, ,

পরশুরাম পৌর ও উপজেলা ভূমি অফিসে দালালচক্রের দাপট সহ ঘুষ বাণিজ্য অব্যাহত 

নিউজটি শেয়ার করুন

পরশুরাম পৌর ও উপজেলা ভূমি অফিসে দালালচক্রের দাপট সহ ঘুষ বাণিজ্য অব্যাহত বার বার সংবাদ প্রকাশের পরও নেই কোন দৃশ্যমান ব্যবস্থা । 
পরশুরাম উপজেলা ও পৌর ভূমি অফিসকে ঘিরে ঘুষ বাণিজ্য, দালাল সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য এবং সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের হয়রানির অভিযোগ দীর্ঘদিনের ।
সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে এই সংক্রান্ত খবর প্রকাশিত হলেও এখনো পর্যন্ত কার্যকর কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বরং অভিযোগ রয়েছে, সময় যত গড়াচ্ছে, ততই আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে দালাল চক্র ও অফিস সংশ্লিষ্টদের ঘুষ বাণিজ্য। ফলে ভূমি অফিসে প্রতিদিনই বাড়ছে জনভোগান্তি, প্রতারণা এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় এলাকাবাসী, সেবাগ্রহীতা এবং সচেতন মহল।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পরশুরাম উপজেলা ও পৌর ভূমি অফিসে নামজারি, খতিয়ান, পর্চা, জমি খারিজ, আরওআর খসড়া, মাঠ পর্চা ও অন্যান্য ভূমি-সংক্রান্ত সেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে পড়তে হচ্ছে দালালদের এবং অফিস সংশ্লিষ্টদের খপ্পরে। সরকারি ফি’র বাইরে অতিরিক্ত অর্থ না দিলে দিনের পর দিন ফাইল আটকে রাখা, অযথা জটিলতা তৈরি করা কিংবা আবেদন নিয়ে ঘোরানোর মতো নানা কৌশলে হয়রানি করা হচ্ছে।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযোগ প্রকাশের পর ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে সংশোধনের ব্যবস্থা সহ বাস্তবে এখনো কোনো দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। ভূমি অফিস এলাকায় দালালদের আনাগোনা যেমন ছিল, তেমনি আছে এবং তেমনিই আছে অফিসে ঘুষ বাণিজ্য। বরং অনেকে বলছেন, “ বার বার সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশের পর কয়েকদিন কিছুটা হলে ও তেমন সতর্কতা দেখা যায়নি এবং আগের মতোই চলছে সব।” অনেকের মতে উপজেলা ভুমি কর্মকর্তার মদদ পুষ্ট হয়ে এসব চলছে এবং তিনি যতই দূর্নীতি ও দালালদের বিরুদ্ধে বলেন কিন্তু এর দায় এড়াতে পারেন না বর্তমান উপজেলা ভুমি কর্মকর্তা।‌ আবার এই উপজেলা ভুমি অফিসের সাথে দূর্নীতি ও দালাল চক্রের সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে সমান গতিতে চলছে পৌর ভূমি অফিস ও।
সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ভূমি অফিসের সামনে ও আশপাশে প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কয়েকজন চিহ্নিত দালাল ব্যক্তি অবস্থান করেন। এছাড়া ও রয়েছে পরশুরাম উপজেলা সাব রেজিস্ট্রার অফিসের নকল নবিশ সহ কয়েকজন দলিল লিখক।তারা সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে কথা বলে নিজেদের ভুমি অফিসের ‘সহযোগী’ বা ‘কম্পিউটার দোকানের লোক’ হিসেবে পরিচয় দেন। পরে বিভিন্ন সেবা দ্রুত পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেন। আবার এছাড়া জমিতে কোন প্রকার আইনি সমস্যা থাকলে ওইসব দালালরা নিজে উপস্থিত থেকে শুনানী ও করে দেয়। ওইসব দালালদের সঙ্গে ভুমি কর্মকর্তাদের রয়েছে দহরম মহরম সম্পর্ক।
স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করে বলেন, দালালের মাধ্যমে যোগাযোগ না করলে ফাইল সামনে এগোয় না। অনেক ক্ষেত্রে অফিসের ভেতরে আবেদন জমা দেওয়ার পরও পরে জানানো হয়—“কাগজে সমস্যা আছে”, “আরও কিছু লাগবে”, কিংবা “সময় লাগবে”। এরপরই দালালদের মাধ্যমে সমাধানের প্রস্তাব আসে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, জমির ধরন ও সেবার ওপর নির্ভর করে ৫ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ দাবি করা হচ্ছে। নামজারি, খারিজ, পর্চা ও খতিয়ান তুলতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি হয়রানির শিকার হচ্ছেন সাধারণ কৃষক, প্রবাসীর পরিবার এবং ভূমি-সংক্রান্ত বিষয়ে অনভিজ্ঞ মানুষজন।
একাধিক সেবাগ্রহীতা জানান, সরকারি ফি খুবই সীমিত হলেও দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়ায় কয়েক গুণ বেশি টাকা গুনতে হচ্ছে। কেউ টাকা দিতে না চাইলে তার ফাইল দীর্ঘদিন পড়ে থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পরশুরাম উপজেলা ও পোস্ট অফিস সংলগ্ন কয়েকটি কম্পিউটার দোকানকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে আরেকটি দালাল সিন্ডিকেট। দোকানগুলোর আড়ালে আবেদনপত্র পূরণ, কাগজপত্র সংগ্রহ, খসড়া তৈরি এবং ফটোকপির নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, দালালরা নিজেদের কম্পিউটার দোকানের কর্মচারী পরিচয় দিলেও তাদের সঙ্গে উপজেলা ভূমি কর্মকর্তার ইশারায় অফিসের ভেতরের কিছু অসাধু ব্যক্তির নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অফিসে জমা দেওয়া ফাইল ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্বিত করে পরে ওই দোকানের লোকজনের মাধ্যমে ‘সমাধান’ দেওয়া হয়।
বিশ্বস্ত সুত্রে অভিযোগ আছে যে কিছু কিছু দালাল একেবারে নিজস্ব অফিস খুলে সেখানে নানা ধরনের ফাইল পত্র রেখে সেবাগ্রহিতাদের সাথে দেনদরবার ও করে থাকেন । এছাড়া অনেক দালাল এবং দলিল লিখক নিজেদের এ্যাসিল্যান্ডের ঘনিষ্ঠ জন বলে ও বহুদিন থেকেই প্রচার করে আসছেন। তারা বিভিন্ন চা দোকানে বসে লোকজনের সামনে এইসব কথা প্রচার করে থাকে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, অফিসের ভেতরে ও বাইরে একটি অদৃশ্য সমন্বয়ের মাধ্যমেই এই চক্র পরিচালিত হচ্ছে। ফলে প্রকৃত সেবাগ্রহীতারা বাধ্য হয়েই দালালের দ্বারস্থ হচ্ছেন।
অনুসন্ধানকারী সূত্র ও স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, এই দালাল চক্রের সঙ্গে জড়িত কয়েকজনের নামও সামনে এসেছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন
শহিদুল ইসলাম ভুট্টো , সবুজ, পারভেজ, মাসুম দলিল লিখক সায়েম, ইলিয়াস, নেজাম উদ্দীন, সাব রেজিস্ট্রার অফিসের নকল নবিশ সাদ্দাম ও তার ভাই বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য।
স্থানীয়দের দাবি, এরা এবং এদের মনোনীত প্রতিনিধিরা প্রতিদিন অফিসের আশপাশে অবস্থান করে সেবাগ্রহীতাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। কেউ সরাসরি অফিসে গিয়ে কাজ করতে চাইলে অফিস সংশ্লিষ্টরা কাগজপত্রে বিভিন্ন সমস্যার কথা বলে দালাল দের কাছে পাঠিয়ে দেয়া হয়।
তবে অভিযুক্তদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কেউই ফোন রিসিভ করেননি।
