, ,

জাইমা রহমান: নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব, অতি দরিদ্র মানুষের উন্নয়ন ও নারীর ক্ষমতায়নের সম্ভাবনা

নিউজটি শেয়ার করুন

জন্মদিনের বিশেষ নিবন্ধ | দারিদ্র্য বিমোচন, সামাজিক নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদার প্রত্যাশা কৃষিবিদ এম. মোজাহিদুল ইসলাম সেলিম, পিএইচডি
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় | বিএইউ ৯০–৯১

 

উন্নয়নের কেন্দ্রে থাকুক মানুষ

বাংলাদেশের উন্নয়নের সাফল্য শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা প্রযুক্তির সম্প্রসারণ দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। উন্নয়নের সুফল দেশের সবচেয়ে দরিদ্র মানুষের ঘরে কতটা পৌঁছেছে, সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা মানসম্মত শিক্ষা পাচ্ছে কি না, অসুস্থ মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাচ্ছেন কি না এবং নারীরা সম্মানজনক কর্মসংস্থানের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হতে পারছেন কি না—এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এই বাস্তবতায় নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব, নারীর ক্ষমতায়ন এবং অতি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও ডা. জুবাইদা রহমানের কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমানের জন্মদিনে তাঁকে শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন নিয়ে একটি বৃহত্তর প্রত্যাশা তুলে ধরা যায়। সেই প্রত্যাশা হলো—ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের আলোচনায় দারিদ্র্য বিমোচন, সামাজিক ন্যায়বিচার, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও মানুষের মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের অধিকার আরও গুরুত্ব পাক।
জাইমা রহমানের ভবিষ্যৎ জনসম্পৃক্ততা নিয়ে আলোচনা করতে হলে ব্যক্তিগত পরিচয়ের বাইরে মানুষের বাস্তব সমস্যা, বিশেষ করে অতি দরিদ্র পরিবার, সুবিধাবঞ্চিত নারী ও তরুণদের জীবনসংগ্রামকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কারণ জনকল্যাণমুখী নেতৃত্বের প্রকৃত মূল্যায়ন হয় মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার সক্ষমতার মধ্য দিয়ে।
তৃণমূলের মানুষের জীবনসংগ্রাম জানার অভিজ্ঞতা
২০২৬ সালের ৪ মার্চ ময়মনসিংহে ব্র্যাকের উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিদর্শনের ঘটনাটি জাইমা রহমানের জনসম্পৃক্ততা নিয়ে আলোচনায় একটি প্রাসঙ্গিক দৃষ্টান্ত। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি ফুলবাড়িয়া উপজেলার দেওখোলা ইউনিয়নের পশ্চিম কালীবাজাইল এলাকায় ব্র্যাকের অতি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন কর্মসূচি পরিদর্শন করেন।
সেখানে উঠান বৈঠকে তিনি কর্মসূচির সুবিধাভোগীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন এবং একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিসহ পাঁচ সদস্যের একটি দলের অভিজ্ঞতা ও জীবনসংগ্রামের কথা শোনেন। এ সময় ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদের কন্যা ও ব্র্যাক এন্টারপ্রাইজেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তামারা হাসান আবেদসহ প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। একই দিনে ত্রিশাল ও ভালুকা উপজেলায়ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিদর্শনের খবর প্রকাশিত হয়।
এই সফরের তাৎপর্য কেবল একটি উন্নয়ন কর্মসূচি পরিদর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দারিদ্র্যের প্রকৃত চিত্র বুঝতে জাতীয় পর্যায়ের পরিসংখ্যানের পাশাপাশি মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শোনা প্রয়োজন। একটি দরিদ্র পরিবারের আয় কীভাবে আসে, সন্তানদের পড়াশোনার ব্যয় কীভাবে মেটানো হয়, অসুস্থ সদস্যের চিকিৎসা কীভাবে চলে কিংবা একজন নারী সীমিত সম্পদ দিয়ে কীভাবে সংসার পরিচালনা করেন—এসব প্রশ্নের উত্তর মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতার মধ্যেই পাওয়া যায়।
