রাজধানীর অন্যতম নন্দিত ও সৌন্দর্যমণ্ডিত এলাকা হিসেবে পরিচিত হাতিরঝিল, গুলশান ও বারিধারা লেক এখন বিষাক্ত বর্জ্য এবং তীব্র দুর্গন্ধের আঁতুড়ঘরে পরিণত হয়েছে। লেকের পচা পানির উৎকট গন্ধে আশপাশের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। এতে নাকাল হয়ে পড়েছেন পথচারী, ভ্রমণপিপাসু এবং স্থানীয় বাসিন্দারা। চিকিৎসকদের মতে, এই বিষাক্ত বাতাস ও দূষিত পানি নগরবাসীর জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।
গুলশান, বারিধারা, হাতিরঝিল লেকে জমা হওয়া বর্জ্য ও দূষিত পানি নিয়েবিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি:পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকদের মতে, উন্মুক্ত ড্রেনেজ ও স্যুয়ারেজ বর্জ্য সরাসরি লেকে এসে পড়ায় পানিতে হাইড্রোজেন সালফাইড ও অ্যামোনিয়া গ্যাস তৈরি হচ্ছে, যা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে তীব্র দুর্গন্ধ সৃষ্টি করে।শ্বাসকষ্ট ও অ্যাজমা: দীর্ঘ সময় দুর্গন্ধযুক্ত বাতাস গ্রহণ করলে ফুসফুসের মারাত্মক ক্ষতি হয় এবং অ্যাজমা বা ব্রঙ্কাইটিসের প্রকোপ বাড়ে।
চর্মরোগ ও অ্যালার্জি: দূষিত বাতাসের সান্নিধ্যে আসা এবং অনুজীবের কারণে চর্মরোগ বৃদ্ধি পায়।
মানসিক স্বাস্থ্য ও মাথাব্যথা: বিষাক্ত গন্ধের ফলে স্থায়ী মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব, বিষণ্নতা এবং অনিদ্রা দেখা দেয়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডঃ সরকার মাহবুব আহমেদ শামীম এর মতে, “তীব্র দুর্গন্ধ কেবল বিরক্তির কারণ নয়, এটি ব্যাকটেরিয়া ও ক্ষতিকর বায়ুকণার আধার। দীর্ঘমেয়াদে এই বাতাসে বাস করা শিশু ও বয়স্কদের ফুসফুসের স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে।”
সমস্যার মূলে ঢাকা ওয়াসা ও রাজউকের ভূমিকা :
লেকে বর্জ্য অপসারণ ও পানি দূষণ রোধের ক্ষেত্রে মূল জবাবদিহিতা আসে ঢাকা ওয়াসা এবং রাজউক (রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ)-এর ওপর। সংস্থা দুটির দায়িত্ব ও গাফিলতির চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:
ঢাকা ওয়াসা : ডোমেনস্টিক স্যুয়ারেজ (পয়োবর্জ্য) ও ড্রেনেজ লাইনের বর্জ্য শোধন নিশ্চিত না করা। গৃহস্থালির অপশোধন করা অপরিশোধিত স্যুয়ারেজ লাইন সরাসরি লেকে যুক্ত হতে দেওয়া। দাশেরকান্দি ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট পুরোপুরি সচল বা কার্যকরভাবে সব এলাকা কাভার করতে না পারা।
রাজউক : হাতিরঝিল প্রকল্পের সার্বিক রক্ষণাবেক্ষণ ও লেকের অবকাঠামো তদারকি না করা। স্পেশাল ড্রেন ও বর্জ্য ফিল্টারিং ইউনিটগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না করা। অবৈধ সংযোগ ও লেকের চারপাশের বাণিজ্যিক বর্জ্য নিষ্কাশন বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া।
ঢাকা ইউটিলিটি রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ওয়াসা এবং রাজউকের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণেই হাতিরঝিল ও গুলশান লেক আজ “খোলা ড্রেনে” পরিণত হয়েছে। ওয়াসা পয়েন্ট বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে, আর রাজউক লেকের পানি পরিষ্কার রাখতে প্রয়োজনীয় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে না।
উত্তরণের উপায়: বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ নগরবাসীকে এই ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে নিম্নে উল্লিখিত জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন: ইটিপি ও পয়েন্ট শোধন: হাতিরঝিলে আসার আগেই ড্রেনের মুখে আধুনিক সেন্ট্রাল ইটিপি (ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান) বসিয়ে পানি শোধন করা। স্যুয়ারেজ আউটলেট বন্ধ করা: গুলশান, নিকেতন ও বারিধারা এলাকার যেসব বাসা ও প্রতিষ্ঠানের পয়েন্ট বর্জ্যের লাইন সরাসরি লেকে গেছে, সেগুলো চিহ্নিত করে ভারী জরিমানা ও লাইন বিচ্ছিন্ন করা। পানি সচল রাখা: বদ্ধ পানিতে পচন বেশি ধরে। তাই যমুনা বা শীতলক্ষ্যা থেকে বিকল্প মাধ্যমে পানি এনে লেকে প্রবাহ তৈরি করা।বায়োলজিক্যাল ট্রিটমেন্ট: লেকের পানিতে প্রয়োজনীয় অ্যারেশন ব্যবস্থা করা এবং অণুজীব ব্যবহার করে দুর্গন্ধ দূরীকরণের আধুনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
দায়ভার কার?
এই অবক্ষয়ের মূল দায়ভার এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ ঢাকা ওয়াসা এবং রাজউক—কারোরই নেই। ওয়াসা তার পয়োবর্জ্য ব্যবস্থাপনায় চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে এবং রাজউক একটি সফল প্রকল্প বাস্তবায়নের পর তার স্থায়িত্ব ও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে অবহেলা করেছে। দুই সংস্থার মধ্যে পারস্পরিক “দাই চাপানোর সংস্কৃতি” বন্ধ করে যৌথ উদ্যোগ না নিলে এই এলাকাগুলো বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে বলে মন্তব্য করেন নগর পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞরা।
ঢাকার লেকের দুর্গন্ধ এবং এর সমাধান বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ ও হোক্কাইডো বিশ্ববিদ্যালয়, জাপান এরগবেষক, ড. এ. আর. এম. মাঈনউদ্দিন চৌধুরী ‘লিটন বলেন,ঢাকার লেকের দুর্গন্ধ শুধু লেকের সমস্যা নয়; এটি নগর ব্যবস্থাপনার অসুস্থতার একটি স্পষ্ট সংকেত। গুলশান, বারিধারা ও হাতিরঝিলের লেক পরিবেশ, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ও নাগরিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পয়োনিষ্কাশন ও বর্জ্য লেকে প্রবেশের ফলে দুর্গন্ধ, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস, মশার বিস্তার ও জনস্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।
তাই নতুন সৌন্দর্যবর্ধন নয়—প্রথমে দূষণের উৎস বন্ধ করতে হবে। পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা সংস্কার, অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন, নিয়মিত বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ এবং কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।আধুনিক ও বাসযোগ্য নগর গড়ে তুলতে নাগরিক নিরাপত্তা, পরিবেশের ভারসাম্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থকে এখন থেকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। একটি পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও টেকসই ঢাকা নির্মাণ সময়ের অপরিহার্য দাবি।





