প্রথম বাংলা ভাষার জন্য গণপরিষদ দাবি তুলছেন শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত
পাকিস্তানের গণপরিষদ যেখানে দাঁড়িয়ে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সামনে দীপ্ত কণ্ঠে শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা করার দাবি উপস্থাপন করেছিলেন। সেই সময় পূর্ব বাংলার অনেক জনপ্রতিনিধি সেখানে উপস্থিত ছিলেন, কেউ কিন্তু তা করতে সাহস পাননি, যা পেরেছিলেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে ছাত্রদের সঙ্গে তিনি সক্রিয় এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ১৮৮৬ সালের ২ নভেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের উত্তরে রামরাইল গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা জগবন্ধু দত্ত ছিলেন মুনসেফ কোর্টের সেরেস্তাদার। তিনি ১৯০৪ সালে নবীনগর হাই স্কুল হতে প্রবেশিকা, ১৯০৮ সালে কলকাতা রিপন কলেজ হতে বি.এ এবং ১৯১০ সালে একই কলেজ হতে বি.এল পরীক্ষা পাস করেন।১৯৪৭ সালের পর একজন অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিক হিসেবে পাকিস্তানের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি করাচিতে গণপরিষদের অধিবেশনে পাকিস্তানের গণপরিষদের ব্যবহার্য ভাষা হবে উর্দু এবং ইংরেজি, তা প্রাথমিকভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। এবং এই অধিবেশনের ব্যবহার্য ভাষা হিসেবে উর্দু এবং ইংরেজিতে শুরু হলে তার প্রতিবাদ করেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। সংবাদ মাধ্যম থেকে জানা যায় গণপরিষদের সভায় ধীরেন্দ্রনাথের স্পষ্ট বক্তব্য ছিল, দেশের ৬ কোটি ৯০ লাখ নাগরিকের মধ্যে ৪ কোটি ৪০ লাখ মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে, তাহলে আপনিই বলুন মাননীয় সভাপতি রাষ্ট্র ভাষা কী হওয়া উচিত। ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি গণপরিষদের অধিবেশন আহ্বানের নোটিস জারি হলে ২৩ ফেব্রুয়ারি ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত তার একটি সংশোধনী প্রস্তাব দাখিল করেন, তার মূল প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, ২৯নং বিধির ১নং উপবিধিতে উর্দু এবং ইংরেজির পর বাংলা শব্দটি সংযুক্ত করার। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলনে রক্ত ঝরে। ২২ ফেব্রুয়ারি এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত গণপরিষদের অধিবেশন বয়কট করেন এবং এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। পরে তিনি কুমিল্লায় চলে আসেন।
তখন থেকেই তার কুমিল্লায় স্থায়ী বাস। প্রথম দিকে কুমিল্লার আদালতের উত্তরে কাপ্তানবাজারে গোমতীর পাড়ে একটি বাসগৃহে ভাড়া থাকতেন। পরে ধর্মসাগর দীঘির পশ্চিমপাড়ে জমি কিনে একটি টিনের আটচালা বাড়ি গড়ে এই বাড়িতেই তিনি আমৃত্যু কাটিয়ে দেন। তাঁর নাতনি আরমা দত্ত সংবাদ মাধ্যমে জানান, ‘পেশা, রাজনীতি এবং আন্দোলন-সংগ্রাম থেকে শুরুকরে সবই ছিলো কুমিল্লা কেন্দ্রিক। আমৃত্যু তিনি কুমিল্লার ধর্মসাগরের পশ্চিম পাড় তাঁর নিজহাতে গড়া এই বাড়িটিতে ছিলেন। ইতিহাসের মহানায়ক ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত আজ নেই। তাঁর স্বপ্নের বাংলাদেশে আজ পতপত করে উড়ছে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের পতাকা। তাঁরই স্বপ্নের বাংলা ভাষা আজ শুধু রাষ্ট্র ভাষাই নয়; ভাষা আন্দোলনের সে দিনটি আজ আন্তর্জাতিক ভাবে সারা বিশ্বে স্বীকৃতি লাভ করেছ। কিন্তু স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠন এবং বাংলা ভাষা আন্দোলনের মহানায়কের যথাযথ মূল্যায়ন এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে যে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে পাক হানাদাররা হত্যা করেছিলো, সেই ঐতিহাসিক বাড়িটির কি অবস্থা তার জন্য প্রশাসনকে অবশ্যই সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। প্রয়োজনে বাড়িটিকে ধীরেন্দ্রনাথ যাদুঘরে রূপান্তর করে নতুন প্রজন্মকে ভাষা সম্পর্কে জানার সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়া হোক। বাংলা ভাষা আন্দোলনের এই মহানায়কের যথাযথ মূল্যায়ন খুবই প্রয়োজন।
🖋️রূপম চক্রবর্ত্তী – প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট – চট্টগ্রাম
#বাংলা #ভাষা #ভাষাআন্দোলন #কুমিল্লা #রাষ্ট্র







