বদলি-বাণিজ্য ও রাজনৈতিক বলয়ের আড়ালে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সদস্যদের নিয়ে অনিয়মের মহোৎসব
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের দুই নির্বাহী প্রকৌশলীর বদলি আদেশকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে ঢাকা জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী মুজাহিদুল ইসলাম আলিফকে ঢাকা মেট্রোতে এবং ঢাকা মেট্রোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোস্তাফিজুর রহমানকে নরসিংদীতে বদলি করা হয়। এই বদলি আদেশের পরপরই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে হাজির হন বিএনপিপন্থীরা এবং বদলি বাতিলের দাবি জানান।
বিএনপিপন্থীদের অভিযোগ, মুজাহিদুল ইসলাম আলিফ বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সদস্য ছিলেন। তারা এই তথ্যের প্রমাণ নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে উপস্থিত হন এবং শিক্ষা সচিবের কাছে আবেদন করেন বদলি আদেশ বাতিল করতে। তাদের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে এই বদলি আদেশ দেওয়া হয়েছে যা অবৈধ ও অন্যায্য। অন্যদিকে মো. মোস্তাফিজুর রহমানকে ঢাকা মেট্রো থেকে নরসিংদীতে বদলি করা হলেও তার বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিক্রিয়া প্রকাশিত হয়নি। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের অভ্যন্তরে এই বদলিকে কেউ কেউ পুরস্কারমূলক পোস্টিং হিসেবে দেখছেন এবং কেউ কেউ দেখছেন রাজনৈতিক প্রভাবিত সিদ্ধান্ত হিসেবে।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের দুর্নীতির দীর্ঘ ইতিহাস:
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর দীর্ঘদিন ধরেই দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে জর্জরিত। ২০২২ সালের এক প্রতিবেদনে উঠে আসে, টানা চার বছর ধরে নতুন প্রকল্প নেই এবং আগের প্রকল্পগুলোর মেয়াদ বাড়িয়ে দফায় দফায় দুর্নীতি হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির অধীনে ৬০ থেকে ৬৫টি প্রকল্প চলমান রয়েছে যার বেশিরভাগেরই মেয়াদ শেষ হয়েছে অনেক আগে। ৩২৯ উপজেলায় কারিগরি স্কুল ও কলেজ স্থাপন প্রকল্পের বরাদ্দ ছিল ২৩ হাজার কোটি টাকা যা ২০১৪-১৫ অর্থবছরে শুরু হয়ে ২০২১ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে মাত্র ৩৬টি টিএসসির কাজ শেষ হয়েছে এবং অন্যগুলোর কাজ এখনো ৩০ থেকে ৪৫ শতাংশ বাকি রয়েছে। একইভাবে ১ হাজার ৮০০ মাদ্রাসা উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ ছিল ৬ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকা যা ২০১৮ সালে শুরু হয়ে শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২২ সালে। কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রকল্পের অগ্রগতি মাত্র ৫০ শতাংশ এবং অর্থ ছাড় করা হয়েছে মাত্র ৩০ শতাংশ। প্রকল্প নেওয়ার সময় ইইডি অতিরিক্ত হিসেব দেখায় এবং বরাদ্দকৃত টাকার বড় অংশ দুর্নীতি হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ডিজাইন পরিবর্তনের নামে প্রকল্পের টাকা কাটছাঁট করে স্ব স্ব জেলার প্রকৌশলীদের পকেটে যায় বলেও অভিযোগ উঠেছে।
রায়হান বাদশার বিতর্কিত নিয়োগ ও প্রধান প্রকৌশলীর দুর্নীতি:
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী রায়হান বাদশার নিয়োগ নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। তিনি দুর্নীতির দায়ে সাজাপ্রাপ্ত এবং বিএনপি আমলে দুর্নীতির দায়ে দণ্ডিত হলেও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সেই সাজা প্রত্যাহার করা হয়। তিনি বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের নেতা হিসেবে দীর্ঘ ১৭ বছর প্রধান কার্যালয়ে থেকে নেতাকর্মীদের আগলে রেখেছেন। ২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট তাকে প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হলে প্রতিষ্ঠানটিতে তোলপাড় শুরু হয়। তার বিরুদ্ধে বেশ কয়েকবার ঠিকাদারদের কাছে অপদস্ত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে এবং তার এসিআরও নেই বলে প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন। সিলেটের অন্তত ১১৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তিনি দুর্নীতি আড়াল করতে সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলীকে জোরপূর্বক অনির্দিষ্টকালের ছুটিতে পাঠিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছিল। ২০২৪ সালের ২১ নভেম্বর শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের তিন শীর্ষ কর্মকর্তাকে ওএসডি করা হয় যারা সবাই বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের সদস্য ছিলেন। এর মধ্যে রায়হান বাদশাও ছিলেন।
বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের রাজনৈতিক প্রভাব:
বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদ শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক গোষ্ঠী হিসেবে কাজ করছে। এই পরিষদের সদস্যরা দীর্ঘদিন একই পদে থেকে দুর্নীতির শেকড় গেড়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নিজেদের বদলি ঠেকাতে তারা রাজনৈতিক প্রভাব ও তদবির বাণিজ্যে লিপ্ত বলে খোদ কর্মকর্তারাই অভিযোগ করেছেন। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী কর্মকর্তাদের তিন বছরের বেশি একই স্থানে থাকার সুযোগ নেই কিন্তু বিশেষ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে শীর্ষসারির কর্মকর্তারা বছরের পর বছর একই পদে বসে আছেন। রায়হান বাদশার অনুসারীরা অনেক প্রকৌশলীকে দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন এবং ভীত প্রকৌশলীদের অনেকেই অফিসে হাজির হলেও স্বল্প সময় অবস্থান করছেন।
টেন্ডার বাণিজ্য ও ঠিকাদারদের হয়রানি:
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে টেন্ডার বাণিজ্য ও ঠিকাদারদের হয়রানি নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। ২০২৫ সালের মে মাসে রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও ছাত্রী হোস্টেল নির্মাণ কাজে প্রায় ২১ কোটি টাকার টেন্ডার অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও নির্বাহী প্রকৌশলী যোগসাজশে নিয়মবহির্ভূতভাবে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নন রেসপন্সিভ করে দিয়ে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দুদকে অভিযোগ দেওয়ার পরও তড়িঘড়ি করে কাজের নোহা দেওয়া হয়েছিল। একইভাবে সমীর কুমার রজক দাসের বিরুদ্ধে নিয়মিত দপ্তরে না থাকা এবং নথিপত্র ও ড্রইং-ডিজাইন আটকে রেখে ঠিকাদারদের হয়রানি করার বিস্তর অভিযোগ রয়েছে।
জমি অবৈধ অধিগ্রহণ ও আদালতের নির্দেশ অমান্য:
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের দুর্নীতি শুধু টেন্ডার বাণিজ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ২০২২ সালে সাভারের হেমায়েতপুর এলাকায় দুই একর জমি অবৈধভাবে অধিগ্রহণ করে সেখানে স্কুল ভবন নির্মাণ কাজ শুরু করা হয়। জমির মালিক বিষয়টি বুঝতে পেরে আদালতে মামলা দায়ের করলে আদালত নির্মাণ কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন। কিন্তু আদালতের নির্দেশ অমান্য করে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর নির্মাণ কাজ চালিয়ে যায়। পরে জমির মালিক ও এলাকাবাসী মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেন।
বদলি বিতর্কের পটভূমি ও বর্তমান পরিস্থিতি:
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে বদলি নিয়ে টানাপোড়েন নতুন নয়। কর্মকর্তারা নিজেদের বদলি ঠেকাতে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে দীর্ঘদিন একই স্থানে থাকার চেষ্টা করেন। মুজাহিদুল ইসলাম আলিফের বদলিকে কেন্দ্র করে বিএনপিপন্থীরা শিক্ষা সচিবের কাছে আবেদন করলেও শিক্ষা মন্ত্রণালয় এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেয়নি। সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, বিষয়টি নিয়ে পর্যালোচনা চলছে এবং শিগগিরই সিদ্ধান্ত জানানো হবে। তবে এই ঘটনা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক বিভাজনের একটি নতুন দিক উন্মোচন করেছে। কর্মকর্তাদের বদলিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপের এই ঘটনা ভবিষ্যতে আরও বড় সংকটের সৃষ্টি করতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের এই চিত্র দেখায় যে প্রকল্প বাস্তবায়নে টেন্ডার বাণিজ্য, নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার, ঘুষ-কমিশনের বিনিময়ে বিল ভাগাভাগি, জমি অবৈধ অধিগ্রহণ এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে দায়মুক্তি এক বিস্তৃত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে চলছে। দুদকের তদন্ত ধীরগতি এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় এসব দুর্নীতি দীর্ঘদিন ধরে বহাল তবিয়তে রয়েছে। জনগণের করের অর্থে বাস্তবায়িত এসব প্রকল্পের মান নিশ্চিত করতে হলে দুদকসহ সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থাগুলোকে আরও কার্যকর ও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে এবং উচ্চপদস্থ দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।







