জাতিসংঘের বিশাল সাধারণ পরিষদ কক্ষে বাংলাদেশের পতাকা ছিল। সামনে বসে ছিলেন বিশ্বের নানা দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানেরা। সময়টা ১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দাঁড়ালেন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মঞ্চে। স্বাধীনতার নয় বছরের মাথায় একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের রাষ্ট্রপ্রধান কথা বলছিলেন এমন এক বিশ্বব্যবস্থা নিয়ে, যেখানে ধনী ও দরিদ্র দেশের ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে। তাঁর ভাষণের কেন্দ্রে ছিল ক্ষুধা, দারিদ্র্য, উন্নয়ন, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজন। জাতিসংঘের সরকারি নথিতে আছে, জিয়াউর রহমান সেদিন বাংলায় ভাষণ দিয়েছিলেন।
সেই ভাষণের ১৩ বছর পর, ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর একই আন্তর্জাতিক মঞ্চে দাঁড়ালেন তৎকালীন বিএনপির চেয়ারপার্সন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মা এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তখন তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। পৃথিবী এর মধ্যে বদলে গেছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হয়েছে। স্নায়ুযুদ্ধের অবসান ঘটেছে। বাংলাদেশও দীর্ঘ সামরিক শাসনের পর সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরেছে। খালেদা জিয়ার ভাষণে তাই গণতন্ত্র, উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, ছোট রাষ্ট্রের অধিকার, দারিদ্র্য, পানি ও পরিবেশের মতো বিষয় সামনে এল।
আর ২০২৬ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর সেই একই মঞ্চে দাঁড়ানোর কথা তাঁদের ছেলে তারেক রহমানের। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে এটি তাঁর প্রথম ভাষণ। তাঁর ভাষণের ঘোষিত বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক নবযাত্রা, আইনের শাসন ও জবাবদিহি, বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, যুব ও নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, রোহিঙ্গা সংকট, প্রযুক্তির ন্যায়সংগত ব্যবহার এবং বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার সংস্কার। তিন প্রজন্ম, তিনটি সময়, তিনটি ভিন্ন বাংলাদেশ—কিন্তু আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের কথা বলার একটি দীর্ঘ পারিবারিক ইতিহাসও এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
এই গল্পের শুরুটা অবশ্য শুধু একটি পরিবারের গল্প দিয়ে বোঝা যাবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের বেড়ে ওঠার ইতিহাস।
১৯৮০ সালের বাংলাদেশকে আজকের বাংলাদেশ দিয়ে কল্পনা করা কঠিন। স্বাধীনতার মাত্র নয় বছর হয়েছে। যুদ্ধের ধ্বংস তখনো অনেক জায়গায় চোখে পড়ত। মানুষের মাথাপিছু আয় কম, কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত, কৃষিই অর্থনীতির প্রধান ভরসা। গ্রামে বিপুল মানুষ ভূমিহীন। প্রতি বছর নতুন মানুষের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার চিন্তা। জিয়াউর রহমান তাঁর জাতিসংঘ ভাষণে এই বাস্তবতার কথাই তুলে ধরেছিলেন। জনসংখ্যার চাপ, বেকারত্ব, ভূমিহীনতা ও কম মাথাপিছু আয়ের মতো সমস্যার কথা তিনি বলেছিলেন। পাশাপাশি কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে আরও আত্মনির্ভর করার প্রয়োজনের কথাও জানান।
কিন্তু তাঁর কথার পরিধি বাংলাদেশের সীমানায় থেমে থাকেনি।
সেদিন জাতিসংঘে দাঁড়িয়ে জিয়াউর রহমান আসলে জানতে চেয়েছিলেন, বিশ্বের এত সম্পদ, এত প্রযুক্তি, এত উৎপাদন ক্ষমতা থাকার পরও কেন মানুষ ক্ষুধার মধ্যে থাকবে? কেন ধনী ও দরিদ্র দেশের দূরত্ব কমবে না? কেন অস্ত্রের পেছনে বিপুল অর্থ খরচ হবে, অথচ দরিদ্র মানুষের জীবন বদলানোর জন্য সহায়তা কমে যাবে?
