আহসান হাবিব মিলন রংপুর থেকে : রংপুর জেলা বিএনপির সদস্যসচিব ও বর্ষীয়ান রাজনৈতিক নেতা আনিছুর রহমান লাকু হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেছেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৫৫ বছর।
বুধবার (৮ অক্টোবর) সকাল ৭টা ১০ মিনিটে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম।
রাজনৈতিক জীবনের বর্ণাঢ্য অধ্যায়, আনিছুর রহমান লাকু ছিলেন রংপুরের রাজনীতির এক পরিচিত মুখ। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি মহানগর বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদক, জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক, কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক এবং জেলা ছাত্রদলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। দলীয় রাজনীতির নানা স্তরে তার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক দক্ষতা প্রশংসিত হয়েছে সর্বমহলে।
দলের কাজে ঢাকা সফরেই শেষ যাত্রা
বিএনপির রংপুর জেলা সম্মেলন উপলক্ষে দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের আমন্ত্রণ জানাতে সম্প্রতি ঢাকায় গিয়েছিলেন লাকু। সেখান থেকে সাংগঠনিক কাজ শেষ করে রংপুরে ফেরার পথে বগুড়ার শেরপুর এলাকায় হৃদরোগে আক্রান্ত হন তিনি। তাৎক্ষণিকভাবে তাকে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে চলে যান না ফেরার দেশে।
শ্রদ্ধা ও শেষ বিদায় বেলায় মরহুম
লাকুর মরদেহ রংপুর শহরের গ্র্যান্ড হোটেল মোড়ে বিএনপির দলীয় কার্যালয়ে নেওয়া হয়, যেখানে সহকর্মী ও সমর্থকেরা তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানান। বাদ আসর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এবং রংপুর কালেক্টরেট ঈদগাহ মাঠে এবং দ্বিতীয় জানাজা মাগরিবের পর তার নিজ এলাকা নুরপুর হোমিও কলেজ সংলগ্ন জামে মসজিদ মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। এরপর পারিবারিক কবরস্থানে তার দাফনকার্য সুসম্পন্ন হয়।
আনিছুর রহমান লাকুর মৃত্যুতে রংপুরে রাজনৈতিক অঙ্গনসহ বিভিন্ন মহলে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। জেলা ও মহানগর বিএনপির নেতৃবৃন্দ, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষ তার অকালপ্রয়াণে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
রংপুর মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সামসুজ্জামান সামু বলেন, লাকু শুধু রাজনৈতিক সহযোদ্ধা নয় সে ছিল আমার ভাই,আমার আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতীক। তাছাড়াও আনিছুর রহমান লাকু ছিলেন একজন আপোষহীন রাজনীতিবিদ ও সংগঠক। তার মৃত্যুতে আমরা একজন নিষ্ঠাবান নেতা ও অভিভাবককে হারালাম। একজন মানুষের চলে যাওয়া,এক ইতিহাসের সমাপ্তি।
রংপুর মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক শহিদুল ইসলাম মিজু বলেন,রাজনীতির কঠিন পথ বেয়ে বহু ত্যাগ ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা আনিছুর রহমান লাকুর জীবন কেবল একটি নাম নয়-তিনি ছিলেন রংপুর বিএনপির সংগঠনের প্রতীক,নেতৃত্বের অনুপ্রেরণা। তার মৃত্যু রংপুরের রাজনীতিতে এক অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি করল।
রংপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম মরহুম আনিছুর রহমান লাকুর ত্যাগ অবদান বিষয়ে
বলেন,আওয়ামী লীগের ফ্যাসিস্ট শাসনামলে বহু নেতা-কর্মীর মতোই আনিছুর রহমান লাকু দলের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে করেছেন এবং তার মূল্যও চুকিয়েছেন কারাবরণ ও মামলা-হয়রানির মধ্য দিয়ে। ২০১৩ সালের নাশকতা ও অগ্নিসংযোগ মামলায় জড়ানো হয় তাকে। সে সময় রাজনৈতিক সহিংসতার একটি ঘটনায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার পর ২০২৩ সালের ২০ নভেম্বর আদালত তাকে ১০ বছরের কারাদণ্ড ও ১০,০০০ টাকা জরিমানা করেন। জরিমানা অনাদায়ে আরও ৬ মাসের কারাদণ্ডের রায় দেওয়া হয়। ২০২২ সালে রংপুরে পুলিশের সঙ্গে বিএনপি নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় দায়ের করা মামলায় আনিছুর রহমান লাকুর নামসহ প্রায় ৩০০ নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়।
একই ধরনের আর একটি ঘটনায় ২০০ বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা হয়, যেখানে লাকুর নামও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এছাড়াও ২০১৫ সালে জাপানি নাগরিক কুনিও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২০১৫ সালে আনিছুর রহমান লাকুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। যদিও এ বিষয়ে যথাযথ প্রমাণ ও ন্যায়বিচার এখনো প্রশ্নবিদ্ধ।
এই সকল মামলা ও হয়রানি সত্ত্বেও আনিছুর রহমান লাকু দলের প্রতি তাঁর অঙ্গীকার থেকে একচুলও পিছিয়ে যাননি। তাঁর এই ত্যাগ নিঃসন্দেহে দল ও গণতন্ত্রের সংগ্রামে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে







