একটি দেশের আন্তর্জাতিক অবস্থান শুধু তার অর্থনীতি, জনসংখ্যা কিংবা ভূগোল দিয়ে নির্ধারিত হয় না।
নির্ধারিত হয় সেই দেশটি বিশ্বমঞ্চে নিজের কথা কতটা স্পষ্টভাবে বলতে পারে, কতটা দক্ষতার সঙ্গে নিজের স্বার্থকে অন্য দেশের স্বার্থের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে পারে এবং সংকটের সময়ে কী ধরনের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ভাষা বেছে নেয়—তার ওপর। নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশন ঘিরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডকে তাই কেবল একটি বিদেশ সফর হিসেবে দেখলে তার তাৎপর্য কমিয়ে দেখা হবে। এটি ছিল বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্রীয় মানসিকতা, কূটনৈতিক সক্রিয়তা এবং ভবিষ্যৎমুখী নেতৃত্বের একটি প্রকাশ।
২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে পৌঁছে ২৫ সেপ্টেম্বর রাত পর্যন্ত চার কর্মদিবসে প্রধানমন্ত্রী প্রায় ৩০টি আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতে অংশ নেন। এর মধ্যে ছিল জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান, সাতটি উচ্চপর্যায়ের বক্তব্য, ১১টি দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং জাতিসংঘ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিউইয়র্ক মিশনের সরকারি বিবরণ বলছে, সফরের কেন্দ্রীয় আলোচনায় ছিল জাতীয় স্বার্থ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি নিরাপত্তা, আঞ্চলিক সহযোগিতা, রোহিঙ্গা সংকট, স্বাস্থ্য, জলবায়ু ও আন্তর্জাতিক শান্তি।
তারেক রহমানের এই সফরের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অর্থ ছিল—বাংলাদেশ নিজের কথা এবার নিজের কণ্ঠে বলেছে। ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে তিনি বাংলা ভাষায় বক্তব্য দেন। বক্তব্যের শুরুতেই তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের স্মরণ করেন। এরপর বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর, রাষ্ট্র পুনর্গঠন, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, নারী ও তরুণদের ক্ষমতায়ন, শিক্ষা, প্রযুক্তি, সামাজিক সুরক্ষা, জলবায়ু ন্যায্যতা, ফিলিস্তিন এবং রোহিঙ্গা সংকটকে একই বক্তব্যের পরিসরে নিয়ে আসেন।
এই ভাষণের একটি বিশেষ দিক ছিল জাতীয় পুনর্গঠনের জন্য তাঁর ‘থ্রি-আর’ ধারণা—রিকভারি, রেস্টোরেশন অ্যান্ড রিকনস্ট্রাকশন। অর্থাৎ অর্থনীতি ও রাষ্ট্রের ক্ষত সারানো, প্রতিষ্ঠান পুনরুদ্ধার এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্গঠন। একটি নির্বাচিত সরকার বিশ্বমঞ্চে শুধু রাজনৈতিক অবস্থানের কথা না বলে রাষ্ট্র পরিচালনার একটি কাঠামোবদ্ধ রূপরেখা তুলে ধরেছে—এই জায়গাটিই ভাষণটিকে আলাদা করে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে এই ‘থ্রি-আর’ কৌশলকে জাতীয় পুনর্গঠনের ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন।
তারেক রহমানের পাঁচ দিনের নিউইয়র্ক সফরে চার দিনের কর্মসূচিতে ৩০টি আনুষ্ঠানিক আন্তর্জাতিক কর্মসূচি, ১১টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ ব্যক্তিদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক হয়েছে। বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি নিরাপত্তা, রোহিঙ্গা সংকট, স্বাস্থ্য, জলবায়ু, আন্তর্জাতিক শান্তি—সবকিছুই আলোচনায় এসেছে। মাহদী আমিনের ভাষায়, সফরের প্রতিটি কর্মসূচিতেই বাংলাদেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও কেবল মাত্র প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একা নন। তার নেতৃত্বেই বিশ্ব মঞ্চে বাংলাদেশকে পথ দেখাচ্ছেন এক ঝাঁক বাংলাদেশি নেতৃত্ব।
জাতিসংঘ সফরের কেন্দ্রবিন্দুতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
তারেক রহমানের এই সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত ছিল ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে তাঁর বাংলা ভাষণ। এটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘে তাঁর প্রথম বক্তব্য এবং একই সঙ্গে জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে সাধারণ পরিষদের মঞ্চে ভাষণ দেওয়ার একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। বক্তব্যের শুরুতেই তিনি মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের স্মরণ করেন। নিজের রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতাকে সামনে রেখে তিনি বিশ্বমঞ্চে বক্তব্যটি সাজিয়েছেন।
ভাষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল এর পরিধি। দেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, আন্তর্জাতিক শান্তি, ফিলিস্তিন, রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, নারী ক্ষমতায়ন, তরুণ উদ্যোক্তা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি—একটি দেশের সামগ্রিক রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারকে একসঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে বিশেষভাবে নজর কাড়ে তাঁর সংঘাত নিরসনের কূটনৈতিক অবস্থান।
তারেক রহমান বলেছেন, “আমরা বিশ্বাস করি, যেকোনো সংঘাতের সমাধান আলোচনা, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই হওয়া উচিত।”
এই একটি বাক্যের মধ্যেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি পরিণত রূপরেখা ধরা পড়ে। শক্তির রাজনীতির পরিবর্তে আলোচনা, আধিপত্যের পরিবর্তে সমতা এবং সংঘাতের পরিবর্তে সমঝোতা, এমন অবস্থান একটি মধ্যম আয়ের, দ্রুত পরিবর্তনশীল এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দেশের জন্য যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।
বাংলাদেশের জন্য ‘থ্রি-আর’ কৌশল
তারেক রহমানের ভাষণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বার্তা ছিল ‘থ্রি-আর’ কৌশল। অর্থাৎ পুনরুদ্ধার, পুনঃস্থাপন ও পুনর্গঠন। তিনি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠনকে একটি দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় কাজ হিসেবে তুলে ধরেছেন।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিনি শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কথা বলেননি; প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলেছেন। কর্মসংস্থান, দক্ষ মানবসম্পদ, নারী উদ্যোক্তা, তরুণ উদ্যোক্তা, প্রযুক্তি ও উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়গুলোকে তিনি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের ভিত্তি হিসেবে দেখিয়েছেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশকে উৎপাদন ও বিনিয়োগের একটি শক্তিশালী কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যও সামনে এসেছে।
এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বক্তব্য দীর্ঘদিন ধরে মূলত উন্নয়ন, সহায়তা, জলবায়ু ঝুঁকি ও মানবিক সংকটকেন্দ্রিক ছিল। এবার তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিনিয়োগ, বাজার, উৎপাদন, প্রযুক্তি ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার প্রশ্ন।
রোহিঙ্গা সংকটে দৃঢ় অবস্থান
রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্য ছিল স্পষ্ট এবং কূটনৈতিকভাবে দৃঢ়। তিনি বলেন, “রোহিঙ্গা সংকটের উৎস ও উৎপত্তি মিয়ানমারে; তাই এর সমাধানও সেখানেই নিহিত।”
তিনি আরও বলেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনই সমস্যাটির একমাত্র সমাধান এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এ বিষয়ে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। একই সঙ্গে প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত জীবনরক্ষাকারী সহায়তা চালু রাখার আহ্বানও জানান তিনি।
এই বক্তব্যের গুরুত্ব আলাদা। কারণ বাংলাদেশ শুধু একজন আশ্রয়দাতা রাষ্ট্র হিসেবে কথা বলেনি; সংকটের উৎস, দায় এবং সমাধানের পথ, তিনটিই একই সঙ্গে চিহ্নিত করেছে। এর আগে ২৩ সেপ্টেম্বর রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে উচ্চপর্যায়ের আলোচনাতেও তারেক রহমান একটি স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য প্রত্যাবাসনপথের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
১১টি দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ
তারেক রহমানের সফরের আরেকটি বড় দিক ছিল দ্বিপক্ষীয় কূটনীতি। চার দিনের কর্মসূচিতে ১১টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। এসব বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, জনশক্তি, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং পারস্পরিক রাজনৈতিক সম্পর্ক গুরুত্ব পেয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে জনশক্তি রপ্তানি ও জ্বালানি নিরাপত্তা, অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
এই কূটনৈতিক ব্যস্ততার মূল্য এখানেই যে, বাংলাদেশ একক কোনো ভূরাজনৈতিক বলয়ের ওপর নির্ভরতার বদলে বহু অংশীদারের সঙ্গে সমান্তরাল সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে। একটি পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থায় এটি বাস্তববাদী কূটনীতির পরিচায়ক।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা
সফরের শেষ পর্যায়ে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শান্তিপূর্ণ ও বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারকও স্বাক্ষর হয়েছে। এটির লক্ষ্য পারমাণবিক প্রযুক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার, নিরাপত্তা, সুরক্ষা, আন্তর্জাতিক মান ও সহযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারণ।
এটিও তারেক রহমানের উপস্থিতিতে সরাসরি স্বাক্ষরিত হয়নি। কিন্তু একই সফরের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিবেশে এই সমঝোতা হওয়া বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ জ্বালানি কাঠামোর সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতার প্রশ্ন জড়িত।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের নৈশভোজ ও বাংলাদেশের দৃশ্যমান উপস্থিতি
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ উপলক্ষে বিশ্বনেতাদের সম্মানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প নিউইয়র্কে একটি নৈশভোজের আয়োজন করেন। সেখানে তারেক রহমান ও ডা. জুবাইদা রহমান অংশ নেন। একই সফরে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের দেওয়া প্রাতরাশেও তাঁরা অংশ নেন।
এটিকে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হিসেবে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই। এটি ছিল বিশ্বনেতাদের সম্মানে আয়োজিত আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক অনুষ্ঠান। কিন্তু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সেখানে উপস্থিতি দেশের আন্তর্জাতিক দৃশ্যমানতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে ট্রাম্পের বার্তা
তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রকাশ্য বক্তব্য এবারের কূটনৈতিক সমীকরণে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কারণ তাঁর বার্তায় শুধু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে উদ্দেশ করে সৌজন্য প্রকাশ করা হয়নি, আলাদাভাবে বাংলাদেশের জনগণ এবং দেশের ভবিষ্যৎ নিয়েও আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।
৩১ আগস্ট তারেক রহমানকে পাঠানো এক চিঠিতে ট্রাম্প বাংলাদেশের জনগণের উদ্দেশে তাঁর “উষ্ণতম শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা” পৌঁছে দিতে বলেন। এরপর বাংলাদেশের মানুষের অতীত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি লেখেন, “তারা অনেক কিছু সহ্য করেছে।” তারপরই আসে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য—“আপনার নেতৃত্বে আমি নিশ্চিত যে তারা এবং আপনার দেশ নিজেরাও একটি অত্যন্ত উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ পাবে।”
একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই বক্তব্যে বাংলাদেশের গুরুত্বটি স্পষ্ট। এখানে আলোচনায় জনগণ, দেশের ভবিষ্যৎ এবং নেতৃত্ব—তিনটিকেই একসঙ্গে সামনে আনা হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ কী পার করেছে, সেই বাস্তবতাকে স্বীকার করে তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ প্রকাশ করেছেন ট্রাম্প। অর্থাৎ তাঁর বার্তায় বাংলাদেশকে একটি সম্ভাবনাময় রাষ্ট্র হিসেবেই তুলে ধরা হয়েছে।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, ট্রাম্প তারেক রহমানের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে সাক্ষাতের আগ্রহও প্রকাশ করেছেন। তিনি লিখেছেন, “অদূর ভবিষ্যতে আপনার সঙ্গে দেখা করার অপেক্ষায় রয়েছি।”