এগুলো নিছক অর্থনৈতিক প্রশ্ন ছিল না। বাংলাদেশের জন্য তখন এগুলো ছিল বেঁচে থাকার প্রশ্ন।
কারণ আন্তর্জাতিক অর্থনীতির বড় কোনো পরিবর্তন বাংলাদেশের মতো দেশের বাজার, খাদ্য, জ্বালানি, বৈদেশিক মুদ্রা ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় সরাসরি প্রভাব ফেলত। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সেই জায়গা থেকেই নতুন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দাবি তুলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, শান্তিকে টুকরো করে দেখা যায় না; পৃথিবীকে ধনী ও দরিদ্র ভাগে রেখে স্থায়ী শান্তিও সম্ভব নয়। তাঁর ভাষণের একটি বক্তব্য ছিল, “প্রয়োজন সাহসী ও সৃজনশীল পদক্ষেপ।”
আজকের পাঠকের কাছে কথাটি হয়তো খুব পরিচিত শোনাবে। কিন্তু ১৯৮০ সালে এটি বলার রাজনৈতিক তাৎপর্য ছিল। তখন পৃথিবী স্নায়ুযুদ্ধের দুই মেরুতে বিভক্ত। অস্ত্র প্রতিযোগিতা চলছে। উন্নয়নশীল দেশগুলো ঋণ, জ্বালানি ও বাণিজ্য সংকটে পড়ছে। এই অবস্থায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি জাতিসংঘে দাঁড়িয়ে উন্নয়নকে বিশ্বশান্তির সঙ্গে এক কাতারে রাখছেন।
আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। জিয়াউর রহমান শুধু দূরের বড় শক্তিগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিলেন না। দক্ষিণ এশিয়ার নিজেদের মধ্যেও সহযোগিতার প্রয়োজনের কথা বলেছিলেন। তিনি আঞ্চলিক সহযোগিতার উদ্যোগের কথা তুলে ধরে বলেছিলেন, অন্য অঞ্চলে যখন সহযোগিতার মাধ্যমে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা হচ্ছে, তখন দক্ষিণ এশিয়াতেও শুরু করা দরকার। তাঁর ভাষণের সেই অংশটি পরবর্তী সময়ে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণার ইতিহাসেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে।
বাংলাদেশের জন্য এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি দৃষ্টিভঙ্গি। একটি নতুন রাষ্ট্র হিসেবে আমরা তখন বিশ্বরাজনীতির দর্শক হওয়ার অবস্থায় ছিলাম না। নিজেদের নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজেদের কথাও বলতে হবে—এই বোধটি জিয়ার জাতিসংঘ ভাষণে স্পষ্ট ছিল।
তেরো বছর পর খালেদা জিয়া যখন জাতিসংঘে দাঁড়ালেন, বাংলাদেশের সামনে তখন আরেক ধরনের বাস্তবতা।
১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরে এসেছে। মানুষের ভোটে সরকার বদল হয়েছে। সামরিক শাসনের দীর্ঘ সময় পেরিয়ে বাংলাদেশ আবার নির্বাচিত সরকারের পথে হাঁটছে। সেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়ার জাতিসংঘ ভাষণে গণতন্ত্রের প্রসঙ্গ তাই স্বাভাবিকভাবেই সামনে এসেছে।
তিনি বলেছিলেন, “গণতন্ত্র ও উন্নয়ন পরস্পরকে শক্তিশালী করে।” কথাটি তখনকার বাংলাদেশের একটি প্রতিচ্ছবি। কারণ ঠিক সেই সময়টিতেই তাঁর নেতৃত্বে দেশের মানুষ সদ্য গণতন্ত্র ফিরে পেয়েছে। আর সেই গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে হলে দারিদ্র্য কমাতে হবে, অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে হবে, মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনতে হবে—এই সম্পর্কটিই তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরেছিলেন।
