দেশের আইন অঙ্গনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, জেরা ও যুক্তির কারিগর, প্রখ্যাত আইনজীবী অ্যাডভোকেট আমিনুল গণি টিটো আর আমাদের মাঝে নেই। গত রাতে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
১৯৬৬ সালের ২৯ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণকারী এই খ্যাতিমান আইনজীবী মৃত্যুকালে ৫৯ বছর বয়সে উপনীত হয়েছিলেন। দীর্ঘ আইনজীবী জীবনে অসাধারণ যুক্তি, তীক্ষ্ণ জেরা ও পেশাগত দক্ষতার মাধ্যমে তিনি দেশের আইন অঙ্গনে এক অনন্য অবস্থান গড়ে তুলেছিলেন।
আদালতপাড়ায় তিনি ‘ট্রায়াল স্টার’ নামে সুপরিচিত ছিলেন। সহকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো মামলার ট্রায়াল বা জেরা শুরু করলেই এজলাসজুড়ে নেমে আসত পিনপতন নীরবতা। তাঁর তীক্ষ্ণ আইনি বিশ্লেষণ, সাবলীল উপস্থাপনা, যুক্তিনির্ভর বক্তব্য এবং অসাধারণ জেরা-কৌশল বিচারাঙ্গনে তাঁকে বিশেষ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছিল। জটিল মামলাকে সহজভাবে উপস্থাপন এবং সূক্ষ্ম জেরার মাধ্যমে সত্য উদ্ঘাটনের দক্ষতার কারণে তিনি বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবী মহলে সমানভাবে শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন।
ব্যক্তিজীবনেও তিনি ছিলেন জ্ঞানচর্চায় নিবেদিত একজন মানুষ। বইপড়া, কবিতা লেখা, গবেষণা এবং দর্শনচিন্তা ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। জীবনের শেষ সময়েও তিনি জ্ঞানচর্চা ও আধ্যাত্মিক ভাবনার মধ্যেই নিজেকে নিমগ্ন রেখেছিলেন। মৃত্যুর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া তাঁর সর্বশেষ পোস্টে রিচার্ড ডকিন্সের “দ্য গড ডিলিউশন” গ্রন্থের ভূমিকার অনুবাদ পাঠের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত লেখা— “তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলে থাকি”—উদ্ধৃত করেন। এতে জীবন, জ্ঞান, বিশ্বাস ও অস্তিত্ব সম্পর্কে তাঁর গভীর চিন্তার প্রতিফলন দেখা যায়।
তাঁর মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর আদালত প্রাঙ্গণ, ঢাকা বার ও সুপ্রিম কোর্ট অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে আসে। সিনিয়র আইনজীবীরা তাঁকে একজন ‘কমপ্লিট ল’ইয়ার’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। জুনিয়র আইনজীবীদের কাছে তিনি ছিলেন আদর্শ মেন্টর, অভিভাবক ও পথপ্রদর্শক। বিভিন্ন আইনজীবী সংগঠন, সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী ও বিশিষ্টজনেরা তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন।
মৃত্যুকালে তিনি অসংখ্য গুণগ্রাহী, সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী ও আত্মীয়স্বজন রেখে গেছেন। আইন অঙ্গন হয়তো ভবিষ্যতেও বহু মেধাবী আইনজীবী পাবে, কিন্তু অ্যাডভোকেট আমিনুল গণি টিটোর মতো রাজকীয় ভঙ্গিতে ট্রায়াল পরিচালনার দৃশ্য আদালত কক্ষ দীর্ঘদিন স্মরণ করবে।
এদিকে মরহুমের জানাজার সময়সূচি ঘোষণা করা হয়েছে। প্রথম জানাজার নামাজ আজ সকাল ৮টায় মোহাম্মদপুরের কাদেরিয়া মাদরাসা প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় জানাজা সকাল ১০টা ৪৫ মিনিটে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয়। পরে তাঁর নিজ জেলা টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার গয়াহাটায় বাদ আসর মরহুমের বাসভবন প্রাঙ্গণে তৃতীয় ও সর্বশেষ জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হবে।
অ্যাডভোকেট আমিনুল গণি টিটোর মৃত্যু দেশের আইন অঙ্গনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। তাঁর প্রজ্ঞা, পেশাদারিত্ব ও মানবিক গুণাবলি সহকর্মী এবং আগামী প্রজন্মের আইনজীবীদের কাছে দীর্ঘদিন অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
মহান আল্লাহ তাআলা মরহুমকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করুন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারকে এই শোক সইবার শক্তি দান করুন, আমিন।







