জলদাস সম্প্রদায়ের সার্থক রূপচিত্র ‘তিতাস একটি নদীর নাম
আমির হোসেনঃ তিতাসের তনুদেহ ঘিরে যে কবিতার রূপোচ্ছাস অদ্বৈত ছড়িয়ে দিয়েছেন তাঁর উপন্যাস “তিতাস একটি নদীর নাম” এর সর্বাঙ্গে তার জুড়ি মেলা ভার। অদ্বৈত মল্লবর্মণ পত্রিকায় চাকরিসূত্রে কলকাতায় জীবন-যাপন করলেও তাঁর শিক্ষা জীবন কেটেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কুমিল্লাতে। এখানেই গড়ে উঠেছে তাঁর লেখক মানস। আক্ষরিক অর্থেই তিনি তিতাসের সন্তান। তিতাসের কোলে তাঁর জন্ম, তিতাসের তীরে তাঁর বেড়ে ওঠা, তিতাসের উপকূলে তাঁর বিচরণ-বিকাশ। তিতাসে সঙ্গে গভীর মিতালি করে কেটেছে তাঁর শৈশব-কৈশোর-তারুণ্য। তাঁর কৌম-জ্ঞাতিগোষ্ঠী-আত্মীয়-পরিজন সহচর সকলেরই বসবাস ও বিচরণ তিতাস তীরে। তাই তাঁর শোনিতে তিতাসের প্রবাহ, নাড়িতে তিতাসের ঢেউয়ের স্পন্দন আর চিত্তে তিতাসের জীবনপ্রবাহ। তাঁর সাহিত্যিক জীবনের সূচনাতেও তিতাস সমাপ্তিতেও তিতাস। তাঁর জীবনই তিতাসময়। তাই অদ্বৈত মল্লবর্মণ তিতাসের সন্তান হয়েও তিতাসের জনক।
অদ্বৈত মল্লবর্মণের সমগ্র সাহিত্যিক জবিনে ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসটি অমর কীর্তি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। প্রতিকূল সংঘাতে ক্রমশ মুছে-আসা মৎসজীবী যে মানুষদের কাহিনী এ উপন্যাসে বর্ণিত হয়েছে তিনি সেই ‘মালো’ সম্প্রদায়ের লোক ছিলেন। তিনি তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও সুগভীর অন্তঃদৃষ্টির কারণেই উপন্যাসটিতে ধীবর সমাজের নিষ্ঠুর জীবনসংগ্রামের সাধারণ কাহিনীকে করে তুলেছেন অবিনশ^র ও অসাধারণ। তিতাস নদী ও তার দু‘কূলের মানুষের জীবনযাত্রাকে ঘিরে রচিত ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসে কিশোর, সুবল, অনন্ত, বনমালী, রামপ্রসাদ, দয়ালচাঁদ প্রমুখ চরিত্রগুলি স্থান পেয়েছে।
গ্রন্থাকারে ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ যেভাবে পাওয়া গেছে, তাতে আছে চারটি খ-; সংখ্যাচিহ্নিত প্রতিটি খ-ে রয়েছে দুটি করে পর্ব। প্রথম খ-ের পর্বদ্বয়ের নাম-‘তিতাস একটি নদীর নাম’ ও ‘প্রবাস খ-’। দ্বিতীয় খ-ের পর্বদ্বয় হচ্ছে ‘নয়াবসত’ ও ‘জন্ম-মৃত্যু-বিবাহ’। তৃতীয় খ-ে আছে ‘রামধনু’ ও ‘রাঙা নাও’ আর চতুর্থ খ-ে ‘দুরঙা প্রজাপতি’ ও ‘ভাসমান’।
তিতাসের সংবেদনময় উপস্থাপন দিয়ে শুরু হয় আলোচ্য উপন্যাস। অদ্বৈতর বর্ণনায় তিতাস হয়ে ওঠে কর্মাত্মক-সমরেশ বসুর গঙ্গা, বিভূতিভূষণের ইছামতি, এমন-কি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মা নদীর মতো অদ্বৈতের তিতাস নিস্ক্রিয় পরিপ্রেক্ষিত মাত্র নয়। বর্ণিতব্য বিষয় ও চরিত্রসমূহকে যেহেতু নিয়ন্ত্রণ করবে তিতাস, তাই প্রথমেই লেখক তুলে ধরেছেন তিতাসের স্বতন্ত্র চারিত্র্য- ‘তিতাস একটি নদীর নাম। তার কূলজোড়া জল, বুকভরা ঢেউ, প্রাণভরা উচ্ছ্বাস। . . . মেঘনা-পদ্মার বিরাট বিভীষিকা তার মধ্যে নাই। আবার রমু মোড়লের মরাই, যদু প-িতের পাঠশালার পাশ দিয়ে বহিয়া যাওয়া শীর্ণ পল্লীতটিনীর চোরা কাঙ্গালপনাও তার নাই। তিতাস মাঝারি নদী। দুষ্ট পল্লীবালক তাকে সাঁতরাইয়া পার হইতে পারে না। আবার ছোট নৌকায় ছোট বউ নিয়া মাঝি কোন দিন ওপারে যেতে ভয় পায় নাই। তিতাস শাহী মেজাজে চলে। তার সাপের মতো বক্রতা নাই, কৃপণের মতো কুটিলতা নাই। কৃষ্ণপক্ষের ভাঁটায় তার বুকের খানিকটা শুষিয়া নেয়, কিন্তু কাঙ্গাল করে না। শুক্লপক্ষের জোয়ারের উদ্দীপনা তাকে ফোলায়, কিন্তু উদ্বেল করে না।’
