, ,

দেশবাসী হতাশ : এসব হচ্ছেটা কি ?- অধ্যক্ষ খান আখতার হোসেন

নিউজটি শেয়ার করুন

২০২৬ সালের ২০-২১ জুলাই। ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন, সামাজিক মাধ্যম এবং গণমাধ্যমের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতা গাজী নজরুল ইসলাম। কারণ একটি ভাইরাল ভিডিও।

ভিডিওতে একজন পুরুষ ও একজন তরুণীকে একটি অফিস কক্ষে দেখা যায়। এরপর শুরু হয় পাল্টাপাল্টি বিবৃতি, অভিযোগ, পাল্টা-অভিযোগ। একদিকে এমপির দাবি “এটি আমার দ্বিতীয় স্ত্রী, চাঁদাবাজির শিকার”। অন্যদিকে সাবেক ড্রাইভারের দাবি “একাধিক স্থানে অপ্রাপ্তবয়স্ক তরুণীর সঙ্গে অনৈতিকতা, সিসিটিভি ফুটেজ আছে”। মাঝখানে জামায়াতের সাংগঠনিক অবস্থান, তরুণী ও তার বাবার বক্তব্য, এবং সময়-তারিখ নিয়ে বিভ্রান্তি।

এই প্রতিবেদনে তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে ঘটনার ধারাবাহিকতা, বিতর্কের মূল পয়েন্ট এবং অসঙ্গতিগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।

২০ জুলাই ২০২৬, সোমবার রাত। ফেসবুক, ইউটিউব ও কয়েকটি অনলাইন পোর্টালে একটি সিসিটিভি ফুটেজ ছড়িয়ে পড়ে। ফুটেজে দেখা যায় ঢাকার মগবাজার এলাকার একটি অফিস রুমে একজন পুরুষ ও একজন তরুণী বসে আছেন। কিছুক্ষণ পর কয়েকজন লোক রুমে প্রবেশ করে। ভিডিওর ক্যাপশনে দাবি করা হয় এটি “জামায়াত এমপি গাজী নজরুল ইসলামের ভিডিও”। প্রথমে এমপির সমর্থকদের একাংশ দাবি করেন এটি এআই দিয়ে বানানো। কিন্তু ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সেই দাবি নিজেই ভেঙে দেন।

২১ জুলাই ২০২৬, মঙ্গলবার সকাল। ভিডিও ভাইরাল হয়। সারাদিন ধরে চলে আলোচনা- সমালোচনা। টকশো, ইউটিউব লাইভ, ফেসবুক পোস্টে ঝড় ওঠে। প্রশ্ন একটাই, একজন সংসদ সদস্য, একজন ইসলামী দলের নেতা, তার আচরণ কি নৈতিকতার সীমার মধ্যে আছে?

২১ জুলাই ২০২৬, বিকেল। গাজী নজরুল ইসলাম নিজে একটি লিখিত বিবৃতি দেন। বিবৃতিতে তিনি বলেন, ভিডিওতে থাকা তরুণী তার “দ্বিতীয় স্ত্রী মোছা. মারিয়াম বেগম”। ঘটনাটি ঘটেছে ১৩ জুলাই ২০২৬, মগবাজারে দ্বিতীয় স্ত্রীর বাবা মো. মাছুম বিল্লাহর অফিসে। তারা সেখানে “সোয়া এক ঘণ্টা” অবস্থান করেন। গাড়িচালক ওবায়দুল্লাহ পরিকল্পনা করে ৫-৭ জন লোক এনে ১ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। রাতে ওবায়দুল্লাহ আরও ১৫ লাখ টাকা চাঁদা চেয়ে হুমকি দেয়। ওবায়দুল্লাহই “হিংসা ও স্বার্থের বশবর্তী হয়ে” সিসি ক্যামেরার ফুটেজ ফাঁস করেছে। এমপির দাবি, এটি “সম্পূর্ণ বেআইনি, হিংসাত্মক, চক্রান্তমূলক এবং চরিত্র হননের সামিল”।