এই বক্তব্য কূটনীতির প্রচলিত সৌজন্যমূলক ভাষার চেয়ে কিছুটা আলাদা। কারণ এখানে ট্রাম্প বাংলাদেশের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্ককে একজন সরকারপ্রধানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। অর্থাৎ তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশের গুরুত্বের পাশাপাশি তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রতিও আস্থার প্রকাশ ঘটেছে।
একটি দেশের আন্তর্জাতিক মর্যাদা অনেক সময় বোঝা যায় বড় শক্তিগুলো সেই দেশকে কীভাবে দেখছে, তাদের সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ করছে এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে কী ধরনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করছে ট্রাম্পের বক্তব্য সেই জায়গায় বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক একটি বার্তা বহন করে।
আর এই বার্তাটি এসেছে এমন এক সময়ে, যখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে দেশের নতুন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরতে নিউইয়র্কে যাচ্ছেন। ফলে ট্রাম্পের বক্তব্য তারেক রহমানের সফরের আগেই বাংলাদেশের নেতৃত্ব এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তর্জাতিক আগ্রহের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন হয়ে ওঠে।
খলিলুর রহমান: জাতিসংঘের সভাপতির আসনে বাংলাদেশ
এই সফরের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক পটভূমি তৈরি করেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। ২ জুন ২০২৬ তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং ৮ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ৪০ বছর পর দ্বিতীয়বারের মতো একজন বাংলাদেশি এই মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্বে এলেন। এর আগে ১৯৮৬ সালে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী এই দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
সাধারণ পরিষদ জাতিসংঘের প্রধান প্রতিনিধিত্বশীল ও নীতিনির্ধারণী অঙ্গ, যেখানে ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্র সমান ভোটাধিকার নিয়ে অংশ নেয়। এই পরিষদের সভাপতি অধিবেশনের সভা পরিচালনা করেন, আলোচনা ও দরকষাকষির প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেন এবং সাধারণ পরিষদের প্রতিনিধিত্ব করেন। ফলে বাংলাদেশের একজন কূটনীতিকের এই আসনে থাকা দেশের জন্য নিছক গৌরবের বিষয় নয়; এটি সরাসরি কূটনৈতিক প্রভাবের একটি সুযোগ।
খলিলুর রহমানের উদ্বোধনী বক্তব্যেও এই দায়িত্বের গভীরতা ধরা পড়ে। বাংলা অনুবাদে তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য ছিল, “আস্থা শুধু চাওয়া যায় না, অর্জন করতে হয়।” আর তিনি জাতিসংঘকে কার্যকর করার জন্য সিদ্ধান্ত, দায়বদ্ধতা ও বাস্তব ফলাফলের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
৮ সেপ্টেম্বর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে তিনি আরও বলেন, “আলোচনা ও সহযোগিতার ওপর আমি উচ্চ অগ্রাধিকার দেব।” তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, সব বিষয়ে একমত হওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু যেখানে ঐকমত্যের জায়গা তৈরি করা যায়, সেখানে তা খুঁজে বের করতে হবে।
২২ সেপ্টেম্বর সাধারণ বিতর্কের সূচনায় তাঁর আরেকটি বক্তব্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ—বিশ্বের মানুষ এখন জানতে চায় জাতিসংঘ শুধু টিকে আছে কি না নয়, জাতিসংঘ কার্যকর কি না।
এখানেই খলিলুর রহমানের গুরুত্ব। তিনি শুধু বাংলাদেশের প্রতিনিধি নন; তিনি এখন এমন একটি বিশ্বসংগঠনের চেয়ার পরিচালনা করছেন, যার সামনে যুদ্ধ, জলবায়ু, বৈষম্য, শরণার্থী, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক আস্থার সংকট একসঙ্গে হাজির হয়েছে।
খলিলুর রহমানের সঙ্গে ড. ইউনূস: বাংলাদেশের আরেকটি আন্তর্জাতিক শক্তি
২১ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সদর দফতরে সামাজিক ব্যবসা, তরুণ ও প্রযুক্তি নিয়ে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানে ড. মুহাম্মদ ইউনূস বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি ড. খলিলুর রহমানও উপস্থিত ছিলেন।
