, ,

ভারতের রাজনীতিতে নতুন শক্তি: সবচেয়ে বড় ভোটার ব্লক হতে যাচ্ছে জেন জি

নিউজটি শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভারতের রাজনীতিতে একটি নীরব কিন্তু গভীর পরিবর্তন দ্রুত দৃশ্যমান হচ্ছে। আগামী ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগেই দেশটির সবচেয়ে বড় প্রাপ্তবয়স্ক প্রজন্মে পরিণত হবে জেনারেশন জেড বা জেন জি। বিশাল এই তরুণ জনগোষ্ঠী শুধু ভোটার সংখ্যার দিক থেকেই নয়, ডিজিটাল সংযোগ, রাজনৈতিক সচেতনতা এবং দ্রুত সংগঠিত হওয়ার সক্ষমতার কারণেও আগামী দিনের ক্ষমতার সমীকরণ বদলে দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাধীনতার পর ভারতের রাজনীতিতে বিভিন্ন সময়ে কৃষক, গ্রামীণ ভোটার, নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত কিংবা নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভোটব্যাংক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কিন্তু ২০২৯ সালের নির্বাচনের আগে প্রথমবারের মতো একটি নির্দিষ্ট প্রজন্ম—জেন জি—দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী ভোটার ব্লকে পরিণত হওয়ার পথে।

জনমিতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচনের সময় ভারতের ১৮ থেকে ৩২ বছর বয়সী জেন জি জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ৩৮ কোটিতে পৌঁছাবে। এর মধ্যে আনুমানিক ১৯ কোটি ৯০ লাখ পুরুষ এবং ১৮ কোটি ২০ লাখ নারী থাকবেন।

এর মাধ্যমে তারা সংখ্যার বিচারে মিলেনিয়াল প্রজন্মকে ছাড়িয়ে ভারতের বৃহত্তম প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীতে পরিণত হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষ্য, এই পরিবর্তন কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়; বরং এটি ভারতের নির্বাচনী রাজনীতির ভবিষ্যৎ এজেন্ডা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কারণ এই প্রজন্মের বড় অংশই প্রথমবারের ভোটার, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী কিংবা কর্মজীবনের শুরুতে থাকা তরুণ পেশাজীবী।

ভারতের সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলন এই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে।

নিট-ইউজি (NEET-UG) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া আন্দোলন দ্রুত শিক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সরকারি দায়বদ্ধতা নিয়ে জাতীয় বিতর্কে রূপ নেয়।

এই আন্দোলনের রাজনৈতিক অভিঘাতও ছিল উল্লেখযোগ্য। শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা এবং বিরোধী দলগুলোর চাপের ফলে বিষয়টি জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে উঠে আসে। ঘটনাটি স্পষ্ট করে দেয়, ডিজিটালভাবে সংযুক্ত তরুণ সমাজ এখন আর শুধু ভোটার নয়—তারা জনমত গঠন ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির অন্যতম বড় শক্তি।

আগের প্রজন্মের তুলনায় জেন জি সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতায় বেড়ে উঠেছে।

স্মার্টফোন, ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ফলে তথ্য সংগ্রহ, মতামত প্রকাশ, প্রচারণা পরিচালনা কিংবা আন্দোলন সংগঠিত করার ক্ষেত্রে তারা অনেক বেশি সক্ষম।

বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচলিত জনসভা বা পোস্টারনির্ভর প্রচারণার পাশাপাশি এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কার্যকর উপস্থিতি তৈরি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কারণ তরুণ ভোটারদের বড় অংশ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিভিন্ন অনলাইন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জেন জি ভোটারদের অগ্রাধিকার আগের প্রজন্মের তুলনায় অনেকটাই ভিন্ন।

তাদের কাছে কর্মসংস্থান, উচ্চশিক্ষার মান, পরীক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি, আবাসন, জীবনযাত্রার ব্যয়, উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ এবং সুশাসনের মতো বিষয়গুলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

অর্থাৎ পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির পাশাপাশি জীবনের বাস্তব সমস্যাগুলোও আগামী নির্বাচনে বড় ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।

ভারত দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের অন্যতম তরুণ জনসংখ্যার দেশ হিসেবে পরিচিত। তবে সেই চিত্র ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে।

জনসংখ্যার কাঠামোতে শিশুদের অনুপাত কমছে, অন্যদিকে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ছে। ফলে ঐতিহ্যগত জনমিতিক সুবিধা বা “ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড” ধীরে ধীরে সংকুচিত হচ্ছে।

এই পরিবর্তনের মধ্যেই জেন জি দেশের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তবয়স্ক প্রজন্ম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। ফলে তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রত্যাশা পূরণ করা আগামী সরকারের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, আগামী কয়েক বছরে ভারতের প্রায় সব বড় রাজনৈতিক দলকেই তাদের নির্বাচনী কৌশলে পরিবর্তন আনতে হবে।

তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে শিক্ষা সংস্কার, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি, স্টার্টআপ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উদ্ভাবন, জলবায়ু পরিবর্তন, মানসিক স্বাস্থ্য এবং ডিজিটাল অর্থনীতির মতো বিষয়গুলোকে আরও গুরুত্ব দিতে হতে পারে।

একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশ্বাসযোগ্য যোগাযোগ, দ্রুত প্রতিক্রিয়া এবং স্বচ্ছ নীতিগত অবস্থানও রাজনৈতিক সাফল্যের অন্যতম শর্ত হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ভারতের এই জনমিতিক পরিবর্তন শুধু দেশটির জন্য নয়, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার গণতন্ত্রের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ।

বাংলাদেশসহ এ অঞ্চলের দেশগুলোতেও তরুণ ভোটার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ডিজিটাল রাজনৈতিক অংশগ্রহণ দ্রুত বাড়ছে। ফলে ভবিষ্যতের রাজনীতিতে তরুণদের প্রত্যাশা, তথ্যপ্রযুক্তির প্রভাব এবং জবাবদিহিমূলক শাসনের প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচন ভারতের জন্য শুধু আরেকটি সাধারণ নির্বাচন হবে না; এটি হতে পারে একটি প্রজন্মগত রাজনৈতিক রূপান্তরের সূচনা। সংখ্যার বিচারে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীতে পরিণত হওয়া জেন জি আগামী দিনের নির্বাচনী ফলাফল, রাজনৈতিক ভাষ্য এবং নীতিনির্ধারণে নির্ধারক ভূমিকা রাখতে পারে।

রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য বার্তাটি স্পষ্ট—ভারতের নতুন ভোটার শক্তিকে আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। যে দল তরুণদের আশা-আকাঙ্ক্ষা, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বচ্ছতা ও উন্নত জীবনের দাবিকে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্যভাবে ধারণ করতে পারবে, আগামী দিনের ভারতীয় রাজনীতিতে তারাই বাড়তি সুবিধা পেতে পারে।