কিন্তু এই বিবৃতির আগেই আরেকটি চিঠি পৌঁছে যায় প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দপ্তরে। ভিডিও ফাঁসের একদিন আগে ২০ জুলাই সোমবার গাজী নজরুলের সাবেক গাড়িচালক ও ব্যক্তিগত সহকারী ওবায়দুর রহমান একটি লিখিত আবেদন জমা দেন। আবেদনে ওবায়দুর রহমানের অভিযোগগুলো ছিল বিস্ফোরক। তিনি বলেন ১৪ জুলাই রাত সাড়ে ১টায় পল্লবীর উত্তর কালশীর “রোজ গার্ডেন টাওয়ার ২”-এর ডি-২ ফ্ল্যাটে তাকে লাঠিসোঁটা দিয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা করা হয়। হামলাকারী হিসেবে তিনি আমিন নামের চাকরিচ্যুত সাবেক এসআই, মাসুম বিল্লাহ ও মোক্তাসিম বিল্লাহর নাম উল্লেখ করেন। তার মা ও বোন তাকে উদ্ধার করে কুর্মিটোলা হাসপাতালে ভর্তি করেন। এই হামলার “প্রধান নেপথ্য নির্দেশদাতা” হিসেবে তিনি সাতক্ষীরা-৪ আসনের এমপি গাজী নজরুল ইসলামের নাম উল্লেখ করেন। ওবায়দুর দাবি করেন, দীর্ঘদিন ড্রাইভার হিসেবে কাজ করার সময় তিনি এমপির “নানা দুর্নীতি, জমি দখল, বালু মহাল দখল, ঘুষ গ্রহণ এবং নারীঘটিত অনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী”। লিখিত আবেদনে তিনি স্পষ্ট উল্লেখ করেন, “এমপি গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে একাধিক স্থানে অপ্রাপ্তবয়স্ক তরুণীকে নিয়ে অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও সিসিটিভি ফুটেজে তার প্রমাণ” রয়েছে। ওবায়দুর বর্তমানে আত্মগোপনে আছেন এবং জীবনের নিরাপত্তা চেয়েছেন।

ঘটনা ভাইরাল হওয়ার পর ২১ জুলাই বিকেলে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় প্রচার সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের একটি বিবৃতি দেন। বিবৃতিতে তিনি বলেন “বিষয়টি নিয়ে গাজী নজরুল ইসলামের নিজের বিবৃতি, তার প্রথম ও দ্বিতীয় স্ত্রী এবং দ্বিতীয় স্ত্রীর বাবার ভিডিও বক্তব্য মিডিয়াতে প্রকাশিত হয়েছে। এ বিষয়ে আরও খোঁজখবর নিয়ে এবং প্রকৃত ঘটনার তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সাংগঠনিক নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।” সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা আজিজুর রহমান কালবেলাকে বলেন “এমপি সাহেব আমাদের জানিয়েছেন, ভিডিওতে যাকে দেখা যাচ্ছে তিনি তার দ্বিতীয় স্ত্রী। প্রথম স্ত্রীর সম্মতিক্রমেই এ বিয়ে হয়েছে। তবে ভিডিওটি কীভাবে প্রকাশ করা হয়েছে সে বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখছি।” তিনি আরও বলেন “বিয়ের সুনির্দিষ্ট তারিখ আমার জানা নেই।”

ভাইরাল হওয়ার পর “দ্য ডিসেন্ট” নামের ফ্যাক্টচেক প্রতিষ্ঠান ভিডিওতে থাকা তরুণী ও তার বাবার সাক্ষাৎকার প্রকাশ করে। তরুণীর নাম মরিয়ম খাতুন। তিনি বলেন “উনি আমার স্বামী। আমাদের বিয়ে হয়েছে। ওইদিন ঘুরতে গিয়ে আমরা আমার বাবার অফিসে রেস্ট নিচ্ছিলাম।” তিনি আরও জানান, তিনি এবার এসএসি পরীক্ষা দিয়েছেন। বাবার নাম মো. মাসুম বিল্লাহ। তার দাবি “৩ লাখ টাকা দেনমোহরে গত ১৭ জুন তার মেয়ের সঙ্গে গাজী নজরুল ইসলামের বিয়ে হয়। ওইদিন উনারা আমার অফিসে এসে রেস্ট নিচ্ছিলেন। সেখান থেকেই ভিডিওটি ধারণ হয়। এর সঙ্গে আমার শ্যালক ওবায়দুল্লাহ জড়িত।”

এখানেই শুরু হয় সবচেয়ে বড় বিতর্ক। কারণ একাধিক তথ্যে অসংগতি দেখা যাচ্ছে। এমপির দাবি বিয়ে হয়েছে ১৭ জুন ২০২৬। কিন্তু ফ্যাক্টচেক প্রতিষ্ঠান “দ্য ডিসেন্ট” এর অনুসন্ধান অনুযায়ী, ভাইরাল হওয়া মূল ফুটেজের টাইমস্ট্যাম্প অনুযায়ী ভিডিওটি ধারণ করা হয়েছে “২০২৩ সালের জুলাই মাসে”। ব্যবধান প্রায় ৩ বছর। কালবেলার প্রতিবেদক এমপিকে জিজ্ঞেস করেন “বিয়ের কাবিন আছে কি না?” গাজী নজরুল বলেন “আমাদের কাছে কাবিন নেই। তবে যিনি বিয়ে নিবন্ধ করেছেন তার কাছ থেকে সংগ্রহ করে দেওয়া যাবে।” “ওইটা আছে বিবাহ যিনি রেজিস্ট্রি করেছেন তার খাতায়। ওটা নিয়ে দিতে হবে। ঘণ্টাখানেক সময় লাগবে” বলেন তিনি।

কাবিননামা নিয়েও ধোঁয়াশা। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কাবিননামায় মরিয়ম খাতুনের জন্মতারিখ ২ মে ২০০৮ উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ বিয়ের সময় তার বয়স ১৮ এর কম। কাজী মাওলানা বি.এ.এম. বাকী বিল্লাহ জানান, গত সোমবার গভীর রাতে তার সঙ্গে যোগাযোগ করে জানানো হয় যে ঢাকায় বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে এবং নিবন্ধনের দায়িত্ব তাকে নিতে হবে। পরে ফোনে দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই তিনি কাবিননামা প্রস্তুত করেন। তিনি বলেন, কনের বাবা ফোনে সম্মতি দেন এবং পরদিন সকালে কনে ও তার অভিভাবক এসে কাবিননামায় স্বাক্ষর করেন। ১৭ জুনকে বিয়ের তারিখ হিসেবে উল্লেখ করার নির্দেশনাও ফোনেই দেওয়া হয়েছিল। একপর্যায়ে তিনি ফোনে বলেন, ‘আচ্ছা ভাই, আমি যাতে বিপদে পড়ে না যাই, আমাদের কেন বিপদে ফেলেছেন’।

২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে জমা দেওয়া এমপির হলফনামায় দ্বিতীয় স্ত্রীর কোনো তথ্য ছিল না বলে জানা যায়। মরিয়ম খাতুনের একটি বায়োডাটায় দেখা যায়, ২০২৬ সালের ২২জুন গাজী নজরুল ইসলাম “জোর সুপারিশ করছি” লিখে স্বাক্ষর করেছেন। কিন্তু সেখানে মরিয়মের বৈবাহিক অবস্থার ঘরে “অবিবাহিত” উল্লেখ রয়েছে। অথচ এমপির দাবি অনুযায়ী বিয়ে হয়েছে ১৭ জুন। বিয়ের ৫ দিন পরও কেন “অবিবাহিত”?

আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, একটি কক্ষে গাজী নজরুল ইসলাম ওই তরুণীকে কয়েকজন ব্যক্তি ঘিরে প্রশ্ন করছেন। “জামায়াত হয়ে এই কাজ কীভাবে করলেন?” “অন্যায় করেছেন কিনা?” এমন প্রশ্নে তিনি মাথা নেড়ে বলেন, ‘বিশ্বাস করেন, আজই প্রথম।’ তরুণীর নাম জানতে চাইলে দীর্ঘক্ষণ নীরব থেকে ‘মাহি’ নাম উল্লেখ করেন। একই ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘আপনারা ভিডিও ডিলিট করে দেন, সবকিছু বলছি।’

এমপির বিবৃতির মূল অংশ ছিল “চাঁদাবাজি”। তার বর্ণনা অনুযায়ী ১৩ জুলাই অফিসে ৫-৭ জন লোক এসে ১ লাখ টাকা নেয়। রাতে ওবায়দুল্লাহ ফোন করে আরও ১৫ লাখ টাকা দাবি করে। পরদিন শ্বশুর মাসুম বিল্লাহ এসআই আমিনুরের সহায়তায় বিমানবন্দর সড়ক থেকে গাড়ি ও চালক উদ্ধার করেন। কিন্তু ওবায়দুরের অভিযোগ পুরো উল্টো। তিনি নিজেই হামলার শিকার এবং তিনি বলছেন এমপিই হামলার নির্দেশদাতা। এখন পর্যন্ত পুলিশের পক্ষ থেকে মগবাজারের চাঁদাবাজির ঘটনায় কোনো মামলা বা জিডির তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

এর মধ্যে আবার “নারী নিয়ে হোটেলে এমপি নজরুলের আরও একটি ভিডিও ফাঁ’স!” শিরোনামে নতুন ফুটেজ ছড়ায়। সেখানে ভিন্ন স্থানে ভিন্ন তরুণীর সঙ্গে তাকে দেখা যায় বলে দাবি করা হয়। এই ভিডিওর সত্যতা এখনো যাচাই হয়নি। তবে একের পর এক ভিডিও সামনে আসায় জনমনে প্রশ্ন বাড়ছে।

এই ঘটনার ৩টি আইনি দিক রয়েছে। যদি ভিডিওটি সত্যিই স্বামী-স্ত্রীর হয় এবং তা অনুমতি ছাড়া ফাঁস করা হয়, তাহলে এটি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের লঙ্ঘন। এজন্য ওবায়দুল্লাহর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। সবার অভিযোগ”অপ্রাপ্তবয়স্ক তরুণী”। তরুণী নিজে বলেছেন তিনি “এবার এসএসসি দিয়েছেন”। বাংলাদেশে এসএসসি পরীক্ষার্থীর বয়স সাধারণত ১৫-১৬ হয়। আবার বিয়ের তারিখ ১৭ জুন ২০২৬ বলা হচ্ছে। যদি সত্যিই ১৮ বছরের কম হয়, তাহলে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন প্রযোজ্য হবে। উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও হামলার অভিযোগ করেছে। এর নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।

গাজী নজরুল ইসলাম জামায়াতের একজন প্রভাবশালী নেতা। সাতক্ষীরা-৪ আসনের এমপি। এই ঘটনার কারণে জামায়াতকে সাংগঠনিকভাবে অবস্থান নিতে হচ্ছে। ২৫ জুলাই দল থেকে তাকে প্রাথমিকভাবে অব্যাহতি এবং পদত্যাগের চাপ দেওয়ার খবর সামাজিক মাধ্যমে ছড়ায়। বিরোধীরা “নৈতিকতা”র প্রশ্ন তুলছে। সামাজিক মাধ্যমে “দ্বিতীয় বিয়ে” ও “চরিত্র” নিয়ে তুমুল ট্রল চলছে। ডাকসুর সাবেক এক নেত্রী ফেসবুকে প্রশ্ন তুলেছেন “এটি দ্বিতীয় স্ত্রী নাকি চাকরির সুপারিশ?”

তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এখন পর্যন্ত যা নিশ্চিত। একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে যাতে গাজী নজরুল ইসলাম ও এক তরুণীকে দেখা যাচ্ছে। এমপি দাবি করেছেন তরুণী তার দ্বিতীয় স্ত্রী এবং ঘটনাটি ১৩ জুলাই ২০২৬। তরুণী ও তার বাবা বিয়ের কথা স্বীকার করেছেন এবং তারিখ বলেছেন ১৭ জুন ২০২৬। সাবেক ড্রাইভার ওবায়দুর হামলা ও অনৈতিকতার অভিযোগ এনে প্রধানমন্ত্রীর কাছে নিরাপত্তা চেয়েছেন এবং “অপ্রাপ্তবয়স্ক” ও “সিসিটিভি ফুটেজ” এর কথা বলেছেন। জামায়াত বলেছে তারা “তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেবে”। ফুটেজের টাইমস্ট্যাম্প ও বিয়ের তারিখে প্রায় ৩ বছরের ব্যবধান রয়েছে বলে ফ্যাক্টচেকাররা দাবি করছে।

একটি ভিডিও ঘিরে এখন তিনটি গল্প চলছে। গল্প ১ – এমপির গল্প: এটি ষড়যন্ত্র। গাড়িচালক চাঁদা আদায়ের জন্য ফাঁদ পেতেছে। গল্প ২ – ড্রাইভারের গল্প: এটি ক্ষমতার অপব্যবহার। এমপি একাধিকবার অনৈতিক কাজ করেছে, প্রমাণ আছে। গল্প ৩ – তরুণী ও বাবার গল্প: এটি বৈধ বিয়ে। পারিবারিক বিষয়।

কোন গল্পটি সত্য? এর উত্তর দিতে পারে শুধু নিরপেক্ষ তদন্ত। প্রয়োজন সিসি ক্যামেরার মূল ফুটেজ ও টাইমস্ট্যাম্প ফরেনসিক পরীক্ষা। বিয়ের কাবিননামা ও নিবন্ধনের কাগজপত্র যাচাই। তরুণীর বয়সের সার্টিফিকেট যাচাই। মগবাজারের চাঁদাবাজি ও পল্লবীর হামলার পৃথক মামলা ও তদন্ত।

ক্ষমতা আর নৈতিকতার প্রশ্নে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন ঘটনা নতুন নয়। গাজী নজরুলের ঘটনার পাশে আরও ঘটনা আছে। ক্ষমতার অপব্যবহার আর দৌরাত্ম্যে অন্ধ অনেক নেতা নিজকে সামলাতে পারেন না।বাংলাদেশের রাজনীতি ও সমাজে আরও বহু ঘটনা ঘটেছে। তেমন কিছু ঘটনাঃ
১।
পিরোজপুরের আওয়ামীলীগের সংসদ সদস্য এমপির বিরুদ্ধে ঢাকার একটি আবাসিক হোটেলে তরুণীসহ আপত্তিকর অবস্থায় ধরা পড়ার অভিযোগ ওঠে। হোটেল বয়ের মোবাইলে ধারণ করা ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়ায়। এমপি দাবি করেন “এটি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র”। পরে বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে যায়।
২.
কক্সবাজারের ইউপি চেয়ারম্যানের ফোনালাপ ফাঁস হয়। যেখানে তিনি এক এসএসসি পাস মেয়েকে “চাকরি এনে দেব” বলে রাত ১২টায় অফিসে ডাকেন। মেয়েটির বাবা সেই রেকর্ড সাংবাদিকদের দেন। চেয়ারম্যান প্রথমে অস্বীকার, পরে “গলা নকল” দাবি করেন। স্থানীয় প্রশাসন তদন্ত করে তাকে ৩ মাসের জন্য বরখাস্ত করে।
৩.
ঢাকার একজন কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে ২০১৬ অভিযোগ, তিনি সরকারি চাকরির নামে গরিব মেয়েদের একটি মেসে নিয়ে যেতেন। এক মেয়ে গোপনে ভিডিও করে রাখে। ভিডিও ভাইরাল হলে কাউন্সিলর বলেন “মেয়েটি আমার দূর সম্পর্কের আত্মীয়”। পরে দল থেকে তাকে শোকজ করা হয়।
৪.
চট্টগ্রামের সাবেক
এক মন্ত্রীর একান্ত সচিবের বিরুদ্ধে ২০১৭ সালে অভিযোগ ওঠে, তিনি ৩টি মেয়েকে আলাদা আলাদা তারিখে “বিয়ে” করে কাবিননামা করেন। সব গুলোই ব্যাকডেটেড। এক মেয়ে থানায় মামলা করলে জানা যায় কাজীকে চাপ দিয়ে কাবিন করানো হয়েছে। পিএস গ্রেপ্তার হন, ৬ মাস পর জামিনে বের হন।

