, ,

সেবার নামে হয়রানি: ব্যাংকিং খাতে গ্রাহক ভোগান্তি চরমে

নিউজটি শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক, মোঃ জামিল উদ্দিনঃ

বাংলাদেশে সেবার নামে গ্রাহক হয়রানি যেন এখন নিত্যদিনের বাস্তবতা। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সেবাখাতে প্রতিনিয়ত মানুষকে ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ, গ্যাস, স্বাস্থ্য, পরিবহন থেকে শুরু করে ব্যাংকিং খাত—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই গ্রাহকসেবা এখন প্রশ্নবিদ্ধ। এর মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র দেখা যাচ্ছে ব্যাংকিং খাতে, যেখানে মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ জমা রাখা হলেও প্রয়োজনের সময় সেই অর্থ তুলতে গিয়ে পড়তে হচ্ছে চরম বিড়ম্বনায়।
ব্যাংক এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে মানুষ নিরাপত্তা ও আস্থার জায়গা থেকে তাদের অর্থ জমা রাখে। ভবিষ্যতের প্রয়োজন, ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা জরুরি মুহূর্তে ব্যবহারের জন্য আমানতকারীরা ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বাস্তবতা হলো—নিজের জমা রাখা টাকা তুলতেই গ্রাহকদের দাঁড়াতে হচ্ছে দীর্ঘ লাইনে, কাটাতে হচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। অনেক সময় একটি সাধারণ লেনদেন সম্পন্ন করতেও দিনের বড় একটি অংশ নষ্ট হয়ে যায়।
বিশেষ করে মাসের শুরু, শেষ কিংবা উৎসবের সময় ব্যাংক শাখাগুলোতে গ্রাহকদের উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়। পর্যাপ্ত কাউন্টার না থাকা, জনবল সংকট, ধীরগতির সেবা এবং প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে সাধারণ গ্রাহককে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। বৃদ্ধ, নারী, অসুস্থ ব্যক্তি কিংবা দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষদের দুর্ভোগ আরও বেশি। অনেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেয়ে খালি হাতে ফিরে যান।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, কিছু ব্যাংকে গ্রাহকরা নিজেদের আমানত ফেরত পেতেও নানা জটিলতার মুখোমুখি হচ্ছেন। কখনও বলা হচ্ছে ‘ক্যাশ সংকট’, কখনও ‘সিস্টেম ডাউন’, আবার কখনও ‘আজ এত টাকা দেওয়া যাবে না’—এমন নানা অজুহাতে আমানতকারীদের হয়রানি করা হচ্ছে। গ্রাহকের নিজস্ব অর্থ উত্তোলনে এমন অনিশ্চয়তা শুধু ভোগান্তিই নয়, ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
একজন আমানতকারী যখন ব্যাংকে অর্থ জমা রাখেন, তখন তিনি শুধু টাকা রাখেন না—তিনি রাখেন তার বিশ্বাস, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা। কিন্তু সেই আমানত ফেরত পেতে যদি তাকে দিনের পর দিন ঘুরতে হয়, তাহলে সেটি শুধু দুর্বল সেবাব্যবস্থার পরিচয় নয়, বরং তা গ্রাহক অধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
ব্যাংকিং খাতে এ ধরনের অনিয়ম ও গ্রাহক হয়রানি বন্ধে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। প্রতিটি শাখায় পর্যাপ্ত জনবল নিশ্চিত করা, কাউন্টার সংখ্যা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিনির্ভর দ্রুত সেবা চালু, গ্রাহক অভিযোগ নিষ্পত্তিতে জবাবদিহিতা এবং আমানত ফেরতে স্বচ্ছ নীতি বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে আরও কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে।
সেবা যদি হয় হয়রানির আরেক নাম, তবে তা কখনোই প্রকৃত সেবা হতে পারে না। ব্যাংক গ্রাহকের আস্থার জায়গা, আতঙ্কের নয়। মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ নিয়ে যেন আর কোনো প্রকার টালবাহানা না হয়—এটাই এখন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।