, ,

দেলাওয়ার হোসেন সাঈদীর মামলার বাদী মানিক পশারীর দাফন, জানাজা ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

নিউজটি শেয়ার করুন

মৃত্যু সকল বিরোধের উর্ধ্বে। ইসলামে লাশের মর্যাদা অপরিসীম। কিন্তু পিরোজপুরে গত ২৪ অক্টোবর যা ঘটল, তা আমাদের সামাজিক সহনশীলতার জন্য এক গভীর অসনি সংকেত।

বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারী — ২০০৯ সালের ১২ আগস্ট যিনি জামায়াত নেতা মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বাদী হয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান সাক্ষী ছিলেন — ৮৭ বছর বয়সে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় মারা যান। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে তিনি এলাকা ছাড়া ছিলেন বলে জানা যায়।

তার লাশ পিরোজপুরে আনার পর দিনভর যে চিত্র আমরা দেখলাম, তা কোনো সভ্য সমাজের জন্য কাম্য নয়।

দুপুর ১২টায় সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে গার্ড অব অনার দিতে গেলে বাধার মুখে পড়ে পরিবার। পুলিশের হেফাজতে লাশ নেওয়া হয় পুলিশ লাইনসে। বিকেল ৫টায় অনেকটা গোপনে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। রাত ১টা পর্যন্ত লাশ পুলিশ হেফাজতে থাকে। রাত ২টায় নিজ গ্রাম চিতলিয়ায় দাফন হয়। হৃদয়বিদারক বিষয় হলো — কবর খোঁড়ার জন্য কোনো পুরুষ মানুষ এগিয়ে আসেনি। তার মেয়ে, বোন ও স্ত্রী নিজেরাই কবর খুঁড়েছেন। একবার খোঁড়া কবর কে বা কারা ভরাট করে দিয়েছিল বলেও পরিবারের অভিযোগ।

এখানে তিনটি প্রশ্ন ওঠে।

প্রথম, লাশের অধিকার: ফৌজদারি মামলার বাদী হওয়া কি কোনো ব্যক্তির জানাজা ও দাফনের অধিকার কেড়ে নেয়? ইসলামী শরীয়াহ এবং বাংলাদেশের সংবিধান — উভয় দৃষ্টিতেই মৃত ব্যক্তির সম্মানজনক দাফন পাওয়া তার পরিবারের অধিকার। তার কৃতকর্মের বিচার জীবদ্দশায় আদালত করবে, মৃত্যুর পর নয়। লাশ আটকে রাখা বা দাফনে বাধা দেওয়া বর্বরতার সামিল।

দ্বিতীয়, গার্ড অব অনারের বিতর্ক: পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদী (প্রয়াত দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পুত্র) তার ফেসবুক পোস্টে বলেছেন — “লাশ দাফনে বা জানাজায় কোনো বাঁধা ছিল না, আপত্তি ছিল ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাকে গার্ড অব অনার প্রদানে”। স্থানীয় জামায়াতেরও একই দাবি। এখানেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একজন ব্যক্তি মুক্তিযোদ্ধা কি না, ভুয়া কি না — তা যাচাই করবে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, ইউএনও বা উপজেলা প্রশাসন নয়, জনতা নয়। যদি তালিকায় নাম থাকে, তবে রাষ্ট্রীয় প্রোটোকল অনুযায়ী গার্ড অব অনার তার প্রাপ্য। যদি ভুয়া হয়, তবে তা বাতিলের প্রক্রিয়াও রাষ্ট্রের। রাস্তায় দাঁড়িয়ে এই বিচার করার অধিকার কারো নেই।

তৃতীয়, রাজনৈতিক সহনশীলতা: জামায়াতে ইসলামী ইতিমধ্যে দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি করেছে তাদের নেতাকর্মী জড়িত কি না তা দেখতে। এটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। কারণ ২০২৬ সালের বাংলাদেশে প্রতিহিংসার রাজনীতির অবসান হওয়া উচিত। সাঈদী সাহেব ২০২৩ সালে মারা গেছেন, তার মামলার বাদী ২০২৬ সালে মারা গেলেন। দুজনেই আজ ইতিহাসের অংশ। জীবিতরা যদি মৃতদের লাশ নিয়েও রাজনীতি করে, তবে জাতি হিসেবে আমরা কোথায় যাচ্ছি?

উপসংহারে একটাই কথা — বিচার হবে আদালতে, ইতিহাস লিখবে ইতিহাসবিদরা। কিন্তু মৃত্যুর পর প্রতিটি মানুষের লাশের মর্যাদা নিশ্চিত করা জীবিতদের ঈমানী ও নাগরিক দায়িত্ব।গু পিরোজপুরের ঘটনা যেন আর কোথাও না ঘটে। প্রশাসনকে আরো সংবেদনশীল হতে হবে, এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রমাণ করতে হবে — তারা লাশের রাজনীতি করে না, মানুষের রাজনীতি করে।
মো: রফিকুল ইসলাম সম্রাট, উপদেষ্টা সম্পাদক, দৈনিক স্বদেশ বিচিত্রা।