, ,

​সরু গলিতে বহুতল ‘জাদুর খেলা’: রাজউকের নাকের ডগায় যেভাবে অনিয়মের বলি হচ্ছে উত্তরখান

নিউজটি শেয়ার করুন

​ঢাকা: উত্তরার উত্তরখানগামী মাজার রোডের মুসলিম গাজী কমপ্লেক্স (হোল্ডিং ১৮৪৪/এ)। এই কমপ্লেক্সের ডান দিক দিয়ে যে সরু পথটি ভেতরে ঢুকেছে, পরিমাপ করলে তার প্রস্থ দাঁড়াবে মাত্র চার ফুট।

অথচ, সেই চার ফুট গলির ভেতরে, সমস্ত নিয়ম-কানুনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে গেছে এক বিশাল সাত তলা ভবন! বর্তমানে যার ছাদ ঢালাইয়ের কাজ চলছে পুরোদমে।

​নগর উন্নয়ন বিধিমালা অনুযায়ী, এত সংকীর্ণ রাস্তায় কোনোভাবেই বহুতল ভবনের নকশা অনুমোদন পাওয়ার সুযোগ নেই। মাঠ পর্যায়ের একজন ইমারত পরিদর্শক নিজেই ফোনালাপে স্বীকার করেছেন—চার ফুটের রাস্তায় বিলাসবহুল বা বহুতল ভবনের প্ল্যান পাস হওয়া সম্পূর্ণ অসম্ভব।

​তাহলে প্রশ্ন জাগে, কোন আলাদিনের চেরাগের বলে রাজউকের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা ও ইমারত পরিদর্শক— মো:নাজমুল হাসান এর ‘তীক্ষ্ণ দৃষ্টি’ এড়িয়ে এই ব্যয়বহুল ও বিলাসবহুল ইমারত নির্মিত হচ্ছে? জমির মালিকের তো এত বড় দুঃসাহস থাকার কথা নয় যে, রাষ্ট্রীয় আইনকে তোয়াক্কা না করে চোখের পলকে সাত তলা বাড়ি তুলে ফেলবেন। তবে কি এটি কোনো জাদুমন্ত্র, নাকি পর্দার আড়ালের কোনো অলিখিত সমঝোতা?

​আইনি শুভঙ্করের ফাঁকি: কী বলে রাজউকের অফিশিয়াল গেজেট?

​সুপরিকল্পিত নগরায়নের জন্য যেখানে রাজউক বড় বড় মেগা প্ল্যান নিয়ে কাজ করছে, সেখানে একজন চার কাঠা জমির মালিকের এত বড় দুঃসাহস হয় কীভাবে? এর নেপথ্যের মূল জাদুমন্ত্রটি বুঝতে হলে উল্টে দেখতে হবে রাজউকের আইন ও সরকারি গেজেট।

 

 

​প্রকৃতপক্ষে, রাজউক (তৎকালীন ডিআইটি) প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ১৯৫৩ সালের টাউন ইম্প্রুভমেন্ট অ্যাক্ট (Town Improvement Act, 1953) এবং পরবর্তীতে প্রবর্তিত ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো অবস্থাতেই চার ফুট রাস্তার সামনে বহুতল ভবন নির্মাণের অনুমতি দেওয়ার কোনো আইনি সুযোগ বা কোনো বিশেষ গেজেট নেই।

​সর্বশেষ ২০০৮ সালের “মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালা” (যা ৩ এপ্রিল ২০০৮ তারিখে সরকারি গেজেটে প্রকাশিত হয়) এবং চলমান বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ/DAP ২০২২-২০৩৫) এর গেজেট অনুযায়ী:

১. নূন্যতম রাস্তার প্রস্থ: যেকোনো সাধারণ বা বহুতল ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে ভবনের সামনের রাস্তার প্রশস্ততা নূন্যতম ৩.৬ মিটার (প্রায় ১২ ফুট) হতে হবে। রাস্তা এর চেয়ে কম হলে রাজউক কোনোভাবেই নকশা অনুমোদন (Plan Approval) দিতে পারে না। চার ফুট রাস্তায় বহুতল ভবনের অনুমোদন দেওয়া সম্পূর্ণ অবৈধ এবং দণ্ডনীয় অপরাধ।

২. সেট-ব্যাক বা বাধ্যতামূলক খালি জায়গা: বিধিমালার বিধি-৩৯ অনুযায়ী, একটি ভবনের চারপাশে (সামনে, পেছনে ও দুই পাশে) নির্দিষ্ট পরিমাণ জায়গা খালি রাখতে হয়, যাকে ‘সেট-ব্যাক’ বলা হয়। বিশেষ করে ভবনের পাশের বা পূর্বের অংশে পূর্বে নির্মিত কোনো ভবন থাকলে, সেখান থেকে নূন্যতম ১.২৫ মিটার থেকে ১.৫ মিটার (প্রায় ৪ থেকে ৫ ফুট) জায়গা সম্পূর্ণ খালি রেখে নতুন ভবনের দেয়াল তুলতে হয়।

​অথচ উত্তরখানের এই চার কাঠা জমিতে নির্মিত ভবনের মালিক পূর্ব পাশের নির্মিত ও বসবাসরত ৬ তলা বাড়িটি থেকে ন্যূনতম সেট-ব্যাকের জায়গা না ছেড়েই গায়ের জোরে ভবন নির্মাণ করে চলেছেন। রাজউকের কোনো আইনি গেজেট বা ধারা অমান্য করে এমন কাজ করার কোনো সুযোগ নেই। তাহলে এই দুঃসাহসের উৎস কোথায়? এর নেপথ্যের পরিকল্পনাকারী ও কারিগর খোদ রাজউকেরই কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী, যারা অর্থের বিনিময়ে এবং নিজেদের ক্ষমতার অপব্যবহার করে পরিকল্পিত নগরায়নের বিরুদ্ধে কাজ করছেন।

​নাগরিক নিরাপত্তা ও মানবিক স্থান কোথায়?

​একটি বারের জন্যও কি ভাবা হয়েছে এই ভবনের বাসিন্দাদের নিরাপত্তার কথা?

​জরুরি চিকিৎসা: মাঝরাতে কোনো মানুষ গুরুতর অসুস্থ হলে তাকে অ্যাম্বুলেন্সে তোলার মতো ন্যূনতম জায়গা কি এই চার ফুটের গলিতে আছে?

​ফায়ার সার্ভিস: আকস্মিক অগ্নিকাণ্ড ঘটলে ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ি ঢোকা তো দূরের কথা, ফায়ার ফাইটারদের হেঁটে প্রবেশ করাই যেখানে দায়, সেখানে জানমালের নিরাপত্তা দেবে কে?

​মরদেহের সম্মান: কোনো মানুষ মারা গেলে তার মরদেহটি খাটিয়ায় করে বের করার মতো মানবিক স্থানটুকুও কি অবশিষ্ট রাখা হয়েছে?

​তথ্য গোপন ও রাজকীয় উদাসীনতা

 

​রাজউকের সুনির্দিষ্ট বিধিমালা অনুযায়ী, আওতাধীন এলাকায় যেকোনো ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে একটি সাধারণ কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাধ্যবাকতা রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, নির্মাণাধীন ভবনের ঠিক সম্মুখভাগে রাজউক কর্তৃক অনুমোদিত প্ল্যান বা নকশার যাবতীয় খুঁটিনাটি তথ্য—যেমন স্মারক নম্বর, অনুমোদনের তারিখ, তলার সংখ্যা এবং ভবনের ধরন—একটি দৃশ্যমান সাইনবোর্ডে প্রদর্শন করতে হয়। একে বলা হয় ‘বাড়ি নির্মাণ তথ্যাবলী’। এই তথ্যবোর্ডের মূল উদ্দেশ্যই হলো স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীদের কাছে ভবনের বৈধতা নিশ্চিত করা এবং নির্মাণ কাজে স্বচ্ছতা বজায় রাখা।

