, ,

সাধারণ মানুষের কাছাকাছি এক স্বাস্থ্যসেবার নতুন রূপকার ডা. জুবাইদা রহমান

নিউজটি শেয়ার করুন

একটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সাফল্য শুধু আধুনিক হাসপাতাল, উন্নত যন্ত্রপাতি কিংবা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না। প্রকৃত সাফল্য তখনই আসে, যখন গ্রামের একজন কৃষক, শহরের একজন শ্রমজীবী মানুষ কিংবা প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন গর্ভবতী নারী প্রয়োজনের মুহূর্তে সহজে চিকিৎসা পান। রোগ শনাক্ত করতে দেরি হয় না, সামান্য অসুখের চিকিৎসার জন্য পরিবারের সঞ্চয় শেষ হয়ে যায় না, আর জরুরি চিকিৎসার অভাবে কাউকে জীবন হারাতে হয় না। সাধারণ মানুষের জীবন ও সামর্থ্যের সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবার এই সংযোগ প্রতিষ্ঠা করাই একটি জনবান্ধব স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রধান লক্ষ্য।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে ডা. জুবাইদা রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্য ও উদ্যোগের মধ্যে এই দর্শনের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা, চিকিৎসাসুবিধার ভৌগোলিক বৈষম্য কমানো, মাতৃ ও শিশুমৃত্যু প্রতিরোধ এবং সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার ওপর তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন। এসব ভাবনা বাস্তবায়িত হলে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা আরও জনমুখী, সাশ্রয়ী ও কার্যকর হয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হবে।
ডা. জুবাইদা রহমানের বিশেষত্ব হলো, তিনি চিকিৎসক হিসেবে স্বাস্থ্যব্যবস্থার বাস্তবতা সম্পর্কে ধারণা রাখেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করার পর তিনি ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের স্বাস্থ্য ক্যাডারে যোগ দেন। পরবর্তী সময়ে লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজে চিকিৎসাবিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন এবং হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেন। তাঁর এই শিক্ষাগত ও পেশাগত অভিজ্ঞতা স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে নীতিনির্ধারণী আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে। [১]
বর্তমানে জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কর্মসূচি ও আলোচনায় তাঁর অংশগ্রহণও দৃশ্যমান। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহধর্মিণী হিসেবে তাঁর একটি রাজনৈতিক পরিচয় রয়েছে। তবে স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে তাঁর বক্তব্যের মূল্যায়ন হওয়া উচিত চিকিৎসাবিষয়ক উপলব্ধি, নীতিগত দৃষ্টিভঙ্গি এবং সাধারণ মানুষের জন্য সেবা সহজ করার সম্ভাবনার ভিত্তিতে।
চিকিৎসার আগে প্রতিরোধ, অসুখ বাড়ার আগে শনাক্তকরণ
স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি বড় দুর্বলতা হলো, অনেক ক্ষেত্রে রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা যায় না। ফলে সাধারণ একটি শারীরিক সমস্যা সময়ের সঙ্গে জটিল হয়ে ওঠে। রোগীকে ছুটতে হয় এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে। চিকিৎসার খরচ বাড়ে, পরিবারের কর্মক্ষমতা কমে এবং কখনো কখনো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
এই বাস্তবতায় চিকিৎসাকেন্দ্রিক ব্যবস্থা থেকে প্রতিরোধকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় উত্তরণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন ডা. জুবাইদা রহমান। ২০২৬ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের ফাঁকে আয়োজিত একটি উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় তিনি বাংলাদেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার পুনর্বিন্যাসের কথা তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে রোগ প্রতিরোধ, আগেভাগে রোগ শনাক্তকরণ, ধারাবাহিক চিকিৎসা এবং মানুষের বসবাসের কাছাকাছি স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। [২]
এই ধারণা সাধারণ মানুষের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর চাপ কমানোর কার্যকর উপায়গুলোর একটি হলো রোগ হওয়ার ঝুঁকি কমানো এবং অসুস্থতার শুরুতেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ কিংবা বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারের মতো রোগের ক্ষেত্রে সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা ও সময়মতো চিকিৎসা একজন মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে। একই সঙ্গে জটিল চিকিৎসার ব্যয়ও কমাতে পারে।
এ ধরনের স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে মানুষকে শুধু হাসপাতালে আসার অপেক্ষায় থাকলে চলবে না। বাড়ি ও সম্প্রদায়ভিত্তিক স্বাস্থ্যশিক্ষা, ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং প্রয়োজন অনুসারে বিশেষায়িত হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। ডা. জুবাইদা রহমানের বক্তব্যে এই সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গির উপস্থিতি আশাব্যঞ্জক।
গ্রাম ও শহরের চিকিৎসাবৈষম্য কমানোর প্রয়োজন
বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো সুযোগ-সুবিধার অসম বণ্টন। রাজধানী ও বড় শহরগুলোতে বিশেষায়িত হাসপাতাল, নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র এবং অভিজ্ঞ চিকিৎসক পাওয়ার সুযোগ তুলনামূলক বেশি। বিপরীতে, প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন রোগীকে গুরুতর অসুস্থতা নিয়ে জেলা শহর কিংবা ঢাকায় আসতে হয়। চিকিৎসার পাশাপাশি তাঁকে বহন করতে হয় যাতায়াত, আবাসন ও স্বজনদের কর্মহানির ব্যয়।
এই বৈষম্যের বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন ডা. জুবাইদা রহমান। ২০২৬ সালের ১ জুলাই বাংলাদেশ সোসাইটি অব ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিনের জাতীয় সম্মেলনে তিনি প্রতিটি জেলা ও সদর হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র স্থাপনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তাঁর উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৩৮ জেলায় কোনো ধরনের আইসিইউ সুবিধা ছিল না। তিনি দক্ষ চিকিৎসক ও নার্সের ঘাটতির পাশাপাশি প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি এবং আধুনিক অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থার ওপরও গুরুত্ব দেন। [৩]
এ বক্তব্যের তাৎপর্য কেবল আইসিইউ শয্যা বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি স্বাস্থ্যসেবার সুযোগকে নাগরিকের ঠিকানা থেকে আলাদা করে দেখার আহ্বান। একজন মানুষের জীবন রক্ষার জন্য তাঁর ঢাকায় বসবাস করা কিংবা ব্যয়বহুল চিকিৎসা কেনার সামর্থ্য থাকা উচিত নয়। জেলা পর্যায়ে জরুরি চিকিৎসা, প্রশিক্ষিত জনবল, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং কার্যকর রোগী স্থানান্তরব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে অনেক রোগী দ্রুত চিকিৎসার সুযোগ পাবেন।
অবশ্য সব হাসপাতালে সমমানের জটিল চিকিৎসাসুবিধা গড়ে তোলা সহজ কাজ নয়। এজন্য প্রয়োজন বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, জনবল, বিদ্যুৎ ও অক্সিজেনের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এবং হাসপাতালগুলোর মধ্যে সমন্বিত যোগাযোগ। জেলা হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সক্ষমতা ধাপে ধাপে বাড়ানোই হতে পারে কার্যকর পথ।
ডা. জুবাইদা রহমানের বক্তব্যকে ইতিবাচক করে তুলেছে সমস্যার এই কাঠামোগত দিকটির প্রতি মনোযোগ। চিকিৎসাসেবা কোথায় কেন্দ্রীভূত, কোথায় ঘাটতি রয়েছে এবং সেই ঘাটতি পূরণে কী ধরনের ব্যবস্থা প্রয়োজন—এগুলো নিয়ে জনপরিসরে আলোচনা বাড়া স্বাস্থ্যখাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
মাতৃ ও শিশুসেবায় প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর ভূমিকা
একটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার মান বোঝার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো মাতৃ ও শিশুর স্বাস্থ্য। গর্ভাবস্থায় নিয়মিত পরীক্ষা, নিরাপদ প্রসব, প্রসব-পরবর্তী পরিচর্যা এবং নবজাতকের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করতে না পারলে স্বাস্থ্যব্যবস্থার সামগ্রিক অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয়।
