বছরব্যাপী নজরুল বর্ষ উদ্যাপনের অংশ হিসেবে ময়মনসিংহে শুরু হয়েছে দুই দিনব্যাপী লোকজ সাংস্কৃতিক মেলা। জেলা প্রশাসন, ময়মনসিংহের আয়োজনে শুক্রবার (৩০ অক্টোবর ২০২৬) মেলার প্রথম দিনে পরিবেশিত হয় বাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকজ সংগীত পালাগান। সমাজ রূপান্তর সাংস্কৃতিক সংঘের শিল্পীরা ‘গুরু-শিষ্য’ শিরোনামে এই পালাগান পরিবেশন করেন। এতে শিষ্যের ভূমিকায় ছিলেন বাউল মো. হাফিজ উদ্দিন এবং গুরুর ভূমিকায় ছিলেন বাউল স্বদেশ তালুকদার।
ময়মনসিংহের শিল্পাচার্য জয়নুল উদ্যানের বৈশাখী মঞ্চে পালাগানের পরিবেশনা দেখতে দর্শকদের উপচে পড়া ভিড় জমে। দীর্ঘদিন পর নগরীর কোনো উন্মুক্ত মঞ্চে ঐতিহ্যবাহী পালাগানের এমন আয়োজন দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করে। উপস্থিত সংস্কৃতিপ্রেমীরা মুগ্ধ হয়ে উপভোগ করেন গুরু-শিষ্যের কথোপকথন, প্রশ্নোত্তর, তত্ত্বকথা ও সুরের লড়াই।
পালাগান বাংলার লোকজ সংস্কৃতির একটি প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ সংগীতধারা। বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে এই গানের বিশেষ জনপ্রিয়তা রয়েছে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন গ্রামীণ জনপদে মেলা, উৎসব ও সাংস্কৃতিক আসরে পালাগান পরিবেশিত হয়ে আসছে। পৌরাণিক কাহিনি, ঐতিহাসিক ঘটনা, আধ্যাত্মিক দর্শন এবং লৌকিক প্রেমকাহিনি পালাগানের অন্যতম বিষয়বস্তু। সাধারণত দুজন প্রধান গায়েন গানের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন জীবনদর্শন, ধর্মীয় তত্ত্ব, শরিয়ত-মারফত ও মানবজীবনের নানা প্রশ্ন তুলে ধরেন। তাঁদের প্রশ্নোত্তর, যুক্তি ও সুরের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে চলে পালার আখ্যান। অনেক ক্ষেত্রে একটি টপ্পা গানের মধ্য দিয়ে পালাগানের সূচনা হয়। সেই গানের বিষয় ও সুরের সূত্র ধরেই পরবর্তী পরিবেশনা বিস্তৃত হয়।
সময়ের পরিবর্তন, পৃষ্ঠপোষকতার অভাব এবং নিয়মিত পরিবেশনার সুযোগ কমে যাওয়ায় পালাগানের চর্চা বর্তমানে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। গ্রামীণ কিছু এলাকায় এই গানের আসর টিকে থাকলেও শহরাঞ্চলে এর উপস্থিতি অনেকটাই কম। নতুন প্রজন্মের কাছে পালাগান পরিচিত করে তোলা এবং শিল্পীদের নিয়মিত পরিবেশনার সুযোগ সৃষ্টি করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
এমন বাস্তবতায় ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজিত লোকজ সাংস্কৃতিক মেলায় পালাগানের পরিবেশনা দর্শকদের মধ্যে নতুন করে আগ্রহ তৈরি করেছে। আয়োজকদের প্রচারণার ফলে বৈশাখী মঞ্চে বিভিন্ন বয়সী মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। দর্শকদের অনেকে মনে করেন, রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতায় নিয়মিত এমন আয়োজন করা হলে পালাগানের মতো লোকজ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মও নিজেদের শেকড়ের সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবে।
পালাগান পরিবেশনকারী সংগঠন সমাজ রূপান্তর সাংস্কৃতিক সংঘের সভাপতি ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘বাঙালি জাতির রয়েছে সমৃদ্ধ লোকজ সংস্কৃতির বিশাল ভান্ডার। পালাগান সেই ঐতিহ্যের অন্যতম মূল্যবান উপাদান। কিন্তু যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এই শিল্পধারা হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আজকের মতো ভবিষ্যতেও প্রশাসন এভাবে এগিয়ে এলে পালাগানের চর্চা বন্ধ হবে না। বরং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এই ঐতিহ্য বেঁচে থাকবে।’
মেলার প্রথম দিনের এই আয়োজন প্রমাণ করেছে, মানুষের মধ্যে লোকজ সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ এখনো রয়েছে। প্রয়োজন শুধু নিয়মিত চর্চা, শিল্পীদের যথাযথ মূল্যায়ন এবং পরিবেশনার উপযুক্ত মঞ্চ। ময়মনসিংহের বৈশাখী মঞ্চে গুরু-শিষ্যের পালাগান সেই সাংস্কৃতিক ধারাকে নতুন করে শ্রোতাদের সামনে তুলে ধরেছে।







