রাজধানীর ধানমন্ডি লেকের একটি অংশে একসময় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকত প্লাস্টিক, বোতল ও নানা ধরনের বর্জ্য। লেকের পাড়ের কিছু জায়গা হয়ে উঠেছিল অপরিচ্ছন্ন। এখন সেই একই জায়গায় দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। টানা ১৫ দিনের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের পর বদলে গেছে লেকের সংশ্লিষ্ট অংশের দৃশ্যপট।
ধানমন্ডি থানা যুবদলের উদ্যোগে এবং যুবনেতা সাজ্জাদ মাহমুদ সোহেলের নেতৃত্বে পরিচালিত এই কার্যক্রমে লেকের বিভিন্ন অংশ থেকে ময়লা-আবর্জনা অপসারণ করা হয়েছে। কর্মসূচির আগে ও পরের দৃশ্য ধারণ করা হয়েছে ভিডিওচিত্রে একই জায়গার দুই সময়ের ছবি, যার মাঝখানে রয়েছে ১৫ দিনের ধারাবাহিক পরিশ্রম।
তবে এই কার্যক্রমকে কেবল পরিচ্ছন্নতার একটি কর্মসূচি হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। ধানমন্ডি লেক ও আশপাশের পরিবেশকে আরও পরিচ্ছন্ন, সবুজ, নিরাপদ এবং মানুষের জন্য ব্যবহারযোগ্য রাখতে যুবদলের পক্ষ থেকে একাধিক সামাজিক ও পরিবেশগত কার্যক্রম ইতোমধ্যে চলমান রয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে বৃক্ষরোপণ, পাখির জন্য বাসা স্থাপন, পথশিশুদের পড়াশোনায় সহযোগিতা এবং মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক কার্যক্রম। পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি এসব কার্যক্রমও ধারাবাহিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
যুবনেতা সাজ্জাদ মাহমুদ সোহেল বলেন, “আমরা হয়তো একদিনে পুরো ধানমন্ডি লেক বদলে দিতে পারব না। কিন্তু একটি জায়গা দিয়ে শুরু করতে পারি। আমাদের নেতা রবিউল ইসলাম নয়ন ভাইয়ের নির্দেশনা ও সহযোগিতায় আমরা এই কাজ শুরু করেছি। ঢাকা-১০-এর শেখ রবিউল আলম রবি ভাইয়ের দিকনির্দেশনাও আমরা পেয়েছি। আমরা চাই, কাজটা যেন কোনো একটি দিনের কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ না থাকে।”
তিনি বলেন, “পরিচ্ছন্নতার কাজের পাশাপাশি আমরা গাছ লাগাচ্ছি, পাখির জন্য বাসা স্থাপন করছি, পথশিশুদের পড়াশোনায় সহযোগিতা করছি এবং তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখতে মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক কাজ করছি। এগুলো আমাদের চলমান সামাজিক কর্মকাণ্ডের অংশ।”
সাজ্জাদ মাহমুদ সোহেলের মতে, একটি শহরের পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি শুধু ময়লা অপসারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের নিরাপদ চলাচল, সবুজ পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, শিশুদের শিক্ষা এবং তরুণদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করেই একটি জনবান্ধব নগরপরিসর তৈরি করা সম্ভব।
“একজন তরুণ যেন মাদকের দিকে না গিয়ে ভালো কোনো কাজে যুক্ত হয়, একটি পথশিশু যেন পড়াশোনার সুযোগ পায়, একটি গাছ যেন বড় হয়ে মানুষের ছায়া হয়, আর একটি পাখি যেন নিরাপদে বাসা বাঁধতে পারে আমরা আমাদের জায়গা থেকে সেই পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছি,” বলেন তিনি।
এই কার্যক্রমে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সহযোগিতা ও দিকনির্দেশনার কথাও উল্লেখ করেছেন আয়োজকেরা। বিশেষ করে ডিএসসিসির প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুস সালাম এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে সাজ্জাদ মাহমুদ সোহেল বলেন, সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে পাওয়া নির্দেশনা ও সহযোগিতা মেনেই তারা কাজ করার চেষ্টা করছেন।
“ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে আমরা ধন্যবাদ জানাই। প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম স্যার এবং সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে আমরা যে সহযোগিতা ও দিকনির্দেশনা পেয়েছি, তা আমাদের কাজকে আরও সংগঠিত করেছে। আমরা সিটি করপোরেশনের সঙ্গে সমন্বয় রেখেই কাজ করতে চাই,” বলেন তিনি।
ধানমন্ডি লেকের স্থানীয় এই উদ্যোগে রবিউল ইসলাম নয়নের নির্দেশনা ও সমন্বয়ের কথাও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট নেতাকর্মীরা। রবিউল ইসলাম নয়ন বর্তমানে কেন্দ্রীয় যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
