, ,

মাদকদ্রব্য অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস এবং বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট

নিউজটি শেয়ার করুন

মাদকাসক্তি ও মাদকদ্রব্যের অবৈধ পাচার বর্তমানে বিশ্বব্যাপী অন্যতম গুরুতর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে বিবেচিত। মাদক শুধু একজন ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে না, বরং পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও অর্থনীতির ওপরও গভীর প্রভাব ক্ষতিকর বিস্তার করে।

যুবসমাজের বিপথগামিতা, অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি, সন্ত্রাসবাদ, খুন-রাহাজানি, অর্থপাচার এবং সামাজিক অবক্ষয়ের সঙ্গে মাদক সমস্যার নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। এই সমস্যা মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সচেতনতা সৃষ্টি ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের লক্ষ্যে প্রতি বছর ২৬ জুন ‘মাদকদ্রব্য অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস’ পালিত হয়।

বাংলাদেশও এই বৈশ্বিক সমস্যার বাইরে নয়। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মাদক পাচার চক্রের প্রভাব বাংলাদেশে দৃশ্যমান। বিশেষ করে ইয়াবা, হেরোইন, গাঁজা, ফেনসিডিল এবং সাম্প্রতিক সময়ে আইস বা ক্রিস্টাল মেথের বিস্তার সমাজের জন্য গভীর এবং নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। তাই এই দিবসের তাৎপর্য বাংলাদেশে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

আন্তর্জাতিক দিবসের সূচনা ও উদ্দেশ্য

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৯৮৭ সালের ৭ ডিসেম্বর গৃহীত ৪২/১১২ নম্বর প্রস্তাবের মাধ্যমে ২৬ জুনকে ‘International Day against Drug Abuse and Illicit Trafficking’ হিসেবে ঘোষণা করে। ১৯৮৮ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালন করা হচ্ছে।

এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য

মাদকাসক্তি সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা।মাদকদ্রব্যের অবৈধ উৎপাদন, পরিবহন ও পাচার রোধে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা। যুবসমাজকে মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতন করা। চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও সামাজিক পুনঃএকীকরণের মাধ্যমে মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনা। একটি স্বাস্থ্যকর ও মাদকমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠায় সরকার ও জনগণকে সম্পৃক্ত করা।

জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক কার্যালয় (UNODC) প্রতি বছর নির্দিষ্ট প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি পালন করে থাকে।

মাদকদ্রব্য অপব্যবহার কী?

চিকিৎসা বা বৈধ প্রয়োজন ছাড়া কোনো নেশাজাতীয় বা মানসিক প্রভাব বিস্তারকারী পদার্থের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারকে মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার বলা হয়ে থাকে। মাদকদ্রব্য মানুষের মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের ওপর প্রভাব ফেলে এবং ধীরে ধীরে মাদক নির্ভরশীলতা সৃষ্টি করে।

প্রচলিত মাদকসমূহ- গাঁজা, হেরোইন, ইয়াবা, ফেনসিডিল, কোকেন, এলএসডি, আইস (ক্রিস্টাল মেথ), বিভিন্ন ধরনের নেশাজাতীয় ট্যাবলেট ও ইনজেকশন

বিশ্বব্যাপী মাদক সমস্যার চিত্র

বর্তমানে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ কোনো না কোনোভাবে মাদক ব্যবহারের সঙ্গে জড়িত। মাদকাসক্তির কারণে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষ মৃত্যুবরণ করছে এবং লাখো পরিবার আর্থিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

মাদক ব্যবসা আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রের অন্যতম প্রধান অর্থের উৎস। অস্ত্র ব্যবসা, মানবপাচার, সন্ত্রাসবাদ এবং অর্থপাচারের সঙ্গে মাদক ব্যবসার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ফলে মাদক শুধু জনস্বাস্থ্যের সমস্যা নয়; এটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্যও একটি বড় হুমকি।

বাংলাদেশে মাদক সমস্যার প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানকারীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রুট হিসেবে ব্যবহৃত হয়। প্রতিবেশী দেশসমূহের সীমান্ত দিয়ে বিভিন্ন ধরনের মাদক দেশে প্রবেশ করে।

বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত মাদকসমূহ

১. ইয়াবা, ২. ফেনসিডিল, ৩. গাঁজা, ৪. হেরোইন, ৫. আইস (ক্রিস্টাল মেথ), ৬. নেশাজাতীয় ট্যাবলেট বিশেষ করে সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে মাদক পাচারের প্রবণতা বেশি দেখা যায়।

যুবসমাজ ও মাদকাসক্তি

একটি দেশের উন্নয়নের প্রধান শক্তি হলো যুবসমাজ। কিন্তু মাদকাসক্তি যুবসমাজের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে দিতে পারে। কৌতূহল, বন্ধুবান্ধবের প্ররোচনা, পারিবারিক অশান্তি, বেকারত্ব, মানসিক চাপ এবং সামাজিক অবক্ষয় অনেক তরুণকে মাদক গ্রহণের দিকে ঠেলে দেয়।

মাদকাসক্তির ফলে বিরূপ প্রতিক্রিয়া
শিক্ষাজীবন ব্যাহত হয়, কর্মক্ষমতা কমে যায়, অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পায়, পারিবারিক সম্পর্ক নষ্ট হয়, মানসিক রোগ ও আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়ে, সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়।

মাদকের স্বাস্থ্যগত ক্ষতি

মাদক মানুষের শরীরের প্রায় সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। তারমধ্যে প্রধানত শারীরিক যেসকল ক্ষতি হয় তা হচ্ছে — হৃদরোগ, লিভারের ক্ষতি, কিডনি বিকল হওয়া, স্নায়ুতন্ত্রের সমস্যা, অপুষ্টি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস ইত্যাদি।

