, ,

তারেক রহমানের জাপান সফর: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

নিউজটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশের কূটনীতিতে জাপান কখনোই শুধু একটি দাতা দেশ ছিল না, জাপান ছিল এক পরীক্ষিত বন্ধুর নাম। ১৯৭১ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে টোকিও-ওসাকার স্কুলের শিশুরা যখন টিফিনের পয়সা জমিয়ে সাহায্য পাঠিয়েছিল, তখন থেকেই এই সম্পর্কের ভিত্তি রক্তের চেয়েও গভীর। সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ২৬-২৯ অক্টোবরের টোকিও সফরকে কেবল একটি রুটিন দ্বিপক্ষীয় সফর হিসেবে দেখা ভুল হবে।

এটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার প্রথম জাপান সফর। তবে ইতিহাসের কাকতালীয় পুনরাবৃত্তি এখানেই — তার পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ ও ১৯৮০ সালে এবং মাতা বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯৪ ও ২০০৫ সালে এই সূর্যোদয়ের দেশে মৈত্রীর সেতু রচনা করেছিলেন। এবার সেই সেতুকে কৌশলগত অংশীদারিত্বের মহাসড়কে উন্নীত করার সুযোগ এসেছে।

প্রত্যাশা কী ছিল?

এই সফরের প্রেক্ষাপটটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (EPA) স্বাক্ষরের পর দুই দেশের সম্পর্ক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের নতুন যুগে প্রবেশ করেছে। একই সাথে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের দ্বারপ্রান্তে। এই সময়ে বাংলাদেশের প্রয়োজন তিনটি জিনিস — বিপুল বেসরকারি বিনিয়োগ, দক্ষ জনশক্তির রপ্তানি এবং মাতারবাড়ীর মতো মেগা প্রকল্পের টেকসই বাস্তবায়ন।

প্রাপ্তি কী হলো?

প্রাথমিক প্রাপ্তি আশাব্যঞ্জক। ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সাথে শীর্ষ বৈঠকের পর প্রকাশিত যৌথ বিবৃতি এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী—

১. এক ট্রিলিয়ন ইয়েনের বিনিয়োগের রূপরেখা: আগামী পাঁচ বছরে জাপানি বেসরকারি খাতে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ইয়েন, যা প্রায় ৬.৩ বিলিয়ন ডলার, বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রায় দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এটি কোনো ঋণ প্রতিশ্রুতি নয়, এটি ব্যবসার আস্থার প্রতিফলন।

২. কৌশলগত সমন্বয়: জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট বলেছে, তারা বাংলাদেশকে স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের অভিন্ন মূল্যবোধে বিশ্বাসী গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক অংশীদার মনে করে। ‘মুক্ত ও অবাধ ইন্দো-প্যাসিফিক’ বাস্তবায়নে সমন্বয় জোরদারের অঙ্গীকার বাংলাদেশকে আঞ্চলিক কূটনীতিতে নতুন উচ্চতা দেবে।

৩. বাস্তবমুখী ৮টি সমঝোতা: কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, মানবসম্পদ উন্নয়ন, বেসামরিক বিমান চলাচল, পরিবেশ সুরক্ষা ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার আধুনিকায়ন নিয়ে আলোচিত ৮টি সমঝোতার মধ্যে ৪-৫টি স্বাক্ষরিত হওয়ার পথে। এটি কেবল অবকাঠামো নয়, মানুষকে কেন্দ্র করে উন্নয়নের দর্শন।

৪. প্রবাসী ও সংযোগ: বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ঢাকা-নারিতা ফ্লাইট দ্বিগুণ করা, ভিসা জটিলতা নিরসন এবং রেমিট্যান্স প্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়ে জাপানে বসবাসরত প্রায় ৩০ হাজার বাংলাদেশির দীর্ঘদিনের দাবি এই সফরে গুরুত্ব পেয়েছে।

তবে প্রাপ্তিকে টেকসই করতে হলে প্রত্যাশার ফাঁদ এড়াতে হবে। এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগ সম্ভাব্য পূর্বাভাস, নিশ্চিত অর্থ নয়। অতীতে মেট্রোরেল, তৃতীয় টার্মিনাল, যমুনা রেলসেতুর মতো প্রকল্পে জাপানি সহযোগিতা সফল হয়েছে কারণ সেখানে ধারাবাহিকতা ছিল। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে আঞ্চলিক বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে এবং আড়াইহাজার বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে জাপানি বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে এখন প্রয়োজন দ্রুত ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন, দুর্নীতি হ্রাস এবং নীতি-ধারাবাহিকতা।

তারেক রহমানের এই সফর তাই একটি বার্তা দেয় — বাংলাদেশ এখন সাহায্য নয়, অংশীদারিত্ব চায়। জাপানও সেই অংশীদারিত্বের জন্য প্রস্তুত। এখন প্রয়োজন সেই প্রতিশ্রুতিকে কাগজ থেকে মাঠে নামিয়ে আনা।
– মো: রফিকুল ইসলাম সম্রাট, সিনিয়র সাংবাদিক।