প্রথম খন্ডের প্রথম পর্বটি একান্তই তিতাসকেন্দ্রিক-অদ্বৈত সচেতনভাবে প্রথমেই নির্মাণ করে নেন তাঁর অন্বিষ্ট প্রতিবেদনের প্রেক্ষাপট। তাঁর বিবরণ পাঠ করে প্রাকৃত জীবন ও তিতাসের অর্ন্তবয়ন সম্পর্কে পাঠক মুহূর্তেই হয়ে ওঠে সচেতন-বোঝা যায় তিতাস নদী যে তার তীরবর্তী প্রাকৃত জীবনের কোষে-কোষে মিশে আছে সে-কথাই লেখক ব্যক্ত করতে চান এখানে- ‘তিতাস একটি নদীর নাম।.. .. নামটি তাদের কাছে বড় মিঠা। তাকে তারা প্রাণ দিয়ে ভালবাসে, তাই এই নামের মালা তাদের গলায় ঝুলানো। শুরুতে কে এই নাম রাখিয়াছিল, তারা তা জানে না। তার নাম কেউ কোনদিন রাখিয়াছে, এও তারা ভাবে না। ভাবিতে বা জানিতেও চায় না। এ কোনদিন ছিল না, এও তারা কল্পনা করিতে পারে না। কবে কোন দূরতম অতীতে এর পারে তাদের বাপ পিতামহেরা ঘর বাঁধিয়াছিল একথা ভাবা যায় না। এ যেন চির সত্য, চির অস্তিত্ব নিয়া এখানে বহিয়া চলিয়াছে। এ সঙ্গী তাদের চিরকালের। এ না হলে তাদের চলে না। এ যদি না হইত, তাদের চলিতও না। এ না থাকিলে তাদের চলিতে পারে না। জীবনের প্রতি কাজে এ আসিয়া উঁকি মারে। নিত্যদিনের ঝামেলার সহিত এর চিরমিশ্রণ। এভাবে লেখক মূল প্রতিবেদনের প্রস্তুতি হিসেবে প্রাকৃত জীবনের সঙ্গে ব্রাত্য নদী তিতাসকে একাত্ম করে নেন।
প্রথম খ-ের দ্বিতীয় পর্বের নাম ‘প্রবাস’। সুবল, তিলক, কিশোর, মোড়ল, বাসন্তী, বেদেনী তরুণী-এসব ব্যক্তির সঙ্গে এ পর্বে পাঠকের পরিচয় ঘটে। এদের সঙ্গে-সঙ্গে পাঠকও লৌকিক উপাদান ও কৌম-সংস্কৃতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়ে পড়েন এ পর্বে। কিশোরের প্রেম, আকস্মিক বিয়ে, মেঘনায় ডাকাত কর্তৃক তার স্ত্রীর অপহৃত হওয়া এসব ঘটনা উপন্যাসে অনিবার্য অনুষঙ্গ। তবু এ পর্বেই অদ্বৈত নির্মাণ করে নেন প্রাকৃত জীবন ও কৌম সংস্কৃতির বিস্তৃত এক প্রতিবেদন। নদীনির্ভর অন্য সব উপন্যাস থেকে ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ এ কারণেই স্বতন্ত্র হয়ে ওঠে যে, কাহিনীর মৌল বয়নের সঙ্গে অর্ন্তবয়নে এখানে উপস্থাপিত হয় নানা কৌম-সংস্কৃতি, বাখতিন-কথিত, ‘পধৎহরাধষ ভড়ষশ-পঁষঃঁৎব’। বোঝা যায়, প্রাকৃত জীবনের পাশাপাশি মাঘম-লের ব্রত উদ্যাপন, কুমারীরর চৌয়ারি ভাসানো, নৌকাযাত্রার বিবরণ, দোলপূর্ণিমার উৎসব, রাধাকৃষ্ণের গান, ব্রাত্যজনের বিবাহপ্রথা ও মালাবদল এসব লোকসাংস্কৃতিক প্রতিবেদন উপস্থাপনও অদ্বৈত মল্লবর্মণের কেন্দ্রীয় অন্বিষ্ট।
উপন্যাসের দ্বিতীয় খ-ের প্রথম পর্ব ‘নয়াবসত’। মেঘনার গর্ভে ডাকাত কর্তৃক কিশোরের সর্বস্ব লুন্ঠন ও স্ত্রী-অপহরণের পর কেটে গেছে চার বছর। এই চার বছরের কোনে বিবরণ উপন্যাসে নেই। বোঝা যায়, কিশোরের জীবন মৌল প্রতিবেদনের প্রেক্ষাপটে লেখকের কাছে লক্ষ্য নয়, উপলক্ষ মাত্র। সমবেত চরিত্রের পাঠই লেখকের কাচে প্রাধান্য পেযেছে; সমষ্টি-চৈতন্য যেখানে বড়, ব্যক্তিচৈতন্য সেখানে স্বাভবিক কারণেই গৌণ। নদীর অবিরল তরঙ্গমালার মাঝে প্রতিটি চরিত্র এক একটি স্বতন্ত্র তরঙ্গ মাত্র; অদ্বৈত মল্লবর্মণের কাছে সামূহিক বাচনটাই সত্য, ব্যক্তি-তরঙ্গ উপলক্ষ মাত্র। এ কারণে এ উপন্যাসের সামূহিক বাচনে সর্বদা ধ্বনিত হয় বহুস্বরের ব্যঞ্জনা। স্ত্রী-অপহরণের চার বছর পর কোনো এক শীতের সকালে কিশোর প্রবেশ করে তিতাস-তীরের মালো পাড়ায়। তার আগমনে আখ্যান যে গতি পেল, তা আরো প্রবল হল গোকর্ণ ঘাটে অনন্ত ও তার মায়ের উপস্থিতিতে। ভারতের বাড়ির আঙিনায় নবাগতকে সমাজভুক্ত করতে গিয়ে লেখক উপস্থাপন করেছেন কৌমবাস্তবতার আরেক প্রান্ত। গৌরাঙ্গ, নিত্যানন্দ, বাসন্তী, অনন্ত, রামপ্রসাদ, দয়ালচাঁদ, কৃষ্ণচন্দ্রের আচরণ-উচ্চারণে তিতাস-তীরের প্রাকৃত জীবন এখানে বিশ^স্ততার সঙ্গে উন্মোচিত।
দ্বিতীয় খ-ের দ্বিতীয় পর্বের নাম ‘জন্ম-মৃত্যু-বিবাহ’। পর্বের নামের মধ্যেই উন্মোচিত জীবনের পরিক্রমার সূত্র। এ পর্বের প্রতিবেদন ঔপন্যাসিক উপস্থাপন করেন প্রধানত অনন্তের মা, সুব্লার বউ, পাগল কিশোর-এই তিনজনের দৃষ্টিকোণ ও বয়ান। এই তিনজনের উচ্চারিত স্বরেই শোনা যায় অনেকার্থ দ্যোতনা ও বহুস্¦রিক ব্যঞ্জনা। অনন্তের মা ও সব্লার বউ-অতি সাধারণ এই দুই কৌমনারীর বয়ানে লেখক উপস্থাপন করেছেন গভীরতর দার্শনিক প্রত্যয়। সেবা ও ভালোবাসা দিয়ে অনন্তের মা তার হারিয়ে-যাওয়া প্রেমিক পাগল কিশোরের পরিচর্যা করে যায়, ভাবে একদিন কিশোরের মধ্যে ফিরে আসবে পূর্বস্মৃতি-‘সেবা যতেœ মুগ্ধ করিয়া, হাসিতে খুশিতে তার মন পূর্ণ করিয়া ওর জীবনে তার অপরিহার্যতাকে কায়েম করিয়া নিয়া, একদিন সে সত্যের মূর্ত ব্যঞ্জনার মধ্য দিয়া জানাইবে ডাকাতেরা তার কেশাগ্রও স্পর্শ করে নাই। .. .তার পাগল নিশ্চয়ই ভাল হইয়া উঠিবে।’ অনন্তের মায়ের এই ভাবনাকে শুশ্রƒষা দিয়েছে সুব্লার বউ। বস্তুত, অনন্তের মা আর সুব্লার বউ যেন রাধা ও যশোদা আদিকল্পের লোকায়ত পুনর্নির্মাণ।
তিতাস একটি নদীন নাম উপন্যাসের তৃতীয় খন্ডের প্রথম পর্বের নামা ‘রামধনু’। ইতোমধ্যে কিশোর ও অনন্তের মা উপন্যাস-আখ্যান থেকে নিস্ক্রান্ত হয়েছে, অনন্তের ছন্নছাড়া ভাসমান জীবনই এখন কথাকারের প্রধান লক্ষ্য। ‘রামধনু’ পর্ব থেকেই আখ্যান দ্রুত হয়ে ওঠে পরিণতিমুখী। পরিণতিকে দ্রুত করতে গিয়ে কথকের প্রতিবেদন ক্রমে রূপান্তরিত হয় লেখকের প্রতিবেদনে। বর্ষার সজল মায়া আকাশে যেভাবে ফোটায় রঙধনু। উপন্যাসের আখ্যান এখন থেকে অগ্রসর হবে, তাতে মালো পাড়া হয়ে পড়বে বিপন্ন, কৌমজীবন ধসে পড়বে-প্রকৃতজনের আশা ও আকাক্সক্ষা রঙধনুর মতোই অলীক ও অধরা। এই স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গ লেখক প্রধানত অনন্তের দৃষ্টিকোণে উপস্থাপন করেছেন। তৃতীয় খ-ের দ্বিতীয় পর্ব ‘রাঙা নাও’ এবং চতুর্থ খ-ের প্রথম ও দ্বিতীয় পর্ব ‘দুরঙা প্রজাপতি’ ও ‘ভাসমান’-এ মালোপাড়ার কৌমজীবনের ধস দ্রুতগতিতে নিষ্পন্ন হয়েছে। রামধনু-রূপ রঙিন জীবনের হাতছানির পরিণতিতে কৌমজীবন থেকে নিস্ক্রান্ত হয়েছে অনন্ত, ধসে গেছে প্রাকৃতজনের মালো পাড়া-তবু অন্তিম বিচারে এই কৌমজীবনায়নই এ উপন্যাসের কেন্দ্রীয় অন্বিষ্ট। এ কারণেই লেখকের বয়ানে নির্লিপ্ত ভাষ্যে মালো সমাজের অন্তিম ধস, তিতাসের বুকে চর জেগে ওঠা, কৃষিজীবীদের কাছে মালোদের পরাভব, সুব্লার বউ-উদয়তারা-বনমালীদের