তাঁর ভাষণে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রয়োজনও ছিল স্পষ্ট। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বাড়াতে হবে। বিনিয়োগ দরকার। প্রযুক্তি দরকার। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বিশ্ব অর্থনীতিতে আরও ন্যায্য সুযোগ দরকার। উন্নত দেশগুলোর সহযোগিতা ছাড়া বাংলাদেশের মতো দেশ একা সব সমস্যার সমাধান করতে পারবে না—এই বাস্তব কথাটিও তিনি বলেছেন।
কিন্তু সেই ভাষণের সবচেয়ে বাংলাদেশি অংশ ছিল পানি।
ফারাক্কা তখন শুধু একটি বাঁধের নাম ছিল না। বাংলাদেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, নদী, মৎস্য, জীবিকা এবং মানুষের ভবিষ্যতের সঙ্গে এর সম্পর্ক ছিল। শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট আর বর্ষায় অতিরিক্ত পানি—দুই দিক থেকেই বাংলাদেশের মানুষ সমস্যায় পড়ত। খালেদা জিয়া জাতিসংঘে সেই বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন। তিনি অভিন্ন নদীর পানির ওপর বাংলাদেশের “অন্তর্নিহিত ও আইনগত অধিকার”-এর কথা বলেছিলেন। ফারাক্কাকে বাংলাদেশের জন্য “জীবন-মরণ সমস্যা” হিসেবেও বর্ণনা করেছিলেন।
এখানে এসে জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার ভাষণ যেন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে যায়।
জিয়া বলেছিলেন, উন্নয়নশীল দেশের মানুষের দারিদ্র্য ও বঞ্চনা দূর করতে বিশ্বব্যবস্থাকে বদলাতে হবে। খালেদা জিয়া বললেন, গণতন্ত্র ও উন্নয়নকে পাশাপাশি এগোতে হবে এবং বাংলাদেশের পানির অধিকারও আন্তর্জাতিক আলোচনায় জায়গা পেতে হবে।
বেগম খালেদা জিয়া তাঁর ভাষণে জিয়াউর রহমানের ১৯৮০ সালের আহ্বরণও স্মরণ করেছিলেন। ১৩ বছর পর একই মঞ্চে একটি ভাষণের সঙ্গে আরেকটি ভাষণের কথোপকথন তৈরি হয়েছিল।
এরপর কেটে গেছে আরও ৩৩ বছর।
বাংলাদেশও বদলেছে।
যে দেশটি একসময় খাদ্য ও বৈদেশিক মুদ্রার সংকট নিয়ে লড়ত, সেই দেশ এখন তৈরি পোশাক রফতানি করে বিশ্বের বড় বাজারে। প্রবাসী আয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। কৃষিতে উৎপাদন বেড়েছে। মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। স্বাস্থ্য ও শিক্ষায়ও বড় পরিবর্তন এসেছে।
কিন্তু উন্নতি মানেই সমস্যার শেষ নয়।
বরং বাংলাদেশের সামনে এখন কিছু প্রশ্ন আরও বড় হয়ে এসেছে। জলবায়ু পরিবর্তনে উপকূলের মানুষের জীবন বদলে যাচ্ছে। নদীভাঙন ও লবণাক্ততা বাড়ছে। রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘ হচ্ছে। বৈশ্বিক বাণিজ্যের নিয়ম বদলাচ্ছে। প্রযুক্তি একদিকে নতুন সুযোগ তৈরি করছে, অন্যদিকে তৈরি করছে নতুন বৈষম্য। আর জাতিসংঘসহ বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা কার্যকরভাবে এসব সমস্যার সমাধান করতে পারবে, সেটিও বড় প্রশ্ন।
এই বাংলাদেশ নিয়েই এবার জাতিসংঘে যাচ্ছেন তারেক রহমান।
২১ সেপ্টেম্বর তিনি নিউইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ছেড়েছেন। ২৪ সেপ্টেম্বর তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রথমবারের মতো ভাষণ দেবেন। পররাষ্ট্র সচিব জানিয়েছেন, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক নবযাত্রা, আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা, বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি যুব ও নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রোহিঙ্গা সংকট, প্রযুক্তির ন্যায়সংগত ব্যবহার এবং বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার সংস্কারের কথা তাঁর বক্তব্যে থাকবে। ভাষণটি হবে বাংলায়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে তাই বাংলাদেশের কথাই আগে।
বিশ্বকে বলতে হবে, বাংলাদেশ কী চায়। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি যারা সবচেয়ে বেশি বহন করছে, তাদের জন্য ন্যায়সংগত অর্থায়ন কেন প্রয়োজন। রোহিঙ্গা সংকটের বোঝা কেন শুধু বাংলাদেশের ওপর থাকতে পারে না। তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য বৈশ্বিক অর্থনীতিতে কী সুযোগ দরকার। প্রযুক্তি যেন শুধু ধনী দেশের সম্পদ না হয়ে ওঠে, তার জন্য কী ধরনের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন। আর বাংলাদেশের মতো দেশগুলো যেন বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, তার জন্য বহুপক্ষীয় ব্যবস্থায় কী পরিবর্তন দরকার।
এই জায়গায় তিনটি ভাষণের সময়ের পার্থক্য খুব পরিষ্কার।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশ তখন বিশ্বকে বলেছিলেন—দারিদ্র্য ও ক্ষুধা দূর করার দায়িত্ব শুধু দরিদ্র দেশের নয়। বিশ্ব অর্থনীতির কাঠামোও বদলাতে হবে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বাংলাদেশ বলেছিলেন, গণতন্ত্র ছাড়া উন্নয়ন পূর্ণতা পায় না। আর বাংলাদেশের নদী ও পানির অধিকারও আন্তর্জাতিক ন্যায়ের অংশ।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বাংলাদেশ এখন বলবেন, নতুন বাস্তবতার নতুন ন্যায়বিচাররের কথা। জলবায়ু, রোহিঙ্গা, প্রযুক্তি, বৈশ্বিক বৈষম্য ও বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার সংস্কার, এসব প্রশ্নে বাংলাদেশের নিজস্ব অবস্থান।
এই তিনটি ভাষণকে পাশাপাশি রাখলে আসলে বাংলাদেশের নিজের ছবিটাই দেখা যায়।
১৯৮০ সালের বাংলাদেশ ছিল বেঁচে থাকার সংগ্রামে থাকা একটি তরুণ রাষ্ট্র। ১৯৯৩ সালের বাংলাদেশ ছিল গণতন্ত্রে ফিরে এসে অর্থনীতিকে নতুন পথে নেওয়ার চেষ্টা করা একটি দেশ। আর ২০২৬ সালের বাংলাদেশ এমন একটি দেশ, যে নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে বিশ্বের সামনে দাঁড়াতে পারে, আবার নিজের ঝুঁকি ও সমস্যার কথাও স্পষ্টভাবে বলতে পারে।
এই ইতিহাসের সবচেয়ে আবেগের জায়গাটি অবশ্য পরিবার।
একজন বাবা ১৯৮০ সালে জাতিসংঘের মঞ্চে দাঁড়িয়েছিলেন। ১৩ বছর পর তাঁর স্ত্রী দাঁড়িয়েছেন সেখানে। এবার তাঁদের সন্তান দাঁড়াতে যাচ্ছেন। মাঝখানে ৪৬ বছর।