ইউনূস এই অনুষ্ঠানে সামাজিক ব্যবসাকে মানুষের সমস্যা সমাধানের একটি বাস্তব পথ হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “অন্যের জীবনকে ইতিবাচকভাবে স্পর্শ করতে পারাটা পরম আনন্দের।” তরুণদের উদ্দেশে তাঁর আরেকটি বক্তব্য ছিল, “মানুষ জন্মগতভাবেই উদ্যোক্তা।”
এখানে ড. ইউনূসের উপস্থিতির গুরুত্ব অন্যভাবে দেখতে হবে। তিনি বাংলাদেশের সরকারি প্রতিনিধি হিসেবে সাধারণ বিতর্কে বক্তৃতা দেননি। বরং একজন বিশ্বপরিচিত সামাজিক উদ্যোক্তা হিসেবে সামাজিক ব্যবসা, ক্ষুদ্রঋণ, তরুণ নেতৃত্ব ও প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে বৈশ্বিক নীতিনির্ধারণী আলোচনায় অংশ নিয়েছেন। এটি বাংলাদেশের নরম শক্তির আরেকটি দিক।
আর খলিলুর রহমান তাঁর বক্তব্যে ইউনূসের কাজের আন্তর্জাতিক প্রভাবের প্রশংসা করেন এবং সামাজিক ব্যবসা ও তরুণ নেতৃত্বকে জাতিসংঘের ভবিষ্যৎ কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করেন।
তরুণ নেতৃত্ব ও প্রযুক্তির প্রশ্নে বাংলাদেশের অবস্থান
খলিলুর রহমানের সভাপতিত্বের অন্যতম অগ্রাধিকার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার শাসন, টেকসই উন্নয়ন ও মানবাধিকার। সামাজিক ব্যবসা, তরুণ ও প্রযুক্তির অনুষ্ঠানে তিনি জোর দিয়ে বলেন, তরুণদের কেবল অংশগ্রহণকারী হিসেবে নয়, নেতৃত্বদায়ী শক্তি হিসেবে দেখতে হবে। তাঁর বক্তব্যের সারমর্ম হলো—তরুণরা যেন পরামর্শ নেওয়ার মানুষ না হয়ে নীতি তৈরি ও বাস্তবায়নের অংশীদার হয়।
অন্যদিকে তারেক রহমানও তাঁর ভাষণে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ভবিষ্যৎ উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে তুলে ধরেছেন।
অর্থাৎ বাংলাদেশের দুই গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ একই বিশ্বমঞ্চে একই ধরনের ভবিষ্যৎ-চিন্তার কথা বলেছে। একদিকে জাতিসংঘের সভাপতির দায়িত্ব থেকে বৈশ্বিক নীতির কাঠামো, অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতীয় উন্নয়ন কৌশল—দুই জায়গাতেই প্রযুক্তি ও তরুণদের গুরুত্ব উঠে এসেছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের কূটনৈতিক বার্তা
জাতিসংঘ সফরের আগে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী বিশ্বনেতাদের সামনে বাংলাদেশের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরবেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এতে দেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর, উন্নয়নের অগ্রাধিকার, বৈশ্বিক শান্তি এবং আন্তর্জাতিক সংকটের টেকসই সমাধান গুরুত্ব পাবে।
সফরের পর বাস্তবে দেখা গেল, সেই পরিকল্পনার প্রায় প্রতিটি অংশই আন্তর্জাতিক আলোচনায় এসেছে। তারেক রহমানের বক্তব্যে গণতান্ত্রিক রূপান্তর, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, শান্তি, রোহিঙ্গা, জলবায়ু ও মানবিক নিরাপত্তা স্থান পেয়েছে। হুমায়ুন কবির নিজেও দ্বিপক্ষীয় কূটনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এবং ব্রাজিলের সঙ্গে দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতার সম্পর্ক আরও জোরালো করার বিষয়ে আলোচনা করেছেন।
তাঁর প্রস্তুতিমূলক বক্তব্য কেবল আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হয়ে থাকেনি; সফরের বাস্তব কর্মকাণ্ডেও তার প্রতিফলন দেখা গেছে।
মাহদী আমিন: স্বল্প সময়ে সর্বোচ্চ কূটনৈতিক ব্যবহার
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহদী আমিন সফরের সার্বিক চিত্র তুলে ধরে বলেছেন, “প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘদিন পর বিশ্বমঞ্চে জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের প্রধান হিসেবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন।”
সফরের শেষে তাঁর আরেকটি বক্তব্য ছিল, “প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ বিশ্বমঞ্চে আরও সমৃদ্ধ ও স্বনির্ভর দেশ হিসেবে এগিয়ে যাবে।”
মাহদী আমিনের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ৩০টি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি, ১১টি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক, জাতিসংঘের বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠকের পাশাপাশি চার দিনে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সফরসঙ্গীরা প্রায় ৮০টি কর্মসূচিতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তাঁর ভাষায়, ছোট প্রতিনিধিদল নিয়ে সময়ের সর্বোচ্চ ব্যবহার করা হয়েছে।