৫.
রাজশাহীর এক এমপির গাড়িচালক ২০১৮ সালে অভিযোগ করেন তার বস “অফিসের কাজের নামে” বিভিন্ন মেয়েকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যান। চালক নিজেই একটি হোটেলের সামনের সিসিটিভি ফুটেজ ফাঁস করেন। এমপি পাল্টা অভিযোগ করেন চালক “চাঁদা চেয়ে না পেয়ে” এমন করেছে। বিষয়টি নিয়ে কোনো মামলা হয়নি।
৬.
বরিশালের এক পৌর মেয়রের ২০২০ সালে একটি ব্যক্তিগত ভিডিও কল ফাঁস হয়। সেখানে এক তরুণীর সাথে অশালীন কথা বলতে শোনা যায়। মেয়র প্রথমে বলেন “এআই দিয়ে ডিপফেক”। পরে তিনি লাইভে এসে ক্ষমা চান এবং বলেন “আমি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলাম”। এরপর তিনি পদত্যাগ করেন।
৭.
সিলেটের এক সরকারি কলেজের অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে ২০২১ সালে অভিযোগ ওঠে, তিনি ভর্তির জন্য মেয়েদের বাসায় ডেকে নিয়ে যেতেন। ২ জন ছাত্রী মিলে অডিও রেকর্ড করে জেলা প্রশাসককে দেন। তদন্তে প্রমাণ মেলায় অধ্যক্ষকে বরখাস্ত ও মামলা করা হয়। এখনো মামলা চলছে।

