মোঃ অহিদ, স্টাফ রিপোর্টার: জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ না পাওয়ায় কুমিল্লার তিতাস উপজেলাজুড়ে তীব্র বিদ্যুৎ সংকট দেখা দিয়েছে। গত কয়েক দিন ধরে চলমান দীর্ঘ লোডশেডিংয়ে উপজেলার লাখো মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ভ্যাপসা গরমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও গ্রামীণ অর্থনীতিতেও পড়েছে নেতিবাচক প্রভাব।স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনের পাশাপাশি রাতেও ঘন ঘন এবং দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় স্বাভাবিক জীবনযাপন প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। শিশু, বয়স্ক, অসুস্থ রোগী, গর্ভবতী নারী এবং নবজাতক পরিবারের সদস্যরা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। রাতের ঘুম ব্যাহত হওয়ায় কর্মজীবী মানুষ থেকে শুরু করে শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডেও এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় বড় বাধা: সামনে বিভিন্ন পাবলিক ও অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা থাকলেও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে তিতাস উপজেলার হাজার হাজার স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থী পড়েছে চরম বিপাকে। অনেকেই বাধ্য হয়ে চার্জার লাইট, জরুরি বাতি কিংবা মোমবাতির ক্ষীণ আলোয় পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে। অভিভাবকদের আশঙ্কা, দীর্ঘমেয়াদে এ পরিস্থিতি শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি ও ফলাফলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ব্যবসা-বাণিজ্যে বাড়ছে লোকসান: বিদ্যুৎনির্ভর ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ডিজিটাল সেবাকেন্দ্র, মেকানিক ওয়ার্কশপ, সেলুন, রেফ্রিজারেশন ব্যবসা এবং সাধারণ দোকানপাটের কার্যক্রমও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনেক ব্যবসায়ী জানান, নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে না পারায় গ্রাহক হারানোর পাশাপাশি প্রতিদিন আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।
স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, “বিদ্যুৎ যেন এখন আমাদের কাছে সোনার হরিণ। দিনে-রাতে কখন বিদ্যুৎ থাকবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। গরমে শিশু-বয়স্ক সবাই কষ্ট পাচ্ছে। আমরা দ্রুত এই সংকটের সমাধান চাই।”
স্থানীয় ত্রুটি নয়, মূল সমস্যা জাতীয় গ্রিডে: বিদ্যুৎ পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিতাস সাব-জোনাল অফিসের সহকারী জেনারেল ম্যানেজার (ওঅ্যান্ডএম) হোসেন মোহাম্মদ রায়হান জানান, তিতাসে কোনো স্থানীয় যান্ত্রিক ত্রুটি বা বিতরণব্যবস্থার বড় ধরনের সমস্যা নেই। মূল সংকট হচ্ছে জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদার তুলনায় কম বিদ্যুৎ বরাদ্দ পাওয়া।
তিনি বলেন, বরাদ্দ ঘাটতির কারণে পুরো উপজেলায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আন্তরিকভাবে কাজ করছে এবং ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের পক্ষ থেকে আশা প্রকাশ করা হয়েছে, আগামী ১৪ থেকে ২০ কার্যদিবসের মধ্যে জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ বরাদ্দের ঘাটতি কিছুটা কাটিয়ে ওঠা গেলে সরবরাহ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে।
দ্রুত সমাধানে কার্যকর উদ্যোগের দাবি: দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ সংকটে অতিষ্ঠ তিতাসবাসী দ্রুত কার্যকর সমাধান চান। তাদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ বিভাগ এবং দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ সমন্বিত উদ্যোগ নিয়ে দ্রুত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বরাদ্দ নিশ্চিত করবে, যাতে জনজীবন স্বাভাবিক হয় এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব কমে আসে।
একই সঙ্গে এলাকাবাসী স্থানীয় সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়ার কাছে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের আশা, তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও উচ্চপর্যায়ের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে তিতাসের বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণে ভূমিকা রাখবেন।
জনজীবনে বাড়ছে অনিশ্চয়তা: স্থানীয়দের ভাষ্য, বিদ্যুৎ সংকট দ্রুত নিরসন না হলে কৃষি, ক্ষুদ্র শিল্প, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতসহ সামগ্রিক গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর প্রভাব আরও গভীর হতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত ও দ্রুত পদক্ষেপের মাধ্যমে তিতাসবাসী স্বাভাবিক বিদ্যুৎ সরবরাহ ফিরে পাওয়ার প্রত্যাশায় দিন গুনছেন।