এ ধরনের সফরের মূল্যায়নে সংখ্যাই সব নয়। কিন্তু সংখ্যাগুলো দেখিয়ে দেয়, এটি নিছক আনুষ্ঠানিক সফর ছিল না; এটি ছিল ঘন কূটনৈতিক কর্মসূচির একটি পরিকল্পিত প্রয়াস।
জুবাইদা রহমান: স্বাস্থ্য কূটনীতিতে বাংলাদেশের নতুন উপস্থাপন
জাতিসংঘ সফরে ডা. জুবাইদা রহমানের উপস্থিতিও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। মাহদী আমিনের তথ্য অনুযায়ী, তিনি আটটি উচ্চপর্যায়ের আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতে অংশ নেন এবং চারটিতে বক্তব্য দেন। এর মধ্যে নারী নেত্রীদের প্ল্যাটফর্ম, ফার্স্ট স্পাউস সংলাপ এবং মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য ও ধাত্রীবিদ্যা বিষয়ক অনুষ্ঠান ছিল উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা তাঁর বক্তব্যের প্রশংসা করেছেন বলেও জানানো হয়।
২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সদর দফতরে মাতৃ ও নবজাতকের মৃত্যু প্রতিরোধ নিয়ে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানে তিনি বাংলাদেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পুনর্বিন্যাসের পরিকল্পনা তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল, “আমাদের সুস্থ বাংলাদেশের যে স্বপ্ন, তা হলো—চিকিৎসাকেন্দ্রিক ব্যবস্থা থেকে এমন একটি ব্যবস্থায় যাওয়া, যেখানে রোগ প্রতিরোধ, রোগের প্রাথমিক শনাক্তকরণ…”
তিনি জানান, বাংলাদেশ ২৫ হাজার পেশাদার ধাত্রী নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করেছে এবং তাঁদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। গর্ভধারণের আগের সময় থেকে প্রসব-পরবর্তী ও নবজাতকের সেবা পর্যন্ত একটি ধারাবাহিক কাঠামো তৈরির কথা তিনি তুলে ধরেছেন।
এটি রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য কূটনীতি। কারণ এখানে বাংলাদেশের পরিচয় এসেছে একটি বড় রোহিঙ্গা-আশ্রয়দাতা দেশ হিসেবে নয়, বরং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পুনর্বিন্যাসে একটি পরিকল্পনা উপস্থাপনকারী দেশ হিসেবে।
ট্রাম্প-মেলানিয়া পরিসরে জুবাইদা রহমান
জুবাইদা রহমান শুধু প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী ছিলেন না। তিনি মেলানিয়া ট্রাম্প আয়োজিত শিশু ও তরুণদের কল্যাণকেন্দ্রিক একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেন। এই উদ্যোগে শিশুদের শিক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার, শিক্ষক ও অভিভাবকদের প্রশিক্ষণ এবং অনলাইন ঝুঁকি থেকে শিশুদের সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে ট্রাম্প-মেলানিয়ার নৈশভোজে তাঁর উপস্থিতিও বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকে পারিবারিক ও সামাজিক একটি মাত্রা দিয়েছে। তারেক রহমান ও জুবাইদা রহমানকে একই কূটনৈতিক পরিসরে উপস্থিত দেখা গেছে, যেখানে বিশ্বের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের জীবনসঙ্গীরাও ছিলেন।
জাইমা রহমান: জাতিসংঘে প্রজন্মের নতুন উপস্থিতি
এই সফরের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি জাইমা রহমানের জাতিসংঘে দায়িত্ব পাওয়া। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির কার্যালয়ে তিনি আইন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সভাপতির কার্যালয়ের ৪০ সদস্যের দলে ছয়জন বাংলাদেশি রয়েছেন।
এখানে আবেগের চেয়ে তথ্যটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এটি বাংলাদেশ সরকারের স্থায়ী মিশনের পদ নয়; জাতিসংঘের সভাপতির কার্যালয়ের পেশাগত দায়িত্ব। মাহদী আমিন বলেছেন, “জাইমা রহমান সরাসরি জাতিসংঘের সদর দপ্তরে সাধারণ পরিষদের সভাপতির কার্যালয়ে লিগ্যাল অফিসার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন।”
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, মাহদী আমিন বলেন, নিয়োগে বাংলাদেশ সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই এবং এটি জাতিসংঘের নিজস্ব নিয়ম ও প্রক্রিয়া অনুসারে হয়েছে। তিনি জানান, পদটি পেশাগতভাবে তৃতীয় স্তরের এবং এর জন্য ন্যূনতম পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতার প্রয়োজন।
