, ,

অন্তরের সীমান্তে প্রহরী

নিউজটি শেয়ার করুন

 সূরা আলে ইমরান ২০০-এর আধ্যাত্মিক অনুরণন

সবর করো, হে পথিক, আঁধার যত ঘন হয়,
সবরেতে রহমত নামে, দুঃখ তখন ক্ষয়।
ঝড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে থেকো, নত করো না শির,
আল্লাহরই পথে যে চলে, সে-ই তো আসল বীর।

ইসবিরূ—বলে রবের বাণী, ধৈর্য ধরো প্রাণ,
কাঁটার পথে ফুল ফুটবে, রাখো তাঁরই ধ্যান।
দুঃখ যদি দরজায় আসে, খুলে দিও দ্বার,
বিপদ মাঝে লুকিয়ে থাকে রহমতেরই ধার।

ওয়া সাবিরূ—আরও দৃঢ়, ভেঙো না হে মন,
বিরোধ যত বাড়ুক তবু সত্য রেখো আপন।
ক্রোধ যদি আগুন হয়ে জ্বলে অন্তর-মাঝে,
ক্ষমার পানি ঢেলে দিও নফসের সেই সাজে।

মানুষ তোমায় ভুল বুঝিলে, তুমি বোঝো রব,
মানুষ যদি দূরে সরায়, তিনি নন তো দূর।
অপমানের পেয়ালা পেলে হাসিমুখে পান,
যে নিজ নফস জয় করেছে—সেই তো মহিয়ান।

ওয়া রাবিতূ—প্রহরী হও অন্তরেরই দ্বারে,
কোন্ বাসনা ঢোকে গোপনে, রাখো তারই ধারে।
চোখের পথে কী যে আসে, দেখো হে মুরীদ,
জিহ্বার পথে কী যে নামে, করো তারই তদীদ।

কানের পথে বিষ ঢুকিলে হৃদয় হয় কালো,
মনের মাঝে অহংকার এলে নিভে যায় আলো।
লোভ যদি সিংহাসনে বসে, প্রেম যায় হারায়,
নফস যদি বাদশাহ হয়, বান্দা কোথায় রয়?

তাই তো হে মন, জাগো এবার, রাত পোহানোর আগে,
নিজের ভিতর যুদ্ধ করো নীরব অনুরাগে।
শত্রু খুঁজো না বাহিরপানে, আগে নিজে চাও,
যে নফস তোমায় বন্দী করে—তাহার শৃঙ্খল ছাও।

মুজাহাদার পথে চলো, নফস করো ক্ষীণ,
জিকির দিয়ে ধুয়ে ফেলো অন্তরের সব ঋণ।
মুরাকাবার নীরব রাতে বসো একাকী,
কে আছো তুমি—কে তোমাতে—দেখো অন্তর আঁকি।

যখন তুমি চুপ হয়ে যাও, কথা বলে প্রাণ,
নীরবতার গভীর সাগর খুলে দেয় জ্ঞান।
“আমি” যখন ক্ষীণ হয়ে যায়, জাগে সত্য-স্বর,
নিজেকে যে হারায় রবের প্রেমে—সে-ই পায় তাঁর ঘর।

ওয়াত্তাকুল্লাহ—তাকওয়া ধরো, রাখো রবের ভয়,
গোপন রাতেও পাপের পথে পা যেন না যায়।
মানুষ যদি না-ও দেখে, দেখেন তো তিনি,
তাঁর নজরের বাইরে কোথায়, বলো, কোন্ দিনই?

ক্ষমতা পেলে বিনয় ধরো, সম্পদ পেলে দান,
জ্ঞান পেলে সেবা করো, পেলে সম্মান।
মর্যাদা যদি আসে কাছে, বলো অন্তরভরে—
“আমি কেবল তাঁরই বান্দা, সবই তাঁর ঘরে।”

যে হৃদয়ে তাকওয়া জাগে, সে হৃদয় নূর,
অন্ধকারে পথ দেখায় সে, দূর করে সুর।
সবর তারই সঙ্গী হয়, জিকির তার গান,
প্রেম তারই কিবলা হয়, খিদমত তার প্রাণ।

হে পথিক, ফালাহ চাও যদি, জয় করো নিজ মন,
দুনিয়া জয় সহজতর, কঠিন নফস-দমন।
সিংহাসনে বসে কী হবে, যদি মনই পরাধীন?
নিজের নফসের দাস যে মানুষ, সে কি সত্যি স্বাধীন?

তোমার চোখে নূর থাকুক, কথায় থাকুক হক,
তোমার হাতে দান থাকুক, হৃদয়ে থাকুক শোক।
শোক নয় যে ভাঙে মানুষ—শোক হোক রবের স্মরণ,
বিরহ হোক মিলনের সেতু, প্রেম হোক অর্ঘ্য-ধরণ।

যখন জীবন ঝড়ে কাঁপে, বলো—“সবর করি”,
যখন নফস আগুন জ্বালে, বলো—“রবেরই স্মরি।”
যখন দুনিয়া টানে তোমায় মিথ্যা সুখের ঘোরে,
রাবিতূ হয়ে দাঁড়িয়ে থেকো অন্তরেরই দ্বারে।

শেষে যখন হিসাব হবে, থাকবে না কোনো ছল,
না থাকবে ধন, না থাকবে মান, না থাকবে বাহুবল।
থাকবে শুধু কর্মের ছায়া, হৃদয়ের পরিচয়—
তাকওয়া যার সঙ্গী ছিল, তারই সত্য জয়।

তাই আজ থেকেই প্রহরী হও নিজের হৃদয়-দ্বারে,
সবর রাখো নিশ্বাসজুড়ে, জিকির রাখো তারে।
মুজাহাদায় নফস পোড়াও, প্রেমে করো স্নান,
তাকওয়ারই ছায়াতলে দাও জীবনের দান।

ইসবিরূ—সবর করো,
ওয়া সাবিরূ—দৃঢ় হও,
ওয়া রাবিতূ—প্রহরী হও,
ওয়াত্তাকুল্লাহ—তাঁকে ভয় করো।

তবে একদিন অন্তর বলে উঠবে নীরবতার তলে—
“আমি” হারাইনি, “আমি” মিশেছি পরম প্রভুর বলে।
সেই তো ফালাহ, সেই তো নূর, সেই তো প্রেমের ধারা—
নিজেকে জয় করে যে জন, জয় করেছে সে সারা।