হারিয়ে যাওয়া, অনন্ত-বালার অন্তহীন ব্যর্থ প্রতীক্ষা-এর সবকিছুই সামূহিক বিনিষ্টির মাঝেও প্রতিবেদনের মৌল উপদান হয়ে থাকে। অনন্তের মাধ্যমেই লেখক অনিবার্য বাস্তবের ভিন্ন এক সন্দর্ভ নির্মাণ করেছেন। মালো পাড়ার এক আশ্রয় থেকে অন্য আশ্রয়ে ঘুরে-ফেরা অনন্ত শেষ পর্যন্ত কৌমজীবনের সীমানা ছাড়িয়ে পাড়ি দিয়েছে অচেনা এবং ভিন্ন এক ‘তিতাস’-¯্রােতে। সেই নতুন পথে তাকে অভ্যর্থনার জন্য আকাশে জেগে থাকে অসংখ্য তারা: ‘রাশি রাশি ফুলঝুরি নামাইয়ার রাখা একপাট আকাশকে বুঝি অনন্তের গায়ের উপর চাপাইয়া ধরিয়া রাখিয়াছে। ঐ যে আকাশের উপর দিয়া এদিক হইতে ওদিকে চলিয়া গিয়াছে কি একটা উজ্জ্বল সাঁকো-কিছুদিন আগের দেখা সেই রামধনুটারই যেন ছিল এটা।… আর তারই চারিপাশে ভিড় করিয়া আছে লাখ লাখ তারা। হাত বাড়াইলেই ধরা যাইবে আর তারই উপর ঝুলিয়া অনন্ত আকাশের এমন এক রহস্যলোকে যাত্রা করিবে যেখানে থাকিয়া সে কেবল অজানা জিনিষ দেখিবে। তাহার দেখা আর কোনো কালে ফুরাইবে না।.. .অনেক দূরের আকাশের তারায় তারায় যেন সড়ক বাঁধিয়াছে। না জানি কত সুন্দর সে পথ, আর সে-পথে চলিতে না জানি কত আনন্দ!…নদীর ¯্রােত তাহাকে দেশ দেশান্তরে ভাসাইয়া নিবে, ঢেউ তাহাকে দোলা দিবে। চারিদিকের আঁধারে কেউ জাগা থাকিবে না। জাগিয়া থাকিবে সে আর তার চারিদিকের আঁধার আর উপর আকাশের তারাগুলি।’ এভাবে মালোকৌমের বিনষ্টি আর অনন্তের অনন্ত পথের অভিযাত্রার মাধ্যমে বক্ষ্যমান এই প্রতিবেদনে ভিন্ন এক সত্যের প্রতি ইঙ্গিত করেন লেখক।
তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসে নির্মিত হয়েছে, জল ও জীবনের নিবিড় ঐকতান। তিতাস গোকর্ণঘাটের মালোকৌমের আদি-অন্ত প্রতিনিধিত্ব করেছে তার সমগ্র রূপচ্ছটা ছড়িয়ে। মালোদের কাছে তিতাস একই সঙ্গে পরম বন্ধু ও চরম শ্রত্রু, একই সঙ্গে সে মাতা ও দয়িতা। জল ও জীবন, নদী ও মানুষের এই নিবিড় একাত্মতায় অদ্বৈত মল্লবর্মণ খুঁজে পেয়েছেন প্রবাহমানতার শাশ^ত সূত্র। তাই তাঁর বয়ানে দেখা যায়: ‘নদীর একটা দার্শনিক রূপ আছে। নদী বহিয়া চলে; কালও বহিয়া চলে। কালের বহার শেষ নেই। নদীরও বহার শেষ নাই। কতকাল ধরিয়া নিরবিচ্ছিন্নভাবে বহিয়াছে। তার বুকে কত ঘটনা ঘটিয়াছে। কত মানুষ মরিয়াছে।.. ..আবার শত মরণকে উপেক্ষা করিয়া কত মানুষ জন্মিয়াছে। তিতাসও কতকাল ধরিয়া বহিয়া চলিয়াছে। তার চলার মধ্যে তার তীরে তীরে কত মরণের কত কান্নার রোল উঠিয়াছে। কত অশ্রু আসিয়া তার জলের ¯্রােতে মিশিয়া গিয়াছে। কত বুকের কত আগুন, কত চাপা বাতাস তার জলে মিশিয়াছে। কতকাল ধরিয়া এ-সব সে নীরবে দেখিয়াছে, দেখিয়াছে আর বহিয়াছে।’
তিতাস নদীই আলোচ্য উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র, কেন্দ্রানুগ শক্তি। তিতাস নদীই অদৃশ্য এক বন্ধনে বেঁধে রাখে তার তীর লগ্ন কৌমজনগোষ্ঠীকে। এ কারণে উপন্যাসের কোনো চরিত্রকেই লেখক আদি-মধ্য-অন্ত সমন্বিত সমগ্রতায় ধারণ করেননি; তাঁর কেন্দ্রীয় লক্ষ্য ছিল তিতাস নদী আর সে নদীর উপর নির্ভরশীল কৌমজনগোষ্ঠীর জীবনযাপনের ছবি অঙ্কন। ফলে কিশোর, কিশোরের বউ, সুবল, বাসন্তী, অনন্ত-কেউই এখানে পূর্ণ বিকশিত হতে পারেনি। তবে এক একটি চরিত্র বহুকৌণিক হীরকের মতো এর নানা দিক