স্থানীয় পর্যায়ে শেখ রবিউল আলম রবি-এর দিকনির্দেশনাতেও কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। তাদের বক্তব্য, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নির্দেশনা, স্থানীয় সাংগঠনিক সমন্বয় এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সহযোগিতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সামাজিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
ধানমন্ডি লেকের পরিচ্ছন্নতার সঙ্গে মাদকবিরোধী কার্যক্রম যুক্ত করার পেছনেও রয়েছে একই চিন্তা তরুণদের জন্য একটি ইতিবাচক সামাজিক পরিবেশ তৈরি করা।
মাদকবিরোধী কার্যক্রমে শুধু অভিযান নয়, সচেতনতা এবং তরুণদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। খেলাধুলা, শিক্ষা, পরিবেশ রক্ষা ও সামাজিক কাজে তরুণদের যুক্ত রাখাকে মাদক প্রতিরোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বিশ্বের বিভিন্ন নগরীর অভিজ্ঞতাতেও জলাধার ও উন্মুক্ত স্থানকে শুধু সৌন্দর্যের জায়গা হিসেবে নয়, বরং পরিবেশ, জননিরাপত্তা ও নাগরিক জীবনের অংশ হিসেবে পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। সিঙ্গাপুরের Singapore River কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলের Hangang River-কে ঘিরে দীর্ঘমেয়াদি নগর ব্যবস্থাপনায় পরিচ্ছন্নতা, পরিবেশ সংরক্ষণ, জনসম্পৃক্ততা ও নিরাপত্তাকে সমন্বিতভাবে দেখা হয়েছে।
ধানমন্ডি লেকের ক্ষেত্রেও স্থানীয় পর্যায়ের এই উদ্যোগে একই ধরনের সমন্বিত চিন্তার প্রতিফলন ঘটছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ধানমন্ডি লেক নিয়ে এই উদ্যোগের সময়টিও বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক পর্যালোচনা সভায় রাজধানীর ধানমন্ডি, গুলশান, বনানী, বারিধারা ও নিকেতন এলাকার লেকগুলোর দূষণ রোধে সমন্বিত কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়। নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ, লেকে পয়ঃবর্জ্য প্রবেশ বন্ধ এবং স্লাজ অপসারণসহ বিভিন্ন বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সরকারি পর্যায়ের এই বৃহত্তর পরিবেশগত উদ্যোগের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে নাগরিক ও সামাজিক অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ধানমন্ডি থানা যুবদলের চলমান কার্যক্রম সেই অংশগ্রহণের একটি উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে।
১৫ দিনের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের আগে ও পরে ধারণ করা ফুটেজে পরিবর্তনটি স্পষ্ট। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের কাছে কাজটির গুরুত্ব শুধু ক্যামেরায় দেখা পরিবর্তনে নয়। তারা পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি গাছ লাগানো, পাখির আবাস তৈরি, পথশিশুদের পড়াশোনায় সহযোগিতা এবং মাদকবিরোধী সচেতনতার মতো কাজও চালিয়ে যাচ্ছেন।
অর্থাৎ একটি পরিচ্ছন্ন লেককে ঘিরে তাদের কর্মকাণ্ডের পরিধি ধীরে ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে পরিবেশ থেকে সামাজিক দায়িত্বে, সামাজিক দায়িত্ব থেকে তরুণদের সম্পৃক্ততায়।
সাজ্জাদ মাহমুদ সোহেল বলেন, “আমাদের কাজটা মানুষের জন্য। আমরা চাই মানুষ নিজের জায়গা থেকে শহরের দায়িত্ব নিক। আমরা আমাদের জায়গা থেকে যতটুকু পারি করে যাব।”
ধানমন্ডি লেকের এই ১৫ দিনের পরিচ্ছন্নতার গল্প তাই শুধু ময়লা সরানোর গল্প নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একটি চলমান সামাজিক উদ্যোগ যেখানে গাছ আছে, পাখির জন্য জায়গা আছে, পথশিশুর পড়াশোনার কথা আছে, তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখার চেষ্টা আছে এবং আছে একটি শহরকে একটু বেশি বাসযোগ্য করে তোলার প্রত্যয়।
একটি শহর একদিনে বদলায় না।
কিন্তু কোনো একদিন, কোনো একজন মানুষ যখন প্রথম ময়লাটা তুলে নেন সেদিন থেকেই হয়তো পরিবর্তনের গল্পটি শুরু হয়।
ধানমন্ডি থানা যুবদলের ১৫ দিনের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম সেই গল্পের একটি অধ্যায়; আর তাদের চলমান সামাজিক কর্মকাণ্ড সেই গল্পকে আরও সামনে নিয়ে যাচ্ছে।