​অথচ উত্তরখানের এই বিতর্কিত সাত তলা ভবনের সামনে এমন কোনো তথ্যবোর্ডের নামনিশানাও নেই। পুরো নির্মাণ প্রক্রিয়াই যেন এক গভীর রহস্যের চাদরে ঢাকা। রাজউকের এই বাধ্যতামূলক নিয়মটি এভাবে প্রকাশ্যে লঙ্ঘন করা সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। তথ্যবোর্ড ঝুলিয়ে রাখলে যেখানে রাজউকের অনুমোদনের শুভঙ্করের ফাঁকি ও জালিয়াতি জনসম্মুখে সবার চোখে পড়ে যাবে, সেখানে তথ্য গোপন রাখাই কি তবে সংশ্লিষ্টদের জন্য বেশি নিরাপদ? এই নীরবতাই প্রমাণ করে, নিয়মের তোয়াক্কা না করে অন্ধকারেই চলছে এই বহুতল ‘জাদুর’ খেলা।

​সর্ষের ভেতরেই ভূত? কর্মকর্তাদের এড়িয়ে যাওয়ার অপকৌশল

​সবুজ ও পরিকল্পিত নগরী গড়ার প্রত্যয়ে রাজউককে রাষ্ট্রীয়ভাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু যখন চোখের সামনে সমস্ত স্বচ্ছতা ধূলিসাৎ করে, পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে এবং জনজীবনকে চরম ঝুঁকিতে ফেলে এমন আবাসন গড়ে ওঠে, তখন ধরে নিতেই হয়—সর্ষের ভেতরেই ভূত লুকিয়ে আছে। সংশ্লিষ্ট (মো: নাজমুল হাসান)এই কর্মকর্তার অজ্ঞাতসারে এত বড় স্থাপনা তৈরি হওয়া স্রেফ অসম্ভব।

​এই অনিয়মের ব্যাপারে বক্তব্য জানতে পুরো দিনজুড়ে রাজউকের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা মো: নাজমুল হাসান এর সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও উনাকে ডেস্কে বা টেবিলে পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার মধ্যে এক ধরনের চরম অনীহা ও এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।

​ইমারত পরিদর্শক নাজমুল হাসানের সাথে যখন ফোনালাপ সম্ভব হয়, তখন তিনি দায় এড়ানোর এক চতুর কৌশল বেছে নেন। তিনি ফোনে অত্যন্ত সংক্ষিপ্তভাবে নিজেকে খুব ব্যস্ত মানুষ হিসেবে তুলে ধরেন এবং এমন ভাব করেন যেন এই সমস্যাগুলো কোন সমস্যাই না। মূল ঘটনাকে ধামাচাপা দেওয়া এবং ওই বিতর্কিত স্থানটি এড়িয়ে যাওয়ার জন্যই মূলত তিনি এই সংক্ষিপ্ত রূপটি ব্যবহার করেন। অথচ ‘কনস্ট্রাকশন ইন্সপেক্টর’ বা ইমারত/নির্মাণ পরিদর্শক; যা স্পষ্টভাবেই প্রমাণ করে যে পুরো বিষয়টি তার কর্মপরিধি ও মাঠ পর্যায়ের তদারকির ভেতরেই পড়ে। ফলে কেবল দাই ছাড়া ভাবে কথা বলে দিলেই এমন গুরুদায়িত্ব থেকে দায়মুক্ত হওয়া যায় না।

তার এই অনমনীয় নীরবতা ও দ্রুত কথা শেষ করার চেষ্টা প্রমাণ করে যে, তার দুর্বলতা ও দায়বদ্ধতাহীনতা বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত। গণমাধ্যমের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা তো দূরের কথা, তিনি যেন এই তথ্য থেকে যত দূরে সরে থাকতে পারেন, ততই বাঁচেন। সংশ্লিষ্ট এই কর্মকর্তার এমন আচরণে স্পষ্ট যে—যা তথ্য গোপন আছে তা গোপনই থাক, আর যেভাবে আইন অমান্য করে ত্রুটিপূর্ণ নগরায়ন ও ভবন নির্মাণ কাজ চলছে, সেভাবেই চলতে থাকুক।

​ এই রহস্যজনক নীরবতা, উদাসীনতা এবং পলায়নপরতা কি কোনো বড়সড় বিপর্যয়ের অপেক্ষা করছে? জবাবদিহিতা আর কতদূর?

​(ধারাবাহিক হবে…)