জাতিসংঘের আলোচনায় ডা. জুবাইদা রহমান পেশাদার ধাত্রীদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার কেন্দ্রীয় অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দেন। গর্ভধারণের পূর্ববর্তী পরামর্শ থেকে শুরু করে গর্ভকালীন পরিচর্যা, প্রসব এবং প্রসব-পরবর্তী সময়ে মা ও নবজাতকের ধারাবাহিক সেবা নিশ্চিত করার কথা তিনি তুলে ধরেন। তাঁর মতে, ধাত্রীদের শুধু সংখ্যা বাড়ালেই হবে না; তাঁদের সমন্বিত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দলের অংশ করে তুলতে হবে।
এই ধারণার বাস্তব গুরুত্ব রয়েছে। গর্ভবতী মায়ের স্বাস্থ্যঝুঁকি আগেভাগে শনাক্ত করা গেলে জটিলতা মোকাবিলার সুযোগ বাড়ে। প্রশিক্ষিত ধাত্রী নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, প্রাথমিক পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় সময়ে উচ্চতর চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠানোর মাধ্যমে মাতৃ ও নবজাতকের জীবন রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারেন।
জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল—ইউএনএফপিএর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় ২৫ হাজার ধাত্রীর পদ সৃষ্টি ও তাঁদের নিয়োগের অঙ্গীকার করেছে। এই উদ্যোগের সফল বাস্তবায়ন মাতৃ ও নবজাতক স্বাস্থ্যসেবার বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। [৪]
এখানে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি কর্মপরিবেশ, নিরাপত্তা, যথাযথ পারিশ্রমিক, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম এবং পেশাগত মর্যাদাও গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্যকর্মীদের দক্ষতা কাজে লাগানোর মতো পরিবেশ তৈরি না হলে জনবল বাড়ানোর প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে।
রোগীর পাশে মানবিকতা ও তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা
ডা. জুবাইদা রহমানের স্বাস্থ্যভাবনার আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো রোগীর শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি তাঁর মানসিক অবস্থা ও পরিবারের উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়া।
২০২৬ সালের ৩১ জুলাই থ্যালাসেমিয়া ও অন্যান্য বিরল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য দেশব্যাপী তথ্যভান্ডার গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি। গর্ভাবস্থায় থ্যালাসেমিয়ার পরীক্ষার সুযোগ বাড়ানো এবং জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে শনাক্তকরণ কার্যক্রম সম্প্রসারণের ওপরও গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে নতুন নিয়োগের পরিকল্পনায় থাকা স্বাস্থ্যকর্মীদের এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরামর্শ দেন।
একটি নির্ভরযোগ্য রোগী-তথ্যভান্ডার স্বাস্থ্য পরিকল্পনায় সহায়ক হতে পারে। কোন এলাকায় কতজন রোগী রয়েছেন, কোথায় কী ধরনের চিকিৎসা প্রয়োজন, কী পরিমাণ রক্ত বা ওষুধ লাগছে এবং কোন জনগোষ্ঠী বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে—এসব তথ্য জানা থাকলে সীমিত সম্পদের ব্যবহার আরও কার্যকর করা সম্ভব।
তবে তথ্য সংগ্রহের সঙ্গে রোগীর গোপনীয়তা, তথ্যের নিরাপত্তা এবং নির্ভুলতা নিশ্চিত করাও জরুরি। বিরল রোগের মতো দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসানির্ভর অবস্থায় রোগী ও পরিবারের জন্য কাউন্সেলিং, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
চিকিৎসায় মানবিকতার গুরুত্ব তুলে ধরা তাঁর বক্তব্যের আরেকটি ইতিবাচক দিক। চিকিৎসক ও রোগীর সম্পর্ক শুধু ব্যবস্থাপত্র কিংবা পরীক্ষার ফলাফলে সীমাবদ্ধ নয়। রোগীর উদ্বেগ মনোযোগ দিয়ে শোনা, রোগ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেওয়া এবং চিকিৎসার সম্ভাব্য পথ ব্যাখ্যা করাও উন্নত স্বাস্থ্যসেবার অংশ।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানটিকে দক্ষিণ এশিয়ার চিকিৎসাশিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যাশাও প্রকাশ করেন ডা. জুবাইদা রহমান। তাঁর বক্তব্যে চিকিৎসাবিজ্ঞানের জ্ঞান, গবেষণা এবং মানবিক নেতৃত্বকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
