সাময়িক বরখাস্তের এক বছর পর চূড়ান্ত বিভাগীয় ব্যবস্থা
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) নকশাকার (চলতি দায়িত্ব) মোঃ শফিউল্লাহ বাবুর চাকরি চলে গেছে। কর্মস্থলে অনুপস্থিতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে রাজউক (কর্মকর্তা ও কর্মচারী) চাকরি বিধিমালা, ২০১৩ এর বিধি ৩৮(১) এর দফা (খ)(ই) অনুযায়ী চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়েছে। এর আগে তাকে সাময়িক বরখাস্তের মেয়াদ শেষে দ্বিতীয় কারণ দর্শানো নোটিশ দেওয়া হয়েছিল, যার জবাব তিনি দাখিল করেননি। রাজউক সূত্রে জানা গেছে, শফিউল্লাহ বাবু রাজউকের প্রশাসন শাখা, রাজধানী, ঢাকায় নকশাকার (চার্ট ড্রাফটিং) পদে কর্মরত ছিলেন। তিনি গত ০৪ আগস্ট ২০২৪ তারিখ হতে অদ্যাবধি পর্যন্ত কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতিরেকে কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন। তার এহেন কর্মকাণ্ডে কর্তৃপক্ষের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে এবং অফিস শৃঙ্খলা ভঙ্গ হয়েছে বলে আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাজউক কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জারি করা চূড়ান্ত অপসারণের আদেশে বলা হয়েছে, শফিউল্লাহ বাবুর বিরুদ্ধে কর্মস্থলে অনুপস্থিতির অভিযোগ উঠলে রাজউক (কর্মকর্তা ও কর্মচারী) চাকরি বিধিমালা, ২০১৩ এর বিধি ৩৭(খ) অনুযায়ী অসদাচরণ এবং বিধি ৩৭(গ) মোতাবেক পলায়নের অভিযোগে অভিযুক্ত করে বিভাগীয় মামলা নং-০৪/২০২৫ রুজু করা হয়। স্মারক নম্বর ২৫.৩৯.০০০০.০০৯.৩১.৪৭১.০১.৯০৭/৯০৮, তারিখ ১৮ জুন ২০২৫ এর মাধ্যমে অভিযোগনামা ও অভিযোগ বিবরণী প্রেরণ করে কারণ দর্শানো হয়। কিন্তু উক্ত অভিযোগনামা ও অভিযোগ বিবরণী গ্রহণ না করায় ডাকটি ফেরত আসে। তিনি উক্ত অভিযোগনামা ও অভিযোগ বিবরণীর জবাব দাখিল করেননি বা ব্যক্তিগত শুনানীর ইচ্ছাপোষণও করেননি। তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের প্রেক্ষিতে গুরুদণ্ড আরোপের সম্ভাবনা থাকায় ন্যায় বিচারের স্বার্থে একই বিধিমালার বিধি ৪১(৩) অনুযায়ী বিষয়টি তদন্তপূর্বক মতামত প্রদানের জন্য জনাব বিধান রায়, উপপরিচালক (প্রশাসন-২), রাজউক, ঢাকা কে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগপূর্বক গত ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে পত্র জারি করা হয়।
তদন্তকারী কর্মকর্তা কর্তৃক গত ১০ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে দাখিলকৃত তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, শফিউল্লাহ বাবু গত ০৪ আগস্ট ২০২৪ তারিখ হতে অদ্যাবধি সংযুক্ত কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন। অর্থাৎ তার বিরুদ্ধে আনীত পলায়নের অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়। তদন্তকারী কর্মকর্তা কর্তৃক দাখিলকৃত তদন্ত প্রতিবেদন, নথি ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে রাজউক (কর্মকর্তা ও কর্মচারী) চাকরি বিধিমালা, ২০১৩ এর বিধি ৩৭(খ) অনুযায়ী অসদাচরণ এবং বিধি ৩৭(গ) অনুযায়ী পলায়নের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় বিধি ৩৮(১)(খ) মোতাবেক গুরুদণ্ড আরোপের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে দ্বিতীয় কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করা হয়। গত ২১ মে ২০২৬ তারিখে জারিকৃত দ্বিতীয় কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব দাখিল না করায় গুরুদণ্ড আরোপের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়। স্মারক নম্বর ২৫.৩৯.০০০০.০০৯.৩১.৪৭১.০১.১৫৬১, তারিখ ২২ জুন ২০২৬ এর চূড়ান্ত আদেশে তাকে চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়। আদেশটি স্বাক্ষর করেছেন ইঞ্জিনিয়ার মোঃ রিয়াজুল ইসলাম, চেয়ারম্যান, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), রাজধানী, ঢাকা।
রাজউক হতে শফিউল্লাহ বাবুর বিরুদ্ধে দুটি পৃথক বিভাগীয় আদেশ জারি করা হয়েছে। প্রথম আদেশটি দ্বিতীয় কারণ দর্শানো নোটিশ, তারিখ ২১ মে ২০২৬, স্মারক নম্বর ২৫.৩৯.০০০০.০০৯.৩১.৪৭১.০১.১২৭৬। দ্বিতীয় আদেশটি চূড়ান্ত অপসারণ সংক্রান্ত, তারিখ ২২ জুন ২০২৬, একই স্মারক নম্বর ২৫.৩৯.০০০০.০০৯.৩১.৪৭১.০১.১৫৬১। দ্বিতীয় কারণ দর্শানো নোটিশে বলা হয়, তিনি গত ০৪ আগস্ট ২০২৪ তারিখ হতে ২১ এপ্রিল ২০২৫ তারিখ পর্যন্ত মোট ২৬০ দিন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতিরেকে কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন। তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ, বিভাগীয় মামলার তদন্ত প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট সকল কাগজপত্র পর্যালোচনায় অসদাচরণ ও পলায়নের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় চূড়ান্ত আদেশে তাকে চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়। চূড়ান্ত আদেশে বলা হয়েছে, তিনি দ্বিতীয় কারণ দর্শানো নোটিশের জবাব দাখিল করেননি। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের আলোকে তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। তাই তাকে চাকরি থেকে অপসারণ করা হলো। এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আদেশে উল্লেখিত অভিযোগসমূহের মধ্যে রয়েছে, তিনি কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকে অফিস শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেছেন। তার বিরুদ্ধে অসদাচরণ ও পলায়নের অভিযোগ আনা হয়েছে। তদন্তে দেখা গেছে, তিনি গত ০৪ আগস্ট ২০২৪ তারিখ হতে অদ্যাবধি সংযুক্ত কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে আনীত পলায়নের অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনের অনুলিপি ৩১ পাতা সংযুক্ত ছিল দ্বিতীয় কারণ দর্শানো নোটিশে। তবে পত্র দুটিতে দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদকের মামলার কোনো উল্লেখ নেই। অভিযোগটি শুধুমাত্র কর্মস্থলে অনুপস্থিতি, অসদাচরণ ও পলায়ন সংক্রান্ত।
শফিউল্লাহ বাবুর স্থায়ী ঠিকানা পিতা মৃত জসমত উল্লাহ, গ্রাম ও পোস্ট অফিস শুভাগাছা, থানা কাজিপুর, জেলা সিরাজগঞ্জ। তাকে চূড়ান্ত আদেশের অনুলিপি প্রদান করা হয়েছে। এছাড়াও আদেশের অনুলিপি রাজউকের সদস্য (সকল), প্রধান প্রকৌশলী (বাস্তবায়ন/প্রকল্প ও ডিজাইন), সিনিয়র সিস্টেম এনালিস্ট, প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ, প্রধান নগর স্থপতি, পরিচালক (সকল), লিয়াজোঁ অফিসার, পরিসংখ্যানবিদ, নথি রক্ষণ কর্মকর্তা এবং অফিস কপি হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। দ্বিতীয় কারণ দর্শানো নোটিশের অনুলিপি সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ), লিয়াজোঁ অফিসার, পরিসংখ্যানবিদ এবং অফিস কপি হিসেবে পাঠানো হয়েছিল।
রাজউকের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে কর্মস্থলে অনুপস্থিতি ও অসদাচরণের বিষয়টি গুরুতরভাবে দেখা দরকার। একজন কর্মচারী দীর্ঘদিন ধরে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলেও প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে কঠোর ব্যবস্থা নেয়নি বলে প্রশ্ন উঠেছে। প্রায় দুই বছর ধরে অনুপস্থিত থাকার পর চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে এ ধরনের অনুপস্থিতির ঘটনা নতুন নয়। তবে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে অফিস শৃঙ্খলা ভঙ্গের প্রবণতা বাড়তে থাকে। রাজউকের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। শফিউল্লাহ বাবু গত ০৪ আগস্ট ২০২৪ তারিখ হতে অনুপস্থিত ছিলেন। প্রথমে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এরপর বিভাগীয় মামলা রুজু, তদন্ত, কারণ দর্শানো নোটিশ এবং অবশেষে চূড়ান্ত অপসারণের আদেশ জারি করা হয়। পুরো প্রক্রিয়ায় প্রায় দুই বছর সময় লেগেছে।
রাজউকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, শফিউল্লাহ বাবুর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া একটি আইনগত প্রক্রিয়া। তবে এত দীর্ঘ সময় ধরে অনুপস্থিত থাকার পরও তাকে চাকরিতে বহাল রাখা হয়েছিল, যা প্রশ্নবিদ্ধ। তিনি আরও জানান, রাজউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মোঃ রিয়াজুল ইসলাম কর্তৃপক্ষের ভাবমূর্তি রক্ষায় এবং অফিস শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কঠোর অবস্থানে রয়েছেন। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে অনুপস্থিতির মতো স্পষ্ট অভিযোগে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া গেলে প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা আরও ভালো হতো বলে মনে করেন তিনি।
রাজউকের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হলে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। প্রথমত, বায়োমেট্রিক উপস্থিতি পদ্ধতি চালু করে অনুপস্থিতি কমাতে হবে। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকলে তাৎক্ষণিকভাবে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। তৃতীয়ত, কর্মস্থলে অনুপস্থিতির কারণ জানতে হবে এবং প্রয়োজনে চিকিৎসা বা অন্যান্য প্রমাণপত্র যাচাই করতে হবে। চতুর্থত, অফিস শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। পঞ্চমত, প্রতিষ্ঠানের ভেতরে নিয়মিত মনিটরিং বাড়াতে হবে। শফিউল্লাহ বাবুর অপসারণের ঘটনা রাজউকের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষায় একটি পদক্ষেপ হতে পারে। তবে একজন কর্মচারীকে অপসারণ করলেই শৃঙ্খলা ফিরে আসবে না। এ জন্য একটি সুদৃঢ় ও টেকসই কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন। রাজধানীর নিরাপদ ও পরিকল্পিত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে রাজউককে শৃঙ্খলিত ও দায়বদ্ধ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে। এটি শুধু রাজউকের জন্যই নয়, সমগ্র রাজধানীবাসীর জন্য জরুরি।






