এ এফ এম রাসেল পাটোয়ারী
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একটি রাষ্ট্রে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, জবাবদিহি ও জনগণের মতপ্রকাশের অধিকার কার্যকর রাখতে স্বাধীন, দায়িত্বশীল ও নিরপেক্ষ গণমাধ্যমের কোনো বিকল্প নেই।
দীর্ঘদিন ধরে দেশের গণমাধ্যম নানা ধরনের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপের মধ্য দিয়ে কাজ করে আসছে। বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন সরকার ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের কাজের পরিবেশেও পরিবর্তন এসেছে। ফলে সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে সংবাদ সংগ্রহ, প্রকাশ ও মতামত তুলে ধরার সুযোগ কতটা নিশ্চিত হচ্ছে—এ প্রশ্ন বারবার সামনে এসেছে।
শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময় এবং পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় দেশের গণমাধ্যমকে ঘিরে নানা আলোচনা, সমালোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এসব অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কোনো নির্দিষ্ট সরকার, দল বা সময়ের বিষয় হওয়া উচিত নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজের একটি স্থায়ী গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া প্রয়োজন।
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন করে সরকার পরিচালনার দায়িত্বে যে পক্ষই থাকুক না কেন, সংবাদপত্র, টেলিভিশন, অনলাইন সংবাদমাধ্যম ও অন্যান্য প্রচারমাধ্যমের ক্ষেত্রে সহনশীল, ইতিবাচক ও দায়িত্বশীল নীতি গ্রহণ করা জরুরি। সরকারের সমালোচনা করা যেমন গণমাধ্যমের পেশাগত দায়িত্বের অংশ, তেমনি সরকারের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড সঠিকভাবে তুলে ধরাও সাংবাদিকতার দায়িত্ব।
একটি শক্তিশালী গণমাধ্যম শুধু সরকারের প্রশংসা করবে—এমন প্রত্যাশা যেমন গণতান্ত্রিক সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করাও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পরিচয় হতে পারে না। স্বাধীনতার পাশাপাশি সাংবাদিকতার পেশাগত নৈতিকতা, তথ্যের সত্যতা, ভারসাম্য ও জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।
বাস্তবভিত্তিক কিছু পদক্ষেপ
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে শুধু নীতিগত বক্তব্য দিলেই হবে না; এর জন্য কার্যকর ও বাস্তবায়নযোগ্য কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
প্রথমত, সাংবাদিকতার কারণে হয়রানি বন্ধে একটি স্পষ্ট নীতিমালা করা যেতে পারে। কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আগে তার প্রকাশিত সংবাদ বা প্রতিবেদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অভিযোগের প্রাথমিক যাচাই এবং যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। সাংবাদিককে তাঁর পেশাগত কাজের কারণে হয়রানি করা হচ্ছে কি না, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার ক্ষেত্রে দ্রুত ও স্বচ্ছ বিচারিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা দরকার। একই সঙ্গে কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ থাকলে তিনি যেন আইনের ঊর্ধ্বে না থাকেন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ সাংবাদিকদের জন্য দায়মুক্তি নয়, বরং ন্যায়সংগত ও নিরপেক্ষ আইনি প্রক্রিয়া প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, সরকারি দপ্তরগুলোতে তথ্য দেওয়ার একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকা উচিত। তথ্য অধিকার আইনের আওতায় চাওয়া তথ্যের উত্তর কত দিনের মধ্যে দিতে হবে, কোন তথ্য দেওয়া যাবে না এবং কেন দেওয়া যাবে না—এসব বিষয়ে আরও স্পষ্টতা প্রয়োজন। সরকারি তথ্যের জন্য সাংবাদিকদের যেন অযথা একাধিক দপ্তরে ঘুরতে না হয়, সে জন্য প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বপ্রাপ্ত তথ্য কর্মকর্তা ও কার্যকর যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিত করা যেতে পারে।
চতুর্থত, সরকারি বিজ্ঞাপন বণ্টনে স্বচ্ছতা আনা জরুরি। কোনো সংবাদমাধ্যম সরকারের সমালোচনা করেছে বলে বিজ্ঞাপন বন্ধ করা কিংবা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়। বিজ্ঞাপন দেওয়ার ক্ষেত্রে পাঠকসংখ্যা, প্রচারসংখ্যা, দর্শক-শ্রোতা, ডিজিটাল উপস্থিতি ও নির্ধারিত পেশাগত মানদণ্ডের মতো পরিমাপযোগ্য সূচক ব্যবহার করা যেতে পারে।
পঞ্চমত, সংবাদমাধ্যমের মালিকানা ও অর্থায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা দরকার। একটি সংবাদমাধ্যমের মালিক কে, তার প্রধান অর্থনৈতিক স্বার্থ কোথায় এবং কোনো রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার সরাসরি সম্পর্ক আছে কি না—এ ধরনের মৌলিক তথ্য জনগণের জন্য সহজে জানার সুযোগ থাকা উচিত। এতে সংবাদ ও মালিকের ব্যবসায়িক স্বার্থের মধ্যে সম্ভাব্য সংঘাত সম্পর্কে পাঠক সচেতন হতে পারবেন।
ষষ্ঠত, সাংবাদিকদের নিরাপত্তার জন্য দ্রুত অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিক হামলা, হুমকি বা বাধার সম্মুখীন হলে স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে। সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনাগুলো রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে তদন্ত করা জরুরি।
সপ্তমত, সংবাদমাধ্যমের জন্য একটি স্বাধীন অভিযোগ ও সংশোধন ব্যবস্থা শক্তিশালী করা যেতে পারে। কোনো সংবাদে ভুল তথ্য প্রকাশিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যেন সহজে প্রতিবাদ বা সংশোধনের আবেদন করতে পারেন। একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যমকেও ভুল হলে দ্রুত সংশোধন প্রকাশের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। এতে মামলা বা প্রশাসনিক চাপের পরিবর্তে পেশাগত জবাবদিহির সুযোগ বাড়বে।
অষ্টমত, সরকারি কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের জন্য গণমাধ্যমের সঙ্গে আচরণবিষয়ক প্রশিক্ষণ চালু করা যেতে পারে। সাংবাদিকের প্রশ্ন করা বা তথ্য চাওয়া যেন দায়িত্ব পালনে বাধা হিসেবে দেখা না হয়—এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন।
নবমত, সংবাদমাধ্যমের নিজস্ব পেশাগত মানও শক্তিশালী করতে হবে। সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য নেওয়া, মতামত ও সংবাদকে আলাদা রাখা, শিরোনামে অতিরঞ্জন এড়িয়ে চলা এবং ভুল হলে দ্রুত সংশোধন প্রকাশ—এসব বিষয়ে প্রতিটি সংবাদমাধ্যমের নিজস্ব সম্পাদকীয় নীতিমালা থাকা উচিত।
দশমত, সাংবাদিকদের চাকরির নিরাপত্তা ও পেশাগত অধিকার নিয়েও বাস্তব পদক্ষেপ প্রয়োজন। কম বেতন, অনিশ্চিত চাকরি ও অতিরিক্ত কর্মচাপ সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সক্ষমতাকে দুর্বল করতে পারে। তাই সংবাদমাধ্যমগুলোতে নিয়োগপত্র, বেতন প্রদানের নিয়ম, ছুটি, কর্মঘণ্টা ও চাকরি থেকে অব্যাহতির ক্ষেত্রে ন্যূনতম পেশাগত মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।
একাদশত, রাজনৈতিক দলগুলোরও একটি আচরণবিধি থাকা উচিত। কোনো সংবাদ বা মতামত পছন্দ না হলে সাংবাদিককে হুমকি, চাপ বা শারীরিকভাবে বাধা দেওয়ার পরিবর্তে প্রতিবাদ, ব্যাখ্যা বা আইনি প্রতিকারের পথ অনুসরণ করতে হবে। ক্ষমতাসীন ও বিরোধী—উভয় রাজনৈতিক পক্ষের জন্য একই নীতি প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
দ্বাদশত, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা পরিমাপের জন্য নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করা যেতে পারে। বছরে অন্তত একবার সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা, হামলা, হুমকি, তথ্য না দেওয়ার অভিযোগ, সরকারি বিজ্ঞাপন বণ্টন এবং গণমাধ্যমের ওপর চাপের অভিযোগ নিয়ে একটি স্বচ্ছ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হলে পরিস্থিতির বাস্তব চিত্র বোঝা সহজ হবে।
স্বাধীনতার পাশাপাশি দায়িত্বও জরুরি
তবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার অর্থ কোনো ধরনের জবাবদিহিহীনতা নয়। সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমকেও আইন, পেশাগত নৈতিকতা এবং তথ্যের সত্যতার প্রতি দায়িত্বশীল থাকতে হবে। গুজব, যাচাই-বাছাইহীন তথ্য, ব্যক্তিগত আক্রমণ কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিভ্রান্তিকর প্রচারণা স্বাধীন সাংবাদিকতার অংশ হতে পারে না।
সরকারের সমালোচনা করার অধিকার যেমন থাকবে, তেমনি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়ার সংস্কৃতিও শক্তিশালী করতে হবে। মতের পার্থক্যকে শত্রুতা হিসেবে না দেখে গণতান্ত্রিক আলোচনার অংশ হিসেবে গ্রহণ করা জরুরি।
শেষ কথা
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো এমন একটি প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ব্যবস্থা তৈরি করা, যা সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে পরিবর্তিত হবে না। কে ক্ষমতায় আছে—সেটি নয়; সাংবাদিকের অধিকার, জনগণের তথ্য জানার অধিকার এবং সংবাদমাধ্যমের পেশাগত স্বাধীনতা—এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে নীতিমালা তৈরি হওয়া উচিত।
সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে নিরপেক্ষ আইনি প্রক্রিয়া থাকবে, ভুল সংবাদ হলে সংশোধনের ব্যবস্থা থাকবে, সরকারি তথ্য পাওয়ার নির্দিষ্ট পথ থাকবে, বিজ্ঞাপন বণ্টনে স্বচ্ছতা থাকবে এবং রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক চাপের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিকার থাকবে—এমন একটি কাঠামোই হতে পারে বাস্তব গণমাধ্যম স্বাধীনতার ভিত্তি।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কোনো রাজনৈতিক দলের অনুগ্রহ নয়; এটি জনগণের অধিকার এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যতম ভিত্তি। তাই আর শুধু প্রতিশ্রুতি নয়—সুনির্দিষ্ট আইন, স্বচ্ছ নীতি, জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান এবং বাস্তব প্রয়োগের মাধ্যমে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার সময় এখনই।
এ এফ এম রাসেল পাটোয়ারী
সম্পাদক জিভিসি নিউজ বিডি. কম






