, ,

সাংবাদিক ও সাংবাদিকতা

নিউজটি শেয়ার করুন

মুন্সী নাহীদ ফরহাদ রাজু:

মানবসভ্যতার অগ্রযাত্রায় এমন কিছু পেশা রয়েছে, যেগুলো কেবল জীবিকা অর্জনের মাধ্যম নয়; বরং সমাজ, রাষ্ট্র এবং ইতিহাসের প্রতি এক গভীর দায়বদ্ধতার প্রতীক। সাংবাদিকতা তেমনই একটি মহান পেশা। এটি ক্ষমতার অলংকার নয়, সত্যের অনুসন্ধান; এটি প্রচারণার ভাষা নয়, বিবেকের উচ্চারণ; এটি কেবল সংবাদ প্রকাশ নয়, মানুষের অধিকার রক্ষার এক নিরন্তর সংগ্রাম।

একটি জাতি কতটা সচেতন, একটি রাষ্ট্র কতটা গণতান্ত্রিক এবং একটি সমাজ কতটা জবাবদিহিমূলক—তার অন্যতম মানদণ্ড হলো সেই দেশের সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও সততা। কারণ সাংবাদিকতা হলো রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন। এই সেতু দুর্বল হলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়, সত্য আড়াল হয়ে যায় এবং অন্যায় শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

সংবাদ কেবল একটি তথ্য নয়; সংবাদ একটি দায়িত্ব। একটি ভুল সংবাদ যেমন মানুষের সম্মান নষ্ট করতে পারে, তেমনি একটি সত্য সংবাদ দুর্নীতির মুখোশ উন্মোচন করতে পারে। একটি নির্ভুল প্রতিবেদন যেমন বিচার প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করতে পারে, তেমনি একটি যাচাইহীন তথ্য সমাজে বিভ্রান্তি, ঘৃণা ও সহিংসতার জন্ম দিতে পারে। তাই সাংবাদিকের প্রতিটি শব্দ হতে হবে তথ্যভিত্তিক, দায়িত্বশীল এবং নৈতিক।

একজন প্রকৃত সাংবাদিক কখনো জনমতকে বিভ্রান্ত করেন না; বরং তথ্য, যুক্তি এবং সত্যের আলোয় মানুষকে সচেতন করেন। তাঁর কলম কারও ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার অস্ত্র নয় এবং কোনো ক্ষমতাবানের প্রচারণার মাধ্যমও নয়। তাঁর একমাত্র অঙ্গীকার—সত্য, ন্যায় এবং জনস্বার্থ।

সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর সাহস। সত্যের পথে হাঁটতে গেলে বাধা আসবেই। কখনো রাজনৈতিক চাপ, কখনো অর্থনৈতিক প্রলোভন, কখনো সামাজিক অপপ্রচার, আবার কখনো ব্যক্তিগত নিরাপত্তার হুমকি—এসবই সাংবাদিকতার বাস্তবতা। কিন্তু ইতিহাসে যাঁরা স্মরণীয় হয়ে আছেন, তাঁরা কোনো সুবিধার জন্য সত্যকে বিসর্জন দেননি। তাঁরা প্রমাণ করেছেন, সত্যকে সাময়িকভাবে চাপা দেওয়া গেলেও চিরদিনের জন্য মুছে ফেলা যায় না।

ডিজিটাল যুগ সাংবাদিকতাকে যেমন দ্রুততর করেছে, তেমনি জটিলও করেছে। আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তেই একটি খবর লক্ষ মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। কিন্তু সেই খবরটি সত্য কিনা, তার উৎস কতটা নির্ভরযোগ্য, তথ্য কতটা যাচাইকৃত—এসব প্রশ্নের উত্তর না জেনেই অনেকেই তা ছড়িয়ে দেন। ফলে গুজব ও অপতথ্য এখন সাংবাদিকতার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

এই বাস্তবতায় একজন সাংবাদিকের প্রথম দায়িত্ব হলো—যাচাই, তারপর প্রচার। দ্রুত সংবাদ দেওয়ার চেয়ে সঠিক সংবাদ দেওয়া অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মানুষের বিশ্বাস একবার হারিয়ে গেলে তা পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন।

সাংবাদিকতার নৈতিকতার মূল ভিত্তি পাঁচটি—সত্যনিষ্ঠা, নিরপেক্ষতা, নির্ভুলতা, মানবিকতা এবং জবাবদিহিতা। একজন সাংবাদিককে তথ্য সংগ্রহের সময় যেমন সতর্ক থাকতে হবে, তেমনি সংবাদ প্রকাশের পরও তার সামাজিক প্রভাব সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। সংবাদ কখনো ঘৃণা উসকে দেবে না, বিচারহীনভাবে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করবে না এবং কোনো গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিদ্বেষ সৃষ্টি করবে না। সংবাদ হবে সত্যের ভাষা, ন্যায়ের কণ্ঠস্বর এবং মানবিকতার প্রতিচ্ছবি।

সাংবাদিকতা কেবল রাজধানীকেন্দ্রিক হতে পারে না। একটি প্রত্যন্ত গ্রামের কৃষকের দুর্দশা, নদীভাঙনে নিঃস্ব মানুষের কান্না, পাহাড়ের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, শিশুর শিক্ষা, নারীর নিরাপত্তা, পরিবেশের সংকট—এসবও সমান গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ। কারণ সংবাদ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা সমাজের সব মানুষের কণ্ঠস্বরকে ধারণ করে।

একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় সম্পদ তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতা। এই বিশ্বাস অর্থ দিয়ে কেনা যায় না, ক্ষমতা দিয়ে অর্জন করা যায় না। এটি গড়ে ওঠে বছরের পর বছর সততা, পরিশ্রম, নিরপেক্ষতা এবং পেশাগত নৈতিকতার মাধ্যমে। তাই সাংবাদিকের কাছে তাঁর বিবেকই সবচেয়ে বড় সম্পাদক।

আজ সাংবাদিকতার সামনে আরেকটি বড় প্রশ্ন—সাংবাদিক কি জনপ্রিয় হওয়ার জন্য লিখবেন, নাকি সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য? জনপ্রিয়তা ক্ষণস্থায়ী; সত্য চিরস্থায়ী। একজন সাংবাদিক যদি মানুষের করতালির চেয়ে সত্যকে বেশি মূল্য দেন, তবে ইতিহাস একদিন তাঁকে সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করবে।

একটি স্বাধীন সংবাদমাধ্যম কোনো রাষ্ট্রের শত্রু নয়; বরং রাষ্ট্রকে আরও শক্তিশালী করে। কারণ ভুল ধরিয়ে দেওয়া, দুর্নীতি উন্মোচন করা, জনগণের সমস্যা তুলে ধরা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা—এসবই একটি সুস্থ রাষ্ট্রব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ। যে রাষ্ট্র সমালোচনা গ্রহণ করতে পারে, সেই রাষ্ট্রই উন্নতির পথে এগিয়ে যায়।

সাংবাদিকতা কখনো ঘৃণার ভাষা নয়; এটি মানবতার ভাষা। এটি বিভাজনের নয়; সংলাপের। এটি অন্ধ অনুসরণের নয়; প্রশ্ন করার সাহসের। কারণ প্রশ্নহীন সমাজে জবাবদিহিতা থাকে না, আর জবাবদিহিতা না থাকলে গণতন্ত্রও টিকে থাকতে পারে না।

পরিশেষে বলতে চাই, সাংবাদিকতা একটি পবিত্র আমানত। এই আমানতের মর্যাদা রক্ষা করা প্রতিটি সাংবাদিকের নৈতিক দায়িত্ব। কলমের শক্তি বন্দুকের শক্তির চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে—যদি সেই কলম সত্য, ন্যায়, মানবিকতা ও বিবেকের পক্ষে ব্যবহৃত হয়।

আসুন, আমরা এমন সাংবাদিকতার স্বপ্ন দেখি—যেখানে সংবাদ বিক্রি হয় না, বিবেক নত হয় না, সত্য আড়াল হয় না এবং মানুষের অধিকার কখনো উপেক্ষিত হয় না। কারণ একটি সৎ কলম কেবল সংবাদ লেখে না; একটি জাতির ভবিষ্যৎও নির্মাণ করে।

সত্যের প্রতি অটল থাকা, মানুষের পাশে থাকা এবং ন্যায়ের পক্ষে নির্ভয়ে কথা বলাই একজন সাংবাদিকের সর্বোচ্চ পরিচয়। সাংবাদিকতা পেশা নয়—এটি সত্য ও মানবতার প্রতি আজীবনের অঙ্গীকার।