দেহের মাঝে রহস্য কত, কে বা তাহার মর্ম জানে, কোন সে আলো জ্বলে অন্তর, কোন সে সুর প্রাণের গানে? মাটির খাঁচায় নূরের পিয়াস, রক্তধারায় সময় বয়, নিজেরে যে চিনিতে পারে, তারই অন্তর সত্যময়।
জ্ঞান আমার প্রথম প্রদীপ, চেতনা তার দীপের শিখা, বিবেক বলে—সত্য ধরো, মিথ্যা হতে দূরে থাকা। উপলব্ধি পথের সাথি, ইচ্ছা জাগায় কর্মের গান, স্মৃতি রাখে জীবনের কথা, বিচার করে মনের টান।
সংস্কারেরা আঁকে ছবি, স্বপ্ন বোনে অচিন দেশ, বিষয়বাসনা ডাকে সদা, মন হারায় আপন বেশ। হে সাধক, তুই থাম একবার, অন্তরটাকে দেখ, কত মুখোশ মনের মাঝে, কত অহংকারের লেখ!
চক্ষু দেখে রঙিন ধরা, কর্ণ শোনে সুরের বাণী, জিহ্বা চাখে মধুর তিক্ত, নাসিকা নেয় সুবাসখানি। ত্বক জানে শীত ও উষ্ণ, মুখে উচ্চারিত হয় বাণী, হস্ত গড়ে কর্মের জগৎ, পদে পদে পথের টানি।
লিঙ্গ ও গুহ্যেন্দ্রিয় দেহের স্বাভাবিক অঙ্গ, সংযম, শুচি, দায়িত্বে জীবন পাক সুমধুর রং। দশ ইন্দ্রিয়ের দ্বারে দ্বারে কত যে মোহের মেলা, বিবেক যদি জাগ্রত থাকে, সত্য হবে পথের ভেলা।
পক্ষী ও পশু, কীট ও পতঙ্গ, বৃক্ষ-লতা আর পানি, বায়ু, আগুন, মাটি মিলে জীবনেরই টানাপোড়েনখানি। প্রকৃতির এই বিস্তর লীলা, সৃষ্টির মাঝে স্রষ্টার নিদর্শন, ধরণিকে যে ভালোবাসে, তারই হৃদয় পায় প্রশমন।
পঞ্চ আত্মার রূপক ধরে সাধক খোঁজে অন্তরপুর, মানবসত্তায় নৈতিক দ্বন্দ্ব, কখনো আলো, কখনো দূর। পরম আত্মা—দর্শনভেদে নানা ভাষার গভীর কথা, জীবের আত্মা, মানববোধে জাগে দায় ও প্রেমের ব্যথা।
শয়তানি প্ররোচনা এলে সত্যের পথে রাখিস ধ্যান, ফেরেশতার পবিত্রতার রূপক হোক সৎকর্মের আহ্বান। আত্মার নামে বিভেদ নয়, ন্যায় ও প্রেম হোক পরিচয়, মানুষ যখন মানুষ হয়, তখনই অন্তর পুণ্যময়।
নফসে আম্মারা টানে নিচে, প্রবৃত্তিরই অন্ধকারে, নফসে লাওয়ামা প্রশ্ন তোলে—ভুল করেছি কোন আচারে? নফসে মুতমাইন্না শান্ত হৃদয়, আল্লাহর স্মরণে স্থির, ক্ষমা, বিনয়, সত্য ও প্রেমে অন্তর হয় নির্মল নীর।
হে মন, তুই আমিত্ব ছেড়ে সত্যের কাছে মাথা নোয়াস, অন্যের দুঃখ নিজের ভেবে খিদমতেরই পথ বেছে নাস। জিকির হোক হৃদয়ের ভাষা, ফিকির হোক জ্ঞানের আলো, মুরাকাবায় দেখ নিজেকে—কোনটি মন্দ, কোনটি ভালো।
চল্লিশ তত্ত্ব চল্লিশ প্রদীপ, জ্বালিস যদি অন্তরঘরে, অহংকারের কালো পর্দা সরবে ধীরে প্রেমের ঝরে। দেহের পরিচয় ক্ষণিক ছায়া, কর্মে ফুটুক সত্যের ফুল, হককে খুঁজিস ন্যায়ের পথে, মিথ্যা থেকে ফিরিয়ে কূল।
আমি কে—এই প্রশ্ন জাগে নিশীথ রাতের নীরবতায়, কে ডাকে মোর অন্তর মাঝে প্রেমের গভীর মুর্ছনায়? নিজেকে জানার সাধনাতেই খুলুক অন্তর-দ্বার, সৃষ্টির সেবায় জীবন হোক প্রেমের অমৃতধার।
শেষ বাণী
দেহ নয় অবজ্ঞার পাত্র, দেহ সাধনারই ক্ষেত্র, মন নয় শত্রু চিরকাল, শুদ্ধ হলে খুলে অন্তর। আত্মপরিচয়, নফসের শুদ্ধি, মানবপ্রেমের সাধন— এই তিন পথে জাগুক মানুষ, সত্য হোক জীবন।
আত্মজ্ঞান যার অন্তরে, তারই সাধনা পূর্ণতার পথে; সৃষ্টির সেবা যার কর্মে, প্রেমের নূর জ্বলে তারই রথে।