মানসিক যেসকল ক্ষতি

ততমধ্যে অন্যতম প্রধান হচ্ছে – বিষণ্নতা, উদ্বেগ, উগ্রতা, স্মৃতিশক্তি হ্রাস, যৌনশক্তি হ্রাস, বিভ্রম, মানসিক ভারসাম্যহীনতা, আত্মহত্যার প্রবণতা ইত্যাদি।

সামাজিক ক্ষতি
যেসকল সামাজিক ক্ষতি সংঘটিত হয়ে থাকে — পারিবারিক কলহ, পরকিয়া সম্পর্ক, বিবাহবিচ্ছেদ, অর্থনৈতিক সংকট, অপরাধ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান হারানো ইত্যাদি।

মাদক ও অপরাধের সম্পর্ক

মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা প্রায়ই অর্থের অভাবে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। অপরদিকে মাদক ব্যবসা পরিচালনাকারী চক্রগুলো অস্ত্র ব্যবসা, মানবপাচার ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও সম্পৃক্ত থাকে।
ফলে মাদক সমাজে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটায় এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করে।

বাংলাদেশ সরকারের পদক্ষেপ

মাদক নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে ততমধ্যে ১. মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর যা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (DNC) মাদক নিয়ন্ত্রণ, প্রতিরোধ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালনা করে। ২. মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮। এই আইনের মাধ্যমে মাদক পাচার, সংরক্ষণ ও বিক্রয়ের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান করা হয়েছে। ৩. সীমান্ত নজরদারি বৃদ্ধি।
বিজিবি, পুলিশ, র‍্যাব, কোস্ট গার্ড এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যৌথভাবে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করছে।৪. সচেতনতামূলক কর্মসূচি। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে সেমিনার, আলোচনা সভা, র‌্যালি এবং গণমাধ্যমে প্রচারণার মাধ্যমে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে।
৫. পুনর্বাসন কেন্দ্র।
মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন কেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে।

মাদক নিয়ন্ত্রণে চ্যালেঞ্জ

যদিও সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, তবুও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে, যেমন – দীর্ঘ সীমান্ত এলাকা, আন্তর্জাতিক পাচারচক্রের সক্রিয়তা, বেকারত্ব ও দারিদ্র্য, সামাজিক সচেতনতার অভাব, পুনর্বাসন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, নতুন ধরনের সিনথেটিক মাদকের বিস্তার, প্রযুক্তির মাধ্যমে অনলাইন মাদক ব্যবসা।

পরিবার ও সমাজের ভূমিকা

মাদক প্রতিরোধে পরিবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে, এক্ষেত্রে পরিবারের করণীয়— সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা, তাদের মানসিক সমস্যার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া, ভালো বন্ধু ও সুস্থ সামাজিক পরিবেশ নিশ্চিত করা, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করা, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করা।

সামাজিকভাবে যা করণীয়

সামাজিকভাবে যা করণীয় ততমধ্যে মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা, তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান ও বিনোদনের সুযোগ সৃষ্টি করা, ধর্মীয় অনুশাসনের অধীনে আনা, মাদকাসক্তদের ঘৃণা নয়, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে সমাজে ফিরিয়ে আনা।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমের ভূমিকা

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা উচিত। শিক্ষার্থীদের নৈতিক মূল্যবোধ ও জীবনদক্ষতা শিক্ষা প্রদান করলে তারা সহজে বিপথগামী হবে না।

গণমাধ্যমও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। টেলিভিশন, রেডিও, সংবাদপত্র এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে মাদকের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরলে জনসচেতনতা বৃদ্ধি পাবে।

আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা

মাদক সমস্যা কোনো একক দেশের সমস্যা নয়। তাই আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তথ্য বিনিময়, সীমান্ত নিরাপত্তা বৃদ্ধি, পাচারচক্রের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন কর্মসূচিতে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে এই সমস্যা মোকাবিলা করা সম্ভব।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে মাদক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গঠনে করণীয়
পরিবারভিত্তিক সচেতনতা বৃদ্ধি।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদকবিরোধী শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা।
যুবসমাজের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি।
সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করা।
আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে পাচার প্রতিরোধ।
পুনর্বাসন কেন্দ্রের সংখ্যা ও মান উন্নয়ন।
ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া কার্যক্রম সম্প্রসারণ।
সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা।
আইন প্রয়োগের পাশাপাশি মানবিক পুনর্বাসন ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেওয়া।

পরিশেষে, মাদকদ্রব্য অপব্যবহার ও অবৈধ পাচার একটি বৈশ্বিক সংকট, যা ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের জন্য বহুমাত্রিক হুমকি সৃষ্টি করছে। প্রতি বছর ২৬ জুন পালিত ‘মাদকদ্রব্য অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস’ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মাদকবিরোধী সংগ্রাম শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি সমগ্র সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব।

বাংলাদেশে মাদক সমস্যা প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং সাধারণ জনগণের সমন্বিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য। সচেতনতা, প্রতিরোধ, চিকিৎসা এবং পুনর্বাসন—এই চারটি স্তম্ভকে ভিত্তি করে একটি সুস্থ, নিরাপদ ও মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব। যুবসমাজকে সুরক্ষিত রাখতে এবং টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। তাহলেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর, সুস্থ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ নির্মাণ করা সম্ভব হবে।

মোফাচ্ছেল চৌধুরী মানিক শাহ, লেখক-গবেষক, মানবাধিকার সংগঠক,
সাব এডিটর, দৈনিক স্বদেশ বিচিত্রা, ঢাকা। ভাইস চেয়ারম্যান, জাতীয় পরিবেশ মানবাধিকার সোসাইটি, কেন্দ্রীয় কমিটি