কয়েক দশক ধরে প্রভাবশালী মহল ও বননির্ভর জনগোষ্ঠীর অব্যাহত জবরদখলে পড়ে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে টাঙ্গাইল বন বিভাগ। বিশাল এলাকার শালবন ও প্রাকৃতিক বনাঞ্চল কেটে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে আনারস, কলা, পেঁপে, আদা ও হলুদের ক্ষেত। পাশাপাশি অবৈধ ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাটবাজার তৈরি করে দখল করা হয়েছে হাজার হাজার একর জমি। ফলে দেশের অন্যতম প্রাচীন এ প্রাকৃতিক বনাঞ্চল জীববৈচিত্র্য হারিয়ে এখন মরুভূমিতে পরিণত হতে চলেছে।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, টাঙ্গাইলের মধুপুর, ঘাটাইল, কালিহাতী, মির্জাপুর ও সখিপুর উপজেলার ১৪২টি মৌজা নিয়ে গঠিত এই বন বিভাগের মোট ভূমির পরিমাণ ১ লাখ ২২ হাজার ৮৭৬ দশমিক ৯ একর। তবে বর্তমানে এরই মধ্যে প্রায় ৫৮ হাজার ৭৭৪ একর ভূমিই বেদখল হয়ে গেছে। যদিও সাম্প্রতিক অভিযানে কিছু জমি উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, এখনও প্রায় ৩৬ হাজার ৪৮৩ একরের বেশি বনভূমি সরাসরি দখলদারদের কবজায় রয়ে গেছে। মির্জাপুরে গেজেটভুক্ত বনের অর্ধেকের বেশি এবং সখিপুরে ৪৭ হাজার একরের মধ্যে ২৬ হাজার একর জমিই চলে গেছে দখলে। ঘাটাইল ও মধুপুরের চিত্রও একই রকম ভয়াবহ।
ঐতিহাসিক আটিয়া ফরেস্টের অংশ হিসেবে ১৮৭৮ ও ১৯২৭ সালের বন আইনে সুরক্ষিত হওয়া এ বনে সমস্যা বহুমাত্রিক। ভূমির রেকর্ডে জটিলতা, স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সঙ্গে বিরোধ এবং সামাজিক বনায়নের নামে প্রভাবশালী চক্রের জমি দখলের কারণে বন উদ্ধার অভিযান প্রতিনিয়ত বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফরেস্ট অফিসাররা সীমানা চিহ্নিত বা উদ্ধার অভিযানে গেলে আন্দোলনের নামে বাধা দেয় প্রভাবশালী মহল
বন ধ্বংসের সরাসরি প্রভাব পড়েছে মধুপুর গড়ের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও বন্যপ্রাণীর ওপর। আগে যেখানে চিতাবাঘ, হাতি, ময়ূর, হরিণ ও লালমুখ বানরের অবাধ বিচরণ ছিল, সেখানে বিদেশি আকাশমণি ও ইউক্যালিপটাসের বাণিজ্যিক রোপণের কারণে পাখির সংখ্যা ও বন্যপ্রাণীর প্রজাতির সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। বনের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকা গারো বা মান্দে জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী জীবনযাত্রাও এতে বড় ধাক্কা খেয়েছে।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ইউনুছ মিয়া জানান, অবৈধ ভূমি দখল, কৃষি সম্প্রসারণ ও বিদেশি প্রজাতির বৃক্ষরোপণের ফলে প্রাকৃতিক বনের গুণগত মান নষ্ট হয়েছে। বন রক্ষায় কৃষি-বনব্যবস্থা (অ্যাগ্রোফরেস্ট্রি) এবং স্থানীয় বননির্ভর জনগণকে যৌথ বন ব্যবস্থাপনায় অন্তর্ভুক্ত করা ছাড়া টেকসই কোনো বিকল্প নেই। দখলদারদের হাত থেকে বনভূমি রক্ষায় জরুরি ও প্রশাসনিক কঠোর পদক্ষেপ চান পরিবেশবিদরা।






