আমির হোসেন
কবি, সঙ্গীতজ্ঞ, কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, চিত্রশিল্পী, প্রাবন্ধিক, দার্শনিক, শিক্ষাবিদ ও সমাজ-সংস্কারক রবীন্দ্রনাথ। মূলত কবি হিসেবেই তাঁর প্রতিভা বিশ্বময় স্বীকৃত। বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী বাংলাভাষা ও সাহিত্যকে এক হাজার বছর এগিয়ে নেবার কৃতিত্ব তারই। এ মহান কবিকে ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। এশিয়ার বিদগ্ধ ও বরেণ্য ব্যক্তিদের মধ্যে তিনিই প্রথম এই পুরস্কার জয়ের গৌরব অর্জন করেন।
যুগে যুগে পৃথিবীতে সাহিত্য, সংস্কৃতি, সভ্যতা, দর্শন ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে যে রূপান্তর ঘটেছে, রবীন্দ্রনাথ সবকিছুকেই আত্মস্থ করেছেন গভীর অনুশীলন, ক্রমাগত নিরীক্ষা এবং বিশ্বপরিক্রমার মধ্যদিয়ে। তাই তাঁর সাহিত্যজীবনের নানা পর্যায়ে বিষয় ও আঙ্গিকের নিরন্তর পালাবদল লক্ষণীয়। এই পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফসল তাঁর অসংখ্য কবিতা, গান, ছোটগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক, গীতিনাট্য, নৃত্যনাট্য, ভ্রমণকাহিনী, চিঠিপত্র এবং দেশে বিদেশে প্রদত্ত বক্তৃতামালা।
রবীন্দ্রনাথকে অনেকে অনেকভাবে বিচার করেছেন, কিন্তু তাঁর সম্বন্ধে শেষকথা বলা কারও পক্ষে সম্ভব হয়নি। রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প নিয়ে কিছু বলার আগে ছোটগল্পের উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ সম্পর্কে আমাদের ধারণা নেওয়া যথার্থ মনে করি। প্রকৃত অর্থে মানুষের আদিম বৃত্তির অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল গল্প বলা বা গল্প শোনা। গল্প বলা বা গল্প শোনার প্রবণতা মানুষের মধ্যে প্রাচীনকাল থেকে বিদ্যমান থাকলেও এর সাহিত্যরূপ পেতে বেশ সময় অতিবাহিত হয়েছে। কবিতা, নাটক, উপন্যাস এমনকি প্রবন্ধেরও পরে ছোটগল্পের সৃষ্টি। মোটকথা কথাসাহিত্য সাহিত্যের একটি সুপ্রাচীন শাখা। আর কথাসাহিত্যের আরেকটি উল্লেখযোগ্য শাখা গল্পসাহিত্য। সেটা মধ্যযুগের ব্যাপার। মাত্র কয়েকশো বছর আগের কথা। ছোটগল্প একান্তভাবেই আধুনিক সাহিত্য-প্রকরণ। মূলত ছোটগল্পের আদি উৎস ভূমি ইউরোপ। রেনেসাঁস পরবর্তীকালে পূঁজিবাদ যখন ক্রমান্বয়ে মাথাচড়া দিয়ে উঠতে থাকে-ঠিক তখনই ছোটগল্প নামক শিল্প আঙ্গিকটির বিকাশ ঘটেছে। এবং এর ঢেউ তরঙ্গায়ীত হতে থাকে দেশ থেকে দেশান্তরে। ক্ষাণিকটা দেরী হলেও তা থেকে বঞ্চিত হয়নি ভারতবর্ষও। শুরুতে আমেরিকা, ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সে সাহিত্যের এই মাধ্যমটি শেকড় মেলতে শুরু করেছিল। বোকাশিও, সার্ভেন্তেস, হেপ্তামেরন, চসার। এঁদের হাত ধরেই বিশ^সাহিত্যে ছোটগল্প সাহিত্য উ˜্গীত হয়েছে। অষ্টাদশ শতাব্দির দ্বিতীয়াংশে প্রকৃত গল্পসাহিত্যের সূচনা। জার্মান সাহিত্যে হোফ্মান ও ফন ক্লিস্ট; মার্কিন সাহিত্যে ন্যাথনিয়েল হথর্ন; রুশ সাহিত্যে আলেকজান্ডার পুশকিন; ফরাসি সাহিত্যে প্রসপার মেরিমে, বাল্জাক ও গোতিয়ে; আইরিশ সাহত্যে মূর ও জেমস জয়েস-এঁরাই বিভিন্ন দেশে গল্পসাহিত্যের অগ্রসূরী। নিউজিল্যান্ড, স্পেন, ইতালি প্রভৃতি দেশেও গল্পসাহিত্য বিকশিত-বিবর্তিত হয়েছে।
বাংলা সাহিত্যে গল্পসাহিত্য মাত্র শতবর্ষ অতিক্রম করেছে। ঊনবিংশ শতাব্দির নব্বইয়ের দশকের পূর্ব পর্যন্ত গল্প রচিত হয়নি। যদিও বঙ্কিম, সঞ্জীব, নগেদ্রনাথ গুপ্ত, স্বর্ণ কুমারী দেবী প্রমুখ সাহিত্যিকরা গল্প লেখতে চেষ্টা করেছিলেন। তথাপি গল্পসাহিত্য বিশেষ করে ছোটগল্প উৎসারিত হয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরে। যদিও মধ্যযুগেও কাহিনীকাব্য ছিল। আমাদের দেশে পুরাণের গল্প, রূপকথার গল্প, ঈশপের গল্প ইত্যাদি নানা ধরনের কাহিনীর মধ্যেই ছোটগল্পের বীজের সন্ধান করা হয়েছে। তবে রবীন্দ্রনাথ্ই একে পূর্ণরূপে অধিষ্ঠিত করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্পসমুহ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ১৮৭৭ খ্রিস্টাব্দে (বাংলা ১২৪০ সাল) ‘ভারতি’র শ্রাবণ-ভাদ্র সংখ্যায় ‘ভিখারিণী’ গল্প প্রকাশের মাধ্যমে বাংলা ছোটগল্প অঙ্গনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রথম পদার্পণ ঘটে। ‘ভিখারিণী’র সাত বছর পর ১৮৯১ সনে লিখলেন ‘ঘাটের কথা’ ও ‘রাজপথের কথা’ তবে তাঁর প্রথম পরিণত ছোটগল্প ‘দেনা পাওনা’ প্রকাশিত হয় ১৯৯৮ সনে হিতবাদী পত্রিকায়। ১৯১৪ সালে নারীর ব্যক্তিত্বের মাহিমা, অধিকার সচেতনতা, মর্যাদাবোধ চিত্রায়িত করেন হৈমন্তী, অপরিচিতা ও স্ত্রীর পত্র গল্পসমূহে।
‘হিতবাদী’ ও ‘সাধনা’ পত্রিকার চাহিদা পূরণের জন্য তিনি ছোট গল্প লিখতে শুরু করেন। এবং জীবনের প্রায় শেষ পর্যন্ত তিনি ছোটগল্পের চর্চা অব্যাহত রেখেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর সাহিত্য-সাধনায় পূর্ববাংলা তথা বাংলাদেশের পল্লি-প্রকৃতি এবং বাংলার প্রধান নদী পদ্মার অনিবার্য শিল্প-প্রেরণা লাভ করেছিলেন। তিনি তাঁর জমিদারী কর্ম উপলক্ষে ১৮৯২ থেকে ১৯০৪ সাল পর্যন্ত সময়কাল কুঠিবাড়ি কিংবা নৌকায় অবস্থান করেছিলেন পতিসর, শিলাইদহ এবং সাজাদপুরে। এ সময়ে নদীমাতৃক পল্লিবাংলার বিস্তীর্ণ জনপদ ও জীবনযাত্রার স্বরূপ তিনি উপলদ্ধি করেছিলেন তাঁর কবিমানসে। এ সময়ে তিনি কাব্যগ্রন্থ সোনারতরী (১৮৯৪) ও চিত্রা (১৮৯৬), ছিন্নপত্রের চিঠিপত্রসহ অনেক ছোটগল্পও লেখেন। একারণে পদ্মাতীরবর্তী পল্লীবাংলা তাঁর বেশিরভাগ ছোটগল্পের পটভূমি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। তাঁর ছোটগল্পে নাগরিক জীবনভাষ্যও সমানভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। এ দুইয়ের সম্মিলনে তিনি সমগ্র বাঙালি জীবনকে তাঁর গল্পে তুলে ধরেছেন। বিশে^র গল্পসাহিত্যে তখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন-অ্যালান পো, মোঁপাসা, সমারসেট মম, চেখভ প্রমুখ সাহিত্যিকরা। এদের সঙ্গে প্রাণের মহাসামুদ্্িরক কল্লোল নিয়ে যোগ দিলেন রবীন্দ্রনাথ। এর আগেও বেশ কিছু প্রতিভাবান লেখক সাহিত্যের এ মাধ্যমটিকে বরণ করে নিয়েছেন। এঁদের মধ্যে তারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায় (১৮৪৩-১৮৯১), ত্রৈলোক্যনাথ পুখোপাধ্যায় (১৮৪৭-১৯১৯), ইন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায় (১৮৪৯-১৯১১), জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৪৯-১৯২৫), স্বর্ণকুমারী দেবী (১৮৫৬-১৯৩২) নগেন্দ্রনাথ গুপ্ত (১৮৬১-১৯৪০) প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। আর এর পরে ঢের প্রতিভাবান লেখক সাহিত্যের এ মাধ্যমটিকে বরণ করে এগিয়ে নিয়েছেন সাফল্যের তটরেখা ধরে। উপন্যাসে যে-সাফল্য বাঙালির অনর্জিত, গল্পে যেন অনায়াস সলীল সাবলীলভাবে বয়ে চলল। উনিশ শতাব্দির সর্বশেষ দশেকে বাংলা গল্পসাহিত্য সৃজিত হয়েছিল। বিংশ শতাব্দির প্রথম পঞ্চাশ বছর এক সংরক্ত আবেগে আলোড়িত ছিল দেশ। তার টুকরো টুকরো জুড়ে গল্পসাহিত্য অগণন লেখকের হাতে যেন একটি চলচ্চিত্রে পরিণত হলো, যেখান থেকে ছেঁকে নেওয়া যাবে আমাদের দেশের জীবনেতিহাস।
রবীন্দ্রনাথ, প্রমথ চৌধুরী ও শরৎচন্দ্রের যথাক্রমে কাব্যময়তা, বাগবৈদগ্ধ্যতা ও সমাজমনস্কতা এই ত্রয়ী বৈশিষ্ট্যের পথ ধরে ছোটগল্পচর্চার ক্ষেত্রে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়। এ সময়ে চারু বন্দোপাধ্যায় (১৮৭৭-১৯৩৮), সুরেন্দ্রনাথ মজুমদার ((১৮৩৮-১৮৭৮), জলধর সেন (১৮৬০-১৯৩৯), হেমেন্দ্রকুমার রায় (১৮৮৮-১৯৬৩), ইন্দিরা দেবী (১৮৭৩-১৯৬০), অনুরূপা দেবী (১৮৮২-১৯৫৮), নিরূপমা দেবী (১৮৮৩-১৯৫১), সীতা (১৮৯৫-১৯৭৪), সৌরেন্দ্রমোহন মখোপাধ্যায়, প্রেমাঙ্কুর আতর্থী, মণীলাল গঙ্গোপাধ্যায়, উপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, শরৎকুমারী চৌধুরানী, রবীন্দ্রকন্যা মাধুরীলতা, শৈরবালা ঘোষজায়া, শ্রীশচন্দ্র সেন, আবদুল ওদুদ, শৈলেশচন্দ্র মজুমদার, সুরেশচন্দ্র সমাজপতি, সুধীন্দ্রনাথ ঠাকুর, হেমেন্দ্র প্রসাদ, ভুবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়, দীনেন্দ্রনাথ রায়, পাঁচকড়ি দে, হরিসাধন মুখোপাধ্যায়, সুরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, দীনেশচন্দ্র সেন( ১৮৬৬-১৯৩৯), হেমেন্দ্রপ্রসাদ ঘোষ (১৮৭৬-১৯৬২), বিজয়চন্দ্র মজুমদার (১৮৬১-১৯৪২), নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত (১৮৮২-১৯৬৪), জগদীশচন্দ্র গুপ্ত (১৮৮৬-১৯৫৭), বিভ’তিভূষণ বন্দোপাধ্যায় (১৮৯৪-১৯৫০), মণীন্দ্রলাল বসু ((১৮৯৭-১৯৮৬), তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায় (১৮৯৮-১৯৭১), কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬), শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় (১৯০০-১৯৬৭), মানিক বন্দোপাধ্যায় (১৯০৮-১৯৫৬), দীনেশরঞ্জন দাস (১৮৮৮-১৯৪১), গোকুলচন্দ্র নাগ ( ১৮৯৪-১৯২৫), মনীশ ঘটক (১৯০১-১৯৮০), প্রেমেন্দ্র মিত্র (১৯০৪-১৯৮৭), প্রবাধকুমার সান্যাল (১৯০৫-১৯৮৩), বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-১৯৭৪), অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত (১৯০৩-১৯৭৬), সুধীন্দ্রনাথ ঠাকুর, হরিসাধন মুখোপাধ্যায়, নিখিলনাথ প্রমুখ ছোটগল্পে বিশেষ কৃতিত্ব দেখিয়েছেন।
বাংলা গল্পসাহিত্যের ধারায় প্রবল একটি ধাক্কা দিল ৪৭-এর দেশবিভাগ। কলকাতা সাহিত্যের একচ্ছত্র রাজধানী ছিল। দেশবিভাগের পর ঢাকাও সাহিত্যের আরেকটি কেন্দ্র হয়ে উঠতে লাগল। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, বাঙালির মর্মতলে অপরাজেয় একটি শিখা জে¦লে দিল। এবং পঞ্চাশের দশকেই গল্পসাহিত্যের একটি ভিত্তিভূমি তৈরী হয়ে গেল। আর ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন সার্বভৌম বাংদেশের জন্ম তার পাটাতন আরো শক্ত করে দিল। আজ অসংখ্য প্রতিভাবান সাহিত্যকের হাতে হাত রেখে গল্পসাহিত্যের বৃক্ষটি পত্র-পল্লবে সুসুভিত হয়ে ফুলে-ফলে মঞ্জুরিত-বিকশিত।
সেই ফল্গুধারাটি বাঙালির গৌরবময় ঐতিহ্যের পথ ধরে রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে বর্তমান অবধি তরুণতম লেখকটি পর্যন্ত-প্রায় শতাধিক বছরের কালখ-ে-বিচিত্র পথে, চৈতন্যের কত নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়ে সৃষ্টির উজ্জ্বল ফসলগুলি ছড়িয়ে আছে। কত ভিন্নভিন্ন মাত্রায় ব্যক্তি, সমাজ ও জীবনকে প্রভাব বিস্তারকারি লেখকরা, বাঁক বদলের কারিগররা দেখাতে চেয়েছেন! মাত্র একশ বছরের মধ্যে বাংলা গল্প যে সমৃদ্ধি অর্জন করেছে তা সত্যিই বিস্ময়কর। আর বিস্ময়কর সমৃদ্ধির বীজমন্ত্রটি ছড়িয়ে দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন অনন্ত জীবন, চিরজীবী মানবাত্মা ও প্রকৃতির চিরন্তন সৌন্দর্যের সাহিত্যিক। মৃত্যুকে তিনি দেখেছেন মহাজীবনের যতি হিসেবে। জীবন-মৃত্যু ও জগৎ-সংসার তাঁর নিকট প্রতিভাত হয় অখ-রূপে। তাঁর সুবিশাল সৃষ্টিভান্ডারই মানুষের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতার মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাব্যগ্রন্থ ৫৬, গীতিপুস্তক ৪, ছোটগল্প ১১৯, উপন্যাস ১২, ভ্রমণ কাহিনি ৯, নাটক ২৯ কাব্যনাট্য ১৯ চিঠিপত্রের বই ১৩, গানের সংখ্যা ২২৩২ আর অংকিত চিত্র প্রায় দুই হাজারের মত। এমন একজন সৃষ্টিশীল ও সাহিত্যভান্ডারে ঋদ্ধ মানুষ সারা পৃথিবীতে দ্বিতীয়জন মেলা ভার।
আমির হোসেন, কথাসাহিত্যিক
মোবাইল: ০১৮১৮০৩১৫৩২







