, ,

মুগদা মেডিকেলে রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম চিকিৎসকরা, শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান

নিউজটি শেয়ার করুন

নিয়মবহির্ভূতভাবে চিকিৎসা নেওয়ার চাপ, চিকিৎসকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ ও প্রভাব খাটানোর চেষ্টার অভিযোগ

রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগীকে চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীরা। রোগীর অতিরিক্ত চাপ, সীমিত জনবল এবং নির্ধারিত সিরিয়াল ও চিকিৎসাসংক্রান্ত নিয়ম অনুসরণ না করার মতো পরিস্থিতির কারণে অনেক সময় স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ছে। এর পাশাপাশি কোনো কোনো রোগী বা তাঁদের স্বজনের অসৌজন্যমূলক আচরণ, তাৎক্ষণিক চিকিৎসা নেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি এবং ব্যক্তিগত প্রভাব খাটানোর চেষ্টার অভিযোগও রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, চিকিৎসকদের প্রতিদিনই রোগীর বিভিন্ন দাবি, অসন্তোষ ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সামাল দিয়ে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে হয়। অথচ চিকিৎসাসেবার স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘ্নিত হলে শুধু চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীরাই নন, চিকিৎসার জন্য অপেক্ষমাণ অন্যান্য রোগীরাও ভোগান্তিতে পড়েন। এ পরিস্থিতিতে হাসপাতালের সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে রোগী ও তাঁদের স্বজনদের সহযোগিতা, ধৈর্য এবং প্রচলিত নিয়ম মেনে চিকিৎসাসেবা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

ডেন্টাল বিভাগে চিকিৎসক-রোগীর কথা-কাটাকাটি

হাসপাতালসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ২৭ অক্টোবর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডেন্টাল বিভাগের বহির্বিভাগে একজন রোগীর সঙ্গে কর্তব্যরত চিকিৎসকের কথা-কাটাকাটির ঘটনা ঘটে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, ডেন্টাল বিভাগে প্রতিদিন আনুমানিক ২০০ থেকে ৩০০ রোগীকে সেবা দিতে হয়। বিপুলসংখ্যক রোগীর চিকিৎসা কার্যক্রম সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার জন্য নির্ধারিত সিরিয়াল অনুসরণ করা গুরুত্বপূর্ণ।

চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, কখনো কখনো নির্ধারিত সময়ের পরে এসে কিছু রোগী সিরিয়াল উপেক্ষা করে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা নেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করেন। আবার অপেক্ষা করতে বলা হলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে কর্তব্যরত চিকিৎসক, নার্স ও টেকনোলজিস্টদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করা হয়। এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসকদের পক্ষে একদিকে অপেক্ষমাণ রোগীদের সেবা নিশ্চিত করা, অন্যদিকে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন ওই রোগী নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে এসে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা নেওয়ার জন্য চাপ দেন। তখন কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে অপেক্ষা করতে বলেন এবং রোগীর চাপ কমলে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার আশ্বাস দেন। এ সময় চিকিৎসকের কক্ষে বারবার প্রবেশের কারণে স্বাভাবিক চিকিৎসা কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।

প্রতিদিনের কর্মচাপে চিকিৎসকদের ওপর বাড়তি চাপ

সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকদের কাজ কেবল রোগী পরীক্ষা ও চিকিৎসাপত্র দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। রোগীর অবস্থা মূল্যায়ন, চিকিৎসার পরামর্শ, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং রোগী ও স্বজনদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পাশাপাশি তাঁদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিপুলসংখ্যক রোগীকে সেবা দিতে হয়।

এ অবস্থায় কেউ সিরিয়াল ভেঙে চিকিৎসা নেওয়ার চেষ্টা করলে কিংবা ব্যক্তিগত পরিচয়, ক্ষমতা বা প্রভাবের কথা উল্লেখ করে বিশেষ সুবিধা দাবি করলে চিকিৎসাসেবা পরিচালনায় জটিলতা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে এমন আচরণে আগে থেকে অপেক্ষমাণ রোগীদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কাও থাকে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিকিৎসক বলেন, “সকাল থেকে একটানা বিপুলসংখ্যক রোগীকে সেবা দিতে হয়। আমরা প্রত্যেক রোগীকে যথাসম্ভব আন্তরিকতার সঙ্গে চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু কেউ নিয়মের বাইরে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দাবি করলে অন্য রোগীদের সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হয়। নিয়ম মেনে অপেক্ষা করতে বললে কখনো কখনো বিরূপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়।”

তিনি আরও বলেন, চিকিৎসকদের সঙ্গে রোগী ও স্বজনদের পারস্পরিক শ্রদ্ধাপূর্ণ আচরণ বজায় রাখা জরুরি। কারণ চিকিৎসাসেবার পরিবেশ স্বাভাবিক থাকলেই সব রোগীকে সুশৃঙ্খলভাবে সেবা দেওয়া সহজ হয়।

অভিযোগ জানাতে রয়েছে প্রশাসনিক ব্যবস্থা

হাসপাতালসংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক সূত্রের দাবি, ঘটনার দিন ওই রোগী প্রশাসনিক কক্ষে গিয়ে চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। এ সময় তাঁকে নিয়ম অনুযায়ী লিখিত অভিযোগ দাখিলের পরামর্শ দেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

হাসপাতালসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, রোগীদের অভিযোগ অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। চিকিৎসাসেবায় কোনো ধরনের অবহেলা, অসৌজন্যমূলক আচরণ বা অনিয়মের অভিযোগ থাকলে তা যথাযথ প্রক্রিয়ায় যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া প্রশাসনের দায়িত্ব। তবে অভিযোগ জানানোর সময় চিকিৎসকদের কাজে বাধা সৃষ্টি, উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি কিংবা অনৈতিকভাবে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা কাম্য নয়।

হাসপাতালের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “রোগীদের অভিযোগ জানানোর জন্য প্রশাসনিক ব্যবস্থা রয়েছে। কোনো রোগী সেবা নিয়ে অসন্তুষ্ট হলে তিনি লিখিতভাবে অভিযোগ জানাতে পারেন। অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তবে অভিযোগের নামে চিকিৎসকদের ওপর অনাকাঙ্ক্ষিত চাপ সৃষ্টি করা বা চিকিৎসা কার্যক্রমে বাধা দেওয়া ঠিক নয়। রোগী ও চিকিৎসক—উভয়ের জন্যই নিরাপদ ও সম্মানজনক পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।”

চিকিৎসকদের ওপর প্রভাব খাটানোর চেষ্টা নিয়ে উদ্বেগ

হাসপাতালসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে রোগী বা তাঁদের স্বজনেরা প্রচলিত নিয়মের বাইরে সুবিধা পেতে ব্যক্তিগত পরিচয়, সামাজিক অবস্থান কিংবা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন। প্রত্যাশিত সুবিধা না পেলে কেউ কেউ কর্তব্যরত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে বিরূপ আচরণ করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি হাসপাতাল সবার জন্য উন্মুক্ত চিকিৎসাকেন্দ্র। এখানে প্রত্যেক রোগীর চিকিৎসাসেবা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। তবে সেই অধিকার নিশ্চিত করতে গিয়ে অন্য রোগীর অধিকার ক্ষুণ্ন করা কিংবা চিকিৎসকদের ওপর অনাকাঙ্ক্ষিত চাপ সৃষ্টি করা সমীচীন নয়। চিকিৎসাসেবায় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হলে ব্যক্তিগত প্রভাবের পরিবর্তে নির্ধারিত নিয়ম ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দিতে হবে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, অভিযোগকারীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি

ঘটনাস্থলে উপস্থিত কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁদের কেউ কেউ অভিযোগকারী রোগীর আচরণ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। তাঁদের দাবি, তাৎক্ষণিক চিকিৎসা নেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি এবং পরবর্তী সময়ে প্রশাসনিক পর্যায়ে অভিযোগ জানানোর ধরন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী ওই রোগীর আচরণে প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা ছিল বলেও অভিযোগ করেছেন।

তবে প্রত্যক্ষদর্শীদের এসব বক্তব্যের স্বাধীন যাচাই করা সম্ভব হয়নি। একইভাবে ঘটনার সব দিক সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও উভয় পক্ষের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।

প্রতিবেদন তৈরির সময় অভিযোগকারী রোগীর বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। ফলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানা যায়নি। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করার সুযোগ থাকবে।

চিকিৎসকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি

চিকিৎসকদের নিরাপত্তা ও সম্মানজনক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা একটি কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীরা নিরাপদ পরিবেশে দায়িত্ব পালন করতে পারলে রোগীদের চিকিৎসাসেবা আরও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হয়।

অন্যদিকে, রোগীদেরও যথাসময়ে যথাযথ চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। তাই কোনো অভিযোগ বা অসন্তোষ দেখা দিলে তা উপেক্ষা না করে নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা এবং প্রয়োজনীয় প্রতিকার নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে অভিযোগের নিষ্পত্তি করতে গিয়ে যেন অন্য রোগীদের চিকিৎসাসেবা ব্যাহত না হয়, সেদিকেও নজর দিতে হবে।

স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টদের মতে, চিকিৎসক ও রোগীর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা এবং কার্যকর যোগাযোগ বজায় থাকলে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব। চিকিৎসকদের পেশাগত সিদ্ধান্তকে সম্মান করার পাশাপাশি তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে তা যথাযথ প্রক্রিয়ায় উপস্থাপন করা উচিত।

সুষ্ঠু চিকিৎসা পরিবেশ বজায় রাখতে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন

মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মতো ব্যস্ত সরকারি হাসপাতালে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সীমিত জনবল ও বিদ্যমান অবকাঠামোর মধ্যে এ দায়িত্ব পালন করতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরলসভাবে কাজ করতে হয়।

এ অবস্থায় রোগীদের নির্ধারিত সিরিয়াল অনুসরণ, কর্তব্যরত কর্মীদের নির্দেশনা মেনে চলা এবং জরুরি রোগীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে হাসপাতাল প্রশাসনের উচিত রোগীদের অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির ব্যবস্থা আরও কার্যকর রাখা এবং চিকিৎসকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা।

সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, রোগী ও চিকিৎসক উভয় পক্ষের অধিকার, দায়িত্ব ও পারস্পরিক সম্মান বজায় রেখে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আরও সুশৃঙ্খল, নিরাপদ ও রোগীবান্ধব পরিবেশ গড়ে উঠবে। কারণ চিকিৎসাসেবা কোনো একক পক্ষের প্রচেষ্টায় নয়; রোগী, চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী ও হাসপাতাল প্রশাসনের সম্মিলিত সহযোগিতার মাধ্যমেই একটি কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব।