শেখ হাসিনা তখন হেভিওয়েট প্রার্থী। ঢাকার যেকোনো আসনে দাঁড়ালেই তাঁর বিজয় প্রায় নিশ্চিত, এমনটাই ছিল রাজনৈতিক মহলের ধারণা। ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি প্রার্থী হলেন ঢাকা-৭ (সূত্রাপুর-কোতোয়ালি) আসনে।
শেখ হাসিনার মতো একজন প্রভাবশালী নেত্রীর বিরুদ্ধে বিএনপি কৌশলগত কারণে কোনো হেভিওয়েট প্রার্থীকে মনোনয়ন দিল না। দলীয় মনোনয়ন পেলেন সাদেক হোসেন খোকা।
রাজনীতির মাঠে তখনো এলাকায় খোকার পরিচিতি খুব একটা বিস্তৃত নয়। কিন্তু ক্রীড়া সংগঠক, সমাজসেবী এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সংগঠক হিসেবে তিনি ছিলেন সুপরিচিত ও জনপ্রিয়। মানুষের সঙ্গে তাঁর ছিল সহজ সম্পর্ক, আন্তরিক যোগাযোগ।
খোকা মনোনয়ন পাওয়ার পরপরই বিএনপির সমর্থকদের মধ্যে দেখা দিল মিশ্র প্রতিক্রিয়া। এক পক্ষ হতাশ। তাদের ধারণা, শেখ হাসিনার মতো প্রার্থীর বিরুদ্ধে একজন হেভিওয়েট প্রার্থী না দিলে অন্তত শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলাও কঠিন হবে। অন্য পক্ষ অবশ্য সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাল। তাদের যুক্তি, যে আসনে বিজয়ের নিশ্চয়তা নেই, সেখানে দলের গুরুত্বপূর্ণ কোনো নেতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলা বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
শুরু হলো নির্বাচনী প্রচারণা।
সহজ প্রতিপক্ষ পেয়েছে, এমন আত্মবিশ্বাসে আওয়ামী লীগের একাংশের সমর্থকেরা জোরেশোরে প্রচারণায় নেমে পড়লেন। প্রচারণার সঙ্গে যুক্ত হলো টিটকারি, বিদ্রূপ, এমনকি মৃদু হুমকিও। অন্যদিকে সাদেক হোসেন খোকার প্রচারণা চলছিল বেশ সাদামাটাভাবে। অর্থনৈতিক ও সাংগঠনিক আয়োজনেও ছিল সীমাবদ্ধতা। নির্বাচনী প্রচারণায় যেন একদিকে ছিল জাঁকজমক, অন্যদিকে নিরাভরণ এক লড়াই।
কিন্তু মাত্র দশ দিনের ব্যবধানে বদলে গেল পুরো নির্বাচনী চিত্র।
খোকার প্রচারণার সেই গরিবি হাল পুরান ঢাকার তরুণদের ভালো লাগল না। তাঁদের কাছে নির্বাচন কেবল জয়-পরাজয়ের হিসাব ছিল না; ছিল সম্মান, আত্মমর্যাদা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রশ্ন। তাঁদের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ল একটি কথা:
‘আমগো খোকা ভাই হারবো, ঠিক আছে। মাগার ইলেকশন তো ইলেকশনের মতো হইতে হইবো!’
এই একটি বাক্য যেন পুরো নির্বাচনের গতিপথ পাল্টে দিল।
পাড়ায় পাড়ায় নৌকার পাশাপাশি গড়ে উঠতে লাগল ধানের শীষের নির্বাচনী ক্যাম্প। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এসব ক্যাম্প পরিচালনায় যাঁরা এগিয়ে এলেন, তাঁদের অধিকাংশই সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। এমনকি তাঁদের মধ্যে নীরবে নৌকার সমর্থকরাও ছিলেন। দলীয় পরিচয়, রাজনৈতিক বিশ্বাস কিংবা মতাদর্শের বিভাজন ছাপিয়ে তাঁরা যেন একজন মানুষকে ঘিরে একত্রিত হলেন।
অতি অল্প সময়ের মধ্যেই সাদেক হোসেন খোকা হয়ে উঠলেন সবার ‘আমগো খোকা ভাই’।
নির্বাচনী প্রচারণার শেষ দিন। একদিকে শেখ হাসিনার জনসভা, অন্যদিকে সাদেক হোসেন খোকার নির্বাচনী মিছিল। পুরান ঢাকার রাজপথে সেই মিছিলের ব্যাপকতা ছিল অভাবনীয়। পুরান ঢাকার ইতিহাসে এত বড় নির্বাচনী মিছিল এর আগে কিংবা পরে হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।
মিছিলের জনসমুদ্রে দেখা গেল এমন অনেক মুখ, যাঁদের রাজনীতির সঙ্গে কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই। এক পিতা তাঁর রাজনীতিবিমুখ ছেলেকে মিছিলে দেখে বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করলেন,
‘তুই এই মিছিলে কী করস?’
ছেলের পাল্টা প্রশ্ন,
‘আপনে আইছেন ক্যান?’
দুজনের আসার কারণ কিন্তু একই। একজন এসেছেন ‘আমগো খোকা’র টানে, আরেকজন এসেছেন ‘আমগো খোকা ভাইয়ের’ মিছিলে।
এভাবেই একজন প্রার্থী দলীয় পরিচয়ের গণ্ডি অতিক্রম করে মানুষের আপনজন হয়ে উঠেছিলেন।
মিছিল চলাকালীন খবর ছড়িয়ে পড়ল, মিলব্যারাকের জনসভায় শেখ হাসিনা আসছেন না।
এরপর এলো নির্বাচনের দিন।
ভোটগ্রহণ চলল শান্তিপূর্ণভাবে। প্রতিটি কেন্দ্রের বাইরে আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের প্রভাব ও উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। তাঁদের মধ্যে ছিল একধরনের আত্মবিশ্বাস, যেন জয় নিয়ে কোনো সংশয়ই নেই। কোনো বড় ধরনের গোলযোগ ছাড়াই শেষ হলো ভোটগ্রহণ।
শুরু হলো ভোট গণনা।
এরপর যা ঘটল, তা অনেককেই বিস্মিত করল। প্রায় প্রতিটি কেন্দ্রেই সাদেক হোসেন খোকা এগিয়ে থাকতে লাগলেন। সবচেয়ে বিস্ময়কর ফল দেখা গেল আওয়ামী লীগ-সমর্থক অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে। সেখানেও খোকা ও শেখ হাসিনার ভোটের ব্যবধান ছিল উল্লেখযোগ্য।
অর্থাৎ দলীয় সমর্থনের প্রচলিত হিসাবকে পাশ কাটিয়ে অনেক ভোটার জাতীয় পর্যায়ের একজন প্রভাবশালী নেত্রীর পরিবর্তে বেছে নিয়েছিলেন নিজেদের এলাকার মানুষটিকে। তাঁদের কাছে শেখ হাসিনা ছিলেন জাতীয় রাজনীতির পরিচিত মুখ, কিন্তু খোকা ছিলেন ‘আমগো খোকা ভাই’।
এই নির্বাচন যেন একটি সত্য আবারও সামনে নিয়ে এসেছিল: রাজনীতিতে দলীয় পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়ার শক্তি তার চেয়েও অনেক বেশি।
রাত আটটার মধ্যেই এলাকাবাসীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল সাদেক হোসেন খোকার বিজয়ের খবর। অথচ তাঁর এই বিজয়ের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসে পরদিন দুপুরে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ঘোষিত ফলাফল যেন মানুষের আগেই জানা এক জনরায়েরই আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি হয়ে উঠেছিল।
সাদেক হোসেন খোকার সেই বিজয় কেবল একটি নির্বাচনী জয় ছিল না। এটি ছিল মানুষের ভালোবাসা, আস্থা, আত্মমর্যাদা ও স্বতঃস্ফূর্ত জনসম্পৃক্ততার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। দলীয় রাজনীতির বাইরে গিয়েও যে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া যায়, তাঁর নির্বাচনী লড়াই তারই স্মরণীয় উদাহরণ।
আজ সাদেক হোসেন খোকার মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে তাঁকে স্মরণ করছি।
মানুষের ভালোবাসায় যিনি একদিন হয়ে উঠেছিলেন পুরান ঢাকার ‘আমগো খোকা ভাই’, সময়ের পরিক্রমায় তাঁর সেই পরিচয়টুকুও ইতিহাসের এক আবেগঘন অধ্যায় হয়ে থাকবে।
পরম করুণাময় আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করুন, তাঁর কবরকে প্রশস্ত ও নূরে পরিপূর্ণ করুন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন।
আমিন।