থেকে আলো ঠিকরে পড়েছে। উপন্যাসের প্রথম পর্বে যাকে আমাদের নায়ক মনে হয়েছিল, দেখা গেল অদ্বৈত শেষ পর্যন্ত তাকে নায়ক করেন নি। যে নারীকে আমাদের মনে হয়েছিল পাশর্^চরিত্র মাত্র, দেখা গেল, তিনিই উপন্যাসের অন্ত পর্যন্ত ঠিকে আছেন রুধির ধারার মতো। মোট কথা মালোকৌমের যাপিত জীবনের উত্তান-পতনের আদি-অন্ত এই খেলায় বিশেষ কোনো চরিত্র নয়, বরং তিতাসলগ্ন কৌমজনগোষ্ঠীর সামূহিক বাস্তবতার প্রতিবেদন রচনাই ছিল অদ্বৈত মল্লবর্মণের মৌল অন্বিষ্ট। তিতাস যতদিন ছিল জলভরা ও বহমান, ততদিন তার তীরবর্তী মালোরাও ছিল উচ্ছল উদ্দাম প্রাণময়। কিন্তু যখনই তিতাস শুকিয়ে গেছে, হয়ে পড়েছে স্থবির ও মৃত, তখনই মালোপাড়ায় লেগেছে বিনষ্টির ছোঁয়া, হতাশার প্লাবন, ধসের জোয়ার। উপন্যাসে আমরা দেখি-তিতাসে চর পড়েছে। সেই চরের দখল নিল কারা? জলের অধিকার যাদের ছিল, সেই জলের নিচের মাটির অধিকারী তারা হলো না। তাহলে কারা হলো? ভূমিহীন চাষীরা? অদ্বৈত লিখেছে: ‘রামপ্রসাদ একলাই গিয়াছিল। তার বাড়ি-সোজা চরের মাটি দখল করিবার জন্য নিশ্চিত মৃত্যু জানিয়াও ঝাঁপাইয়া পড়িল। জোয়ান ভাইদের পাশে রাখিয়া লড়াই করিতে করিতে বৃদ্ধ সেই মৃত্যুও বরণ করিল। করম আলি বন্দে আলি প্রভৃতি ভূমিহীন চাষীরাও আসিয়াছিল, কিন্তু মার খাইয়া ফিরিয়া গিয়াছে। কেহ এক খামচা মাটিও পাইল না। তবে পাইল কে। দেখা গেল যারা অনেক জমির মালিক, যাদের জোর বেশি, তিতাসের বুকের নয়া মাটির মালিক হইল তারাই।’ অর্থাৎ পুঁজিবাদী সমাজের সর্বগ্রাসী দখল প্রবণতার কাছে মার খেল তিতাস পারের নিঃশ^-রিক্ত অসহায় মালোগোষ্ঠী আর ভূমিহীন কৃষক। তিতাসের জল শুকিয়ে চর পড়ার পর সেই চরের মাটি তাদের হাতছাড়া হয়ে তাদের হতাশা ও দারিদ্রকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। তিতাস তাদের করেছে ভাগ্যবিড়ম্বিত। এখানেই নদী ও জীবনের যুগলবন্দিতে ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ হয়ে উঠেছে অনন্য। তিতাস না থাকলে মালোরাও থাকে না, তিতাস না চললে মালোরা চলে না। তিতাস-তীরের কৌমজীবনকে আদি-অন্ত নিয়ন্ত্রণ করে এ নদী। নদী ও মানুষের এই নিবিড় সম্পর্ক, এমন জৈব-একাতœতা অন্য কোনো বাংলা উপন্যাসে পরিলক্ষিত নয়। অসাধারণ নৈপুণ্যে অদ্বৈত মল্লবর্মণ তিতাস নদীর এই সকর্মক ভূমিকা তুলে ধরেছেন। উপন্যাসের প্রথাগত নায়ক-নায়িকা কিশোর ও তার স্ত্রী দ্বিতীয় খ-ের দ্বিতীয় পর্ব ‘জন্ম-মৃত্যু-বিবাহ’-এর মধ্যেই পৃথিবী থেকে হারিয়ে যায়, উপন্যাস তবু প্রলম্বিত হয় আরো চারটি পর্বে। এর মহাকাব্যিক পটে অনেক চরিত্রের আগমন-প্রস্থান ঘটেছে, কিন্তু আদি-অন্ত ক্রিয়াশীল থেকেছে একমাত্র তিতাস নদী। তিতাস নদী ছিল মালোকৌমের কাছে জীবিকার একমাত্র উৎস ভিন্নার্থে জননী। মালোদের উপর তিতাসের নিয়ন্ত্রণের একটি উদাহরণ দেখা যায় উপন্যাসের ‘ভাসমান’ পর্বের একটি অসামান্য বর্ণনায়-‘গ্রামের কয়েকজন উৎসাহী ধনী ব্যক্তি মালোদের জন্য এখানে শহর হইতে ঋণদান কোম্পানীর একটি শাখা আনিয়াছিল। সুদ খুব কম দেখিয়া মালোরা সকলেই হুজুগে মাতিয়া টাকা ধার করিয়াছিল। সে অনেক দিন আগের কথা। সেই থেকে প্রতি বছর চক্রবৃদ্ধি হারে কেবল সুদই যোগাইয়া আসিয়াছে, আসল আদায় হওয়া দরকার। তাই তারা পেয়াদার সঙ্গে জবরদস্ত বাবু পাঠাইয়াছে। তার নাম বিধুভূষণ পাল। গ্রামের পালদের সঙ্গে তার আত্মীয়তা ছিল। তাদের নিকট মালোদের প্রকৃত অবস্থা জানিয়া লইয়া মালোপাড়াতে আসিয়া রুদ্রমূর্তি ধারণ করিল। বুড়াবুড়া মালোদের দাড়ি ধরিয়া টানিয়া জলে নামাইল। চোখ ঘুরাইয়া বলিল, ‘ক’ তোর কাছে কত আছে। শীতকাল। তিতাসে জলে দাঁড়াইয়া ঠক ঠক করিয়া কাঁপিতে কাঁপিতেও তাদের মুখ দিয়া মিথ্যা কথা বাহির হইত না। সর্বত্র মিথ্যা কথা বলিতে পারিলেও তিতাসে জলে নামিয়া মিথ্যা বলা তাদের পক্ষে অসম্ভব ছিল।’ এভাবে দেখা যায়, তিতাসের জলের সঙ্গে মালোদের সম্পর্ক কতটা গভীর ও পবিত্র, সেকথা উচ্চবর্গের শোষকও জানতেন।
তিতাসের জলে আছে, মালোকৌমের দৃষ্টিতে, অনন্ত শক্তি ও সম্ভাবনার উৎস। তিতাসকে নিয়ে মালোদের গর্ব ও গৌরবের কোনো শেষ নেই। কিন্তু সেই তিতাসই যখন হয়ে পড়ে জলশূন্য, তার বুকে জাগে একের পর এক চর, তখন মালোরা দুঃখে ও বেদনায় ও অভিমানে ভেঙ্গে পড়ে। আবার যখন বর্ষাকালে জলে ভরে উঠে তিতাস তখন জেলেরা মন প্রসন্ন হয়ে উঠে। কারণ তারা তিতাসের এই জলভরা চেহারা দেখেই অভস্থ। এভাবে লেখক জল ও জললগ্ন মানুষের এক ধ্রুপদী প্রতিবেদন নির্মাণ করে বাংলা কথাসাহিত্যে সংযোজন করেন স্মরণীয় এক মাত্রা।অদ্বৈত মল্লবর্মণ তাঁর ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসে লোক উপাদানের স্বার্থক প্রয়োগ ঘটান। উপন্যাসে দুঃখের দাবাদাহে যন্ত্রণা ক্লিষ্ট মানুষ স্বস্তির নিশ^াস ছাড়ে লোক উপাদানের অনুষঙ্গে। গৌরাঙ্গ সুন্দর মালোর পতœী যৌবনেই না খেতে পেয়ে শুকিয়ে মারা গেছে। তার অনেক দিন পরে তিতাসে তীরের মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা ব্যক্ত হয়েছে এভাবে: ‘উঃ বউটা মরিয়া কি ভালই না করিয়াছে। থাকিলে আজ তার অবস্থা হতো ঠিক নিত্যানন্দ দাদার মতো।’
গ্রাম বাংলার পল্লী রমনীদের দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন প্রসঙ্গ উঠে এসেছে উপন্যাসে: ‘মা তার নাদুষ নুদুষ ছেলেকে ডুবাইয়া চুবাইয়া তোলে। বউ-ঝিরা সব কলসি লইয়া ডুব দেয় পরক্ষণে ভাসিয়া ওঠে। অল্পদূর দিয়া নৌকা যায় একের পর এক।’ উপন্যাসে আছে নতুন বউয়ের স্বামীর বাড়ি যাওয়া এবং স্বামীর বাড়ি থেকে বাপের বাড়ি ফিরে আসার চিত্র: ‘তার পর বাপের বাড়ি হইলে এক দৌড়ে ঘরে ঢুকিয়া ছোট ছোট ভাই বোনদের বুকে চাপিয়া ধরে।’
প্রবাস খ-ে কিশোর ও সুবল মোড়লের বাড়িতে সন্ধ্যা বেলায় গানের আসর গড়ে তুলে। সেখানে গাওয়া গানগুলি মূলত লোক উপাদানের সমন্বয়েই রসময় হয়ে উঠেছে। নৌকায় মাছ নেই এ কথা বলে দেয়ার পরও বেদেনী একরকম জোর করেই নৌকায় ওঠে। নৌকা দুলে উঠলে অবলম্বন হিসেবে সে কিশোরকে জড়িয়ে ধরে। নৌকার টাল সামলানোর জন্য-‘বেদেনী এক হাত ডান বগলের তলায় ও অন্যহাত বাম কাঁধের উপর দিয়া বুক পর্যন্ত বাড়াইয়া কিশোরকে নিজের বুকে চাপিয়া ধরিল। অবলম্বন পাইয়া কিশোর পড়িয়া গেল না।’ এখানে কিশোর প্রথমে বেদেনীর শরীরের স্পর্শ অনুভব করে। বস্তুত অজানা নারীর শরীরের স্পর্শে পুরুষের সুখানুভুতি মালো সমাজের জীবনচিত্রে মানানসই। এভাবে অসংখ্য খ- খ- লোক ঘটনার সমাবেশ দেখা উপন্যাসের বয়ানে।