তবে এই সফর থেকে জাইমা রহমানের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মসূচি বা নির্দিষ্ট নীতিগত অঙ্গীকার সম্পর্কে সিদ্ধান্ত টানা সমীচীন নয়। বরং ঘটনাটিকে অতি দরিদ্র মানুষের বাস্তবতা সামনে আনা এবং তাঁদের জীবনমান উন্নয়ন নিয়ে বৃহত্তর জনআলোচনা তৈরির একটি সুযোগ হিসেবে দেখা যেতে পারে।
দারিদ্র্যের বাস্তব চিত্র: অগ্রগতির পাশাপাশি নতুন চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশ দারিদ্র্য হ্রাসে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে বহু পরিবার এখনো আয়, পুষ্টি, চিকিৎসা, শিক্ষা ও নিরাপদ জীবিকার ক্ষেত্রে নানা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর খানা আয় ও ব্যয় জরিপ ২০২২ অনুযায়ী, দেশে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ এবং চরম দারিদ্র্যের হার ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। গ্রামাঞ্চলে চরম দারিদ্র্যের হার ছিল ৬ দশমিক ৫ শতাংশ, আর শহরাঞ্চলে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। এসব পরিসংখ্যান ২০২২ সালের জরিপভিত্তিক; এগুলোকে বর্তমান দারিদ্র্যের হার হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়।
এই চিত্র থেকে বোঝা যায়, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা, মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং টেকসই কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ জরুরি।
অতি দরিদ্র পরিবারগুলোর সমস্যা বহুমাত্রিক। অনিয়মিত আয়, জমি ও উৎপাদনশীল সম্পদের অভাব, খাদ্য ও পুষ্টির অনিশ্চয়তা, চিকিৎসার ব্যয়, শিক্ষার সীমাবদ্ধতা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি তাঁদের জীবনকে কঠিন করে তোলে। নারীপ্রধান পরিবার, প্রতিবন্ধী সদস্য থাকা পরিবার, চরাঞ্চল, হাওর, উপকূলীয় এলাকা ও নগর বস্তির অনেক মানুষ এসব সংকটে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।
এ অবস্থায় শুধু সাময়িক আর্থিক সহায়তা দিয়ে দারিদ্র্যের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন এমন একটি সমন্বিত ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে পরিবারগুলো খাদ্য ও পুষ্টির নিরাপত্তা, মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং নিয়মিত আয়ের সুযোগ পাবে।
সহায়তা থেকে স্বাবলম্বিতা: দারিদ্র্য বিমোচনের কার্যকর পথ
অতি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এসব উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করে স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে কর্মসূচির সামঞ্জস্য, যথাযথ সহায়তা, নিয়মিত তদারকি এবং দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের ওপর।
দরিদ্র পরিবারের জন্য জীবিকা গড়ে তোলার উপকরণ, দক্ষতা প্রশিক্ষণ, সঞ্চয়ের সুযোগ, স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সংযোগ এবং আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডে সহায়তা কার্যকর হতে পারে। বিশেষ করে দরিদ্র নারীদের স্বাবলম্বী করে তোলা এবং পরিবারের আয় বৃদ্ধির সক্ষমতা তৈরি করা এসব উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।
দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্য শুধু একটি পরিবারকে তাৎক্ষণিক সংকট থেকে উদ্ধার করা নয়; বরং এমন সক্ষমতা গড়ে তোলা, যাতে পরিবারটি ভবিষ্যতের প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে নিজের আয় ও জীবনমান ধরে রাখতে পারে।