এই জায়গাটিকে বাংলাদেশের একটি প্রজন্মগত অর্জন হিসেবেও দেখা যায়। একজন বাংলাদেশি তরুণ পেশাজীবী জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের একটি কার্যালয়ে আইনগত দায়িত্ব পালন করছেন—এটি আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্রে বাংলাদেশের মানবসম্পদের উপস্থিতিরও প্রতিফলন।
ভাষণ কেন গুরুত্বপূর্ণ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভাষণ নিয়ে দেশে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমানসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ভাষণের বিভিন্ন দিকের প্রশংসা করেছেন। বিশেষ করে রোহিঙ্গা সংকট, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, বিশ্বশান্তি, জলবায়ু, নারী ও তরুণদের প্রশ্নে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ ভাষণের শক্তি হিসেবে বিশ্বশান্তি, আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং বহুপক্ষীয় সহযোগিতার ওপর জোর দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। তিনি আরও বলেন, বাংলায় দেওয়া ভাষণে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরা হয়েছে।
ভাষণের সবচেয়ে বড় সাফল্য সম্ভবত এখানেই—বাংলাদেশের কথা বলা হয়েছে বাংলাদেশের ভাষায়, বাংলাদেশের স্বার্থের জায়গা থেকে এবং একটি বৃহত্তর বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে যুক্ত করে।
বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের একসঙ্গে বহু কণ্ঠ
নিউইয়র্কের ৮১তম সাধারণ অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য একটি বিশেষ ছবি তৈরি করেছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনে বাংলাদেশ। সাধারণ বিতর্কের মঞ্চে বাংলাদেশ। সামাজিক ব্যবসার বৈশ্বিক আলোচনায় বাংলাদেশ। স্বাস্থ্য কূটনীতির আলোচনায় বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক আইন ও পেশাগত ক্ষেত্রে বাংলাদেশি তরুণ। বিশ্বনেতাদের কূটনৈতিক আয়োজনে বাংলাদেশ।
এই দৃশ্যগুলোকে আলাদা আলাদা ঘটনা হিসেবে দেখলে এর রাজনৈতিক তাৎপর্য কমে যায়। একসঙ্গে দেখলে বোঝা যায়, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজের পরিচয়কে বহুমাত্রিক করার পথে এগোচ্ছে।
একজন প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় নীতি বলছেন। একজন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিশ্বের সবচেয়ে বড় বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। একজন নোবেলজয়ী সামাজিক ব্যবসার দর্শন ব্যাখ্যা করছেন। একজন চিকিৎসক মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলছেন। একজন তরুণ আইনজীবী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে পেশাগত দায়িত্ব পালন করছেন।
এটি একটি দেশের কূটনৈতিক সক্ষমতার নতুন বিন্যাস।
নেতৃত্বের প্রশ্নে তারেক রহমানের জায়গাটি কোথায়
এখন প্রশ্ন আসে, এই পুরো ছবির কেন্দ্রে তারেক রহমানের জায়গাটি কোথায়?
উত্তরটি তাঁর সফরের ধরনেই পাওয়া যায়। তিনি শুধু একটি ভাষণ দিয়ে ফিরে আসেননি। একই সফরে রাজনৈতিক বক্তব্য, অর্থনৈতিক যোগাযোগ, দ্বিপক্ষীয় কূটনীতি, রোহিঙ্গা, জলবায়ু, স্বাস্থ্য, বিনিয়োগ, বিমান পরিবহন ও জ্বালানি নিরাপত্তাকে একই জাতীয় স্বার্থের কাঠামোর মধ্যে নিয়ে এসেছেন। চার দিনের কর্মসূচিতে ৩০টি আনুষ্ঠানিক আন্তর্জাতিক কর্মসূচি ও ১১টি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক সেই সক্রিয়তার প্রমাণ।
তাঁর উপস্থিতি সেখানে প্রতিটি বাংলাদেশি নেতৃত্বের অবস্থান, আত্মবিশ্বাস ও অবস্থানকে শক্তিশালী ও দৃঢ় করেছে।
সবচেয়ে বড় বিষয়, তাঁর বক্তব্য। যেখানে কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল একটি পুনর্গঠিত বাংলাদেশ—যে বাংলাদেশ নিজের সার্বভৌমত্বে দৃঢ়, আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় আগ্রহী, বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত, প্রযুক্তির জন্য প্রস্তুত, রোহিঙ্গা ইস্যুতে দৃঢ় এবং শান্তির প্রশ্নে কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দেয়।
