সারাদেশে গরুর মাংসের চড়া দামের সুযোগ নিয়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে এক শ্রেণীর অসাধু ও দুষ্কৃতকারী চক্র। মুনাফার লোভে তারা গোপনে অসুস্থ, মুমূর্ষু এমনকি মৃত ঘোড়া, শেয়াল ও কুকুর জবাই করে গরুর মাংস হিসেবে বাজারে সাধারণ মানুষের কাছে বিক্রি করছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিভিন্ন সময় এসব চক্রের সদস্যদের গ্রেফতার করলেও আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে তারা পুনরায় একই অপরাধে জড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রচলিত আইনের কঠোর প্রয়োগের অভাব এবং জনসচেতনতা না থাকায় এই ভয়াবহ অপকর্ম থামানো যাচ্ছে না।
শরীরের জন্য নীরব ঘাতক: যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
গবেষণায় দেখা গেছে, ঘোড়ার মাংস মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এর মূল কারণগুলো হলো:
মারাত্মক ব্যাকটেরিয়া: ঘোড়ার মাংসে ১০০% ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া যেমন Salmonella এবং Trichinella থাকার প্রবল সম্ভাবনা থাকে, যা থেকে মারাত্মক খাদ্য বিষক্রিয়া হতে পারে।
ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া: ঘোড়াকে সাধারণত ব্যথানাশক হিসেবে ‘ফিনাইলবুটাজোন’ (Phenylbutazone) দেওয়া হয়। এই রাসায়নিক মিশ্রিত মাংস খেলে মানুষের শরীরে ‘অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া’ বা ক্যান্সারের ঝুঁকি বহুলাংশে বেড়ে যায়।
ভারী ধাতুর উপস্থিতি: ঘোড়ার কলিজা ও কিডনিতে প্রচুর পরিমাণে ক্যাডমিয়াম জমা থাকে, যা মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে। এছাড়া এতে উচ্চ মাত্রার লবণ ও চর্বি থাকায় হৃদরোগের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়।
আইন কী বলে?
বাংলাদেশে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ঘোড়ার মাংস বিক্রি করা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। দেশের প্রচলিত তিনটি আইনে এর শাস্তির বিধান রয়েছে:
প্রাণিকল্যাণ আইন ২০১৯: অসুস্থ বা মালিকবিহীন প্রাণি নিধন করলে ৬ মাসের কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।
পশু জবাই ও মাংসের মান নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১১: লাইসেন্স বা স্বাস্থ্য পরীক্ষা ছাড়া মাংস বিক্রি করলে ১ বছরের জেল বা জরিমানার বিধান রয়েছে।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯: প্রতারণার মাধ্যমে মাংস বিক্রি করলে ১ থেকে ৩ বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপট
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের মতো দেশগুলো জনস্বাস্থ্য রক্ষায় ঘোড়া জবাই নিষিদ্ধ করেছে। উন্নত বিশ্বে ঘোড়াকে খাদ্যের পরিবর্তে মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
অন্যদিকে, ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও এটি পরিহারযোগ্য। ইসলামিক বিধান অনুযায়ী ঘোড়ার মাংস খাওয়া নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। সুনানে নাসাঈ ও আবু দাউদের হাদীস অনুযায়ী, রাসূলুল্লাহ (সা.) ঘোড়ার গোশত খেতে নিষেধ করেছেন। ওলামায়ে কেরামদের মতে, এটি ‘মাকরূহে তানযীহি’, যা এড়িয়ে চলাই বাঞ্ছনীয়।
সতর্কতা ও করণীয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অসাধু তৎপরতা বন্ধ করতে বাজার তদারকি (মার্কেট মনিটরিং) জোরদার করার বিকল্প নেই। অপরাধীদের বিরুদ্ধে ‘বিশেষ ক্ষমতা আইনে’ বিচার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। ক্রেতাদেরও মাংস কেনার সময় সতর্ক থাকতে এবং কোনো এলাকায় সন্দেহজনক কার্যকলাপ দেখলে দ্রুত স্থানীয় প্রশাসন বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে জানানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।