এই অভিযোগের বিষয়ে পরশুরাম উপজেলা ভূমি কর্মকর্তা শাফায়েত আক্তার নুর অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “আপনি তো আমার কতৃপক্ষ নন। আপনার কাছে কেন এবিষয়ে অভিযোগ যাবে? তিনি বলেন অন্য কোন সাংবাদিক এই বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ করছেনা কিন্তু আপনি কেন প্রকাশ করছেন! তিনি জানতে চান পরশুরাম প্রেস ক্লাবের সভাপতি তো আপনার অথোরিটি । নিউজ করার আগে ওনার অনুমতি নিয়েছেন কিনা? পরিশেষে তিনি বলেন “আমি বরং দালাল চক্র এবং দূর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছি। এ কারণেই আমাকে জড়িয়ে বিভিন্ন অভিযোগ তোলা হচ্ছে।
তবে সরেজমিনে উপজেলা ভূমি কর্মকর্তার কথার সাথে প্রকৃত মিল খুঁজে পাওয়া যায় নি।
, অফিস এলাকায় দালালদের উপস্থিতিসহ কোন প্রকার দূর্নীতি ও বন্ধ হয়নি। বরং স্থানীয়দের অভিযোগ, আগের মতোই অফিসের আশপাশে তাদের তৎপরতা রয়েছে এবং অফিসে ভুমি সংক্রান্ত কোন অর্থনৈতিক দূর্নীতি ও একটু কমেনি।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে—যদি দালালদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে এখনো কীভাবে প্রকাশ্যে তারা অফিস এলাকায় যায় এবং প্রশাসনের চোখের সামনে এমন একটি চক্র কীভাবে দিনের পর দিন সক্রিয় থাকে—সেই প্রশ্নও তুলছেন স্থানীয়রা।
এত এত অভিযোগ এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পরও এখনো পর্যন্ত কোনো অভিযান, প্রশাসনিক ব্যবস্থা কিংবা দালালমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত হওয়ার মতো দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখা যায়নি বলে দাবি এলাকাবাসীর। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, কেবল আশ্বাস দিয়ে এ ধরনের অনিয়ম বন্ধ করা সম্ভব নয়। মাঠপর্যায়ে কঠোর নজরদারি, দালালদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান, অফিসে সিসিটিভি মনিটরিং সহ অভিযোগ গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা চালু না করলে এই দুর্নীতির চক্র ভাঙা সম্ভব হবে না। স্বচ্ছতা না এলে কমবে না জনভোগান্তি।ভূমি অফিসকে ঘিরে গড়ে ওঠা ভিতরে বাইরে এই সিন্ডিকেটের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। সরকারি সেবা পেতে গিয়ে হয়রানি, অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং প্রতারণার শিকার হয়ে অনেকেই নীরবে ফিরে যাচ্ছেন। কেউ কেউ জমি-সংক্রান্ত কাজের জন্য ধার-দেনা করে টাকা জোগাড় করতেও বাধ্য হচ্ছেন।
স্থানীয় নাগরিক সমাজের নেতৃবৃন্দের দাবি, অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা তদন্ত করে প্রয়োজন হলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।
তাদের ভাষায়, “স্মার্ট বাংলাদেশের কথা বলা হলেও, মাঠপর্যায়ে যদি সাধারণ মানুষ ঘুষ ছাড়া ভূমি অফিসে সেবা না পায়, তাহলে রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবেই।”
পরশুরাম উপজেলা ও পৌর ভূমি অফিসে দালাল সিন্ডিকেট ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ নিয়ে প্রশাসন শেষ পর্যন্ত কী পদক্ষেপ নেয়—এখন সেদিকেই তাকিয়ে আছে স্থানীয় জনসাধারণ, সচেতন মহল এবং ভুক্তভোগী সেবা গ্রহীতারা।