বিশ্বের ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, ক্ষমতার দম্ভ যখন চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছায়, তখন সাংবাদিকতার কলমই হয়ে ওঠে সেই দম্ভ ভাঙার শেষ হাতিয়ার।
১৯৭২ সালে ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির মাধ্যমে যখন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের সিংহাসন টলে গিয়েছিল, কিংবা ১৯৭১ সালে পেন্টাগন পেপারস প্রকাশের মাধ্যমে ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিন সরকারের মিথ্যাচার উন্মোচিত হয়েছিল—প্রতিটি ক্ষেত্রেই সাংবাদিকরা প্রমাণ করেছেন, কোনো ক্ষমতাবানই সত্যের চেয়ে বড় নন। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য, সিরাজগঞ্জ স্বাস্থ্য বিভাগের বর্তমান চিত্র যেন সেই ইতিহাসের উল্টো যাত্রার গল্প শোনাচ্ছে।
সম্প্রতি সিরাজগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. মো. নুরুল আমিনের সাথে সাংবাদিক মোহাম্মদ মঈনুল হোসেনের কথোপকথন পেশাদারিত্বের চরম লঙ্ঘন এবং ক্ষমতার বিকৃত মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে। একজন সরকারি কর্মকর্তা যখন তথ্য দেওয়ার পরিবর্তে সাংবাদিকদের তথ্যের ‘সোর্স’ (উৎস) জানতে চেয়ে চাপ সৃষ্টি করেন, তখন প্রশ্ন জাগে—তিনি কি জনসেবার ব্রত নিয়ে চেয়ারে বসেছেন, নাকি নিজের দপ্তরের অনিয়ম ধামাচাপা দিতে ‘তদন্তকারী’ সেজেছেন?
সম্মান যখন ক্ষমতার দম্ভে বন্দি
কথোপকথনের এক পর্যায়ে সাংবাদিক যখন সিভিল সার্জনকে ‘ভাই’ সম্বোধন করেন, তখন তিনি চরম ক্ষুব্ধ হয়ে জানতে চান, “আমি জেলা কর্মকর্তা, আমাকে কেন ভাই বলছেন?” সাংবাদিক পাল্টা প্রশ্ন করেন, “আপনি কি ‘মহোদয়’ বললে খুশি হন?” একজন সরকারি কর্মকর্তার এই আচরণ প্রমাণ করে যে, তিনি জনগণের সেবক নয়, বরং নিজেকে রাজকীয় মর্যাদায় অধিষ্ঠিত মনে করেন। অথচ প্রশাসনিক প্রটোকল বা সৌজন্যবোধ কোনোটিই সাংবাদিকদের প্রতি এমন তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার অনুমতি দেয় না। জনগণের করের টাকায় বেতন পাওয়া একজন কর্মকর্তা যখন জনগণের কণ্ঠস্বরকে ‘তুমি-তোকারি’ বা ছোট করে দেখার প্রবণতা দেখান, তখন তা কেবল তাঁর সংকীর্ণ মানসিকতারই পরিচয় দেয় না, বরং উচ্চপদের অহমিকা কীভাবে শুভবুদ্ধিকে গ্রাস করে তার নগ্ন বহিঃপ্রকাশ ঘটায়।
আইন কী বলে? সিভিল সার্জনের কি জানা নেই?
বাংলাদেশের উচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট রায় ও পর্যবেক্ষণ রয়েছে যে, সাংবাদিকরা তাঁদের সংবাদের উৎস বা সোর্স প্রকাশ করতে বাধ্য নন। সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে প্রদত্ত মত প্রকাশের স্বাধীনতার আলোকে আদালত বারবার বলেছেন, গণমাধ্যম রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ এবং দুর্নীতি দমনে তাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। হাইকোর্টের এই রায়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সিভিল সার্জন যেভাবে সোর্সের নাম জানতে চেয়েছেন, তা সরাসরি আদালত অবমাননার শামিল। যে কর্মকর্তা আদালতের নির্দেশনা মানতে কুণ্ঠাবোধ করেন, তিনি কীভাবে জেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্য বিভাগের অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন—তা নিয়ে জনমনে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
সাংবাদিকতা: দায়বদ্ধতার আয়না
সাংবাদিকতা কেবল পেশা নয়, এটি একটি ব্রত। রানা প্লাজা ট্র্যাজেডিতে ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে লাইভ সংবাদ প্রচার করে সাংবাদিকরাই বিশ্বকে জানিয়েছিলেন শ্রমিকের করুণ আর্তনাদ। সাগর-রুনী হত্যাকাণ্ডের মতো অন্ধকার অধ্যায়েও সাংবাদিকরাই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন সত্য উন্মোচনের প্রত্যাশায়। সাংবাদিকের নজরদারিই যখন সমাজে আলো ফেলে, তখন সিভিল সার্জনের মতো একজন জেলা কর্মকর্তা কেন সাংবাদিকদের খাটো করার চেষ্টা করছেন? এর নেপথ্যে কি তবে কোনো গভীর অসংগতি রয়েছে, যা জনসম্মুখে আসার ভয় পাচ্ছেন তিনি?
ডা. মো. নুরুল আমিনের এই আচরণ মূলত দুর্বল চিত্তের বহিঃপ্রকাশ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে সাংবাদিকদের নিয়ে উপহাস করার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তারই অনুকরণে তিনি নিজেকে জাহির করতে চেয়েছেন। কিন্তু তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে যখন কোনো দুর্নীতি বা অনিয়ম বেরিয়ে আসে, তখন এই সাফাই গাওয়ার সংস্কৃতি কোনো কাজে আসে না।
আমরা সিভিল সার্জনকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই—সাংবাদিকরা কারো দয়ার পাত্র নন। আপনার চেয়ারের গরিমা আপনার কাজের স্বচ্ছতার ওপর নির্ভর করে, সাংবাদিকদের শাসানোর ওপর নয়। তথ্যের উৎস জানতে চাওয়া আপনার এখতিয়ার নয়, বরং তথ্য প্রদান করা আপনার সাংবিধানিক দায়িত্ব।
ইতিহাস সাক্ষী, সত্যের পথ কখনো রুদ্ধ করা যায় না। যে সিভিল সার্জন সাংবাদিকদের সোর্স জানতে চেয়ে এবং ‘মহোদয়’ সম্বোধনের বায়না ধরে ক্ষমতার দাপট দেখাতে চাইছেন, তিনি হয়তো বুঝতে পারছেন না—তাঁর এই ঔদ্ধত্যই প্রমাণ করে যে সিরাজগঞ্জের স্বাস্থ্য বিভাগে কতটা গভীর ক্ষত রয়েছে। সাংবাদিকরা কেবল আয়না ধরেন; সেই আয়নায় নিজের কদর্য চেহারা দেখে সাংবাদিকদের দোষারোপ না করে, দপ্তরের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই হবে আপনার জন্য বুদ্ধিমানের কাজ।
সাংবাদিকতার নজরদারি থেকে কেউই ঊর্ধ্বে নন—সেটি যত বড় কর্মকর্তার চেয়ারই হোক না কেন। সিরাজগঞ্জের জনস্বার্থে সাংবাদিকরা তাঁদের কাজ চালিয়ে যাবেন, সত্য একদিন প্রকাশিত হবেই।
সিরাজগঞ্জের স্বাস্থ্য বিভাগের বর্তমান এই পরিস্থিতি নিয়ে আরও কোনো তথ্য বা বিশেষ কোনো দিকে নজর দিতে কি আপনি চাইছেন?







