, ,

​বিধি বাম রাজউকে: দুই বাড়ির মগজে পাড়া দিয়ে উঠছে বহুতল ভবন, পরিদর্শক মোহনের ‘সেতুবন্ধনে’ ফুরফুরে মালিক!

নিউজটি শেয়ার করুন

নগরীর সুপরিকল্পিত আবাসন নিশ্চিত করতে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) কাগজে-কলমে এক বিশাল কর্মীবাহিনী সাজিয়েছে।

মাঠ পর্যায়ে রাজউকের নিয়ম রক্ষায় নিয়োজিত আছেন ইমারত পরিদর্শক, তাদের উপরে প্রধান ইমারত পরিদর্শক, তারও উপরে অথরাইজড অফিসার এবং জোনভিত্তিক দেখভালের জন্য রয়েছেন পরিচালক। উদ্দেশ্য একটাই—আইন মেনে পরিকল্পিত নগরী গড়ে তোলা। কিন্তু বাস্তবে রূপ নিচ্ছে ঠিক তার উল্টো চিত্র। কর্মকর্তাদের ইশারায় এবং পকেটস্থ সমঝোতায় আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ঢাকার বুকে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে একের পর এক ঝুঁকিপূর্ণ ইমারত।

​এরকমই এক নির্মম ও ভয়ঙ্কর অনিয়মের জীবন্ত দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে হোল্ডিং নং- ৫৩৮/৪এ (ননী ভিলা) মনিপুর, মিরপুর এবং সংলগ্ন পাটোয়ারী বাড়ি (৫৩৮/৩) মনিপুর, মিরপুর এলাকা।

​দুই পাশে ‘মগজে পাড়া’, বীর দর্পে উঠছে তালার পর তালা

​হোল্ডিং ৫৩৮/৪ মনিপুর-এর নির্মাণাধীন ভবনটি কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে, বীর দর্পে উপরের দিকে ওঠা শুরু করেছে। রাজউকের ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী, দুই পাশে ন্যূনতম ২ ফিট করে মোট ৪ ফিট জায়গা ছেড়ে ভবন নির্মাণ করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অথচ, এই ভবনটির মালিকের টাকার গরমে যেন আইন অন্ধ। ডানের ‘ননী ভিলা’ (৫৩৮/৪এ) মনিপুর এবং বামের ‘পাটোয়ারী বাড়ি’র (৫৩৮/৩) মনিপুর একেবারে গা ঘেঁষে, দুই পাশের প্রতিবেশীর মাথায় ও মগজে পাড়া দিয়ে দিব্যি একের পর এক তলা ওপরের দিকে তুলে যাওয়া হচ্ছে। প্রতিবেশীর আলো-বাতাস চুরির এই উৎসবে রাজউকের আইন যেন স্রেফ এক টুকরো কাগজ!

​পরিদর্শক মোহনের ‘চমৎকার সেতুবন্ধন’: আইন যখন পকেটস্থ

​প্রশ্ন উঠেছে, কার ইশারায়, কাদের খুঁটির জোরে এই বেআইনি বিলাসপুরী নির্মিত হচ্ছে? অনুসন্ধানে জানা যায়, এই অনিয়মের বীজ বোনা হয়েছিল আরও ৮-১০ মাস আগে। তৎকালীন দায়িত্বে থাকা ইমারত পরিদর্শক সোলাইমান হোসেন ও প্রধান ইমারত পরিদর্শক জয়নাল আবেদীনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় এই বেআইনি নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়।

​আর বর্তমান ইমারত পরিদর্শক মোহাম্মদ মোহন হোসেন মাঠে এসে সেই প্রয়াত ও সিনিয়র কলিগদের দেখানো পথেই হেঁটেছেন। তিনি মাঠের পরিস্থিতি ‘বুঝে-শুনে’ ও গুছিয়ে ভবন মালিকদের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। রাজউকের নিয়ম ভাঙলে কার কী আসে যায়—মোহন সাহেব মাঠে আছেন তো! ভবন মালিক এবং রাজউক কর্তাদের পকেটের সমন্বয় করতে মোহাম্মদ মোহন হোসেন এক চমৎকার ‘সেতুবন্ধন’ তৈরি করেছেন। যার ফলে রাজউকের নাকের ডগায় এই অবৈধ ভবন তুলে মালিক পক্ষ এখন আছেন বেশ ফুরফুরে মেজাজে।

​ওপর মহলের মৌন সম্মতি ও কোটি টাকার বাণিজ্য

​অনুসন্ধানে এবং নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় জনমতে আরও এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। মাঠ পর্যায়ের এই পুকুরচুরি কেবল ইমারত পরিদর্শক মোহনের একক সিদ্ধান্তে হচ্ছে না। অভিযোগ রয়েছে, রাজউককে মোটা অংকের অবৈধ অর্থ দিয়ে ম্যানেজ করেই এই বহুতল ভবন নির্মাণ কাজ সচল রাখা হয়েছে। আর এই পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যস্থতাকারী বা ‘ডিল মেকার’ হিসেবে কাজ করেছেন ইমারত পরিদর্শক মো: মোহন হোসেন।

​স্থানীয়দের দাবি, এই অনৈতিক বাণিজ্যের বিষয়টি রাজউকের ওপর মহলের কর্তারাও বেশ ভালোভাবেই অবগত আছেন। বিশেষ করে সংশ্লিষ্ট জোনের অথরাইজড অফিসার মাসুক সাহেব এবং পরিচালক হামিদুল ইসলাম সাহেব পুরো বিষয়টি জেনেও রহস্যজনক কারণে নীরব ভূমিকা পালন করছেন। ফলে মাঠের পরিদর্শক থেকে শুরু করে জোনের শীর্ষ কর্মকর্তা—সবারই এই নিয়মবহির্ভূত নির্মাণ যজ্ঞে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্মতি রয়েছে বলে জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

মানুষ বাঁচবে না মরবে, দেখার কেউ নেই

​ফায়ার সার্ভিস কিংবা পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র, কিংবা রাজউকের ইমারত বিধিমালা—কোনো কিছুরই তোয়াক্কা করা হয়নি এই ভবনে। ভবিষ্যতে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢোকার মতো ন্যূনতম রাস্তাও রাখা হয়নি। এই ঘিঞ্জি, হিজিবিজি নগরীতে মানুষ বাঁচবে নাকি মরবে, তা নিয়ে এই অর্থলোভী মালিক আর দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। তাদের একমাত্র লক্ষ্য—আইন ভেঙে বহুতল ভবন খাড়া করা আর মাস শেষে ভাড়ার টাকা গোনা।

​মাঠে কাজ করা এই পরিদর্শকেরা যখন রক্ষক হয়ে ভক্ষকের ভূমিকা পালন করেন, আর ওপর মহলের কর্মকর্তারা যখন তাতে চোখ বুজে থাকেন, তখন এই অনিয়মের দায়ভার রাজউকের ওপর মহলের কর্তারা কোনোভাবেই এড়াতে পারেন না। মাঠ পর্যায়ের পরিদর্শক মোহনের এই ‘সেতুবন্ধন’ বাণিজ্য আর কতদিন চলবে? রাজউকের নীতি নির্ধারকদের কি ঘুম ভাঙবে না? নাকি কোনো বড়সড় বিপর্যয়ের পর তাদের নড়েচড়ে বসার চেতনা ফিরবে? ঢাকার সাধারণ মানুষ এখন এই উত্তরই খুঁজছে।