স্বাস্থ্যসেবাকে নাগরিকের অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠার চ্যালেঞ্জ
স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করার পথে অর্থনৈতিক বাধা বড় সমস্যা। বিশ্বব্যাংকের তথ্যভান্ডারে অন্তর্ভুক্ত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বাস্থ্যব্যয়-সংক্রান্ত উপাত্ত অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশে মোট স্বাস্থ্যব্যয়ের প্রায় ৭৯ শতাংশ এসেছে মানুষের নিজস্ব পকেট থেকে। অর্থাৎ চিকিৎসার ব্যয়ের বড় অংশই পরিবারকে সরাসরি বহন করতে হয়েছে।
এই বাস্তবতায় স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের পাশাপাশি আর্থিক সুরক্ষার ব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও পরীক্ষা সহজলভ্য করা, জরুরি চিকিৎসায় আর্থিক বাধা কমানো, দরিদ্র পরিবারের জন্য সহায়তা বাড়ানো এবং স্বাস্থ্যখাতে সরকারি বিনিয়োগের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে কমিউনিটি ক্লিনিকের বিদ্যমান নেটওয়ার্ক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, এ ধরনের সেবা মানুষের কাছাকাছি মৌলিক চিকিৎসা পৌঁছে দিতে এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বাস্তব সুফল পেতে প্রয়োজন পর্যাপ্ত ওষুধ, দক্ষ জনবল, মানসম্মত সেবা এবং কার্যকর তদারকি।
ডা. জুবাইদা রহমানের সামনে তাই সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হলো স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে ঘোষিত লক্ষ্যগুলোকে বাস্তব পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত করা। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামো শক্তিশালী করা, নারী স্বাস্থ্যকর্মীদের দক্ষতা কাজে লাগানো, জেলা পর্যায়ে জরুরি চিকিৎসা বাড়ানো এবং রোগ প্রতিরোধে তথ্যভিত্তিক কর্মসূচি চালু করার মতো উদ্যোগ সমন্বিতভাবে এগোলে সাধারণ মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে।
তবে এসব উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের মান, অর্থের যথাযথ ব্যবহার এবং সেবার জবাবদিহির ওপর। নতুন হাসপাতাল কিংবা জনবল নিয়োগের সংখ্যা দিয়ে একা সাফল্য বিচার করা যাবে না। দেখতে হবে, রোগী কত দ্রুত চিকিৎসা পাচ্ছেন, প্রয়োজনীয় ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে কি না, রোগ শনাক্ত করতে কত সময় লাগছে এবং চিকিৎসার খরচে পরিবার কতটা সুরক্ষা পাচ্ছে।
ডা. জুবাইদা রহমানকে স্বাস্থ্যসেবার নতুন রূপকার হিসেবে মূল্যায়নের ভিত্তি এখানেই। তাঁর চিকিৎসক পরিচয়, প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার ওপর জোর, গ্রাম ও শহরের বৈষম্য কমানোর আহ্বান এবং মাতৃ ও শিশুসেবাকে শক্তিশালী করার ভাবনা একটি জনমুখী স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রয়োজনীয় দিকগুলো সামনে এনেছে।
একটি সুস্থ বাংলাদেশ গড়তে হলে স্বাস্থ্যসেবাকে হাসপাতালের সীমানা থেকে বের করে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে তুলতে হবে। যেখানে রোগের আগেই সচেতনতা পৌঁছাবে, অসুস্থতার শুরুতেই চিকিৎসা মিলবে এবং অর্থের অভাবে কারও জীবন ঝুঁকিতে পড়বে না—সেই বাংলাদেশই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য।
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে ডা. জুবাইদা রহমানের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তাঁর ভাবনা যদি কার্যকর নীতি, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং সবার জন্য মানসম্মত চিকিৎসার নিশ্চয়তায় রূপ নেয়, তবে সাধারণ মানুষের কাছাকাছি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠার পথে তা হবে একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি।

রাজু আলীম
কবি, সাংবাদিক, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব