত প্রতিযোগিতায় সবাইকে পেছনে ফেলে প্রথম স্থান (চ্যাম্পিয়ন) অর্জন করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরাইলের ‘শাপলা ভয়েস ক্লাব’। বিজয়ী দলকে ট্রফির পাশাপাশি নগদ দুই লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়া হয়। প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে সদর উপজেলার দারমা গ্রামের নৌকা, তারা পায় দেড় লাখ টাকা এবং তৃতীয় স্থান লাভ করে নবীনগরের ‘পুইল যুব সংঘ’, যাদের হাতে তুলে দেওয়া হয় এক লাখ টাকা। এ ছাড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া প্রতিটি দলকে সান্ত্বনা পুরস্কার হিসেবে নগদ ৩০ হাজার টাকা ও বিশেষ ট্রফি প্রদান করা হয়।প্রতিযোগিতা শেষে জেলা প্রশাসক মো. আবুসাঈদের সভাপতিত্বে এক জমকালো পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বিজয়ীদের হাতে ট্রফি ও প্রাইজমানি তুলে দেন সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামল।অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নাদিয়া পাঠান পাপন, জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম, পুলিশ সুপার শাহ মো. আব্দুর রউফ, পৌরসভার প্রশাসক শরিফুল ইসলামসহ প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ। পুরো অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত প্রাণবন্তভাবে সঞ্চালনা করেন সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রোমানা আক্তার এবং ডা. মো. আব্দুল মতিন।উপস্থিত সুধীজন ও আয়োজকরা জানান, দুই বছর পর তিতাসের বুকে নৌকা বাইচকে ঘিরে মানুষের এই অভূতপূর্ব স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি প্রমাণ করে, আধুনিকতার যুগেও গ্রাম-বাংলার এই লোকজ সংস্কৃতি মানুষের হৃদয়ে কতটা গভীর জায়গা জুড়ে রয়েছে।







