চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির মনোনীত সদস্যদের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দুই দিনব্যাপী সিমুলেশনভিত্তিক প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) শুরু হয়ে বুধবার (৭ অক্টোবর) পর্যন্ত উপজেলার চাম্বল হোসাইনিয়া কনভেনশন হলে এ প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলে প্রশিক্ষণের বিভিন্ন অধিবেশন ও ব্যবহারিক অনুশীলন।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের সার্বিক সহযোগিতায় বাঁশখালী উপজেলা প্রশাসন এ প্রশিক্ষণের আয়োজন করে। এতে সহযোগিতা করে ইউনিসেফ বাংলাদেশ, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি (বিডিআরসিএস), আন্তর্জাতিক ফেডারেশন অব রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজ (আইএফআরসি), ইউএনএফপিএ, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি), সেভ দ্য চিলড্রেন, কেয়ার ইন্টারন্যাশনাল, ইসলামিক রিলিফ, নরক্যাপ ও ইপসাসহ বিভিন্ন মানবিক ও উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা।
মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে মানবিক ও উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর অংশগ্রহণে প্রণীত ‘সিমুলেশনভিত্তিক সমন্বিত প্রশিক্ষণ মডিউল’ অনুসরণ করে এ প্রশিক্ষণ পরিচালনা করা হয়।
প্রশিক্ষণে উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মোট ৩৫ জন প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়, স্বাস্থ্য বিভাগ, কৃষি, প্রাণিসম্পদ, মৎস্য, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা, সমাজসেবা, প্রকল্প বাস্তবায়ন, মহিলা বিষয়ক, যুব উন্নয়ন, খাদ্য, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রতিনিধিরা ছিলেন।
এ ছাড়া আনসার ও ভিডিপি, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি এবং ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি (সিপিপি)-এর প্রতিনিধিরাও প্রশিক্ষণে অংশ নেন। স্থানীয় পর্যায়ে কর্মরত বেসরকারি সংস্থা ইপসা, ব্র্যাক, ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন, হীড বাংলাদেশ, প্রশিকা, দিশারী, কারিতাস ও যুগান্তর সমাজ উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিরাও এতে যোগ দেন।
প্রশিক্ষণে দুর্যোগ ঝুঁকি বিশ্লেষণ, প্রস্তুতি, আগাম কার্যক্রম (অ্যান্টিসিপেটরি অ্যাকশন), দুর্যোগকালীন সমন্বয়, তথ্য আদান-প্রদান, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে হাতে-কলমে অনুশীলন করানো হয়।
সিমুলেশন অনুশীলনের অংশ হিসেবে সম্ভাব্য বিভিন্ন দুর্যোগ পরিস্থিতি তৈরি করে অংশগ্রহণকারীদের নিজ নিজ দপ্তরের দায়িত্ব ও ভূমিকা পালনের সুযোগ দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে দুর্যোগের আগে, দুর্যোগ চলাকালীন এবং পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কীভাবে দ্রুত সমন্বয় ও কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যায়, সে বিষয়ে বাস্তবভিত্তিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেন অংশগ্রহণকারীরা।
প্রশিক্ষণের শেষ পর্যায়ে ‘আফটার অ্যাকশন রিভিউ’ (এএআর) অনুষ্ঠিত হয়। এতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান সক্ষমতা, কার্যক্রমের সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাব্য ঘাটতিগুলো চিহ্নিত করা হয়। পাশাপাশি চিহ্নিত ঘাটতি পূরণ এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় আরও কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে অংশগ্রহণকারীদের মাধ্যমে বাঁশখালী উপজেলার জন্য একটি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়।
সমাপনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. নাসির উদ্দিন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের উপসচিব পদমর্যাদার উপপরিচালক মো. কাজী বদিউজ্জামান, ইউনিসেফ বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের ফিল্ড অফিসের প্রধান (চিফ অব ফিল্ড অফিস) মাধুরী ব্যানার্জী এবং বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির পরিচালক এমএম আলমগীর (অব. কর্নেল)।
সমাপনী বক্তব্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন বলেন, “বাঁশখালী একটি উপকূলীয় ও দুর্যোগপ্রবণ উপজেলা। এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যরা নিজ নিজ দায়িত্ব হাতে-কলমে অনুশীলনের সুযোগ পেয়েছেন। প্রশিক্ষণে প্রণীত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে উপজেলা প্রশাসন সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করবে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সদর দপ্তর, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে।”
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. নাসির উদ্দিন এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. কাজী বদিউজ্জামান বলেন, “সারা দেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটিগুলোকে একই মানের ও বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণের আওতায় আনা আমাদের লক্ষ্য। বাঁশখালীতে অনুষ্ঠিত এ প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে দেশের অন্যান্য এলাকায় প্রশিক্ষণ পরিচালনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”
আয়োজকরা জানান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটিগুলোকে আরও যুগোপযোগী ও কার্যকর করে তুলতে মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে ইউনিসেফ, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিসহ ২০টিরও বেশি মানবিক ও উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা যৌথভাবে এ সমন্বিত প্রশিক্ষণ প্যাকেজ তৈরি করেছে।
পর্যায়ক্রমে দেশের ৭টি বিভাগের ২৫টি জেলা ও ১০৪টি উপজেলায় এ প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর আওতায় সর্বোচ্চ ৫ হাজার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য, সরকারি কর্মকর্তা ও মানবিক সহযোগী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাঁশখালীতে অনুষ্ঠিত প্রশিক্ষণ থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতা, চিহ্নিত ঘাটতি ও প্রণীত কর্মপরিকল্পনা পরবর্তী ধাপের প্রশিক্ষণ আয়োজন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করতে কাজে লাগানো হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।