তিতাস পাড়ের মালো সমাজের জন্ম-মৃত্যু-বিবাহ অনুষঙ্গে ছড়িয়ে আছে লোক-বিশ^াস ও সংস্কার। যা স্থানিক জীবনের আচার-আচারণকে পরিস্ফুট করে। তেমনি কিছু নিদর্শন: তিতাস নদী শান্ত প্রকৃতির, মেঘনা বা পদ্মার মতো এই নদীতে তুফান ওঠে না। এখানকার মালো সম্প্রদায়ের মানুষেরা তিতাসে মাছ ধরতে গেলে বাড়ির লোকজন নিশ্চিত মনে থাকতে পারে। এরা বিশ^াস করে-‘তিতাসের বুকে ঝড়-তুফানের রাতেও স্বামী-পুত্রদের পাঠাইয়া ভয় করেনা। বউরা মনে করে স্বামীরা তাদের বাহুর বাঁধনেই আছে। মায়েরা ভাবে ছেলেরা ঠিক মায়ের বুকে মাথা এলাইয়া দিয়া শান্ত মনে মাছ-ভরা জাল গুটাইতাছে।’ তিতাস তীরের মানুষেরা নদীতে নৌকা ভাসালে আলী বা আল্লার নাম স্মরণ করে। কারণ তারা মনে করে নদীর সমস্ত বিপদে এই আলী বা আল্লাই রক্ষা করবে-‘জোবেদ আলীর ছেলেরা যখন আলী আলী বলিয়া নৌকায় নদী পার হইতে থাকে, মুনীস দুই জন তখান চারিজোড়া বলদ ও দুই জোড়া ষাঁড়ের অনিচ্ছুক দেহমন শীতের জলে নামাইয়া মাথায় পাগড়ি বাঁধিয়া গরুদের ল্যাজে ধরিয়া আল্লা আল্লা মোমিন বলিয়া সাঁতার দেয়।’ বস্তুত আল্লা, পীর বা নদীর দেবতা বলে পরিচিত। নদীতে প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে এরা মানুষকে রক্ষা করে। তিতাস তীরের মালোরা বসন্ত উৎসব বা দোল খেলাকে নিজেদের জীবনের সাথে জড়িয়ে নেয়। এরা মনে করে এই হোলি রংয়ের আবীর তিতাসের বুকেও রঙের খেলা জাগায়। এ সময় তারা নিষ্ঠার সাথে তাদের নৌকাতেও রং মাখায়। এতে নাকি তাদের জীবনের স্বাচ্ছন্দ্য ফেরে এমনই বিশ^াসে বিশ^াসী এরা-‘নৌকাতে যে পুরুষ থাকে সে থালির আবীর নৌকার মাঝের গুরায় আর গলুইয়ে নিষ্ঠার সহিত মাখিয়া দেয়। ধান দুর্বাগুলি দুই আঙ্গুলে তুলিয়া ভক্তিভরে আবীর মাখানো জায়গাটার উপর রাখে। এ সময় বউ জোকার দেয়। সে আবীরের রাগে তিতাসে বুকেও রঙের খেলা জাগে।’
অদ্বৈত তাঁর উপন্যাসের প্রথম খ-ের প্রবাস পর্বে ‘মাঘমন্ডলের ব্রত’-এর বর্ণনা দিয়েছেন: ‘তিতাস নদীর তীরে মালোদের বাস। ঘাটে-বাঁধা নৌকা, মাটিতে ছড়ানো জাল, উঠানের কোণে গাবের মট্কি, ঘরে ঘরে চরকি, টেকের, তক্লি-সুতা কাটার, জাল বোনার সরঞ্জাম। এই সব নিয়াই মালোদের সংসার। নদীটা যেখানে ধনুকের মতো বাঁকিয়াছে সেইখান হইতে গ্রামটার শুরু। মস্ত বড় গ্রামটা,-তার দিনের কলরব রাতের নিশুতিতেও ঢাকা পড়ে না। দক্ষিণ পাড়াটাই গ্রামের মালোদের। মাঘ মাসের শেষ তারিখে সেই মালোপাড়াতে একটিা উৎসবের ধুম পড়িল। এটা কেবল কুমারীদের উৎসব। নাম মাঘম-লের ব্রত।’ এই ‘মাঘমন্ডলের ব্রত’ উৎসবের শেষে মালো সমাজের কুমারী মেয়েদের মধ্যে চৌয়ারী ভাসানোর রীতি প্রচলিত আছে। মেয়েরা আশা করে তাদের ভাসানো চৌয়ারী যেন কোন কোন পুরুষ ধরে। কারণ তারা বিশ^াস করে ভাসানো চৌয়ারী যে পুরুষ ধরবে তার সাথে সেই কুমারী বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবে। উপন্যাসে বাসন্তীও আশা করেছিল যে তার ভাসানো চৌয়ারী কিশোর ধরুক। কিন্তু ঘটনাক্রমে সুবল বাসন্তীর ভাসানো চৌয়ারী ধরে। উপন্যাসের ঘটনাতেও তাই দেখি বাসন্তীর সাথে সুবলের বিয়ে হতে-‘ছেলেরাই যদি ধরিতে না পারিল তবে মেয়েদের উহা ভাসাইবার সার্থকতা কই। কিশোরের জন্য বাসন্তীর মনে বড় ব্যথা পাইল। এমন সুন্দর চৌয়ারীটা সে পাইল না, পাইল সুবল।’ বস্তুত এভাবে নারী মনের সংযোগে লৌকি সংস্কারকে তুলে ধরা হয়েছে। সুবল ও তিলক চাঁদকে নিয়ে কিশোর শুকদেব পুরের উজানি নগরের খলাতে মাছ ধরতে যাচ্ছে। বিদায় কালে নারীরা জয়ধ্বনি দিয়ে তাদের বিদায় ক্ষণটিকে শুভ করে তুলছে। আর মাঝি মাল্লারা পীরের নাম করে নৌকা নদীতে ভাসিয়ে দেয়। তারা বিশ^াস করে পাঁচ পীরের নাম করলে নৌকা ছাড়লে স্বচ্ছন্দে গন্তব্য স্থানে পৌঁছানো যায়-‘পাঁচ পীর বদরের ধ্বনি দিয়া প্রথম লগি ঠেলা দিল তিলক। সুবল হালের বৈঠা ধরিল।’ বস্তুত নদীতে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য মাঝি মাল্লারা আজও পীরের নাম করে থাকে। এই আল্লা বা পীরই সমস্ত বিপদ থেকে তাদের রক্ষা করবে। এই ধারণা বহু দিনের যা উপন্যাসে দেখানো হয়েছে।
জন্ম-মৃত্যু-বিবাহ প্রসঙ্গে মালো সমাজ এক বিশেষ সংস্কারে আবদ্ধ। এরা বিশ^াস করে-‘ছাইলা হইলে পাঁচ ঝাড় জোকার, মাইয়া হইলে তিন ঝাড়।’ এমনই লোক সংস্কারে আবদ্ধ এই জীবন চিত্র। মালো সমাজের মেয়েরা বিশ^াস করে স্বামী ছাড়া নারীর জীবন অর্থহীন। অনন্তর মাকে বলতে শুনি-‘পুরুষ ছাড়া নারাীর জীবনের কানাকড়ি দাম নাই।’ বস্তুত পুরুষ শাসিত সমাজ নারীদের মনে এমনই ধারণার জন্ম দেয়। মানুষ মারা গেলে শ্রাদ্ধ শান্তি না হওয়া পর্যন্ত তার আত্মা মানুষের চারিপাশে চলাফেরা করে। সময় সুযোগ পেলে সে নিকট আত্মীয়কে মেরে ফেলে। তাই মৃত ব্যক্তির শ্রাদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত তার সন্তানদের একা পথে চলতে দেওয়া হয় না। তার সঙ্গে একজন করে লোক সবসময় থাকে। এই রকম পরিচয় পাই অনন্তর মায়ের মৃত্যুতে-‘অন্তত শ্রাদ্ধ শান্তি না হওয়া পর্যন্ত একমাস তো খুব ভয়ে ভয়ে কাটাতে হয়। তার আত্মা তখন ছেলের চারিপাশে ঘুরিয়া বেড়ায় কিনা। একা পাইলে কিংবা আঁধারে, কি বট বা হিজল গাছের তলায় পাইলে, কিংবা নদীর পারে পাইলে কাছে কেউ না থাকিলে লইয়া যায়। নিয়া মারিয়া ফেলে।’ বস্তুত মৃত মানুষের আত্মা সর্ম্পকে এ ধারণা বহু দিন থেকেই প্রচলিত।
অনন্ত বিশ^াস করে মৃত মানুষ, কাকের রূপ ধরে এসে সন্তানের দেওয়া জাউ কলা খেয়ে যায়। কারণ তার শিশু মনকে প্রবোধ দেওয়ার জন্যে বাসন্তী এমনই গল্প করে অনন্তের সাথে। তাই সুবলের বউ বাসন্তী সাতখানা খোলে জাউ আর কলা দিয়ে তুলসী তলায় সাজিয়ে দিলে, অনন্ত তাতে জল দিয়ে কাকের জন্য অপেক্ষা করে-‘যে দিন কাক আসে না, সেদিন অনন্ত ডোঙ্গা হাতে করিয়া আ আ করিয়া ডাকিয়া বেড়ায়-তারা বলিয়াছে, মা নাকি কাকের রূপ ধরিয়া আসিয়া অনন্তর দেওয়া জাউ-কলা খাইয়া যায়। অনন্ত যাহা কিছু শোনে, কিছুই অবিশ^াস করে না। যে কাকগুলি খাইতে আসে, এক দৃষ্টে তাদের দিকে চাহিয়া দেখে-এর মধ্যে কোনটা তার মা হইতে পারে।’ বস্তুত মৃত মানুষ নিয়ে এমনই ধারণা আজও প্রচলিত আছে। কাক মৃত মানুষের আত্মার প্রতীক হিসেবে মানুষের মনে জায়গা করে নেয়। এমনই অসংখ্য লোক বিশ^াস-সংস্কার, আচার-আচরণের গন্ডিতে মালোসমাজ আবদ্ধ। যার পরিচয় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অদ্বৈত মল্লবর্মণ তুলে ধরেছেন তার ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসে।
আমির হোসেন, কথাসাহিত্যিক
৮/৩ তুরাগ সিটি, মিরপুর-১, ঢাকা
মোবাইল:০১৮১৮০৩১৫৩২