এজন্য জীবিকা উন্নয়ন কর্মসূচিকে বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন। উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য, সহজ আর্থিক সেবা, কারিগরি পরামর্শ এবং উৎপাদনশীল সম্পদে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা গেলে দরিদ্র পরিবারগুলোর স্বাবলম্বী হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
সামাজিক নিরাপত্তা: বরাদ্দের পাশাপাশি প্রয়োজন কার্যকর বাস্তবায়ন
অতি দরিদ্র মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্ত নারীদের সহায়তা, প্রতিবন্ধী ভাতা, খাদ্যসহায়তা এবং দুর্যোগকালীন আর্থিক সহায়তা অনেক পরিবারের জন্য জীবনধারণের গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন।
২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। তবে এই অর্থের প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে প্রকৃত উপকারভোগী শনাক্তকরণ, সহায়তার পর্যাপ্ততা, স্বচ্ছ বণ্টন এবং কার্যকর জবাবদিহির ওপর।
সামাজিক সহায়তা কার্যকর করতে হলে প্রকৃত উপকারভোগী শনাক্ত করা, নিয়মিত অর্থ বা উপকরণ পৌঁছানো, অনিয়ম ও হয়রানি কমানো এবং অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। সহায়তা যেন কারও অনুগ্রহ হিসেবে বিবেচিত না হয়; বরং মানুষের প্রয়োজন, অধিকার ও মর্যাদার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়।
বিশেষ করে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, প্রবীণ, একক অভিভাবক এবং কর্মক্ষমতা সীমিত এমন মানুষের জন্য আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি সহজলভ্য চিকিৎসা, পরিচর্যা ও সামাজিক অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করতে হবে।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সাফল্য শুধু কতজনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে তা দিয়ে নয়, বরং সহায়তা তাঁদের জীবনযাত্রায় কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে, তা দিয়েও মূল্যায়ন করা জরুরি।
শিক্ষা ও কর্মসংস্থান: দারিদ্র্যের চক্র ভাঙার ভিত্তি
দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার সবচেয়ে কার্যকর পথগুলোর একটি হলো মানসম্মত শিক্ষা এবং উপযুক্ত কর্মসংস্থান। দরিদ্র পরিবারের শিশুদের অনেক সময় পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করতে হয়। শিক্ষার খরচ, যাতায়াতের ব্যয়, পুষ্টির ঘাটতি ও পারিবারিক সংকটের কারণে তাদের বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে।
এই পরিস্থিতি পরিবর্তনে দরিদ্র পরিবারের শিশুদের শিক্ষায় ধরে রাখা, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ, ডিজিটাল দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কর্মবাজারের চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি।
একই সঙ্গে তরুণদের জন্য শিক্ষানবিশ কর্মসূচি, স্থানীয় শিল্পে কাজের সুযোগ, ক্ষুদ্র উদ্যোগ গড়ে তোলার সহায়তা এবং উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ বাড়াতে হবে। শুধু ঋণ প্রদানই যথেষ্ট নয়। ব্যবসা পরিচালনা, হিসাবরক্ষণ, বাজারসংযোগ ও প্রযুক্তি ব্যবহারে সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন, যাতে নতুন উদ্যোক্তারা টিকে থাকতে পারেন এবং তাঁদের উদ্যোগ স্থায়ী আয়ের উৎসে পরিণত হয়।
গ্রামীণ বাংলাদেশে কৃষি, প্রাণিসম্পদ, মৎস্য, নার্সারি, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং কৃষিভিত্তিক শিল্প অতি দরিদ্র পরিবারের জন্য আয়ের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। এসব উদ্যোগকে টেকসই করতে মানসম্মত উপকরণ, কারিগরি পরামর্শ, উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য বাজার এবং দুর্যোগের ঝুঁকি মোকাবিলার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে কর্মসংস্থানমূলক উদ্যোগের সংযোগ তৈরি করা গেলে গ্রামেই আয় ও কাজের সুযোগ বাড়ানো সম্ভব। এতে কর্মসংস্থানের জন্য অনিবার্যভাবে শহরমুখী হওয়ার চাপও কিছুটা কমানো যেতে পারে।

নারীর ক্ষমতায়ন: পরিবারের উন্নয়ন থেকে সমাজের পরিবর্তন
অতি দরিদ্র পরিবারের নারীরা প্রায়ই সীমিত সম্পদ দিয়ে সংসার পরিচালনা, শিশুদের লালন-পালন, পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা এবং অসুস্থ সদস্যের পরিচর্যার দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু তাঁদের অনেকেরই নিজস্ব আয়, সম্পদ, প্রশিক্ষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ সীমিত।
নারীর ক্ষমতায়ন তাই শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্বে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয় নয়; এটি পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
দরিদ্র নারীদের দক্ষতা প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্র উদ্যোগে সহায়তা, সহজ আর্থিক সেবা, বাজারে প্রবেশাধিকার, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং সম্পদের ওপর অধিকার নিশ্চিত করা গেলে তাঁরা নিজেদের জীবনমান উন্নয়নের পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতেও অবদান রাখতে পারবেন।
এ ক্ষেত্রে বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা, প্রতিবন্ধী নারী, একক অভিভাবক এবং অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত নারীদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণের সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে।
নারীর নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণ নিয়ে জাইমা রহমানকে ঘিরে যে জনআলোচনা রয়েছে, তার সঙ্গে তৃণমূলের নারীদের বাস্তব সমস্যা যুক্ত হলে তা একটি অর্থবহ আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। তবে এ সম্ভাবনাকে তাঁর ঘোষিত কর্মসূচি হিসেবে নয়, বরং ভবিষ্যৎ জনসম্পৃক্ততার একটি সম্ভাব্য দিক হিসেবে দেখা উচিত।
কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়ানো: দারিদ্র্য বিমোচনের বড় সুযোগ
বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে কৃষির সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। কৃষি শুধু খাদ্য উৎপাদনের উৎস নয়; এটি গ্রামীণ পরিবারের আয়, ক্ষুদ্র উদ্যোগ, কৃষিভিত্তিক শিল্প এবং অসংখ্য মানুষের জীবিকার ভিত্তি।
তবে কৃষিতে বহু মানুষের নিয়োজিত থাকা আর তাঁদের শ্রমের উৎপাদনশীলতা বেশি হওয়া এক বিষয় নয়। কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হলে উন্নত প্রযুক্তি, মানসম্মত বীজ, সুষম সার ব্যবস্থাপনা, আধুনিক সেচ, যান্ত্রিকীকরণ, ফসলের রোগবালাই ব্যবস্থাপনা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য বাজার নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের উপাত্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশে কৃষি, বন ও মৎস্য খাতে কর্মীপ্রতি সংযোজিত মূল্য ছিল স্থির ২০১৫ সালের মার্কিন ডলারে প্রায় ১ হাজার ২৩৬ ডলার। একই সূচকে ভারতের ক্ষেত্রে তা প্রায় ২ হাজার ১৫৯ ডলার এবং পাকিস্তানের ক্ষেত্রে প্রায় ৩ হাজার ১৮৬ ডলার। এসব উপাত্ত কৃষি শ্রমিকের সরাসরি মজুরি নয়; বরং সংশ্লিষ্ট খাতে কর্মীপ্রতি সংযোজিত মূল্যের একটি অর্থনৈতিক পরিমাপ।
এই তুলনা বাংলাদেশের কৃষিতে শ্রমের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। তবে উৎপাদনশীলতার পার্থক্য শুধু প্রযুক্তির কারণে তৈরি হয় না; জমির আকার, ফসলের ধরন, শ্রমের সংজ্ঞা, যন্ত্রের ব্যবহার, বাজারব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক কাঠামোও এতে প্রভাব ফেলে।
বাংলাদেশে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হলো কৃষির সঙ্গে মূল্য সংযোজনমূলক কর্মকাণ্ডের সংযোগ জোরদার করা। বীজ উৎপাদন ও বিপণন, চারা উৎপাদন, নার্সারি, ফসল সংগ্রহ-পরবর্তী ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব।
বিশেষ করে মানসম্মত বীজের প্রাপ্যতা কৃষি উৎপাদনের ভিত্তি। উচ্চফলনশীল জাতের বীজ ব্যবহার করলেই প্রত্যাশিত ফলন নিশ্চিত হয় না; বীজের জাতগত বিশুদ্ধতা, ভৌত বিশুদ্ধতা, অঙ্কুরোদ্গম ক্ষমতা, সবলতা এবং স্বাস্থ্যমানও নিশ্চিত করতে হয়। বীজের গুণগতমান উন্নত হলে কৃষকের উৎপাদনঝুঁকি কমানো এবং জমির উৎপাদনক্ষমতা কাজে লাগানোর সুযোগ বাড়ে।
একই সঙ্গে ক্ষুদ্র কৃষক ও প্রান্তিক পরিবারের জন্য কৃষি সম্প্রসারণসেবা, মানসম্মত উপকরণ, সহজ শর্তে অর্থায়ন, ফসল বিমা বা উপযোগী ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং ন্যায্য বাজার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোগে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো গেলে পরিবারের আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি স্থানীয় কর্মসংস্থানও সম্প্রসারিত হতে পারে।
এভাবে কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, কৃষিভিত্তিক শিল্পের বিকাশ এবং দক্ষতা উন্নয়নকে দারিদ্র্য বিমোচনের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হবে।
মাঠপর্যায়ের উন্নয়নে পাঁচটি অগ্রাধিকার
অতি দরিদ্র মানুষের জীবনমান উন্নয়নে বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে পাঁচটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে।

*প্রথমত, পরিবারের মৌলিক নিরাপত্তা।* খাদ্য, পুষ্টি, বাসস্থান, নিয়মিত আয় এবং সামাজিক সুরক্ষার বাস্তব অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে সহায়তা নির্ধারণ করতে হবে।

*দ্বিতীয়ত, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন।* প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্র উদ্যোগ, বাজারসংযোগ ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির সুযোগ বাড়াতে হবে, যাতে নারীরা নিজস্ব আয় ও সম্পদের ওপর অধিকতর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেন।

*তৃতীয়ত, শিক্ষা ও শিশুর বিকাশ।* সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষায় অংশগ্রহণ, পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা এবং বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া রোধের উদ্যোগ জোরদার করতে হবে।

*চতুর্থত, স্বাস্থ্য ও স্যানিটেশন।* নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যবিধি, পুষ্টি এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার প্রাপ্যতা বাড়াতে হবে। প্রতিবন্ধী ও প্রবীণ ব্যক্তিদের প্রয়োজনের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে।

*পঞ্চমত, টেকসই জীবিকা। কৃষি, প্রাণিসম্পদ, মৎস্য, নার্সারি ও ক্ষুদ্র ব্যবসার মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে স্থায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ নিতে হবে।
এসব উদ্যোগ সফল করতে সরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সহযোগিতা প্রয়োজন। উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরির সময় স্থানীয় মানুষের মতামত অন্তর্ভুক্ত করা এবং ফলাফল নিয়মিত মূল্যায়ন করাও জরুরি।

সহায়তা নয়, সক্ষমতা ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠাই হোক লক্ষ্য
দারিদ্র্য বিমোচনের একটি মৌলিক নীতি হলো—মানুষকে শুধু সহায়তার গ্রহীতা হিসেবে নয়, নিজের জীবন পরিবর্তনের সক্ষম অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা।
জরুরি খাদ্য ও আর্থিক সহায়তা প্রয়োজনীয় হলেও দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের জন্য স্থায়ী আয়, দক্ষতা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষার সুযোগ এবং উৎপাদনশীল সম্পদে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। অতি দরিদ্র পরিবারের উন্নয়নে এমন কর্মসূচি প্রয়োজন, যার মাধ্যমে মানুষ নিজের শ্রম ও দক্ষতা কাজে লাগিয়ে আয় করতে পারবেন, সন্তানদের শিক্ষার ব্যয় বহন করতে পারবেন এবং অসুস্থতা বা দুর্যোগের সময় সম্পূর্ণ অসহায় হয়ে পড়বেন না।
এ জন্য সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পাশাপাশি এনজিও, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
কর্মসূচির সাফল্য শুধু কতজনকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে, তা দিয়ে নয়; বরং কতটি পরিবার স্থিতিশীল আয় অর্জন করেছে, কতজন শিশু শিক্ষায় টিকে আছে, কতজন নারী অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম হয়েছেন এবং কত পরিবার সংকটের সময় নিজেদের সামলে নিতে পারছে—এসব সূচক দিয়েও মূল্যায়ন করতে হবে।

নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বে মানবিক বাংলাদেশের প্রত্যাশা
জাইমা রহমানের জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি বাংলাদেশের অতি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য একটি বৃহত্তর প্রত্যাশা তুলে ধরা যায়। ভবিষ্যতের নেতৃত্ব এমন হওয়া প্রয়োজন, যা উন্নয়নের সাফল্য বিচার করবে সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তনের ভিত্তিতে।

একটি শিশু নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে পারছে কি না, একজন মা তাঁর পরিবারের জন্য পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করতে পারছেন কি না, একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি প্রয়োজনীয় সেবা পাচ্ছেন কি না, একজন তরুণ সম্মানজনক কর্মসংস্থান খুঁজে পাচ্ছেন কি না এবং একজন দরিদ্র নারী নিজের আয় ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অর্জন করছেন কি না—এসবই উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

একইভাবে, একজন কৃষক উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন কি না, একজন কৃষিশ্রমিকের উৎপাদনশীলতা বাড়ছে কি না এবং একটি গ্রামীণ পরিবার কৃষির সঙ্গে যুক্ত থেকে স্থিতিশীল আয় অর্জন করতে পারছে কি না, সেসব প্রশ্নও উন্নয়নের আলোচনায় গুরুত্ব পাওয়া উচিত।

ময়মনসিংহে উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিদর্শনের ঘটনাটি তৃণমূলের মানুষের অভিজ্ঞতা সামনে আনার একটি বাস্তব প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে। মানুষের কথা শোনা, তাঁদের সমস্যা বোঝা এবং উন্নয়ন উদ্যোগের কার্যকারিতা পর্যালোচনা করা জনকল্যাণমুখী নেতৃত্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চর্চা হতে পারে।

বাংলাদেশের সামনে এখন এমন উন্নয়নধারা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন, যেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি সামাজিক ন্যায়বিচার, নারীর ক্ষমতায়ন, কৃষির আধুনিকায়ন এবং সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করার বিষয়গুলো সমান গুরুত্ব পাবে।

জাইমা রহমানের জন্মদিনে সেই প্রত্যাশাই সামনে আসুক—একটি মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ, যেখানে দারিদ্র্য কোনো শিশুর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না, নারীর সম্ভাবনা সামাজিক বাধায় আটকে থাকবে না এবং উন্নয়নের সুফল পৌঁছাবে সমাজের সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা মানুষের কাছেও।