৮.
খুলনার এক উপজেলা চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ২০২২ সালে অভিযোগ ওঠে, তিনি ১৭ বছরের এক মেয়েকে “দ্বিতীয় স্ত্রী” দাবি করে একটি ভাড়া বাসায় রাখেন। মেয়েটির বাবা থানায় অভিযোগ করলে পুলিশ মেয়েটিকে উদ্ধার করে। চেয়ারম্যান বলেন “মেয়ে স্বেচ্ছায় এসেছে”। আদালত মেয়েটিকে পরিবারের কাছে দেয় এবং চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে বাল্যবিবাহ আইনে মামলা হয়।
৯.
নারায়ণগঞ্জের এক সংসদ সদস্যের ছেলের ২০২৩ সালে একটি রিসোর্টের সিসিটিভি ফুটেজ ফাঁস হয়। সেখানে তাকে ২ জন তরুণীর সাথে দেখা যায়। ছেলেটি দাবি করেন “বন্ধুরা মজা করছে”। মেয়ে দু’জনের একজন পরে ফেসবুকে লাইভে এসে বলেন “আমাদের চাকরির কথা বলে ডাকা হয়েছিল”। বিষয়টি নিয়ে এখনো তদন্ত চলছে।
১০.
ঢাকার এক প্রতিমন্ত্রীর ব্যক্তিগত ফটোগ্রাফার ২০২৫ সালে গ্রেপ্তার হন। তার মোবাইলে মন্ত্রীর সাথে বিভিন্ন নারীর ছবি পাওয়া যায়। ফটোগ্রাফার অভিযোগ করেন “মন্ত্রীই মেয়েদের ম্যানেজ করতে বলতেন”। মন্ত্রী পাল্টা বলেন “ফটোগ্রাফার আমাকে ব্ল্যাকমেইল করছিল”। আদালতে মামলা বিচারাধীন।
১১.
২০২৩ সালে চট্টগ্রামের এক সাবেক মেয়রের একটি অডিও ফাঁস হয় যেখানে তাকে এক তরুণীকে “চাকরি দেব, কিন্তু দেখা করতে হবে” বলতে শোনা যায়। অডিও ভাইরাল হওয়ার পর মেয়র বলেন, “এটি আমার কণ্ঠ না, এআই দিয়ে বানানো”। কিন্তু ভয়েস ফরেনসিক রিপোর্টে তার কণ্ঠই মেলে। নৈতিকতার প্রশ্নে তিনি পদত্যাগ করেন। পরে তিনি বলেন, “আমি ফাঁদে পড়েছি”।
১২.
২০১৯ সালে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের এক প্রভাবশালী এমপির বিরুদ্ধে রাজধানীর একটি পাঁচ তারকা হোটেলে তরুণী নিয়ে আপত্তিকর অবস্থায় ধরা পড়ার অভিযোগ ওঠে। হোটেলের সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এমপি দাবি করেন, তিনি সেখানে দলীয় বৈঠকে ছিলেন। তরুণীকে তার “আত্মীয়” বলেও দাবি করেন। পরে মেয়েটির পরিবার থানা থেকে অভিযোগ তুলে নেয়। মামলা আর আগায়নি। কিন্তু ভিডিও থেকে যায়।
১৩.
২০২১ সালে কুমিল্লার এক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, তিনি সরকারি চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে এক এসএসসি পাস তরুণীকে নিজের অফিস কক্ষে ডাকেন। মেয়েটির বাবা বিষয়টি ভিডিও করে রাখেন। ভিডিও ভাইরাল হলে চেয়ারম্যান প্রথমে অস্বীকার করেন, পরে বলেন “মেয়েটি তার ভাতিজি”। স্থানীয় প্রশাসন তদন্ত করে চেয়ারম্যানকে সাময়িক বরখাস্ত করে। কিন্তু ৬ মাস পর তিনি আবার দায়িত্বে ফেরেন।
১৪.
২০২ সালে ঢাকার এক মন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে একাধিক তরুণীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়েন। ধরা পড়লে “বিয়ে করব” বলে একটি মেয়েকে দিয়ে কাবিননামা করান। কিন্তু কাবিননামা ছিল ব্যাকডেটেড এবং কাজী পরে স্বীকার করেন তিনি কিছুই জানতেন না। মেয়েটি পরে আদালতে মামলা করলে পিএস জামিনে বেরিয়ে আসেন। মামলা এখনো চলমান।
১৫.
২০২৪ সালে রাজশাহীর এক সরকারি কলেজের অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ভর্তি ও বৃত্তির নামে ছাত্রীদের ডেকে নিয়ে যৌন হয়রানি করতেন। এক ছাত্রী গোপনে অডিও রেকর্ড করে। অডিও প্রকাশের পর অধ্যক্ষ বলেন, “মেয়েটি খারাপ, সে আমাকে ফাঁসিয়েছে”। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্তে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে প্রমাণ মেলে। তাকে চাকরিচ্যুত করা হয় এবং মামলা হয়।

এই ঘটনাগুলোর সাথে গাজী নজরুলের ঘটনার মিল হল ক্ষমতার ব্যবহার, দুর্বল মেয়েকে টার্গেট, ধরা পড়ার পর “ষড়যন্ত্র” বা “বিয়ে”র অজুহাত, এবং শেষে প্রমাণের অভাবে মামলা ধামাচাপা। পার্থক্য শুধু এটুকু, এবার একজন সংসদ সদস্য এবং একটি বড় ইসলামী দলের নেতা জড়িত।

কেন বারবার একই ঘটনা ঘটছে? প্রথমত ক্ষমতার অপব্যবহার। এমপি, মন্ত্রী, চেয়ারম্যানরা মনে করেন তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে। “আমি যা বলব তাই আইন” এই মানসিকতা। দ্বিতীয়ত দারিদ্র্য ও বেকারত্ব। গাজী নজরুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি মেয়েটিকে “চাকরি দেব” বলে ডেকেছিলেন। ২০-৩০ লাখ টাকা ঘুষ ছাড়া চাকরি নেই, এই হতাশা থেকে মেয়েরা ফাঁদে পা দেয়। তৃতীয়ত প্রমাণ লোপাটের সংস্কৃতি। ভিডিও ফাঁস হলে প্রথমে “এআই” বলা হয়। তারপর “বিয়ে”র গল্প আনা হয়। কাবিননামা ব্যাকডেট করা হয়। কাজীকে চাপ দেওয়া হয়। চতুর্থত রাজনৈতিক দলের দ্বিচারিতা। ধরা না পড়া পর্যন্ত সবাই চুপ। ধরা পড়লে “ব্যক্তির দায়, দলের না”। অথচ মনোনয়ন দেওয়ার সময় দলই যাচাই করে না।

সামাজিক মাধ্যমে তিন ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। একদল বলছে, “গরিবের মেয়ের ইজ্জত নিয়ে খেলেছে, ফাঁসি চাই”। আরেকদল বলছে, “এটি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, জামায়াতকে ঘায়েল করার চক্রান্ত”। তৃতীয় দল বলছে, “ব্যক্তি অপরাধী, দলকে দোষ দেবেন না”।

কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, একজন জনপ্রতিনিধির কাছে জনগণ কী প্রত্যাশা করে? শুধু উন্নয়ন? নাকি নৈতিকতা? সাতক্ষীরার শ্যামনগরের মানুষ বলছে, “নজরুল সাহেব এলাকায় অনেক উন্নয়ন করেছেন। কিন্তু এখন যা হয়েছে তা মেনে নেওয়া যায় না।” আবার অনেকে বলছে, “তিনি জনগণের ভোটে এমপি, তাকে সরানোর অধিকার দলের নেই, ইসির আছে”।

গাজী নজরুল ইসলামের ঘটনা শুধু একজন ব্যক্তির পতন না। এটি আমাদের রাজনীতি, সমাজ ও নৈতিকতার আয়না। একটি ভিডিও একটি দলের ভাবমূর্তি, একটি এলাকার সম্মান এবং একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

সমাধান একটাই, তদন্ত। আবেগ নয়, গুজব নয়। সিসি ক্যামেরার মূল ফুটেজ ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো। কাবিননামা ও কাজীর বক্তব্য যাচাই। মরিয়ম খাতুনের বয়সের সার্টিফিকেট পরীক্ষা। চাঁদাবাজি ও হামলার অভিযোগের পৃথক মামলা।

যদি অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে কঠোর শাস্তি। আর যদি ষড়যন্ত্র হয়, তাহলে যারা ষড়যন্ত্র করেছে তাদেরও শাস্তি। নইলে কাল আবার আরেকজন জননেতা মুখ থুবড়ে পড়বেন। আর আমরা ফেসবুকে ঝড় তুলে ভুলে যাব।

রাজনীতিতে নৈতিকতা ফিরিয়ে আনতে হবে। ক্ষমতা মানে লাইসেন্স না। জনগণের টাকায় বেতন নেওয়া প্রতিটি জনপ্রতিনিধিকে মনে রাখতে হবে, তারা জনগণের চাকর। মালিক না।

আর কোনো অসহায় তরুণীকে যেন চাকরির লোভে, অভাবের তাড়নায় কারো রুমে যেতে না হয়। সেই বাংলাদেশই আমাদের কাম্য।