, ,

রাজনগরে উচ্ছেদ আতঙ্কে ৩০ পরিবার: উত্তরভাগ চা বাগান কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ভিটেমাটি দখলের অভিযোগ

নিউজটি শেয়ার করুন

মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার উত্তরভাগ ইউনিয়নে দীর্ঘ ছয় দশক ধরে বসবাস করা ২৫-৩০টি পরিবার এখন ভিটেমাটি হারানোর চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। উত্তরভাগ চা বাগান কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কোনো পূর্ব নোটিশ ছাড়াই জোরপূর্বক উচ্ছেদের চেষ্টার অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় কালাইগুল ও মুটুকপুর গ্রামের বাসিন্দারা। এ ঘটনায় ওই এলাকায় বর্তমানে চরম উত্তেজনা ও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

ঘটনার নেপথ্যে: দীর্ঘ আইনি লড়াই ও বর্তমান সংকট
অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজনগরের উত্তরভাগ টিজি মৌজায় অবস্থিত ‘উত্তরভাগ চা বাগান’ ১৯৯২ সাল থেকে পলিমান এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিজ নিয়ে পরিচালনা করে আসছে। তবে বিমলানগর চা বাগানের তৎকালীন মালিক সিদ্ধার্থ সাম ওই মৌজার ৪৬ একর জমির মালিকানা দাবি করে ২০১৩ সালে একটি মামলা করেন। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে গত বছরের ২৮ অক্টোবর আদালত উত্তরভাগ চা বাগানের পক্ষে রায় প্রদান করেন।

আদালতের এই রায় আসার পর থেকেই বাগান কর্তৃপক্ষ ওই জমিতে যুগ যুগ ধরে বসবাসরত পরিবারগুলোকে উচ্ছেদ করে জমিটি নিজেদের দখলে নেওয়ার তোড়জোড় শুরু করে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, তাৎক্ষণিক এই রায়ের পর চা বাগান কর্তৃপক্ষ তাদেরকে কিছুই জানায়নি। আর
এখান থেকেই শুরু হয় সংকটের।
ভুক্তভোগীদের আহাজারি: ‘কোথায় যাব আমরা?’
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দাবি, তারা পাকিস্তান আমল থেকে অর্থাৎ প্রায় ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ওই জমিতে সেমিপাকা ঘর তৈরি করে এবং গাছগাছালি রোপণ করে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন।

শামিম মিয়া (বাসিন্দা, মুটুকপুর): তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “আমাদের পূর্বপুরুষরা এখানে জন্মেছেন, আমরাও বড় হয়েছি। এখন বাগান কর্তৃপক্ষ আমাদের ওপর হামলা ও মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করছে। মাথা গোঁজার একমাত্র ঠাঁইটুকু রক্ষায় আমরা বাধ্য হয়ে মৌলভীবাজার জজ আদালতে মামলা করেছি।”মামলা নং৪৩/২৬

ফুলেছা বেগম (ভুক্তভোগী): কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি বলেন, “৬০ বছর ধরে এই মাটিতে আমাদের রক্ত-ঘাম মিশে আছে। এখন হুট করে আমাদের তাড়িয়ে দিলে আমরা পরিবার নিয়ে কোথায় দাঁড়াব? আমাদের যাওয়ার কোনো জায়গা নেই।”

বাগান কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
অভিযোগ অস্বীকার করে উত্তরভাগ চা বাগানের ব্যবস্থাপক মো. লোকমান আহমদ চৌধুরী বলেন, “আদালতের রায় অনুযায়ী ওই ৪৬ একর জমির আইনগত মালিক উত্তরভাগ বাগান। এর মধ্যে ৭-৮ একর জমি এখনো অবৈধ দখলে রয়েছে। আমরা শুধু আমাদের জমি বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য বলেছি। কিন্তু কিছু স্বার্থান্বেষী ভূমিখেকো লোক সাধারণ মানুষকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে আমাদের স্টাফদের ওপর হামলা করেছে।” তিনি আরও দাবি করেন, দুটি পরিবার স্বেচ্ছায় জমি ছেড়ে দিলেও একটি পক্ষ অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে।

সচেতন মহলের ধারণা : জনবসতি এলাকায় চা বাগান করার জন্য সরকার লিজ দিতে পারে না,
ভুক্তভোগীরা জানান, জেলা প্রশাসক কে ভুল তথ্য দিয়ে চা বাগান কর্তৃপক্ষ লিজ নিয়েছে।

আশঙ্কা ও স্থানীয় উদ্বেগ
বর্তমানে কালাইগুল ও মুটুকপুর গ্রামে এক শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা বিরাজ করছে। একদিকে ভিটেমাটি রক্ষার মরণপণ লড়াই, অন্যদিকে আদালতের রায়ের দোহাই দিয়ে দখল বুঝে নেওয়ার চেষ্টা—উভয় পক্ষের অনড় অবস্থানে যেকোনো সময় বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

মানবিক দিক বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘদিনের বসতি স্থাপনকারী এই পরিবারগুলোর পুনর্বাসন বা সুষ্ঠু সমাধানের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এখন দেখার বিষয়, আইনি মারপ্যাঁচ আর মানবিকতার এই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত জয় কার হয়।