এমন নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা অবশ্য নিউইয়র্কে নয়, ঢাকায়। জাতিসংঘের ভাষণে যে অর্থনৈতিক সংস্কারের কথা বলা হয়েছে, তা দেশে বাস্তবায়ন করতে হবে। বিনিয়োগের কথা বলা হয়েছে, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। দক্ষ মানবসম্পদের কথা বলা হয়েছে, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকে তার উপযোগী করতে হবে। রোহিঙ্গার কথা বলা হয়েছে, প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক চাপ ধরে রাখতে হবে।
অর্থাৎ বিশ্বমঞ্চে অর্জিত মর্যাদাকে দেশের ভেতরের বাস্তব উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করাই হবে পরবর্তী বড় দায়িত্ব।
বাংলাদেশের জন্য নিউইয়র্কের বার্তা
এই সফরের সামগ্রিক মূল্যায়নে সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো, বাংলাদেশ এবার শুধু তার সমস্যার কথা বলেনি; তার সম্ভাবনার কথাও বলেছে।
শুধু রোহিঙ্গা নয়, বিনিয়োগও আছে। শুধু জলবায়ু ঝুঁকি নয়, সবুজ রূপান্তরের কথা আছে। শুধু উন্নয়ন সহায়তা নয়, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের কথা আছে। শুধু রাজনৈতিক অবস্থান নয়, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও নারী ক্ষমতায়নের কথাও আছে।
আর এই বহুমাত্রিক বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে নেতৃত্ব দিয়েছেন তারেক রহমান।
খলিলুর রহমানের সভাপতির আসন বাংলাদেশের কূটনীতির মর্যাদা বাড়িয়েছে। ড. ইউনূসের সামাজিক ব্যবসার উপস্থিতি দেশের নরম শক্তিকে সামনে এনেছে। হুমায়ুন কবিরের সক্রিয় কূটনীতি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রকে বিস্তৃত করেছে। মাহদী আমিন সফরের কৌশলগত সংগঠন ও ফলাফল তুলে ধরেছেন। জুবাইদা রহমান স্বাস্থ্য ও নারী-শিশু ইস্যুতে বাংলাদেশের নতুন কথকতা তুলে ধরেছেন। জাইমা রহমান আন্তর্জাতিক পেশাজীবনের নতুন প্রজন্মের প্রতীক হিসেবে সামনে এসেছেন।
সব মিলিয়ে নিউইয়র্কে বাংলাদেশের উপস্থিতির সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো কোনো একটি চুক্তি, কোনো একটি নৈশভোজ কিংবা কোনো একটি ভাষণ নয়। অর্জন হলো, বাংলাদেশকে এবার একাধিক মাত্রায় দেখা গেছে।
শেষ কথা: বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নতুন আত্মবিশ্বাস
একসময় আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশকে মূলত দারিদ্র্য, দুর্যোগ, জলবায়ু ঝুঁকি ও শরণার্থী সংকটের আলোকে দেখা হতো। এখন সেই পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, মানবসম্পদ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, স্বাস্থ্য কূটনীতি এবং বহুপক্ষীয় নেতৃত্ব।
এই পরিবর্তন এক দিনে তৈরি হয়নি। বহু বছরের রাষ্ট্রীয় কূটনীতি, উন্নয়ন অভিজ্ঞতা, প্রবাসী জনগোষ্ঠী, শান্তিরক্ষা কার্যক্রম এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের দীর্ঘ অংশগ্রহণ তার ভিত্তি তৈরি করেছে। কিন্তু সেই অর্জনগুলোকে একটি নতুন রাজনৈতিক ভাষায় সামনে নিয়ে আসার সুযোগ তৈরি হয়েছে বর্তমান নেতৃত্বের সময়ে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাতিসংঘ সফর সেই সম্ভাবনার একটি দৃশ্যমান প্রকাশ।
তিনি বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে বলেছেন বাংলাদেশের কথা। খলিলুর রহমান বিশ্বসংগঠনের সভাপতির আসনে থেকে বিশ্বকে শুনছেন এবং আলোচনার পথ তৈরি করছেন। ড. ইউনূস বাংলাদেশের সামাজিক উদ্যোগের অভিজ্ঞতা তুলে ধরছেন। জুবাইদা রহমান স্বাস্থ্য ও নারী-শিশুর প্রশ্নে দেশের কথা বলছেন। জাইমা রহমান আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে পেশাগত দায়িত্ব পালন করছেন।
এই ধারাবাহিকতা যদি দেশের ভেতরের প্রতিষ্ঠান, অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিনিয়োগ ও মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে নিউইয়র্ক সফর একটি কূটনৈতিক সফরের স্মৃতি হয়ে থাকবে না; এটি বাংলাদেশের নতুন আন্তর্জাতিক যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হয়ে উঠবে।
বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের কণ্ঠ এখন আগের চেয়ে স্পষ্ট। সেই কণ্ঠে আত্মবিশ্বাস আছে, স্বার্থের প্রশ্নে দৃঢ়তা আছে, আবার সহযোগিতার জন্য দরজাও খোলা আছে।
আর সেই নতুন আত্মবিশ্বাসের রাজনৈতিক মুখ হয়ে সামনে এসেছেন তারেক রহমান।
কবি ,সাংবাদিক, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ও সম্পাদক , ইউএসএ বাংলা নিউজ।