তিনটি ভাষণকে শুধু উত্তরাধিকার হিসেবে দেখলে ভুল হবে। কারণ প্রতিবারই সঙ্গে ছিল বাংলাদেশ। জিয়াউর রহমানের সঙ্গে ছিল সদ্য স্বাধীন দেশের ক্ষুধা ও উন্নয়নের প্রশ্ন। খালেদা জিয়ার সঙ্গে ছিল গণতন্ত্রে ফেরা বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা এবং পানির অধিকার। তারেক রহমানের সঙ্গে যাচ্ছেন একটি অনেক বড় অর্থনীতির বাংলাদেশ, যে এখন জলবায়ু পরিবর্তন, প্রযুক্তি, রোহিঙ্গা সংকট ও বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার প্রশ্নেও নিজের কথা বলতে চায়।
আর একটি ছোট অথচ অর্থপূর্ণ মিল আছে।
১৯৮০ সালে জিয়াউর রহমান জাতিসংঘে বাংলায় কথা বলেছিলেন। ২০২৬ সালে তাঁর ছেলে তারেক রহমানও বাংলায় কথা বলবেন। জাতিসংঘের সরকারি নথিতে জিয়ার ভাষণ সম্পর্কে স্পষ্টভাবে বলা আছে—তিনি বাংলায় বক্তব্য দিয়েছিলেন এবং ইংরেজি পাঠটি তাঁর প্রতিনিধিদল সরবরাহ করেছিল।
ভাষা একই থাকছে। কিন্তু দেশটি আর আগের জায়গায় নেই।
১৯৮০ সালের সেই হলঘরে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি যে প্রশ্ন তুলেছিলেন, মানুষের এত সম্পদ, জ্ঞান ও প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও কেন পৃথিবীতে ক্ষুধা ও দারিদ্র্য থাকবে, সেই প্রশ্নের পুরো উত্তর আজও মেলেনি। বেগম খালেদা জিয়া দেখিয়েছিলেন গণতন্ত্র ও উন্নয়ন পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত, সেটিও বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘ আলোচনার অংশ হয়ে আছে।
এবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে নতুন সময়ের বাংলাদেশ।
তাঁর ভাষণ এখনো হয়নি। তাই ইতিহাস তার মূল্যায়ন করার জায়গায় পৌঁছায়নি। কিন্তু মঞ্চে ওঠার আগেই একটি বিষয় নিশ্চিত হয়ে গেছে—বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি দীর্ঘ পারিবারিক অধ্যায় আবার জাতিসংঘের মঞ্চে ফিরে এসেছে।
১৯৮০ থেকে ১৯৯৩, ১৯৯৩ থেকে ২০২৬ এই পথটি আসলে বাংলাদেশের পথ। দরিদ্র ও যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ থেকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা, গণতন্ত্রে ফিরে আসা, অর্থনীতির বিস্তার এবং নতুন বৈশ্বিক সংকটের মুখোমুখি হওয়া, সবকিছুর ছাপ এই তিনটি জাতিসংঘের ভাষণে পাওয়া যায়।
তাই ২৪ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে বাংলাদেশের পতাকার নিচে যখন তারেক রহমান দাঁড়াবেন, তাঁর পেছনে শুধু একটি পরিবারের দুই প্রজন্মের স্মৃতি থাকবে না। থাকবে একটি দেশের দীর্ঘ পথচলা। সেই পথের শুরুতে ছিল ক্ষুধা ও দারিদ্র্য থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। পরে যুক্ত হয়েছে গণতন্ত্র ও উন্নয়নের প্রশ্ন। আর এখন সেই তালিকায় এসেছে জলবায়ু ন্যায়বিচার, রোহিঙ্গা সংকট, প্রযুক্তির ন্যায্য ব্যবহার এবং একটি আরও কার্যকর বিশ্বব্যবস্থার দাবি।
জাতিসংঘের মঞ্চে তিন প্রজন্মের এই উপস্থিতির সবচেয়ে বড় গল্প সম্ভবত এটাই, মানুষ বদলেছে, সময় বদলেছে, বিশ্বের সমস্যাও বদলেছে; কিন্তু বাংলাদেশের নিজের কথা নিজেই বলার প্রয়োজনটি বদলায়নি।
রাজু আলীম
কবি, সাংবাদিক, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব







